৩০ জানুয়ারি কী হতে যাচ্ছে?

Send
বিভুরঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৩:১৮, জানুয়ারি ০৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:২০, জানুয়ারি ০৩, ২০২০

বিভুরঞ্জন সরকার২০১৯ সালকে বিদায় দিয়ে ২০২০ সালকে আমরা বরণ করে নিয়েছি। গত বছর শুরু হয়েছিল একাদশ সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী উত্তেজনা দিয়ে। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছিল একাদশ সংসদ নির্বাচন। ওই নির্বাচনের ফল হয়েছিল ‘বিস্ময়কর’! আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা পেয়েছিল অস্বাভাবিক জয়। বিএনপি ও তার মিত্রদের ঘটেছিল শোচনীয় পরাজয়। নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়েছিল। মানে, বিএনপিসহ সবাই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। দশম সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়নি। কারণ বিএনপিসহ অনেক দলই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। তারপর সেই নির্বাচনটি শান্তিপূর্ণও হয়নি। জ্বালাও-পোড়াওসহ ব্যাপক সহিংসতা হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন বন্ধ করা যায়নি। ওই বিতর্কিত নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত সরকার মেয়াদকাল পূর্ণ করতে পারবে না বলে মনে করা হলেও তা হয়নি। সরকার দাপটের সঙ্গেই মেয়াদ পূর্ণ করে নতুন নির্বাচনের আয়োজন করেছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার কথা বললেও বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে গিয়েছে। আগের নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ভুলের পুনরাবৃত্তি করা থেকে বিএনপি বিরত থাকে একাদশ সংসদ নির্বাচনে। বিএনপি ভেবেছিল একাদশ সংসদ নির্বাচনে দেশে ভোট বিপ্লব হবে। আগের নির্বাচনে মানুষ ভোট না দিলেও আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করায় বিএনপি ধরেই নিয়েছিল, মানুষ এই ‘শঠতা' মেনে নেবে না। আওয়ামী লীগের পেছনে জনগণের সমর্থন নেই বলেই তারা চালাকির আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু সুযোগ পেলেই মানুষ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ভোট দেবে। আর আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানেই বিএনপি। আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরে মানুষ আর কাকে ভোট দেবে?

ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে একটি ঐক্যফ্রন্ট করে বিএনপি ঐক্যের পরিধি বাড়িয়ে একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি নিশ্চিত করতে চেয়েছিল। রাজনীতি যেহেতু কৌশলের খেলা, সেহেতু বিএনপির কৌশলের বিপরীতে আওয়ামী লীগ তথা সরকারও কৌশল করছিল, নির্বাচনে জেতার ছক কষেছিল। সরকারের কৌশল বুঝতেই পারেনি বিএনপি ও তার মিত্ররা। ভোটের ফল ঘোষণার পর বোঝা গেলো বিএনপি আওয়ামী লীগের ভরাডুবি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলেও আওয়ামী লীগ বিএনপির লজ্জাজনক হার ঠিকই নিশ্চিত করেছে। নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, বিএনপি ৬০/৭০টি আসন পেতে পারে। ভোটের ফল ঘোষণার পর সেটা হলো ৬/৭টি।

নির্বাচনের এই ফল মেনে নেওয়া বিএনপির জন্য সহজ ছিল না। কিন্তু এই ভোট-অনিয়মের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী প্রতিবাদ তেমন জোরালো হলো না। মানুষ অসন্তুষ্ট চিত্তে ফল মেনে নিলো। এরকম নির্বাচন যে প্রহসন, এটা যে গণতন্ত্রের চিরায়ত ধারণার পরিপন্থী, তা বুঝেও কেন এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে উঠলো না, ভাবার বিষয় সেটাই। সরকার বা আওয়ামী লীগের ওপর মানুষের অসন্তোষ থাকলেও বিএনপির ওপর মানুষের আস্থাহীনতা আরও প্রবল বলেই সম্ভবত মানুষ একাদশ জাতীয় সংসদের ফলও মেনে নিয়েছে।

নির্বাচনের ফল মেনে নিতে কিছুদিন গাঁইগুঁই করলেও ধীরে ধীরে শান্ত হয় বিএনপি। এমনকি সংসদে না যাওয়ার সিদ্ধান্তেও অটল থাকতে পারেনি দলটি। আওয়ামী লীগের কাছে কৌশলের খেলায় হেরে গিয়ে বিএনপি এখন পস্তাচ্ছে। তারা কোমর সোজা করে আর দাঁড়াতেই পারছে না। তাদের জড়তা কাটছে না। একটা বছর কেটে গেলো কিন্তু বিএনপি পথের দিশা খুঁজে পেলো না। বিগত বছরজুড়েই ‘তামাশার নির্বাচন’ নিয়ে মুখরোচক আলোচনা হয়েছে, কিন্তু দেশে আবার কীভাবে একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা যায়, তার কোনও সর্বসম্মত উপায় খুঁজে বের করা যায়নি।

নতুন বছর শুরু হয়েছে নির্বাচনের উত্তাপ ছড়িয়ে। আগামী ৩০ জানুয়ারি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এটা জাতীয় নির্বাচন নয়। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী পরাজিত হলে সরকারের পতন হবে না। বিএনপির প্রার্থী জিতলে তারা সরকারও গঠন করতে পারবে না। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও বলেছেন, ওই নির্বাচনে হারলে তাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে না। এসবই ঠিক। তারপরও ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যে জয়লাভের জন্যই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে, তা নিয়েও কোনও সংশয় থাকা উচিত নয়। দক্ষিণ সিটিতে নতুন প্রার্থী দেওয়ার কারণেও বোঝা যায়, আওয়ামী লীগ সিটি নির্বাচন হালকাভাবে নিচ্ছে না। ঢাকা-১০ আসনের সংসদ সদস্য এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আত্মীয় শেখ ফজলে নূর তাপস সংসদ সদস্যপদ ছেড়ে দিয়ে মেয়র পদে প্রার্থী হয়েছেন, নিশ্চয় জয়ের স্বপ্ন নিয়েই।

সিটি নির্বাচনে বিএনপিও অংশ নিচ্ছে। তবে বিএনপি কি জেতার জন্য এই নির্বাচন করছে? বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘এই সরকার ও এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন কখনও অবাধ ও সুষ্ঠু হতে পারে না। তারপরও গণতান্ত্রিক উপায়ে আমরা রাজনীতি করি, জনগণের কাছে পৌঁছার জন্য এবং আমাদের  দাবিগুলোকে জনগণের কাছে নিয়ে যেতে এই নির্বাচন আমরা হাতিয়ার হিসেবে নিয়েছি।’ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ও বলেছেন, ‘আমরা জেনেশুনে বিষ পান করেছি।’ অর্থাৎ পরাজয় জেনেও তারা সিটি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। মির্জা আলমগীর স্পষ্ট করেই বলেছেন, সুষ্ঠু হবে না প্রমাণ করতেই নির্বাচনে যাচ্ছে বিএনপি। নির্বাচনের আগেই হেরে যাওয়ার মানসিকতার প্রকাশ কি দলের কর্মী-সমর্থকদের উৎসাহিত করবে? বিএনপি যেহেতু নিজেদের জনপ্রিয় বলে দাবি করে, সেহেতু তাদের পজিটিভ প্রচারণা চালানো উচিত।
তবে নির্বাচনে হার কিংবা জিত—দুটোতেই বিএনপির লাভ। জিতলে তো কথাই নেই। যেমন মির্জা আলমগীর এখনই বলছেন, ‘১০০ জন লোককে জিজ্ঞাসা করুন, ৯০ জনই বলবে এই সরকারকে আমরা চাই না।’ জিতলে আরও বড়াই করে বলবেন, কেমন বলেছিলাম না, এই সরকারের পেছনে জনসমর্থন নেই। তাই সরকারের পদত্যাগ এবং আগাম জাতীয় নির্বাচনের দাবি তুলে হইচই শুরু করতে পারবে। আবার পরাজিত হলেও তারা পুরনো কথাই নতুন করে বলতে পারবে, আমরা আগেই বলেছিলাম, এই সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীন সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি তারা আবার সামনে আনার সুযোগ পাবে।

৩০ জানুয়ারির ঢাকার দুই সিটির নির্বাচনের জয়-পরাজয় আওয়ামী লীগ এবং সরকারের জন্য কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ওবায়দুল কাদের সিটি নির্বাচনকে নতুন বছরের প্রথম চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, ‘একটা ভালো নির্বাচন হোক, এটাই চাই। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিতে নির্বাচন কমিশনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবো। ফল যাই হোক মেনে নেবো।’

নির্বাচনের ফল নিয়ে কারও কারও আগ্রহ-কৌতূহল আছে। আবার অনেকের নেই-ও। আওয়ামী লীগ হারার জন্য নির্বাচন করছে না, বিএনপিও জেতার জন্য করছে না। এই বিষয়টি মাথায় রাখলেই নির্বাচন কেমন হবে তা বোঝা যায়। তাই ৩০ জানুয়ারি কী হবে, তা নিয়ে আগাম উত্তেজনা ছড়ানোর কিছু আছে বলে মনে হয় না। ১০০ জনের ৯০ জনই যদি এই সরকারকে না চাইতো, তাহলে বিএনপিকে এমন এতিমের মতো চলতে হতো না। আওয়ামী লীগ দলকে নবায়নের চেষ্টা করছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে। দলের পরিচয়ে যারা অন্যায়-অপকর্ম করেছে, তাদের বিরুদ্ধে সীমিতভাবে হলেও ‘অ্যাকশন' শুরু হয়েছে। ইমেজ সংকট কাটিয়ে ওঠার একটি গরজ আওয়ামী লীগ এবং সরকার বোধ করছে। অর্থাৎ তাদের কানে পানি ঢুকেছে। কিন্তু বিএনপি তো যেমন ছিল তেমনই আছে। তাদের কোনও পরিবর্তন নেই। দেশ বদলাচ্ছে। বদলাচ্ছে মানুষের মন-মানসিকতা। রাজনীতি নিয়ে মানুষের মাথাব্যথা কম। এই যে দেশে রাজনীতির নামে কোনও অশান্তি নেই, ভাঙচুর-জ্বালাও-পোড়াও নেই, এতে মানুষ খুশি। কিছু মানুষ নিশ্চয়ই পরিবর্তন চায়। কিন্তু তার জন্য তার জীবন-জীবিকা বিপন্ন হোক—তা চায় না। নানা রকম অনিশ্চয়তা থাকলেও দেশে না-খাওয়া মানুষ নেই বললেই চলে। চরম দারিদ্র্য দূর হয়েছে। তাই এখন কেবল এক সরকারকে সরিয়ে আরেক সরকার গদিতে বসানোর রাজনৈতিক বিলাসিতা অনেকের মধ্যেই নেই।

আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরালে কারা ক্ষমতায় আসবে? তারা এরচেয়ে ভালো কী করবে, কীভাবে করবে, সেটা মানুষের কাছে স্পষ্ট না হলে মানুষ পরিবর্তনমুখী হবে বলে মনে হয় না।


শেখ হাসিনার চেয়ে উপযুক্ত কোনও নেতাও মানুষের চোখের সামনে নেই। হাসিনার বিকল্প যে খালেদা নন, এখন এটা মানুষ বোঝে। তাই বিএনপিকে কেবল আওয়ামী লীগবিরোধিতায় মশগুল হয়ে থাকলে হবে না, তাদের রাজনীতি বদলাতে হবে, নেতৃত্বও বদলাতে হবে। মানুষের মনোভাব না বুঝে শুধু বাগাড়ম্বর করলে চলবে না। ৩০ জানুয়ারি ঢাকা উত্তরে আওয়ামী লীগের ব্যবসায়ী নেতা আতিকুল ইসলাম মুখোমুখি হবেন বিএনপির তাবিথ আওয়ালের। তাবিথ গত নির্বাচনে আনিসুল হকের সঙ্গে লড়তে গিয়ে ভোটের দিন দুপুরেই রণে ভঙ্গ দিয়েছিলেন। তারপর এই কয় বছর কি তিনি মানুষের সঙ্গে ছিলেন? তবে আপদে-বিপদে মানুষের পাশে না থাকলেও এবার নাকি তিনি শেষ পর্যন্ত থাকবেন নির্বাচনী মাঠে। আতিকুল হকের নয় মাস মেয়রগিরি করার অভিজ্ঞতা আছে। দেখা যাক, কী হয়!



ঢাকা দক্ষিণে আওয়ামী লীগের ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির নতুন প্রার্থী প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন। তিনি সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে। বাবার সহানুভূতি কাজে লাগিয়ে বাজিমাত করতে পারবেন কি? তিনি রাজনীতিতে নবাগত এবং নির্বাচনি অভিজ্ঞতাও নেই। বিএনপির ধানের শীষ তার শক্তি এবং বাবার পরিচয় তার ভরসা। আওয়ামী লীগ প্রার্থী শেখ তাপস রাজনীতিতে একেবারে নতুন নন। একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার অভিজ্ঞতাও তার আছে। আর আছে নৌকা ও সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার ‘দোয়া'। দুই সিটির নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে, সেটা বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু নির্বাচনটি বিতর্কমুক্ত হবে, সে নিশ্চয়তা কি কেউ দিতে পারবেন?
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

/এমএমজে/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ