‘মিসিং মিডল’-এর স্যার আবেদ

Send
ইকরাম কবীর
প্রকাশিত : ১৭:৪৪, ডিসেম্বর ২৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৫০, ডিসেম্বর ২৪, ২০১৯

ইকরাম কবীরছোটবেলায় একটি কবিতার কয়েকটি লাইন খুব ভালো লেগেছিল। কবির নাম মনে নেই। তবে তিনটি লাইন মনে আছে–

জীবন খুব অল্পের জন্য সুখী,
আরও অল্পের জন্য অসুখী
,
বাকি সবার জন্য অনিশ্চিত
'

কথাগুলো সর্বজনীন। কিন্তু কবির মতো সাজিয়ে সবাই বলতে পারেন না। এসব কথা আমরা সারাক্ষণই বলছি। হাটে-মাঠে-ঘাটে। এবড়োথেবড়ো শব্দে। সুখ-দুঃখের গল্পই আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জীবনের প্রধান ভাবনার বিষয়, আলোচনার বিষয়। বলছি ঠিকই, আলোচনা করছি ঠিকই, তবে কেন যেন আমাদের দুঃখগুলোকে কিছুটা সুখে রূপান্তরিত করতে আমরা কার জন্যে যেন বসে থাকি। আশায় থাকি হঠাৎ করেই যেন দুঃখগুলো সুখ হয়ে যায়। আমরা আমাদের অনুঘটকের জন্যে অপেক্ষা করি। নিজেরা নিজেদের অনুঘটক হই না, নিজের সুখের জন্যে, নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্যে তেমন কিছু করি না। ধরেই নিই, আমাদের সেই বহু প্রতীক্ষিত অনুঘটক কবে দেখা দেবেন এবং এসে আমাদের ভাগ্যে পরিবর্তন আনবেন।

এমন কয়েকজন অনুঘটকের দেখা আমাদের জীবনে মিলেছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে ও পরে আমাদের রাজনৈতিক অনুঘটককে পেয়েছিলাম। তাঁর ডাকে দেশ স্বাধীন হয়েছিল,তা আমরা সবাই জানি।

তারপর পেয়েছিলাম কয়েকজন উন্নয়নের চালিকাশক্তিকে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে প্রায় শূন্য থেকে শুরু করতে হয়েছে। না ছিল খাবার, না ছিল মানুষের বসবাসের জন্যে ঘরবাড়ি। একটি ভগ্ন অর্থনীতিকে আবার দাঁড় করানো তখনকার সরকারের একার পক্ষে সম্ভব ছিল না। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের মানুষকে দেখাশোনা করাও একা সরকারের পক্ষে সম্ভব ছিল না। আবার কেমন করে বেসরকারি উদ্যোগে দেশের মানুষকে সাহায্য করা যায়, তাও আমাদের জানা ছিল না।

আমাদের পথ দেখিয়েছিলেন স্যার ফজলে হাসান আবেদ। তিনি ছিলেন সেই স্বপ্নদ্রষ্টা অনুঘটক, যিনি নিজের স্বপ্ন বাকি সবার মধ্যে সঞ্চালিত করতে পেরেছিলেন। আজকের ব্র্যাকের যেকোনও কর্মীর সঙ্গে কথা বললেই বোঝা যায়, তারা স্যার আবেদের স্বপ্ন দ্বারা কতটুকু উদ্বুদ্ধ। বাংলাদেশের যেই মানুষই তাঁর সংস্পর্শে এসেছেন, তারাই দেশের জন্যে কাজ করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন।

স্যারের কাজের সঙ্গে পরিচয় আমার অনেক দিনের, কিন্তু তাঁর সঙ্গে মুখোমুখি পরিচয় খুব অল্প দিনের। সাংবাদিকতা করতে গিয়ে মাঝে-মাঝে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে, কিন্তু ভালো করে সাক্ষাৎ হয়েছে যখন তাঁর প্রতিষ্ঠিত ব্র্যাক ব্যাংকে কাজ করতে আসি। সাদাসিদে মানুষ। নিজের জন্য চাওয়া একেবারেই নেই। তিনি যে প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি করেছিলেন সেগুলো কেমন করে টেকসই হবে এবং শুধু দেশে নয়, বিদেশেও পিছিয়ে পড়া মানুষকে কেমন করে সাহায্য করতে পারবে– এটাই ছিল তাঁর চাওয়া।

স্যার ফজলে হাসান আবেদের সম্পর্ক ছিল মাটির সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে, মাটির মানুষের সঙ্গে। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের মানুষের জন্যে তিনি যেমন ব্র্যাক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তেমনি তিনি এগিয়ে এসেছিলেন সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষকে ব্যাংকিং সেবা দিতে এবং অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করতে। এই পিছিয়ে পড়া মানুষদের তিনি ‘মিসিং মিডল’ বলতেন। যে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিকরণের কথা আমরা সব সময় বলছি, তা তিনি করে দেখিয়েছিলেন সেই স্বাধীনতার পরপরই।

তিনি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করতেন, পিছিয়ে পড়া মানুষদের উন্নয়ন ছাড়া, বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই তাঁর তৈরি করা আজকের এই ব্র্যাক ব্যাংক। তাঁর তৈরি এই ব্যাংকই বাংলাদেশের প্রথম এই পিছিয়ে পড়া মানুষদের ব্যবসা করতে সাহস দিয়েছিল। এই ব্যাংকই প্রথম ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের বিনাশর্তে পাশে এসে দাঁড়িয়ে দেখিয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতই বাংলাদেশের উন্নয়নের মূলশক্তি।

এরাই আমাদের দেশের সেই ‘মিসিং মিডল’। অর্থনীতিতে এদের অবদানই সবচেয়ে বেশি, কিন্তু এদের কেউ দেখতে পায় না, মূল্যায়ন করে না, এদের কোনও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চায় না। এদের জীবন অনিশ্চিত। এই অনিশ্চিত জীবন থেকেই স্যার আবেদ এই জনগোষ্ঠীকে বের করে এনে এক টেকসই নিশ্চয়তা দেওয়ার চেষ্টা সারা জীবন করে গেছেন। তিনি ছিলেন সেই কবি, যিনি এই জনগোষ্ঠীর অনিশ্চয়তা পরিষ্কার দেখতে পেয়েছিলেন এবং তা দূর করার সমাধান খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন।

নিজের কাজ দিয়ে তিনি যে মাপের মানুষে পরিণত হয়েছিলেন, যে সামর্থ্য অর্জন করেছিলেন, যে প্রভাব তিনি সব ক্ষেত্রে ফেলতে পেরেছিলেন, হয়তো খুবই স্বাভাবিক ছিল রাজনীতিতে জড়িয়ে যাওয়ার। কিন্তু তা আমরা দেখিনি। উন্নয়ন ছিল তাঁর জীবনের ব্রত এবং সেই ব্রত থেকে বিচ্যুত হননি কখনও।  তিনি এত সুন্দর করে রাজনীতি থেকে দূরে থেকেছেন যা বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষের পক্ষেই সম্ভব হয় না। এবং এখানেই তাঁর আরেক সাফল্য।

মানুষের উন্নয়নের কথা ভেবেছেন, কিন্তু শুধু একপেশে উন্নয়ন নিতে তিনি চিন্তা করেননি। একজন মানুষের অর্থের প্রয়োজন। কিন্তু শুধু অর্থ মানুষকে ভালো রাখতে পারে না। তার প্রয়োজন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন, সামাজিক নিরাপত্তা–সবকিছু নিয়ে তিনি এক সামগ্রিক উন্নয়নের কথা ভেবেছেন।

আমরা জানি না তাঁর মতো আরেকজন মানুষ এ দেশে আবার কবে আবির্ভূত হবেন। স্যার আবেদের শিক্ষা আমাদের জন্যে পাথেয় হয়ে থাকবে। তাঁর মতো মানুষের শুধু আমাদের দেশে নয়, এই পৃথিবীতে অনেক প্রয়োজন। আমরা আশা করি তাঁর সঙ্গে যারা কাজ করেছেন, তাঁকে যারা কাছ থেকে দেখে তাঁর কাছ থেকে দীক্ষা নিয়েছেন, তারা সেই দীক্ষাকে পাথেয় করে মানুষের জন্যে কাজ করবেন, দেশের জন্যে কাজ করবেন।

লেখক: গল্পকার

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ