সিটি নির্বাচন: বিএনপি কেন ডিফেন্সিভ?

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ১৭:২২, জানুয়ারি ০৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২৩, জানুয়ারি ০৯, ২০২০

আমীন আল রশীদরাজনীতির মাঠে নির্বাচন হচ্ছে সবচেয়ে বড় ‘খেলা’। অন্য খেলার সঙ্গে এর তফাৎ হলো, এখানে একসঙ্গে অনেক দল অংশ নেয়। অনেক পক্ষের মাঝখানে রেফারির দায়িত্ব পালন করে নির্বাচন কমিশন। আবার নির্বাচন কমিশন কতটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে, সেটি নির্ভর করে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা তাকে কতটা সহায়তা দেবে এবং নির্বাচনে সরকারের প্রভাব বিস্তার করা না করার ওপর। তার মানে ভোটের খেলায় সরকার নিজেও একটি পক্ষ। স্বভাবতই প্রতিটি পক্ষেরই ভিন্ন ভিন্ন কৌশল থাকে। সরকারি দলের প্রার্থীদের কৌশলের সঙ্গে বিরোধী দলের কৌশল মিলবে না। আবার সরকারি ও বিরোধীদের বাইরে অন্যান্য ছোট ও মাঝারি দলগুলোর কৌশল হয়তো আরও ভিন্ন। কিন্তু আসন্ন ঢাকা সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ বা প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির অবস্থান শুরু থেকেই ডিফেনসিভ। অর্থাৎ গোল দেওয়া নয়, বরং গোল ঠেকানোর জন্যই তাদের সব আয়োজন। অন্তত দলের সিনিয়র নেতাদের কথাবার্তা শুনে সেরকমই মনে হয়। কিন্তু  তাদের এই ডিফেনসিভ কৌশল  ভোটার ও সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে কী বার্তা দিচ্ছে? সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি এখন সামনে এসেছে, তা হলো—এই নির্বাচনে বিএনপি আসলে কী অর্জন করতে চায়? তারা নিজেদের প্রার্থীদের জয় চায়, নাকি প্রমাণ করতে চায় এই সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে যে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয় না?

সম্প্রতি বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতার মন্তব্য খেয়াল করা যাক। পয়লা জানুয়ারি রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে ছাত্রদলের ৪১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, তা প্রমাণ করতেই বিএনপি নির্বাচনে যাচ্ছে। তিনি বলেন, মানুষ শুধু আমাদের প্রশ্ন করে আপনারা নির্বাচনে কেন গেলেন। ২০১৪ সালে যখন নির্বাচনে যাইনি তখন বলা হয়েছে, আমরা ভুল করেছি। ১৮ সালে নির্বাচনে গিয়েছিলাম প্রমাণ করতে আওয়ামী লীগের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। অনেকে প্রশ্ন করছেন, ঢাকা সিটি নির্বাচনে গেলেন কেন? আমি বলতে চাই, আওয়ামী লীগের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না—এ কথা বারবার প্রমাণ করতে মেয়র নির্বাচনে গিয়েছি (দৈনিক ভোরের কাগজ,২ জানুয়ারি) ।

৩ জানুয়ারি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, বিএনপি প্রার্থীদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ নির্বাচন প্রহসনের নির্বাচন হবে (প্রথম আলো ৩ জানুয়ারি)। এর আগে ২৭ ডিসেম্বর বিএনপির আরেক সিনিয়র নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ওপর অনাস্থা থাকলেও ঢাকা সিটি নির্বাচনে অংশ নিয়ে আমরা জেনেশুনে বিষপান করেছি (এনটিভি অনলাইন, ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯)।

এখন প্রশ্ন হলো—বর্তমান সরকারের অধীন সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না প্রমাণ করার জন্য বিএনপিকে ঢাকা সিটি নির্বাচনে অংশ নিতে হচ্ছে? এর দ্বারা তারা ভোটার ও দলের সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে কী বার্তা দিচ্ছে? তারা কি সরকারের পতনের দাবিতে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলবে? তাদের নিজেদের ঘর ঠিক আছে? নেতৃত্ব ঠিক আছে? দলের সিনিয়র নেতাদের মধ্যে ঐক্য আছে? তারা জানে—মাঠপর্যায়ে তাদের নেতাকর্মীরা তাদের জন্য কতটুকু ডেডিকেটেড? দলের চেয়ারপারসনের মুক্তি অথবা জামিনের জন্য তারা এখন পর্যন্ত চোখে পড়ার মতো বা সরকারকে বাধ্য করার মতো কোনও আন্দোলন কর্মসূচি দিতে পেরেছে? যদি না পারে তাহলে দুর্বল ও ক্ষয়িষ্ণু অবস্থানে থেকে আওয়ামী লীগের মতো বৃহৎ একটি শক্তির বিরুদ্ধে এই দলটি যে এখনও মোটামুটি দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে, সেটিই বরং তাদের সৌভাগ্য। দল ঠিক করার আগে তারা সরকার ও ইসি নিয়ে যত কথাই বলুক, সেটি খুব একটা হালে পানি পাবে বলে মনে হয় না।

বিএনপি নেতারা স্বপ্নে বিভোর, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে মানুষ তাদের দলের প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়বে এবং দেশে ভোট বিপ্লব হয়ে যাবে। কিন্তু মানুষ তাদের প্রার্থীদের কেন ভোট দেবে—সেই প্রশ্নের কোনও সদুত্তর তারা দিতে পারবেন বলে মনে হয় না। অন্তত ঢাকার দুই অংশে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের তুলনায় তাদের প্রার্থীরা কেন অধিকতর যোগ্য, সেই প্রশ্নের জবাবও তারা দিতে পারবেন না। শুধু সরকারবিরোধী সেন্টিমেন্ট দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয় না। মানুষ দেখে কাকে ভোট দিলে তার লাভ। কে তাদের নাগরিক সমস্যার সমাধান করতে পারবেন। দক্ষিণ সিটিতে সাঈদ খোকনকে তার দলই এবার আর মনোনয়ন দেয়নি। সুতরাং শুধু আওয়ামী লীগ বা সরকারবিরোধী সেন্টিমেন্ট কাজে লাগিয়ে দলের নেতাকর্মীরা বিএনপি প্রার্থীদের ভোট দিলেও সাধারণ ভোটাররা কেন তাদের প্রার্থীদের ভোট দেবে, সে প্রশ্নের উত্তর বিএনপিকেই খুঁজতে হবে।

সম্ভবত সেই প্রশ্নের সদুত্তর নেই বলেই তারা আগে থেকেই ডিফেনসিভ। কথা হচ্ছে, এই সরকার ও ইসির অধীনে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয় না—এ কথা প্রমাণ করার জন্যই যদি বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়, তাহলে তাদের সমর্থক ও ভোটাররা কেন ভোটকেন্দ্রে যাবে? যদি তাদের উদ্দেশ্যেই থাকে সরকার ও ইসিকে পক্ষপাতদুষ্ট প্রমাণ করা, তাহলে তাদের প্রার্থীরা কেন জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী এবং ভোটারদের কাছে ভোট ও দোয়া চেয়ে বেড়াচ্ছেন?

যদি ঢাকার দুই সিটিতেই অথবা কোনও একটিতে তাদের মনোনীত মেয়র প্রার্থী জয়ী হন, তখন বিএনপি কী করবে? তারা কি তখনও বলবে যে, এই সরকার ও ইসির অধীনে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয় না? আওয়ামী লীগের আমলেই অতীতের সিটি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীরা গণহারে জয়লাভ করেছেন। এখনও সিলেট ও কুমিল্লায় যারা মেয়র, তারা বিএনপির প্রার্থী হিসেবেই নির্বাচন করেছিলেন। তাহলে বিএনপি এখন যে ধরনের ডিফেনসিভ অবস্থান নিয়েছে, তাতে কি তারা ধরেই নিয়েছে যে, তাদের প্রার্থীরা হেরে যাবেন?

নির্বাচন কেমন হবে, সেটি অনেকাংশে নির্ভর করে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী কতটা শক্তিশালী তার ওপর। এর একটি ভালো উদাহরণ চট্টগ্রামের প্রয়াত মেয়র এবিএম মহিউদ্দীন চৌধুরী। ২০০৫ সালের নির্বাচনে তিনি হারিয়েছিলেন তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীকে। ওই সময়ে তার নির্বাচনি কৌশল, ভাষা ও শরীরী ভাষা ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীকেও কাঁপিয়ে দিয়েছিল। তিনি বলতেন, ‘সুষ্ঠু ভোট আদায় করে ছাড়বো; ভোটকেন্দ্র দখল করতে দেওয়া হবে না; ভোটের ফল পরিবর্তন করা যাবে না’ ইত্যাদি। এসব বলে তিনি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের চাঙা রাখতেন। আঞ্চলিক ভাষায় একটি শব্দ আছে ‘হ্যাডম’, মানে দাপট। ভোটাররা প্রার্থীর মার্কা দেখেন, ভোট দেন, এটি যেমন সত্য, তেমনি প্রার্থীর হ্যাডম কতটা আছে, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সঙ্গে তিনি টিকে থাকতে পারছেন কি না, সেটিও তাদের বিবেচনায় থাকে।

কিন্তু বিএনপি এখন ঢাকা সিটি নির্বাচনে যা করছে, তাদের যে ভাষা ও শরীরী ভাষা, তা নেতাকর্মীদের মধ্যে কেবল হতাশাই বাড়াবে। কারণ, তাদের মনেও এরকম একটি ধারণা তৈরি হবে যে, তাদের প্রার্থীরা হেরে যাবেন। ফলে জেতার জন্য যে চেষ্টা, সেটি তাদের মধ্যে অনুপস্থিত থাকবে। যেসব সাধারণ ভোটার বিএনপির প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে আছেন, তারও হয়তো শেষমেষ ভাববেন, ভোট দিয়ে লাভ নেই। ফলে সরকার ও ইসিকে পক্ষপাতদুষ্ট প্রমাণের জন্য ভোটে অংশ নেওয়া, জেনেশুনে বিষপান, প্রহসনের নির্বাচন হবে—এসব কথা বলা বস্তুত নিজেদের পায়ে কুড়াল মারারই শামিল। ইসি সুষ্ঠু নির্বাচন করবে কিনা বা সরকার তাদের সুষ্ঠু নির্বাচনে সহায়তা দেবে কিনা, তারচেয়ে বড় কথা বিরোধী পক্ষ সুষ্ঠু নির্বাচন আদায় করে নিতে পারলো কিনা? ফলে ডিফেনসিভ না খেলে বিএনপির এখন উচিত চট্টগ্রামের প্রয়াত মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর ইলেকশন মডেল অনুসরণ করা।

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর।

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ