শেখ হাসিনাতেই নির্ভার আওয়ামী লীগ, নিরাপদ বাংলাদেশ

Send
ড. এ কে আব্দুল মোমেন
প্রকাশিত : ১৬:২২, ডিসেম্বর ২১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২৪, ডিসেম্বর ২১, ২০১৯

ড. এ কে আব্দুল মোমেন১৯৮১ সালের ১৪, ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের তিন দিনব্যাপী দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে। দলে নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণের পাশাপাশি দলকে অধিকতর শক্তিশালী ও সুসংহত করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনাকে তার অনুপস্থিতিতে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ভয়াল কালো রাতে প্রবাসে অবস্থান করায় বেঁচে যান দুই বোন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। দলের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর ওই বছরের ১৭ মে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসেন। সেদিনের আবহাওয়া ছিল বৈরী। তবু প্রিয় নেত্রীকে সেদিন এক নজর দেখার জন্য কুর্মিটোলা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শেরেবাংলা নগর পর্যন্ত ঢল নামে লাখো মানুষের। শোকাবহ আগস্ট ট্র্যাজেডির পর প্রিয় নেত্রীকে ফিরে পেয়ে আবেগ-আপ্লুত হয়ে পড়ে বাংলার আপামর জনসাধারণ। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু ধ্বনিতে সেদিন প্রকম্পিত হয় পুরো এলাকা। স্বজন হারানোর বেদনায় কাতর  প্রিয় নেত্রী সেদিন স্বদেশের মাটিতে পা রেখে জাতির জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার দীপ্ত শপথ নেন। বিমানবন্দরে লাখো জনতার উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু তনয়া অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেন, ‘বাংলার দুঃখী মানুষের সেবায় আমি আমার এ জীবন দান করতে চাই। আমার আর হারানোর কিছুই নেই। পিতা-মাতা, ছোট ভাই রাসেলসহ সবাইকে হারিয়ে আমি আপনাদের কাছে এসেছি, আমি আপনাদের মাঝেই তাদের ফিরে পেতে চাই।’

সেদিন শেরেবাংলা নগরে সুপ্রশস্থ মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে আয়োজিত বৈদ্যুতিক আলোহীন অন্ধকার পরিবেশ, ঝড়-বৃষ্টির দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও দূর থেকে লাখো মানুষ এসেছিলেন পরিবার হারানো এক এতিম সন্তানকে এক পলক দেখতে। লাখো জনতার মুহুর্মুহু স্লোগানে প্রকম্পিত হয়েছিল গোটা বিমানবন্দর এলাকা। বিমানবন্দরে সেদিন লাখো জনতার উদ্দেশে গণতন্ত্র মুক্তির নবতর সংগ্রামে নিজের বলিষ্ঠ শপথের কথা উচ্চারণ করে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি নেতা নই। সাধারণ মেয়ে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রতিষ্ঠার একজন কর্মী। আপনাদের কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার জন্য আপনাদের নিয়ে আমি নিরলস সংগ্রাম চালিয়ে যাবো।’

পঁচাত্তর ট্র্যাজেডির পর আওয়ামী লীগ মোটামুটি ছন্নছাড়া হয়ে গিয়েছিল। দেশে ফিরে এসে দলটি হাল ধরেন শেখ হাসিনা। ঘটনার পরিক্রমায় সাধারণ জীবনযাপন থেকে আজ  তিনি বিশ্বের প্রভাবশালী নারী প্রধানমন্ত্রী। তবে তার রাজনৈতিক জীবনটা মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। বিশেষত সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত আন্দোলনে তিনি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেন। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ভোটের দাবিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯৮৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি তিনটি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি নব্বইয়ের ঐতিহাসিক গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। সংবিধানের ৫১ ও ৫৬ ধারা অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তরের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ঘোষণা দেন। পরবর্তীকালে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনা পঞ্চম জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত হন। তিনি রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তন করে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের জন্য রাজনৈতিক দলসহ সবাইকে সংগঠিত করেন। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য ১৯৯৪-১৯৯৫ সালে শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রক্রিয়া চালুর জন্য তীব্র আন্দোলন শুরু করেন। তার আন্দোলনের ফলে সৃষ্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ১২ জুন ১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে  আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে নির্বাচিত হয় এবং ২৩ জুন ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হয়ে দেশের উন্নয়ন ও গরিব-দুঃখী মানুষের ভাগ্য-পরিবর্তনে মনোযোগী হন। তার নেতৃত্বেই প্রথমবারের মতো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার গৌরব অর্জন করে বাংলাদেশ। পার্বত্য শান্তিচুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে অশান্ত ওই অঞ্চল তথা সমগ্র দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯৯ সালে তারই উদ্যোগে আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক দিবস ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পায়।

পরবর্তী সময়ে ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে আন্তর্জাতিক মহলের ষড়যন্ত্রের কারণে দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব থেকে সরে যেতে হয়। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির হাতে চলে যায় দেশ। ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে তাকে এবং তার অনুগামীদের হত্যার উদ্দেশ্যে নারকীয় গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। ওই ঘটনায় সৃষ্টিকর্তার অশেষ মেহেরবাণীতে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গেলেও আইভি রহমানসহ আওয়ামী লীগের ২৪ জন নেতাকর্মী নিহত হন। এরপর ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে দায়িত্ব গ্রহণ করে ড. ফখরুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এ সময় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে সোচ্চার হলে শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে সরাতে ড. ফখরুদ্দিনের নেতৃত্বে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই প্রিয় নেত্রীকে গ্রেফতার করে।

দীর্ঘ কারাবাসের পর ২০০৮ সালের ১১ জুন তিনি প্যারোলে মুক্তি পান। এর পরদিনই চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যান। হত্যার হুমকি ও হাজারো ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে চিকিৎসা শেষে ৬ নভেম্বর তিনি দেশে ফিরে আসেন। এর মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের দৃঢ়তা প্রকাশ পায়।

এক এগারোর সময়ে দলের মধ্যে ভাঙনের গুঞ্জন শুরু হলে শেখ হাসিনা তা দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করেন। তিনি তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রাখেন। অসীম সাহস, দৃঢ মনোবল ও অভীষ্ট লক্ষ্যে অবিচল থেকে সব চ্যালেঞ্জ এবং ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে শেখ হাসিনা দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অতীতের যেকোনও সময়ের তুলনায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আজ আরও বেশি শক্তিশালী এবং আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী জাতির সামনে ‘দিনবদলের সনদ’ উপস্থাপন করে আবারও রাষ্ট্রের জনগণের সেবা করার সুযোগ ফিরে পায়। ২০০৯ সালে রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণ করে দেশের উন্নয়নে দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। সরকার গঠনের পর তিনি তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত করেন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর বিশেষ জোর দেন। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার রূপরেখা তৈরি করেন এবং সে অনুযায়ী কাজ করা শুরু করেন। যার ফলে দেশ আজ  উন্নয়নের মহাসড়কে।

২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর শেখ হাসিনা দেশে আইনের শাষণ প্রতিষ্ঠা করেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার খুনিদের বিচার, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি দল ও দলের বাইরের দুর্নীতিবাদ ব্যক্তিদের যথাযথ আইনের আওতায় নিয়ে আসার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা।

সফলভাবে পাঁচ বছর দেশের জনগণের সেবা করার পর ২০১৪ সালে শেখ হাসিনার সরকার উন্নয়নমূলক কাজগুলোর ধারাবাহিকতা ধরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আবারও জনগণের সেবা করার সুযোগ পায়। ২০১৮ সালে ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ শিরোনামে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেন। একাদশ সংসদ নির্বাচনে যা জনমনে ব্যাপক সাড়া ফেলে। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে টানা চতুর্থ বারের মতো সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এক সময়ের কথিত ‘তলা বিহীন ঝুড়ি’, যুদ্ধ বিধ্বস্ত আর ভঙ্গুর অর্থনীতির বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিক উন্নয়নে অপ্রতিরোধ্য। বৈশ্বিক ষড়ষন্ত্র, হাজারো বাধা-বিপত্তি এবং নানা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ পেয়েছে নিম্ন আয়ের অর্থনীতি থেকে মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা। এছাড়া গত এক দশকে সব সামাজিক সূচককে ঈর্ষণীয় সাফল্যের কারণে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে মাথা পিছু আয়। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি যে পথে এগুচ্ছে তার গতিপ্রবাহ দিন দিন বিশ্বকে হতবাক করছে। অতি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড-এর এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের চেয়ে ধনী দেশে রূপান্তরিত হবে বাংলাদেশ। এই সময়ের মধ্যে ভারতীয়দের চেয়ে আর্থিকভাবে স্থিতিশীল অবস্থায় থাকবে এই দেশের জনগণ। সে সময় ভারতের মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে ৫ হাজার ৪০০ ডলারে। একই সময়ে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় আরও ৩০০ ডলার বেড়ে দাঁড়াবে ৫ হাজার ৭০০ তে। বর্তমানে বৃহৎ অর্থনীতির দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৪১তম। বিশ্বের পাঁচটি ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংক বলছে, চলতি বছরে সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে বিশ্বে এমন পাঁচটি দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি ‘দ্য বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট এপ্রিল ২০১৯: টুওয়ার্ডস রেগুরেটরি প্রিডিকটেবিলিটি’ শীর্ষক প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়। এছাড়া অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সূচকেও এগিয়েছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের ‘বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সূচক ২০১৯’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের বছরের তুলনায় সাত ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। এ সূচকে বাংলাদেশের পেছনে রয়েছে ভারত ও পাকিস্তান।

রফতানি খাতেও জয়জয়কার বাংলাদেশের। প্রচলিত ও অপ্রচলিত উভয় বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি বাড়ছে। গেলো অর্থবছরের হিসাব মতে, প্রচলিত বাজারে আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে রফতানি বেশি হয়েছে ১৬ শতাংশ। এ সময় অপ্রচলিত বাজারে রফতানি বেড়েছে ২৭ শতাংশেরও বেশি। বর্তমানে দেশের ৯৮ শতাংশ চাহিদা মিটিয়ে বিশ্বের ১৬০টি দেশে রফতানি হচ্ছে বাংলাদেশের ওষুধ। অথচ এক সময়ে যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে ওষুধ দিতে চায়নি উন্নত বিশ্ব।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নারী-পুরুষ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়নে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। গত এক দশকে বাংলাদেশে নারীর কর্মসংস্থান উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। নারী-পুরুষের সমতা অর্জনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ। সেইসঙ্গে কমেছে মজুরি ব্যবধানও। রাজনৈতিক স্থিতিশীল পরিবেশের কারণে অধিক হারে বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছে বিদেশিরা। বিগত বছরে দেশে ৩৫০ কোটি ডলারের বেশি সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। বস্তুত গেলো বছরে এফডিআইয়ের প্রবৃদ্ধি ৬৮ শতাংশ যা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। এছাড়া সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, সৌদি আরবের মতো দেশগুলোও বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

দেশি-বিদেশি সব ষড়যন্ত্র আর বানোয়াট মনগড়া অভিযোগের পাহাড়কে মিথ্যে প্রমাণিত করে প্রমত্তা পদ্মার বুকে আজ  সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে বাংলাদেশের স্বপ্ন পদ্মা সেতু মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। এক সময় মেট্রোরেলকে স্বপ্ন মনে করা হতো। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়নে অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশে ইতোমধ্যে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে মেট্রোরেল। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট এখন বাস্তবতা। এছাড়া মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে শেখ হাসিনার সরকার। নতুন মেয়াদে চতুর্থবারের মতো সরকার গঠনের পর শেখ হাসিনা জঙ্গি, সন্ত্রাস ও মাদকের মতো দুর্নীতির বিরুদ্ধেও ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেছেন। জনসাধারণের দুর্ভোগ ও ভোগান্তি দূরীকরণে দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ার লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা।

জলবায়ু পরিবর্তনের ও প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকির কারণে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ‘বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা’ নামে একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে শেখ হাসিনার সরকার। সমগ্র বাংলাদেশ এই মহাপরিকল্পনার আওতাভুক্ত। সর্বশেষ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় ‘ডেল্টা প্ল্যান’ নামে বেশি পরিচিত শতবছরের এ মহাপরিকল্পনার অনুমোদন দেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। ২১০০ সাল পর্যন্ত এই প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজ চলবে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এভাবে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ অচিরেই সুখী-সমৃদ্ধ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত হবে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী বা ‘মুজিব বর্ষ’ পালন করবে বাংলাদেশ এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করে বাংলাদেশ হবে মধ্যম আয়ের দেশ। ২০৩০ সালে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় হবে প্রায় ৫ হাজার ৭০০ মার্কিন ডলার। ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াবে বাংলাদেশ।

প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা অসীম সাহস, দৃঢ় মনোবল ও অভীষ্ট লক্ষ্যে অবিচল থেকে সব চ্যালেঞ্জ এবং ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আর এসবই সম্ভব হয়েছে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, প্রজ্ঞা আর কূটনৈতিক দক্ষতার কারণে। মিয়ানমারে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নিপীড়নের মুখে পালিয়ে আসা সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত শেখ হাসিনা আজ ‘মানবতার জননী’। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সাময়িকী ‘দ্য ফরেন পলিসি’র করা ‘প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা’ ক্যাটাগরিতে সেরা ১০ চিন্তাবিদের তালিকায় ওঠে এসেছে জননেত্রী শেখ হাসিনার নাম। মার্কিন প্রভাবশালী সাময়িকী ফোর্বসের চোখে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ১০০ নারী’র তালিকায় ২৬ তম স্থানে রয়েছেন প্রিয় নেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা। বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায়ও স্থান পেয়েছেন তিনি। বিশ্বের সেরা পাঁচ নীতিমান নেতার একজন হলেন প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা; বলছে নাইজেরিয়ার প্রভাবশালী দৈনিক ডেইলি লিডারশিপ।

বর্তমান বিশ্বে এশিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাজনৈতিক নেত্রী হচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এশিয়ার চীন, হংকং, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের পাঁচজন রাজনৈতিক নারী নেত্রীর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড তুলে ধরে আন্তর্জাতিক টিভি চ্যানেল ডিসকভারি ডিকোড একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ‘এশিয়ান ফাইভ মোস্ট পাওয়ার ফুল উইমেন ইন পলিটিক্স’ শীর্ষক সচিত্র প্রতিবেদনটিতে এশিয়ার নারী নেত্রীদের মধ্যে শেখ হাসিনাকে তালিকার প্রথমেই স্থান দেওয়া হয়েছে। আবার, ফোর্বস-এর ২০১৯ সালে বিশ্বের ১০০ ক্ষমতাধর নারীর তালিকা প্রকাশ করেছে। যেখানে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তালিকা অনুসারে বিশ্বের ২৯তম ক্ষমতাধর নারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চেয়ে ক্ষমতাধর কোনও নারী নেই। ফোর্বস প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে বলছে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন শেখ হাসিনা। যিনি বর্তমানে চতুর্থ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।

রোজ গার্ডেন থেকে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। সময়ের পরিসংখ্যানের গ্রাফ বলছে, পার হতে যাচ্ছে ছয় যুগ। প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দীর্ঘ এই সময়ে যেমন বিস্তৃত হয়েছে, বেড়েছে সাংগঠনিক মজবুতিও। বঙ্গবন্ধু মানেই যেমন বাংলাদেশ, তেমনি বাংলাদেশ মানেই যেন আওয়ামী লীগ। স্বাধীনতা অর্জন আর উন্নয়নের পরিক্রমায় শক্তিশালী অস্তিত্বের জানান দেওয়া—দুটোর সঙ্গেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত বাংলাদেশ। ইতিহাসের বিশ্লেষণ বলছে, আওয়ামী লীগ মানে বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূলধারা, আর সংগ্রামী মানুষের প্রতিচ্ছবিও দেখা যায় আওয়ামী লীগেই। বাঙালি জাতির মুক্তির মূলমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে গণতান্ত্রিকভাবে জন্ম নেওয়া উপমহাদেশের প্রাচীনতম ও ঐতিহ্যবাহী বৃহৎ রাজনৈতিক দলটির পূর্ণতা পেয়েছে শেখ হাসিনার প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে। পুরান ঢাকার রোজ গার্ডেনে যে দলটির প্রতিষ্ঠা, সেই দলটি এখন বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে সুরম্য ১০ তলা নিজস্ব কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। শেখ হাসিনা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে একক নেতৃত্বে সামলেছেন দলের গতিপ্রকৃতি। বিরাজনীতিকরণ, ভাঙনের নানামুখী ষড়যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করে দলকে করেছেন শক্তিশালী। তার দূরদর্শী নেতৃত্বের ফলেই বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া দলটি টানা তৃতীয়বারের মতো রাষ্ট্রক্ষমতাতেও আসীন হয়েছে।

গণতান্ত্রিক আন্দোলন, দেশগড়ার বৈচিত্র্যমুখী কর্মসূচি আর নেতৃত্ব তৈরির ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণের পর বলাই যায়, ‘আওয়ামী লীগ একটি অনুভূতির নাম’। এই অনুভূতি নবীণ-প্রবীণের মাঝে ছড়িয়ে দিতে আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। সারাদেশে এখন প্রায় দুই হাজারের মতো প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন, প্রয়োজনের নিরিখে নেওয়া হচ্ছে নতুন নতুন প্রকল্প। আগামী বছর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকীর বছরব্যাপী কর্মসূচি।

‘ভিশন ২০২১’; ‘২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ অর্জন’; ‘রূপকল্প ২০৪১’ বাস্তবায়নেও দরকার ভিশনারি নেতৃত্ব, যা কেবল শেখ হাসিনার মধ্যেই বিদ্যমান। তাই ২১তম জাতীয় সম্মেলনে শেখ হাসিনার কাধে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব তুলে দেওয়া যথার্থ হয়েছে। অতীতের মতো আবারও তার নেতৃত্বে জনগণের কাছে নতুন গতিতে, নব উদ্যমে, নবতর প্রত্যয়-প্রত্যাশার অঙ্গীকার পূরণে নতুন প্রজন্ম নিজেদের নিয়োজিত করবে।

দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই বাবার দেখানো পথে দলকে পুনর্গঠন করতে থাকেন শেখ হাসিনা। দলের মধ্যে একক নেতৃত্বে অবস্থান করেন তিনি। ক্ষমতার বাইরে থেকে কিংবা ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় নিজেদের ভুল শুধরিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ফের গণমানুষের দলে রূপ নিয়েছে, সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়েছে। ধারাবাহিক নেতৃত্বে শেখ হাসিনা আজ সরকারের মধ্যে যেমন অধিক শক্তিশালী, তেমনি দলের মধ্যে আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। সুদিনে সবাইকে পাশে নিয়ে আর দুর্দিনে ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে বন্ধুর পথে এগিয়ে চলছেন। কর্মকৌশল পাল্টে বারবার দলকে করেছেন অপ্রতিরোধ্য। সংগ্রামের এ পথ চলায় বহুবার হামলার শিকার হয়েছেন শেখ হাসিনা। সাড়ে তিন যুগের রাজনৈতিক জীবনে অসংখ্য মামলার আসামিও হতে হয়েছে তাকে। গ্রেফতার হয়েছেন, কারাবরণও করেছেন একাধিকবার। তবু যেন ইস্পাতসম মনোবল। আর এমন মনোবলেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনাতেই নিরাপদ। শত প্রতিকূলতা আর জীবন বিনাশী ষড়যন্ত্র পায়ে ঠেলে শেখ হাসিনা এগিয়ে চলছেন এক অদম্য গতিতে। যেন তার হাতেই আজ সাড়ে চার দশকের বাংলাদেশ অধিক নিরাপদ, নিশ্চিত নির্ভার।

লেখক: পররাষ্ট্রমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

 

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ