‘প্রধানমন্ত্রী চাইলেই’ ঢাকায় গ্রহণযোগ্য ভোট

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ১৫:০৬, ডিসেম্বর ২৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১০, ডিসেম্বর ২৯, ২০১৯

আমীন আল রশীদনির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ৩০ জানুয়ারি ঢাকার দুই অংশ, অর্থাৎ উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ভোট হবে। মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ‘ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন’ নাগরিকরা।
ভোটাধিকার প্রয়োগের বিষয়টিকে বন্ধনীর ভেতরে রাখার কারণ, বিগত কয়েকটি নির্বাচনে পুরো ভোটব্যবস্থাটি যেভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, তাতে ঢাকা সিটি নির্বাচন কেমন হবে, তা মূলত নির্ভর করছে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।
বলা হয়, ভোট চলাকালীন নির্বাচন কমিশনই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। বস্তুত এটি একটি ‘কেতাবি কথা’। কেন ‘কেতাবি কথা’, সে বিষয়ে যাওয়ার আগে আমরা বরং নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের সাম্প্রতিক একটি মন্তব্যের দিকে দৃষ্টি দেই, যিনি নিয়মিত বিরতিতে ‘বোমা ফাটান’ এবং বাকি চার সহকর্মীর সঙ্গে নিজের পার্থক্যটাও স্পষ্ট করেন। সবশেষে তিনি বললেন, ‘অবৈধভাবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের গণতন্ত্রের প্রতি কোনও কমিটমেন্ট থাকে না।’ এই বক্তব্যের দ্বারা তিনি কী ইঙ্গিত করেছেন, নিশ্চয়ই তার ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই।

স্মরণ করা যেতে পারে, এর আগে তিনি একাধিকবার কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নিজের আপত্তি বা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন। তিনি প্রথম নোট অব ডিসেন্ট দেন সিটি নির্বাচনে এমপিদের প্রচারণার বিষয়ে। এরপর জাতীয় নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহারে আপত্তি জানিয়ে কমিশনের সভা বর্জন করেন। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তিনি সবার জন্য সমান-সুযোগ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলে কিছু আছে বলে তিনি মনে করেন না। ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কথাটা এখন একটা অর্থহীন কথায় পর্যবসিত হয়েছে’ বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি এবার এমনও বলেছেন, নির্বাচন কমিশন আইনত স্বাধীন, কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে সেই স্বাধীনতা নির্বাচন প্রক্রিয়ার কাছে বন্দি। এজন্য নির্বাচন প্রক্রিয়ার সংস্কার প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

এরকম বাস্তবতায় সম্প্রতি ঘোষিত হয়েছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি নির্বাচনের তফসিল। প্রধান দুই দল তাদের প্রার্থীদের নামও ঘোষণা করেছে।

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ আছে আরও দুই বছর। এই সময়ের মধ্যে ঢাকার এই দুই অংশের নির্বাচনকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে মনে করে কমিশনও। স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলেও ঢাকা সিটি নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের মতোই গুরুত্বপূর্ণ এবং মর্যাদার। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের সঙ্গে সরকারে বা সংসদে রদবদলের কোনও সম্পর্ক না থাকলেও, ঢাকা সিটির নির্বাচন বড় দুই দলের জন্যই প্রেস্টিজ ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। ফলে সরকার যদি মনে করে এ দুটি জায়গায় তারা ছাড় দেবে না, তাহলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করা কঠিন।

পুরো নির্বাচন কমিশনও যদি এ ব্যাপারে একমত হন যে তারা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করবেন, সেটি কখনও সম্ভব হবে না যতক্ষণ না সরকার মনে করে তারা এরকম একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানে ইসিকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেবে। সংবিধান (অনুচ্ছেদ ১২৬) যদিও বলছে, ‘নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হইবে’, কিন্তু না করলে কী হবে, সে কথা উল্লেখ নেই। আবার সরকার যদি ইসিকে সর্বাত্মক সহায়তা না করে এবং কমিশন যদি এটা স্বীকার না করে, তাতে জনগণ বা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো যতই চিৎকার করুক, এটা প্রমাণ করা কঠিন যে, নির্বাচন পক্ষপাতদুষ্ট হয়েছে। অর্থাৎ আইনত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন বলা হলেও তাদের নাটাই নির্বাহী বিভাগেরই হাতে। অতএব কেমন ভোট হবে, সেটি নির্বাচনের কমিশনের ওপরে যতটা না, তার চেয়ে অনেক বেশি নির্ভর করে সরকারের ওপরে।

সরকার কী চায় অথবা চায় না, সেটিও নির্ভর করে সরকারের প্রধান তথা রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী মানে প্রধানমন্ত্রী কী চান—তার ওপর। রাষ্ট্রের প্রধান তিনটি (আইন, বিচার, নির্বাহী) অঙ্গের মধ্যে আইন ও নির্বাহী বিভাগ মূলত অভিন্ন। কারণ প্রধানমন্ত্রী একইসঙ্গে সংসদ নেতা এবং দলীয় প্রধান। আবার রাষ্ট্রপতিকে সব কাজ করতে হয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে। এমনকি দেশে জরুরি অবস্থা জারি করতে হলেও সেখানে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ প্রয়োজন। অর্থাৎ সাংবিধানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী প্রকারান্তরে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাটিও প্রয়োগ করেন। প্রধানমন্ত্রী সংসদকে যখন যে ধরনের আইন প্রণয়নের নির্দেশ দেবেন, সংসদ সেটি করতে বাধ্য।

এই বিপুল ক্ষমতাধর ব্যক্তি যা চাইবেন, যেভাবে চাইবেন, রাষ্ট্র মূলত সেভাবেই চলতে বাধ্য। সুতরাং তিনি যদি চান, ৩০ জানুয়ারি ঢাকার দুই অংশে পক্ষপাতমুক্ত নির্বাচন হবে এবং নিজেদের দলীয় প্রার্থীদের যেকোনও মূল্যে জিতিয়ে আনার কোনও লক্ষ্য যদি না থাকে, যদি তিনি মনে করেন জনগণ যাদের ভোট দেবে, তারাই বিজয়ী হবেন, তাহলেই কেবল একটি অবাধ-সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে পারে।

১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে দেশে সংসদীয় পদ্ধতি চালুর প্রাক্কালে সংবিধানের যে ১২তম সংশোধনী আনা হয়, তখন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করে রাষ্ট্রপতিকে মূলত একটি আলঙ্কারিক পদে পরিণত করা হয়। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার বাইরে কোনও নীতি-নির্ধারণে আদতে তার করার কিছুই নেই।

জাতীয় সংসদে বছরের প্রথম অধিবেশনের উদ্বোধনী দিনে রাষ্ট্রপতি যে ভাষণ দেন, সেটিও মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হতে হয়। অর্থাৎ নির্বাহী বিভাগ তাকে যেরূপ কথা বলার অনুমতি দেবেন, মহামান্য রাষ্ট্রপতি কেবল ততটুকুই বলবেন। সংসদে রাষ্ট্রপতির এই ভাষণের পদ্ধতি শুনে কারও মনে হতে পারে, তিনি বোধ হয় সরকারের মুখপাত্র।

আবার ক্ষমতা যাই থাকুক না কেন, রাষ্ট্রপতি পদে মেয়াদ নির্ধারিত। অর্থাৎ একটানা হোক বা না হোক, দুই মেয়াদের বেশি কেউ রাষ্ট্রপতি পদে থাকতে পারবেন না (অনুচ্ছেদ ৫০(২)। যদিও নির্বাচিত হলে একজন ব্যক্তি আজীবন প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারেন। এখানে তাদের কোনও মেয়াদের সীমাবদ্ধতা নেই। অর্থাৎ যখন সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তন করে সংবিধান সংশোধন করা হয়, তখন সচেতনভাবেই প্রধানমন্ত্রীর পদের মেয়াদের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

অস্বীকার করার উপায় নেই, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকে ১৯৯১ সালের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে নির্বাচনি ব্যবস্থা বলে কিছু ছিল না। ওই বছর অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে যে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনি ব্যবস্থা গড়ে উঠছিল, ধীরে ধীরে সেটির অবনতি হতে হতে এখন আর নির্বাচনি ব্যবস্থা বলে দেশে কিছু অবশিষ্ট আছে কিনা, তা নিয়ে জনমনে সংশয় রয়েছে। ফলে যে পদ্ধতিতে নির্বাচন হচ্ছে, সেটির সংস্কার যে জরুরি, এ কথা সচেতন মহল মানলেও সেই সংস্কারের কাজটিও করতে হবে মূলত নির্বাহী বিভাগকে। সরকার যদি মনে করে কোনও সংস্কার প্রয়োজন নেই বা বিদ্যমান ব্যবস্থাটিই সঠিক, তাহলে একা মাহবুব তালুকদার সংস্কারের কথা বলে সংবাদ শিরোনাম হতে পারেন বটে, তাতে পরিস্থিতির কোনও উন্নতি হবে না। বরং তিনি সহকর্মীদের কাছে যেমন ‘সংখ্যালঘু’ হিসেবে প্রমাণিত হবেন, তেমনি ক্ষমতাবানদের রোষানলেও পড়বেন। যেমন সবশেষ মন্তব্যের পরে তার সম্পর্কে তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেছেন, ‘মাহবুব তালুকদার যা বলেছেন তা আত্মপ্রবঞ্চনা। পদত্যাগ করে এ কথাগুলো বললে সমীচীন হতো।’ তথ্যমন্ত্রী মনে করেন, আলোচনায় থাকার জন্য মি. তালুকদার এ ধরনের কথা বলেন।

আমাদের দেশে একটা সময় পর্যন্ত ভোট শব্দটির সঙ্গে ‘উৎসব’ কথাটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিল। ‘আজ ভোট উৎসব’—এরকম শিরোনাম হয়েছে গণমাধ্যমে। কিন্তু ভোট থেকে ‘উৎসব’ শব্দটি তো হারিয়ে গেছেই, বরং অনেক সময় ভোটও হয় না। গত ৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত রংপুর-৩ উপনির্বাচনে ভোট পড়েছে ২২ শতাংশেরও কম এবং ওই সময় একটি সংবাদপত্রের শিরোনাম ছিল: ‘ভোটার খুঁজতে খুঁজতেই শেষ রংপুরের ভোট।’ নির্বাচন চলাকালীন ফেসবুকে ঢাকার একজন সাংবাদিক লিখেছেন, ‘টিসিবির পেঁয়াজ কিনতে লম্বা লাইন, অথচ রংপুরে ভোটারের কোনও লাইন নেই।’

আসন্ন ঢাকা সিটি নির্বাচনে এই অনাগ্রহের পুনরাবৃত্তি না হোক। অথবা এমনও না হোক যে, মেয়র পদে একাধিক প্রার্থী না থাকায় কেবল সরকারি দলের প্রার্থীরাই জিতে গেলেন কিংবা ভোটের মাঠে সব দলের প্রার্থী থাকলেও নির্বাচনি দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিরা বিশেষ প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করলেন যাতে পুরো ব্যবস্থাটি বিতর্কিত হয় এবং ভোট শেষ হওয়ার আগেই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা ভোট বর্জন করেন। এর কোনোটিই স্বাস্থ্যকর নির্বাচন এবং আরও বিস্তৃত পরিসরে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

ভালো ভোট মানে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে, প্রচুর ভোটার উপস্থিতি থাকবে এবং ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে এসে ভোট দিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরবেন এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ভোটগণনা শেষে সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া প্রার্থীকে রিটার্নিং কর্মকর্তা বিজয়ী ঘোষণা করবেন। সেইসঙ্গে পরাজিত প্রার্থীরা ফল মেনে নেবেন। ভোট সুষ্ঠু হলো, শান্তিপূর্ণ হলো, কোথাও উত্তেজনা ছড়ালো না, কিন্তু ভোটকেন্দ্র খালি—এমন শান্তিপূর্ণ নির্বাচন গণতন্ত্রের জন্য কাঙ্ক্ষিত নয়।

যেহেতু নানা কারণেই নির্বাচনি ব্যবস্থাটি বিতর্কিত এবং প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, যেহেতু সাধারণ মানুষের মনে ভোট নিয়ে একধরনের অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে, ফলে ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে সেই ব্যবস্থাটি আবার সুন্দর হয়ে ফিরে আসুক। মানুষ ভোটের লাইনে দাঁড়াক এবং নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাক। আগের রাতে ভোট হয়ে গেছে বা নির্দিষ্ট এক বা একাধিক প্রার্থীর পক্ষে ইসি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকেরা পক্ষপাতমূলক আচরণ করেছেন—এরকম অভিযোগে নির্বাচনি ব্যবস্থাটি আবারও প্রশ্নবিদ্ধ না হোক। কারণ গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান শর্ত গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। এখানে ত্রুটি থাকলে গণতন্ত্রও ত্রুটিপূর্ণ থেকে যায়। 

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর।

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ