আবেগে ‘ভোট ক্রয়’ আর নয়

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৭:০৩, ডিসেম্বর ২৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০৪, ডিসেম্বর ২৮, ২০১৯

তুষার আবদুল্লাহআমরা একজন নগরপিতার আবেগ অশ্রু দেখলাম। মেয়াদ শেষে যখন মনোনয়ন পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়লো, হেভিওয়েট একজন যখন তার দলের পক্ষে মনোনয়নপত্র তুললেন–তখন তিনি বুঝতে পারলেন বিগত দিনগুলোয় কত ভুল করে ফেলেছিলেন! দায়িত্বে থাকার সময় বুঝতে পারেননি। নগরবাসীরা  যখন ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কিত, একের পর এক নাগরিকের প্রাণ যাচ্ছে,  আইসিইউ’তে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে হাজার হাজার মানুষ,  যার মধ্যে শিশুরাও রয়েছে; তখনও তিনি ছিলেন উদ্বেগহীন। নকল, ভেজাল, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ আর কয়েকজন তারকা সঙ্গে নিয়ে তিনি মশার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছিলেন। এডিস মশা জন্ম নেয় স্বচ্ছ জলে। অথচ তাকে দেখা গেছে শুকনো রাস্তায় কামান আর ঝাড়ু নিয়ে ঘুরতে। মশার সঙ্গে লড়াইয়ে তিনি পরাজিত হয়েছেন, এই উপলব্ধি জাগ্রত হতে তার আরেকটি মনোনয়নলগ্ন পর্যন্ত আসতে হলো। তিনি তো দায়িত্ব নেওয়ার পরই সমালোচিত হয়েছিলেন নিজ নামে ঝুলন্ত ডাস্টবিন ফুটপাতে ছড়িয়ে দিয়ে। অকার্যকর ওই ডাস্টবিনগুলো তার আমলের অন্যতম বড় অর্থের অপচয়ের উপলক্ষ ছিল।
তার বাবা যখন নির্বাচিত হয়ে মেয়র হলেন, সেই ১৯৯৪ সালের শেষ নির্বাচনি সভাতেও তিনি আবেগ বাষ্পিত কণ্ঠে বক্তৃতা করেছিলেন। সেই আবেগে নগরবাসীর মনও বাষ্পিত হয়েছিলেন। কিন্তু ভোটে জিতলেও মশার সঙ্গে তিনি জিততে পারেননি।

এত গেলো দক্ষিণের খবর।  নগরবাসী কীভাবে স্বপ্ন দেখতে হয়, আর  কী করে নগর সাজাতে হয়, সে বিষয়ে ঢাকা উত্তরের সাবেক মেয়র প্রয়াত আনিসুল হক এক ধরনের উদাহরণ তৈরি করে নিয়েছিলেন। নগরবাসী যখন আধুনিক শহর গড়ার স্বপ্ন দেখতে ভুলেই গিয়েছিল, তখন তিনি আবার সেই স্বপ্নের বীজ বুনতে শুরু করেছিলেন। দুই-একটি ফুল ফুটতে না ফুটতেই জীবন থেকে বিদায় নেন তিনি। তেজগাঁও-সাতরাস্তা সড়ক থেকে ট্রাক সরিয়েই তিনি অতীত-বর্তমানের মেয়রদের থেকে এগিয়ে গিয়েছিলেন।

তাকে অনুকরণ করে ‘কোকিল’ হতে চেয়েছিলেন দক্ষিণের  মেয়রও, উত্তরের বর্তমান মেয়রকে অনুসরনের চেষ্টা করে গেছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এডিস মশার কাছে তাকেও আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে। এখন উভয়েই বলছেন কিছু কাজ বকেয়া রয়ে গেছে। এজন্য তাদের দাবি—অসমাপ্ত কাজ শেষ করার জন্য সুযোগ দিতে হবে। এখন বিনীত প্রার্থনা। এটা সব দায়িত্ব পালন করা কর্তার কৌশল। এই বিনয়ে মজা গেলে পস্তাতে হয় নাগরিকদেরই।

বিএনপি’র দুই মেয়রকে অবিভক্তকালে দেখেছে নগরবাসী। সদ্য প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকা মেয়াদপূর্তির পরও দীর্ঘ সময় দায়িত্বে ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার প্রতি নগরবাসীর প্রত্যাশার পর্বত তৈরি হয়েছিল। কিন্তু নগরের কিছু রাস্তা মুক্তিযোদ্ধাদের নামে নামকরণ ছাড়া কোনও ঝলক তিনি দেখাতে পারেননি। মির্জা আব্বাস নগর সরকারের ঘোষণা তুলে, নগর সরকার ছাড়া ঢাকার উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে, দায় মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেন। রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে যারা নগরের দায়িত্ব নেন, তাদের দুজনই ব্যবসায়ী। কিছু কাজ দেখানোর চেষ্টার পেছনে উভয়ের প্রচ্ছন্ন শক্তির কথাও নগরবাসীর কাছে অনেকটাই খোলামেলা।

মোহাম্মদ হানিফ, মির্জা আব্বাস ও সাদেক হোসেন খোকা তাদের ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করার খানিকটা হলেও চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাদের উত্তরসূরিরা সেই পথে হাঁটেননি। তারা ‘একলা চলো’ নীতি বেছে নিয়েছিলেন। একলা চলতে গিয়ে নগরের কোনও দুর্যোগ মোকাবিলায় সফল হননি। সর্বশেষ ডেঙ্গু দুর্যোগে আমরা তাই দেখলাম। ৩০ জানুয়ারির নির্বাচন কতটা উত্তাপ ছড়াবে, তার আঁচ আর দুই একদিন পর বোঝা যাবে। ওই উত্তাপই বলে দেবে ভোটকেন্দ্রে নাগরিকদের লাইন দীর্ঘ হবে কতটা। তবে যারাই নগরের দুই প্রান্তের মেয়র হয়ে আসুন না কেন, কাউন্সিলরদের সঙ্গে নিয়ে কাজ না করলে, তারা এবারও নাগরিকদের হৃদয়ে নগরপিতার আসন পেতে ব্যর্থ হবেন।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ