ভারতকে রক্ষা করতে প্রণব বাবুদের মুখ খোলা জরুরি

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৩:৪৩, ডিসেম্বর ২৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২৬, ডিসেম্বর ২৬, ২০১৯

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ধর্মকর্ম করা মানুষ। তিনি বিশুদ্ধ ব্রাহ্মণ। দুর্গাপূজার সময় তিনি নিজ রাজ্য পশ্চিমবাংলায় এসে তার নিজ গ্রামে গিয়ে পূজামণ্ডপে বসে নিজেই পূজার ক্রিয়াকর্ম সমাধান করেন। মুখার্জি, চ্যাটার্জি, বন্দ্যোপাধ্যায়েরা হচ্ছেন উচ্চস্তরের ব্রাহ্মণ। ব্রাহ্মণেরও এক হাজার ৮৮৬টি সাব-কাস্ট আছে।
প্রণব মুখার্জি কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন। প্রতিমন্ত্রী থেকে রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত হয়েছেন। তিনি ভারতের ১৩তম রাষ্ট্রপতি কিন্তু কখনও ধর্মকে রাষ্ট্রব্যবস্থায় টেনে আনেননি। রাষ্ট্রপতির মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি এখন অবসরে আছেন। দিল্লিতেই বসবাস করেন। ভারতীয় রাষ্ট্রপতিরা অবসরে গেলে আর দলীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হন না। প্রণব বাবু এখন রাজনীতি থেকে দূরে অবস্থান করছেন।
ভারতে এখন বিজেপি সরকার। নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী। লোকসভায় বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। বিজেপি হচ্ছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম আর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ ভারতকে হিন্দু রিপাবলিক বানাতে বদ্ধপরিকর। তাই বিজেপি সরকার সেই পথে হাঁটছে। সাম্প্রতিক সময়ে তারা ভারতকে হিন্দু রিপাবলিক বানানোর মতলবে নাগরিক সংশোধনী আইন পাস করেছে, আর সুপ্রিম কোর্টের আদেশে আসামে নাগরিকপঞ্জি হয়েছিল, যা তারা ভারতের সব রাজ্য করার কথা বলে বেড়াচ্ছেন।

নাগরিকত্ব আইনে শুধু বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান থেকে ভারতে গেলে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, খ্রিষ্টানরা নাগরিকত্ব পাবেন, কোনও মুসলমান নয়। আর নাগরিকপঞ্জি নাগরিকত্ব বাতিলের এক নতুন পথ খুলেছে। এখন ভারতে এ নিয়ে জোর আন্দোলন চলছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্ভবত এই আইনের পক্ষে জনমত সৃষ্টির জন্য গত ২২ ডিসেম্বর রবিবার দিল্লির রামলীলা ময়দানে বেশ বড় একটি জনসভা করেছেন। তিনি নাগরিকপঞ্জিকে সুপ্রিম কোর্টের আদেশ বাস্তবায়ন বলে উল্লেখ করেছেন এবং নাগরিকপঞ্জি নিয়ে আরও কিছু কথা বলেছেন, যা সুস্পষ্ট বা সুনির্দিষ্ট নয়।

সুপ্রিম কোর্ট নাগরিকপঞ্জির কথা বলেছেন শুধু আসামের জন্য, অন্য কোনও রাজ্যের জন্য নয়। তারা তো বলছেন সব রাজ্যের কথা। গত ১১ মার্চ ২০১৯ কলকাতায় অমিত সাহা এক জনসভায় বলেছেন, তারা সারা ভারতে এনআরসি করবেন আর ‘উইপোকা, তেলাপোকা বেছে হয়তো মারবেন, না হয় বঙ্গোপসাগরে ছুড়ে ফেলে দেবেন।’

কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বলছেন তারা নাগরিকপঞ্জির কোনও কথা বলেননি। এটা প্রধানমন্ত্রীর স্রেফ একটি মিথ্যা কথা। নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ নাগরিকপঞ্জির কথা সুযোগ পেলেই বলছেন। তা যদি প্রধানমন্ত্রীর মনের কথা হতো তাহলে জনসভায় তিনি বলতে পারতেন নাগরিকপঞ্জি আর কোনও রাজ্যে হবে না। কিন্তু তিনি তা বললেন না। পুরনো এজেন্ডা এত সহজে বাতিল করেন কীভাবে!

এই বছর লোকসভা ভোটের ইশতেহারে এনআরসি নিয়ে বিজেপির প্রতিশ্রুতি ছিল। এতদিন বলেছেন বিজেপি সেই ম্যান্ডেট পেয়েই এনআরসি-সিএএ করেছেন। ক’দিন আগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজেও সংসদে জানিয়েছিলেন, দেশের সব রাজ্যে আসামের মতো জাতীয় নাগরিকপঞ্জি হবেই, এবং তা হবে ২০২৪ সালের ভোটের আগেই। এমনকি এ বছর জুনে সংসদের সেন্ট্রাল হলে স্বয়ং রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ জানিয়েছিলেন, সারা দেশে এনআরসি চালু করাকে তার সরকার অগ্রাধিকার দেবে।

যাহোক, লেখা আরম্ভ করেছি প্রণব বাবুকে নিয়ে। তিনি গত ১৬ ডিসেম্বর নয়াদিল্লির ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন দফতরে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বলেছেন, ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতা মানে যা খুশি তা করা নয়। ভারতে নানা ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায় রয়েছে। গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদের এই পরিবেশ যেন কোনোভাবে লঙ্ঘিত না হয়।’ কিছুদিন আগে তাকে আরএসএস তাদের এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি করে নিয়ে গিয়েছিল নাগপুরে। তিনি সেখানে গিয়েও একই কথা বলেছেন। তাদের এসব কথা বলা অহেতুক।

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে যা হচ্ছে তাকে লক্ষ্য করেই প্রণব মুখার্জি এ কথা বলেছেন। নরেন্দ্র মোদি মনে করছেন তারা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছেন, সুতরাং তারা যেন নারীকে পুরুষ, পুরুষকে নারী বানানোর ক্ষমতার মালিক হয়েছেন। ইচ্ছে করলে বাইর থেকে এনে কাউকে ভারতীয় নাগরিক বানাবেন আর নিজের নাগরিককে নাগরিকত্বহীন করবেন।

গত ক’দিন রাজপথের আন্দোলনের গতি-প্রকৃতিতে মনে হয় না যে ভারতীয় জনগণ ৭২ বছরের পুরনো সংবিধানকে যেনতেনভাবে পরিবর্তন হতে দেবেন। প্রণব বাবুরা একটু শক্ত হলে ভারতীয় শাসনতন্ত্র দুর্বৃত্তদের হাত থেকে রক্ষা পাবে। ভারতের স্থপতিরা বুঝেছিলেন, ভারতে হিন্দুর সংখ্যা বেশি হলেও সেখানে বিচিত্র ধর্ম-বর্ণের লোক বাস করেন। সুতরাং তারা বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের ব্যবস্থা করে সংবিধান রচনা করেছিলেন, যাতে ভারত টিকে থাকে।

মিয়ানমারে ১৩৫টি উপজাতি রয়েছে। কেউ কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি অনুগত নয়। সে কারণে  মিয়ানমার সরকার কেন্দ্রীয়ভাবে সব এলাকায় শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। স্থপতিরা বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হলে ভারতের অবস্থাও মিয়ানমারের মতো হতো। এখন নরেন্দ্র মোদিরা যা করছেন তা মিয়ানমার বানানোর প্রচেষ্টা। অশ্বমেধ যজ্ঞ করে এখন রাষ্ট্রের সীমানা বাড়ানোর যুগ আর নেই।

ভারতের ৩০ কোটি মুসলমানকে যদি নরেন্দ্র মোদির সহ্য করতে না পারেন তবে জায়গা ছেড়ে দিয়ে পৃথক করে দিতে হবে। মেরে কেটে নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে ভাসমান নাগরিক করার পরিকল্পনা স্বপ্নবিলাস মাত্র। আধুনিক বিশ্বে তা কখনও সম্ভব নয়। ভারতের বর্তমান নাগরিকত্ব সংশোধনী দেশটির শাসনতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটা শাসনতন্ত্রের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। পাঁচ নম্বর ধারারও পরিপন্থী। শাসনতন্ত্রের প্রস্তাবনাকে অমান্য করেই এই সংশোধনী পাস করা হয়েছে।

ভারতের সুপ্রিম কোর্টে ৫৯টি রিট আবেদন জমা পড়েছে। নরেন্দ্র মোদি নিজেদের ইচ্ছা বাস্তবায়নের হাতিয়ার বানিয়েছে সুপ্রিম কোর্টকে। সুপ্রিম কোর্টও লম্বা এক তারিখ নির্ধারণ করেছেন শুনানির জন্য। বাবরি মসজিদ নিয়েও এক বিতর্কিত রায় দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। অযোধ্যায় কোনও রাজার রাজত্ব ছিল তেমন কোনও ইতিহাস নেই। এক অনৈতিহাসিক কাল্পনিক রাজার নামে মন্দির। এলাহাবাদ হাইকোর্ট বলেছেন, এখানে কোনও মন্দির ছিল না। তা স্বীকার করেছেন সুপ্রিম কোর্টও। সুপ্রিম কোর্ট মসজিদকে জায়গা না দিয়ে সম্পূর্ণ জায়গাটা মন্দিরের জন্য ছেড়ে দিয়েছেন অথচ মথুরায় মসজিদ আর মন্দির পাশাপাশি রয়েছে। এলাহাবাদ হাইকোর্ট শুধু মথুরার মন্দির-মসজিদের মাঝখানে একটা প্রাচীর নির্মাণ করে দিয়েছে।

যাক, প্রণব বাবুদের ভারতব্যাপী একটা ভাবমূর্তি রয়েছে। এখন প্রণব বাবুরা মুখ খুললে ভারত বেঁচে যায়।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ