জঙ্গি দমনে বাংলাদেশের ‘রোল মডেল’ হওয়ার বিপদ

Send
এম আবুল কালাম আজাদ
প্রকাশিত : ১৩:২৬, জানুয়ারি ০৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৩০, জানুয়ারি ০৩, ২০২০

এম আবুল কালাম আজাদ২০১৭ সালের ২৮ জুন সংসদে এক প্রশ্ন-উত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর জঙ্গি দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা গ্রহণ করে জঙ্গি দমনে সারা বিশ্বে ‘রোল মডেল’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গুলশানে হলি আর্টিজানে দেশের সবচেয়ে বড় জঙ্গি হামলার এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী এমন ঘোষণা দেন। পরবর্তী সময়ে যেটি আওয়ামী লীগের নেতা, মন্ত্রী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের বক্তব্যে উচ্চারিত হতে থাকে। সম্প্রতি জামালপুরে পুলিশের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, সফলভাবে জঙ্গি দমনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এক রোলে মডেল। এর আগেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি এমন দাবি করেছেন।
সরকারের এমন দাবির সপক্ষে অন্যতম যুক্তি হলো ২০১৬-এর জুলাইয়ের পর দেশে বড় কোনও জঙ্গি হামলার ঘটনা না ঘটা (কয়েকটি ছোট হামলা ছাড়া যেমন ২০১৮ সালের মার্চে সিলেটে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলা এবং গত ৩০ সেপ্টেম্বর খুলনা আওয়ামী লীগের অফিসে বোমা হামলা)। হলি আর্টিজানে হামলা পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘বিশেষ অভিযানে’ অনেক জঙ্গির মৃত্যু এবং আটক হওয়ার কারণে হামলা বন্ধ হয়েছে বলে জোর দাবি করা হয়। এভাবে বল প্রয়োগ বা ‘hard approach’ নীতি প্রয়োগ করে হামলা বন্ধ করতে পারলেই কি জঙ্গি দমনে রোল মডেল হওয়া যায়? বাস্তবতার নিরিখে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা জরুরি।

গোটা বিশ্বে উগ্র জঙ্গিবাদ আজ বড় এক সমস্যা। বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, বিচারহীনতা, বৈষম্য, সমান সুযোগের অভাব, প্রযুক্তির প্রভাব এমনকি ব্যক্তিগত কারণেও মানুষের মাঝে এক ধরনের অসন্তোষ বা ক্ষোভের সৃষ্টি হচ্ছে। স্বাভাবিক উপায়ে তা প্রশমন করতে না পেরে অনেকে অস্বাভাবিক পথ বেছে নিচ্ছে। ক্ষোভ, অসন্তোষ থেকে পরিত্রাণ পেতে তারা নিজেরা অথবা অন্যের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে উগ্র জঙ্গিবাদে জড়িত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা, শান্তি, স্থিতিশীলতার ও উন্নয়নের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিভিন্ন দেশ এই উগ্র ধারণা বা দর্শন মোকাবিলার জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের বহুমুখী প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য থাকে হামলা বন্ধ করা। অনেকেই তাই বেছে নেয় বলে ‘hard approach’ নীতি, যা হামলা বন্ধে ভূমিকা রাখে। তবে কেউ রোল মডেল দাবি করেছে বলে জানা নেই। কেননা তারা ভালো করেই জানে, জঙ্গিবাদের মতো অপশক্তিকে সাময়িকভাবে দমন করা গেলেও আবার তা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশে সর্বশেষ জঙ্গি হামলা হয় শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে ২০১৬ সালের ৭ জুলাই। ইসলামিক স্টেটের আদর্শে অনুপ্রাণিত জঙ্গিদের ওই হামলায় দুই পুলিশ সদস্যসহ ৪ জন নিহত হয়। এরপর দেশে বড় হামলা না হওয়ার পেছনে অনেক কারণ আছে। জঙ্গিবিরোধী অভিযানে অনেক জঙ্গির আহত-নিহত ও গ্রেফতার হওয়া নিঃসন্দেহে একটি বড় কারণ, তবে একমাত্র কারণ নয়। বাংলাদেশে বড় ধরনের জঙ্গি হামলা না হওয়ার পেছনে তিনটি বিষয় বড় ভূমিকা রেখেছে বলে আমি মনে করি।

ক. সরকারের আন্তরিকতা ও হার্ড অ্যাপ্রোচ

১ জুলাই ২০১৬ রাজধানীর হলি আর্টিজানে হামলা করে জঙ্গিরা ১৭ বিদেশি নাগরিকসহ ২২ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৫ জঙ্গি অস্ত্র ও বিস্ফোরক নিয়ে বেকারিতে ঢুকে সবাইকে জিম্মি করে। ঘটনার ভয়াবহতা পর্যালোচনা না করে পুলিশের দুই কর্মকর্তা বেকারিতে ঢুকতে চেষ্টা করলে জঙ্গিদের গুলি ও বোমার আঘাতে তারা মারা যায়। কয়েকজন জিম্মিকে ছেড়ে দিলেও জঙ্গিরা অন্যদের নৃশংসভাবে হত্যা করে। এর পর পরই ৫ জঙ্গির ছবিসহ আইএস তার মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে হামলার দায় স্বীকার করে। জঙ্গিরা সবাই সেনাবাহিনীর অভিযানে নিহত হয়।

দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী হামলার পর সরকারের টনক নড়ে, জঙ্গিদের দমনে দেশব্যাপী শুরু হয় সর্বাত্মক অভিযান। দেশের সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় পরিচালিত ২৬টি ‘হাই রিস্ক’ অভিযানে ৭৫ জঙ্গি নিহত হয়। এছাড়া এক হাজারের বেশি সন্দেহভাজন জঙ্গিকে আটক করা হয় এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়। এর ফলে আইএস ও অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়ে, অনেকে আত্মগোপনে চলে যায়। সব মিলিয়ে জঙ্গিরা হামলা পরিচালনার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।

খ. ইসলামিক স্টেট ও তার তথাকথিত খিলাফতের পতন

আমেরিকা ও ইংল্যান্ডের ইরাকে হামলার (যুদ্ধের) মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া বা (ISIS) গ্লোবাল সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদে এক নতুন মাত্রা যুক্ত করে। নির্যাতন, হত্যা আর যৌন দাসত্বের মাধ্যমে একদিকে আইএস যেমন বর্বরতার সকল মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, অন্যদিকে দুনিয়াব্যাপী শিক্ষিত ও ধনী পরিবারের যুবকদের তাদের মতবাদে আকৃষ্ট করে জঙ্গিবাদের সনাতন ধারণা বদলে দিতে সক্ষম হয়। ২০১৪ সালের ৪ জুলাই ইরাকের মসুল শহরের ঐতিহাসিক আল নুরি মসজিদ থেকে ইসলামিক স্টেটের প্রধান আবু বকর আল বাগদাদি খিলাফতের হাঁক দেন এবং নিজেকে খলিফা হিসেবে দাবি করেন। তার ডাকে সাড়া দিয়ে এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৩০ হাজার যুবক ইরাক ও সিরিয়ায় পাড়ি জমায় আইএসের পতাকাতলে যুদ্ধ করতে। বাংলাদেশ থেকেও কয়েকশ যুবক সিরিয়ায় গমন করে যুদ্ধে অংশ নেয়। অল্প সময়ের মাঝেই ইসলামিক স্টেট ইরাক ও সিরিয়ার বৃহৎ ভূখণ্ড দখল করে সনাতনি ইসলামী শাসন ব্যবস্থা কায়েম করতে সক্ষম হয়। সংগঠনের যোদ্ধাদের দ্বারা নির্যাতিত হয়ে শত শত মানুষ মারা যায়। অসংখ্য মেয়েদের যৌনদাসি বানিয়ে ধর্ষণ করা হয়। এমন বর্বরতা আর নির্যাতন ইতিহাসে আর কোনও জঙ্গি সংগঠন করেনি।

বাগদাদি শুধু ইরাক ও সিরিয়ায় তার কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ রাখেনি। তার অনুসারীরা বিভিন্ন দেশেও আক্রমণ শুরু করে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকায় ইসলামিক স্টেট একের পর এক হামলা চালিয়ে বিশ্বব্যাপী ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশও এ থেকে বাদ যায়নি। বাংলাদেশে এর প্রভাব ছিল অভাবনীয়। এদেশের পুরনো জঙ্গি সংগঠনের কিছু জঙ্গি ইসলামিক স্টেটের মতবাদে আকৃষ্ট হয়ে ছোট ছোট গ্রুপে কাজ করতে থাকে এবং এক সময় হামলা শুরু করে। অনেক শিক্ষিত ও ধনী পরিবারের যুবকরাও এপথে পা বাড়ায়। এভাবে পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চল ও সম্প্রদায়ে জঙ্গি সংগঠনটি শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে আমেরিকার নেতৃত্বে বহুজাতিক বাহিনী, সিরিয়া ও রাশিয়াসহ কয়েকটি দেশ আইএসসের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক হামলা শুরু করলে ২০১৭ সাল থেকে সংগঠনটি তার শক্তি হারাতে থাকে এবং ২০১৯-এর মার্চে দখলে থাকা সকল ভূখণ্ড হারালে বাগদাদির তথাকথিত খিলাফতের পতন ঘটে। এতে অসংখ্য যোদ্ধা নিহত হয়, অনেকে ধরা পড়ে, আবার অনেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এছাড়া বিশ্বজুড়ে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে এক ধরনের অবরোধ গড়ে ওঠে। বিভিন্ন দেশে সরকার এবং তাদের আর্মি ও পুলিশ বাহিনী সর্বাত্মক অভিযান শুরু করলে অনেক জঙ্গি মারা যায়, অনেকে বন্দি হয় এবং বাকিরা আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হয়। ভূখণ্ড, নেতৃত্ব ও যোদ্ধা হারিয়ে জঙ্গি সংগঠনটির নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ে। অস্ত্র, গোলাবারুদ আর অর্থের জোগানও বন্ধ হয়ে যায়। সব মিলিয়ে হামলা পরিচালনার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তাই ইসলামিক স্টেট তার ধ্বংসাত্মক দর্শনের মাধ্যমে দুনিয়াজুড়ে যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, তাতে ভাটা পড়ে। ফলে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বেই জঙ্গি তৎপরতা বহুলাংশে কমে যায়।

গ. জঙ্গি সংগঠনগুলোর কৌশলগত পরিবর্তন

গত কয়েক বছর ধরে, বিশেষ করে আইএসের উত্থানের পর বিশ্বব্যাপী জঙ্গিবাদবিরোধী বিভিন্ন ধরনের অভিযান চলছে। সরকারের আন্তরিকতার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেক বেশি তৎপর। তাদের আক্রমণাত্মক নীতির প্রেক্ষিতে জঙ্গিরা অনেকখানি কোণঠাসা হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে জঙ্গি সংগঠনগুলো তাদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে কৌশল পরিবর্তন করে থাকে। যেসব নেতাকর্মী পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে, তারা কিছু দিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর পুনরায় সংগঠিত হয় এবং গোপনে তাদের কর্মকাণ্ড শুরু করে। নতুন সমর্থক সংগ্রহ করে সংগঠনকে আবার চাঙ্গা করার চেষ্টা করে। আর এভাবেই সবার অগোচরে শক্তি অর্জন করে পুনরায় হামলা চালানোর মাধ্যমে তাদের উপস্থিতি জানান দেয়। অতীতে বিভিন্ন দেশে এভাবেই জঙ্গিদের পুনরুত্থান ঘটেছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটও সেরকম। ২০০৫ সালে জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ বা জেএমবি দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলা পরিচালনা করে। এরপর দেশে ও বিদেশের চাপে তৎকালীন বিএনপি সরকার জেএমবি নেতাদের আটক করতে সচেষ্ট হয়। ২০০৭ সালের মধ্যে সংগঠনটির ৬ শীর্ষ নেতা ধরা পড়ে এবং সে বছরেই (সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে) সন্ত্রাস, মানুষ হত্যা ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের অপরাধে তাদের ফাঁসি দেওয়া হয়। এছাড়া কয়েকশ’ নেতাকর্মীকে আটক করা হয়। তবে অনেকে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। নেতৃত্ব হারিয়ে জেএমবি ২০০৭ সালের পর নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। সেসময় অভিযানের মুখে অন্য জঙ্গি সংগঠনগুলো যেমন হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ বা হুজিবির তৎপরতাও ঝিমিয়ে পড়ে। এতে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, যেখানে সবাই ভাবতে থাকে দেশে জঙ্গিদের আর উত্থান ঘটবে না। বস্তুত সেসময় জঙ্গিবাদের নতুন এক পটভূমি তৈরি হচ্ছিল। ২০১৩ সালের মধ্যে জেএমবি, আল-কায়েদার মতাদর্শে অনুসারী আনসার আল ইসলাম বা আনসারুল্লাহ বাংলা টিম এবং আইএসের মতাদর্শে অনুসারী ছোটখাটো কয়েকটি দল নীরবে কর্মী সংগ্রহ করে, তাদের অস্ত্র ও বিস্ফোরক দিয়ে বোমা বানানোর ওপর প্রশিক্ষণ দিয়ে আবার হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছিল। একাজে তারা বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি স্থানকে আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করে। শুধু তাই নয়, পশ্চিমবঙ্গেও জেএমবি নতুন একটি বেজ তৈরি করতে সক্ষম হয় যা সংগঠনটির আস্তানা গড়তে ও হামলার প্রস্তুতি নিতে ভূমিকা রাখে। ২০১০, ২০১১ ও ২০১২ সালে Improvised Explosive Device (IED) উদ্ধার ও কিছু জঙ্গি আটকের ঘটনা তাদের পুনরুত্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। কিন্তু সরকারের আন্তরিকতার অভাব ও পুলিশের নজরদারি না থাকার কারণে সেসময় জানা সম্ভব হয়নি জঙ্গিরা ঠিক কীভাবে সংগঠিত হচ্ছিল বা হামলার পরিকল্পনা করছিল কিনা। জঙ্গিরা যে ভয়ংকর এক পরিকল্পনা নিয়ে তৈরি হচ্ছে তা তখন অনুধাবন করা সম্ভব হয়নি। তাই ২০১৩ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি ব্লগার রাজীব হায়দার হত্যার মধ্য দিয়ে হামলা শুরু হলো, তখন সরকার বা দেশের মানুষ ভাবতেই পারেনি, তারা পরবর্তী ৩ বছর একের পর এক হামলা চালিয়ে যেতে সক্ষম হবে।

গত সাড়ে তিন বছর বড় কোনও হামলা না হওয়ার পেছনে জঙ্গিদের কৌশল পরিবর্তন একটি অন্যতম কারণ হতে পারে।

তাই জঙ্গিদের দমনের সাফল্যে আত্মতুষ্টির বিষয়টি এক ভয়ংকর প্রবণতা। রাজনৈতিক সুবিধা লাভের জন্য সফলভাবে জঙ্গিদের দমন বা হামলা বন্ধের জন্য বড়াই করার কোনও সুযোগ নেই। কারণ আত্মতৃপ্তির মধ্যে থাকে এক ধরনের দুর্বলতা। আর জঙ্গিরা সেই দুর্বলতার সুযোগেই থাকে।

জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশ মূলত অন্য দেশের পুরনো এক নীতি অনুকরণ করে আসছে, আর তা হলো বল প্রয়োগের মাধ্যমে বা অভিযানের মাধ্যমে তাদের দমন করা। কিন্তু বল প্রয়োগের এ নীতি জঙ্গি দমনে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হলেও পৃথিবীর অনেক দেশ অনেক আগে থেকেই soft approach নীতি ব্যবহার করছে, যেখানে একদিকে মানুষ যেন জঙ্গিবাদে না জড়ায় তার চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে Deradicalisation and Rehabilitation কর্মসূচির মাধ্যমে জড়িতদের জঙ্গিবাদের পথ থেকে ফিরিয়ে এনে পরিবার ও সমাজে পুনর্বাসনের প্রচেষ্টাও করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে তারা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে মানুষ, বিশেষ করে যুবকরা কেন জঙ্গিবাদের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। গবেষণা করে অনেক ধরনের ফর্মুলা ব্যবহার করেও উগ্র জঙ্গিবাদকে সফলভাবে দমন করতে না পারার কারণও খুঁজে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে আমরা সামগ্রিকভাবে জঙ্গি দমনের ক্ষেত্রে অন্য দেশের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছি। যদিও সম্প্রতি আমরাও soft approach নীতির কথা বলছি এবং তা প্রয়োগের বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করছি। দেরিতে হলেও সরকার জঙ্গিবাদের কারণগুলো বের করারও চেষ্টা করছে এবং বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করে কীভাবে এই ব্যাধি থেকে দেশকে মুক্ত করা যায়, তার প্রচেষ্টা চালাতে পরিকল্পনা করছে।

গত ১১ ডিসেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত National Conference on Countering Violent Extremism এ courting violent extremism and transnational crime unit এর প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ২৬টি “high risk” অভিযানের মাধ্যমে জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে এবং আক্রমণের অনেক পরিকল্পনা রুখে দিতে পারলেও দেশে radicalization বাড়ছে বা মানুষ জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকছে। জঙ্গিবাদ পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, সচ্ছল ও শিক্ষিত পরিবারের সন্তানেরা জঙ্গিবাদে জড়িত হচ্ছে। শুধু মাদ্রাসা নয়, আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও radicalization হচ্ছে। জঙ্গিবাদে নারীদের অংশগ্রহণও বাড়ছে এবং একজন জঙ্গিবাদে জড়ালে গোটা পরিবার জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছে। মনিরুল আরও বলেন উগ্রবাদীরা খুব সফলভাবে social media, cyber world ব্যবহার করছে। তারা শত শত websites ও social media groups এ সক্রিয় আছে, প্রতিনিয়ত প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে, অর্থ ও সদস্য সংগ্রহ করে কোথাও কোথাও training দিচ্ছে। যারা জামিনে বেরিয়ে যাচ্ছে তারা পুনরায় জঙ্গি কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছে এবং বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যারা বিদেশে আছে, তারা অনেকে ইরাক-সিরিয়ায় গিয়েছে, তাদের অনেকের দেশে ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যা আমাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তবে তিনি আশ্বস্ত করেন, বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করে সার্বিকভাবে জঙ্গিবাদ মোকাবিলার জন্য তারা কাজ করে যাচ্ছেন।

কিন্তু এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে আমরা একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে আছি। এখনও আমরা জানি না ঠিক কী কী কারণে যুবকরা জঙ্গিবাদে জড়াচ্ছে। একদিকে জেলে অবাধে হাজতিদের মধ্যে জঙ্গিবাদ ছড়াচ্ছে, অন্যদিকে গ্রেফতারকৃত জঙ্গিদের জঙ্গি মতবাদ থেকে মুক্ত করে সমাজে পুনর্বাসন করার দৃশ্যমান কোনও উদ্যোগ নেই। নারীরাও বিপজ্জনকভাবে জঙ্গিবাদে আকৃষ্ট হচ্ছে। এক কথায় জঙ্গিবাদ দমনে যে প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে, তা নিতান্তই অপ্রতুল ও বিক্ষিপ্ত, যা জঙ্গিবাদ দমনে দীর্ঘমেয়াদে সফলতা অর্জনে সহায়ক হবে না। জঙ্গি দমনে তাই zero tolerance নীতি গ্রহণ করা হলেও, সমন্বিত, পরিকল্পিত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সম্ভব হইনি।

জঙ্গিরা কি আবার কৌশলগত অবস্থানে?

২০০৬ সালের পর দেশে জঙ্গি হামলা বন্ধ হয়ে যায় এবং পরবর্তী বেশ কয়েক বছর দেশে কোনও জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেনি। এমন পরিস্থিতিতে সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দেশের মানুষের মাঝে ধারণা জন্মায়, জঙ্গি সংগঠনগুলো আর কখনও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না। শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে সর্বশেষ বড় ধরনের জঙ্গি হামলার ঘটনার পর আবার সে ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে জঙ্গি নেটওয়ার্ক ভেঙে গেছে, আর তাই হামলা চালানোর মতো সক্ষমতা আর তারা অর্জন করতে পারবে না। এমন ভেবে নিলে আমরা বোকার স্বর্গে বসবাস করছি। আইএস তার ভূখণ্ড আর খিলাফত দুটোই হারিয়েছে, কিন্তু তার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়নি। এমনকি আইএস প্রধান বাগদাদির নিহত হওয়ার পরেও সংগঠনটি বড় হুমকি হিসেবে বিদ্যমান। তারা সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, আফ্রিকা এবং আরও কিছু দেশে নিজেদের অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে আইএস আফগানিস্তানে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এবং দেশটিতে কয়েকটি হামলা পরিচালনা করে। গত সপ্তাহে নাইজেরিয়ার আইএস অনুসারীরা এক ভিডিও বার্তার মাধ্যমে দাবি করে যে বাগদাদিকে মেরে ফেলার প্রতিশোধ হিসেবে তারা ১১ জনকে খুন করেছে। বাংলাদেশেও জঙ্গিরা বসে নেই। তারা যে সক্রিয় এবং হামলা চালাতে সক্ষম তার প্রমাণ আইএস বারবার দিয়ে যাচ্ছে। গত এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৪টি হামলার দায় স্বীকার করে জঙ্গি সংগঠনটি। সর্বশেষ ৩০ সেপ্টেম্বর খুলনায় আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলার দাবি করছে আইএস। এছাড়া প্রায়ই সন্দেহভাজন জঙ্গিরা ধরা পড়ছে এবং বিস্ফোরক উদ্ধার করা হচ্ছে। তবে শুধু আইএস না, আল কায়েদার আদর্শের জঙ্গিরাও বাংলাদেশের জন্য বড় হুমকি বলে ধারণা করা হয়।

জঙ্গিরা সব সময় এক ধাপ এগিয়ে চিন্তা করে। পুরনো কৌশল পরিত্যাগ করে নতুন নতুন কৌশল নিয়ে তারা আবির্ভূত হয়। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এখন তারা cyber space-এ বেশি তৎপর। তাই তাদের গতিবিধি বা পরিকল্পনা জানতে হলে প্রয়োজন সার্বক্ষণিক digital monitoring, যেখানে আমরা অনেকাংশেই পিছিয়ে আছি। এক কথায়, সফলভাবে জঙ্গিবাদকে মোকাবিলা করতে হলে বৃহত্তর রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আর সেটা করতে হবে একটি ‘জাতীয় সন্ত্রাসবিরোধী কৌশল’ প্রণয়নের মাধ্যমে, যা এখনও আমরা করতে সক্ষম হইনি। তবে সম্ভাব্য সকল পন্থা ব্যবহার করে সফলভাবে জঙ্গিবাদ মোকাবিলা করতে পারলেও রোল মডেল দাবি করা সমীচীন হবে না। কেননা জঙ্গিবাদকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা সম্ভব না। কিছু সময়ের জন্য দমন করা গেলেও এই অপশক্তি আবার ফিরে আসে, নতুন নামে, নতুন কৌশলে।

এক্ষেত্রে ২০১৭ সালের মে মাসে আল কায়েদার আদর্শে অনুপ্রাণিত এক জঙ্গির সাক্ষাৎকার গ্রহণের কথা বলে লেখাটা শেষ করতে চাই। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম জঙ্গি হামলা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণ। জিজ্ঞেস করেছিলাম অভিযানে আটকের ভয়ে জঙ্গিরা কি আত্মগোপনে চলে গেছে? নাকি তারা হামলা চালানোর সক্ষমতা হারিয়েছে? আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সে বলেছিল, স্যার, দেখানোর দরকার ছিল দেখায় দিছে। আবার যখন দেখানোর দরকার হবে তখন দেখবেন কেউ হামলা ঠেকাতে পারবে না। সে বলেছিল, সারা দেশে, সকল শ্রেণি-পেশায় তাদের আদর্শের অনুসারীরা আছে, যারা ইসলামী শাসন কায়েমের জন্য গোপনে কাজ করে চলেছে।

লালমনিরহাটের এই জঙ্গি একবার গ্রেফতার হয়ে জামিনে ছাড়া পেলেও সাক্ষাৎকার দেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে আবার তাকে আটক করে পুলিশ।

লেখক: সাংবাদিক ও জঙ্গিবাদ বিষয়ক বিশ্লেষক

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ