২০১৯: ‘বেদনাকে বলেছি কেদো না’র বছর

Send
আহসান কবির
প্রকাশিত : ১৯:৪৫, জানুয়ারি ০১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৪৮, জানুয়ারি ০১, ২০২০

আহসান কবির‘ভালোবাসার বিচার করুক সম্পর্কের চোখ
বন্ধন যে চাই না আমি তেমন কিন্তু নয়
ভালোবাসার অসুখ তোমায় পোড়াবে নিশ্চয়
অশোক হতে চাই না আমি ভুলে তোমার শোক!’
প্রিয় তুনাবী
কেমন আছ ট্রাম্পের দেশে? প্রেমের স্কুল কী এখনো স্মৃতি হয়ে তোমার বুকে ঘণ্টা বাজায়? সম্পর্কের ছুটি শেষ করে আমাকে কি কখনো ফেরাতে ইচ্ছে করে না তোমার প্রেমের স্কুলে? ভালোবাসার অসুখ কি একটুও পোড়ায় না তোমাকে? নাকি হৃদয়ের তালিকা থেকে আমাকে বাদ দিতে ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকারের মতো নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাস করে বসে আছ? ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পাস করা এই বিলের কারণে হয়তো নাগরিকত্ব তালিকায় পাস করে যাবে আফগানিস্থান, পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়া হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ বা অন্য কোনও ধর্মের মানুষ। শুধু ধর্মের কারণে ফেল করে এই তালিকা থেকে বাদ পরে যেতে পারে লাখো মুসলমান, হয়তো তাদের বের করে দেওয়া হবে ভারত থেকে। এত দিন ধরে জমানো সব সম্পদ ফেলে উদ্বাস্তু হয়ে ভারত থেকেই বের হয়ে যাওয়ায় কি তাদের নিয়তি?
তুনাবী, তুমি কি জানো—উদ্বাস্তু হওয়া কতখানি বেদনার, গ্লানির? তবু সিরিয়া,বাংলাদেশ কিংবা আফ্রিকার কয়েকটি দেশের মানুষ গভীর সমুদ্রে ‘কূল নাই কিনার নাই’ হয়ে ভেসে বেড়ায়, খুঁজে ফেরে আমেরিকা, মালয়েশিয়া কিংবা অন্য কোনও দেশের একটু মাটি। বেশিরভাগ মানুষের মৃত্যু হয় সমুদ্রেই, কেউ কেউ বন্দি হয় নিরাপত্তাবাহিনীর হাতে, সর্বস্ব হারিয়ে ফিরতে হয় নিজ দেশেই। উদ্বাস্তুদের কোনও ফেরার সুযোগ থাকে না, যেমন সুযোগ নেই আমার তুনাবী, তোমার কাছে ফিরে যাওয়ার! ভালোবাসার অসুখ হয়তো তোমাকে পোড়ায় না, কখনো টের পাও না তুনাবী, আমার হৃদয় পোড়া উত্তাপ! মনে পড়ে কবি হেলাল হাফিজের সেই কবিতার লাইন—‘আগুনে পোড়ালে তবু কিছু রাখে/ কিছু থাকে/ হোক না তা শ্যামল রঙ ছাই/ মানুষে পোড়ালে আর কিছুই রাখে না/ কিচ্ছু থাকে না।’
হ্যাঁ, তুনাবী। মানুষে পোড়ালে কিচ্ছু রাখে না কিচ্ছু থাকে না। আর তাই মানুষের সৃষ্ট আগুনে এবছরের ফেব্রুয়ারিতে পুরনো ঢাকার চুড়িহাট্টায় পুড়ে গেছে ৭৮ জন মানুষ, ছাই হয়ে গেছে তাদের হৃদয়ের গল্প! চকবাজারের চুড়িহাট্টার ওয়াহিদ ম্যানসন এর সামনের জায়গাটা ছিল গল্পের জায়গা। মুক্ত নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা। আগুনের নদী চুড়িহাট্টাকে মৃত নগরী বানিয়েছে। গল্প আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নেই আর। যে মানুষ পুড়ে যায় তার কিছু গল্প জমে থাকে নিকটজনের কাছে। নাসিরুদ্দিন তার মেয়েকে হারিয়েছিলেন ক্যানসারে। চুড়িহাট্টার আগুন কেড়ে নেয় তার ছেলেকে। যে চার বন্ধু প্রতিদিন আড্ডা দিতেন, চা-বিস্কুট খেতেন সেই আড্ডাতেই তারা পুড়ে মরেছিলেন।একুশের অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করে ফিরছিলেন দুই বান্ধবী—দোলা আর বর্ষা। আগুন ‘কবিতার মতো এই দুইজন মানুষকে’ও পুড়িয়ে মেরেছিল। আগুন কবিতা জানে না, পোড়াতেই জানে। তাই বনানীর ফারুক রূপায়ন টাওয়ারের আগুন পুড়িয়ে মারে ৩২ জনকে। মোস্তাফিজ,ফারুক কিংবা মিথির মতো ফারুক রূপায়ন টাওয়ারের মানুষখেকো আগুনের পেটে যাওয়া ৩২ জনের গল্প এমনই। সব হারানোর এই সব গল্পে মাতম, কান্না কিংবা বিলাপ সব কিছু চলে যায় আগুনের পেটে। মানুষ পুড়ে অঙ্গার হয় এই সব গল্পে। তুনাবী, লাভ আর লোভে পরা মানুষগুলোর লোভাতুর জিহবা কি ওই আগুনের শিখা নয়? কেন ১৮ তলা ভবন ২৩ তলা হবে? কেন নকশার সবটা মেনে ভবন নির্মিত হবে না? কেন এসব উঁচুতলা ভবনে ফায়ার এক্সিট থাকবে না? থাকলেও সেটা খুবই অপরিসর কিংবা বন্ধ করা থাকবে? আগুন নির্বাপণের যন্ত্রপাতি কেন কাজ করবে না? ভবনটা বাসযোগ্য করে গড়ে না তুলে বর্গফুট হিসেবে ভাড়া দেওয়াটাই কি আসল? তুমিও কি সুখের কাছে নিজেকে ভাড়া দিয়েছ তুনাবী? তোমার মতো অর্থাৎ মালিক ছাড়া আর সবার জীবন কি এমন আগুন হাতছানির?
হ্যাঁ, তুনাবী, কারও কারও জীবনের গল্প এমন আগুন হাতছানির।এ বছরের মার্চে ফেনীর সোনাগাজীর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নির্যাতন করার দায়ে মাদ্রসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা গ্রেফতার হলে তার সহযোগীরা নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। পাঁচদিন আগুনের সঙ্গে যুদ্ধ করে পুরো দেশকে কাঁদিয়ে মারা যায় নুসরাত। বছর শেষে সিরাজ উদদৌলার ফাঁসি রায় হয়। জানি না, এই রায়ে নুসরাতের আত্মা আদৌ শান্তি পেয়েছে কিনা। দিন যাবে, তবু তনুর মতো নুসরাতের গল্প বেঁচে থাকবে তার আত্মীয় স্বজনের মাঝে, বেঁচে থাকবে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে। অনেকেই ভাববে প্রতিবাদের আরেক নাম নুসরাত, কেউ কেউ হয়তো তবু বলবে জেনেশুনে আগুনে হাত দেওয়ার নাম সাহস নয়!
তুনাবী, তোমাকে ভালোবাসার আরেক নাম কি আগুনে হাত দেওয়া? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া না গেলেও বেদনার আরেক নাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবরার এর হত্যাকাণ্ড। বাবার যে চওড়া কাঁধ ছোটকালে খুব প্রিয় ছিল আবরারের, শেষযাত্রায় সেই ‘প্রিয় কাঁধ’ই বেছে নিতে হয়েছিল তাকে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের করা চুক্তি নিয়ে স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণে ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্প দিয়ে আবরারকে নির্মমভাবে পেটানো হয়। আবরারের চীৎকারে এগিয়ে আসেনি কেউ। ‘ভাই আমি শিবির নই, ভাই আমার পরিবারের সবাই আওয়ামী লীগ’—আবরারের এই আকুতি শোনেনি কেউ। মৃত্যুর আগে তাকে কেউ একফোঁটা জল দেয়নি! হত্যার পর তার লাশ ফেলে রাখা হয়েছিল সিঁড়িতে! হয়তো লাশটা গুম করে ফেলার ইচ্ছে ছিল হত্যাকারীদের। দুই-একজন দেখে ফেলার কারণে লাশটা সিঁড়িতেই ফেলে রাখা হয়। তুনাবী, ভালোবাসার জন্য যদি আমাকে কখনো শাস্তি দিতে হয়, তাহলে কিছু বদনাম দিয়ে তারপর হত্যা করো আমাকে। হয়তো কোনও শাস্তিই হবে না তোমার। এরপর এই উদ্বাস্তুর লাশ ফেলো রেখো রাস্তায়, প্রিয় তুনাবী, এ বছরের কোনও একদিন, ঢাকার রাস্তায় যেমন মুখ থুবড়ে পরেছিল তসলিমা বেগম রেনুর লাশ। ঢাকার বাড্ডার একটি স্কুলে মেয়েকে ভর্তি করার জন্য কথাবার্তা বলতে গিয়েছিলেন রেনু। গুজবের পাখায় ভর করা ফুঁসে ওঠা অবুঝ মানুষ ছেলে ধরা সন্দেহে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলে তাসলিমা রেনুকে, তার লাশ মুখ থুবড়ে পরে থাকে রাস্তায়, কেউ এগিয়ে আসেনি তাকে উদ্ধার করতে। ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে একা একা বাস করা রেনুর মেয়ের জন্য খাবার নিয়ে ফেরার কথা ছিল। আজও হয়তো ছোট্ট মেয়েটা অপেক্ষা করে থাকে, ভাবে তার মা ফিরবেই!
তুনাবী, তুমি যেমন বেঁচে থেকেও ফিরবে না, তেমনি এ বছর না ফেরার দেশে চলে গেছেন মি. ক্লিনখ্যাত রাজনীতিবিদ সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, কবি আল মাহমুদ, সংগীতশিল্পী সুবীর নন্দী, মুক্তিযোদ্ধা ,সুরকার ও সংগীত পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ফজলে হোসেন আবেদ, নাট্য ব্যক্তিত্ব ও সাহিত্যিক মমতাজউদ্দীন আহমেদ এবং হোসাইন মুহম্মদ এরশাদসহ অনেকে। যতদিন তুমি ফিরবে না তুনাবী, ততদিন মনে পড়বে সুবীর নন্দীর সেই বিখ্যাত গান—‘হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে একটি কথাই শুধু জেনেছি আমি/ পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই’ অথবা ‘কেন ভালোবাসা হারিয়ে যায় দুঃখ হারায় না/ কেন স্বপ্ন ভেঙে যায়/ মানুষ কথা দিয়ে কথা রাখে না!’ যতদিন বাংলা কবিতা থাকবে আল মাহমুদের কথা মানুষ ভুলবে না। তুনাবী, তোমার সঙ্গে আমার মিলন হয়নি বলে বিয়ের কাবিনটা আমার কাছে সোনালিই থেকে যাবে! যতদিন বাংলাদেশ থাকবে মানুষ মনে রাখবে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের নাম। গাইবে—‘সবক’টা জানালা খুলে দাও না’ কিংবা ‘রেললাইনের ধারে মেঠোপথটার পাশে দাঁড়িয়ে/ এক মধ্যবয়সী নারী রয়েছে দু-হাত বাড়িয়ে/ খোকা ফিরবেই।’
কোনও মায়ের আকুতিতেই আর ফিরবেন না মুক্তিযোদ্ধা ও অবিভক্ত ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা। মুক্তিযুদ্ধে জিতে গেলেও ক্যানসারের সঙ্গে জিততে পারেননি সাদেক হোসেন খোকা। ঢাকা শহরের রাস্তাগুলো ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের বীরনায়কদের নামে নামকরণ করার কারণে মানুষ তাকে ভুলতে পারবে না।
তুনাবী, দুই যুগ অপেক্ষার পরও যেমন আমি তোমাকে ভুলতে পারিনি ঠিক তেমনিভাবে ভুলতে পারবো না তিতাস ঘোষকে। ছেলেটা মোটরসাইকেল চালাতে যেয়ে আহত হয়েছিল। তাকে প্রথমে ভর্তি করা হয়েছিল খুলনার একটা হাসপাতালে। সেখান থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা আনার সময় অ্যাম্বুলেন্স আটকে দেওয়া হয় মাওয়া ফেরিঘাটে। যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার এক ভিআইপির জন্য ফেরি আটকে রাখা হয়। দেরির কারণে ফেরির ছাড়ার পর মাঝনদীতেই মারা যায় তিতাস!
তুনাবী, তোমার মতো ভিআইপি প্রেমিকার কারণেই হয়তো একদিন খুব অবহেলায় মারা যাবো আমি। একজনমের প্রতীক্ষা শেষে শুধু তোমার প্রতীক্ষা নিয়ে আমি পরজনমে যাবো। এই দেশে বাংলা ছবির বাস্তবতার মতো কোনও রকমে বেঁচে আছি আমি। ২০১৯ সালের বায়ান্ন সপ্তাহে মুক্তি পেয়েছে মাত্র ৪৬টি ছবি, ‘বক্সঅফিস হিট’-এর তালিকায় নাকি দু’টি ছবিও নেই। এক সময়ের চব্বিশ ঘণ্টা গমগম করা এফডিসি এখন ভুতুড়ে নগরী, এক সময়ের জমজমাট জুট মিলগুলোর মতোই ‘পোড়োবাড়ি’ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বকেয়া মজুরি আদায়ের জন্য জুটমিলের শ্রমিকরা মাঝে মাঝে অনশন ধর্মঘটের ডাক দেয়, চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকারা মাঝে মাঝে খবর হয়ে আসেন পত্রিকার পাতায় কিংবা টেলিভিশনগুলোতে!
তুনাবী, আমি এখনও সৎ-প্রেমিকের মতো জীবন যাপন করি। আমাকে নিয়ে খবর প্রকাশিত হয় না যেমন হয় বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের নিয়ে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ফারজানার বিরুদ্ধে ছাত্র বিক্ষোভের জের ধরে কয়েক মাস ভার্সিটি বন্ধ থাকে। কোটি টাকা ঘুষ দেওয়াকে বলা হয় ‘ঈদ সেলামি’ এবং এই অভিযোগে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক শোভন ও রাব্বানী তাদের দলীয় পদ হারান, কিন্তু ভিসি ফারজানা ইসলাম ঠিকই টিকে যান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর আখতারুজ্জামানের ডায়ালগ, ‘দশ টাকায় একটা চা, একটা সিঙ্গাড়া একটা সমুচা পাওয়া যায়—এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জানলে বিশ্বরেকর্ড হতো’ ভাইরাল হয়। ভাইরাল হয় জগন্নাথ ইউনিভার্সিটির ভিসি মিজানুর রহমানের ডায়ালগ—‘প্রধানমন্ত্রী চাইলে আমি ভিসির পদ ছেড়ে যুবলীগের দায়িত্ব নেবো’। এক ছাত্রীর সঙ্গে কথোপকথনের রেকর্ড ভাইরাল হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বিরুদ্ধে ছাত্র ছাত্রীদের তুমুল আন্দোলন জমে ওঠে। এর জেরে ভিসি নাসিরউদ্দীন পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ভিসিবিরোধী আন্দোলন হয় পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে, বরিশাল ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। রেডিও, টেলিভিশন ও পত্রপত্রিকার খবরের শিরোনাম হওয়ার কারণে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের নাম দেওয়া হয় ‘রূপাচার্য’ (যারা ছাত্রছাত্রীদের স্বার্থের বিপক্ষে গিয়ে নিজ ও সরকারের স্বার্থকে রূপ দেন, তাকেই রূপাচার্য বলা হচ্ছে) এসব ঘটনার বিপরীতে তুনাবী, তুমি আমাকে ‘প্রেমাচার্য’ নাম দিতে পারো। কারণ আজও আমি তোমার অপেক্ষায় সৎ প্রেমিকের মতো কোনও রকম জীবনযাপন করছি!
তুমিহীনা দুই যুগ বেঁচে থাকার মতো পেঁয়াজবিহীন কয়েক মাস খাওয়া-দাওয়া করতে বাধ্য হয়েছি। তুনাবী, তোমার মতো দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছিল পেঁয়াজ। দুই যুগ আগে তোমার চলে যাওয়াকে আমি যেমন গুজব ভেবেছিলাম, এ বছর তেমন গুজবের পাখায় ভর করা গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন কয়েকজন, গুজব উঠেছিল পদ্মাসেতু নির্মাণে নাকি মানুষের কাটা মাথার দরকার হচ্ছে। লবণ বাজারে নেই এমন গুজবের কারণে লবণ নিয়েও লঙ্কাকাণ্ড হয়েছে এদেশে। বঙ্গবন্ধু বিপিএলে বোম্বে থেকে ক্যাটেরিনা কাইফ আর সালমান খানরা এলেও এটা নিয়ে তেমন লঙ্কাকাণ্ড ঘটেনি। যদিও শ্রীলঙ্কায় গির্জায় আত্মঘাতী বোমা হামলায় মারা গেছে প্রায় তিন শত মানুষ, মারা গেছে নিউজিল্যান্ডে, মারা গেছে আইএস প্রধান বাগদাদি, তবু সন্ত্রাসবাদী হামলা তেমন কমেনি, হয়তো কমবেও না। তুনাবী কখনোই কমবে না তোমার প্রতি আমার ভালোবাসার আকুতি। যতদিন বেঁচে আছি তোমাকে না পাওয়ার বেদনাকে বুকে নিয়েই বাঁচবো। হয়তো চুড়িহাট্টা বা ফারুক রূপায়ন টাওয়ারের আগুনের মতো আমার হৃদয়টা পুড়তেই থাকবে। হয়তো সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত রাজীবের দুই এতিম ভাইয়ের মতো আমি আরও ক্রমাগত অসহায় হবো, দুই বাসের মাঝখানে ঝুলে থাকা রাজীবের কাটা হাতের মতো আমার ভালোবাসাও ঝুলে থাকবে, তবু সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত দিয়া খানম ও রাজুর মতো আমি তোমাকে কখনোই ভুলতে পারবো না তুনাবী। আমি আজীবন মুক্তিযুদ্ধ ও তোমার প্রেমে সৎ থেকেছি, রাজাকারের তালিকা প্রণয়ন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক যতবড় ভুল করেছেন, আমি কখনো তোমার প্রতি সামান্য ভুলও করতে পারবো না। তুমুল আলোচিত কবিতার বই ‘যে জ্বলে আগুন জ্বলের’ পর ছত্রিশ বছর পার করে হেলাল হাফিজ এ বছর তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থের নাম যেমন রেখেছেন—‘বেদনাকে বলেছি কেদো না’, ঠিক তেমনি তুনাবী, এবছর আমার জমানো সব বেদনাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছি কেঁদো না! তুনাবী অনেকেই তোমার আমার প্রেমের গল্প জানতে চায়, এর পরিণতির কথা জানতে চায়। আমরা কে কাকে ছেড়ে গেছি, সেই হারজিতের গল্প শুনতে চায়। আমি তাদের কাছে হেলাল হাফিজের সুন্দর দু’টি লাইন তুলে ধরতে চাই:
হয়তো তোমাকে হারিয়ে দিয়েছি
নয়তো গিয়েছি হেরে
থাক না ধ্রুপদী অস্পষ্টতা
কে কাকে গেলাম ছেড়ে!
ধ্রুপদী অস্পষ্টতা নিয়ে কিছু প্রেম টিকে থাকুক তুনাবী। ভালো থেকো। আশা করি ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো নার’ বছর পার করে মানুষ মানুষকে নিয়ে যাবে আশা ও হাতছানিময় নতুন বছরে!
ইতি
তোমার চালচুলোহীন
মুনাদ

লেখক: রম্য লেখক

/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ