‘লিডার ইজ নেভার রং’-এর দেশ

Send
ডা. জাহেদ উর রহমান
প্রকাশিত : ১৭:১৫, জানুয়ারি ১১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৬, জানুয়ারি ১১, ২০২০

ডা. জাহেদ উর রহমানবসের প্রিয়ভাজন হওয়ার দু’টি নিয়ম আছে। নিয়ম এক–বস সব সময়ই সঠিক। নিয়ম দুই–বসের কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে আপনার যদি কোনও সংশয় থাকে, তাহলে নিয়ম নম্বর এক অনুসরণ করুন। কথাগুলো কৌতুক হিসেবে শুনেছি এতদিন। একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এর কিছুটা সত্যতাও আছে হয়তো বা। এমন মানসিকতা কোনও প্রতিষ্ঠানের বসের থাকলেও সেটা কর্মচারীরা বুঝে নেন তার নানা আচার-আচরণে; বস প্রকাশ্যে কথাগুলো বলে ফেলেন সাধারণত। কোনও কোনও ‘স্বচ্ছ বস’ অবশ্য মনে থাকা কথাগুলো বলেও ফেলেন।
এমন একজন ‘স্বচ্ছ বস’-এর দেখা পাওয়া গেলো। তিনি জি এম কাদের। হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদের ভাই। রাজনীতিবিদ হিসেবে এরশাদের ইন্টিগ্রিটি নিয়ে আমৃত্যু গুরুতর প্রশ্ন ছিল, কিন্তু তার ভাই জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগের কথা শোনা যায়নি। একজন সজ্জন রাজনীতিবিদ হিসেবে তার পরিচিতি আছে। কিন্তু এটা বাংলাদেশ।
২০১৪ সালের নির্বাচনে এরশাদ বেঁকে বসলেও সরকার এবং তার কিছু বন্ধুর চাপে রওশন এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি নির্বাচনে গিয়েছিল। সব রাজনৈতিক দলের নির্বাচন বয়কটের মুখে এটি তৎকালীন সরকারের জন্য লাইফলাইন হয়েছিল। স্বাভাবিক কারণেই রওশন এরশাদের প্রতি সরকারি দলের কৃতজ্ঞতা বোধ ছিল। সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতার সীমা ছিল না বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদেরও। এই কৃতজ্ঞতায় দল পরিচালনায় প্রতিটি পদক্ষেপ তিনি সরকারের মর্জিমাফিক নিতেন। এই স্মৃতি ভোলার নয়, একবার ‘সরকারি বিরোধী দল’ তকমা গা থেকে ঝেড়ে ফেলে জাতীয় পার্টিকে সত্যিকারের বিরোধী দল করতে চেয়েছিলেন রওশন। এবং সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছিলেন মন্ত্রীদের মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিতে, কারণ তিনি তাদেরকে পদত্যাগ করতে বললেও তারা করছিল না। গণতন্ত্র নামে এই দেশে কী অবিশ্বাস্য যাত্রাপালা মঞ্চস্থ হয়েছে তার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকবে এটি।

এরশাদ যতদিন বেঁচেছিলেন ততদিন এবং এরশাদের মৃত্যুর পর কিছুদিন জাতীয় পার্টির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রওশন বেশ ঝামেলায় ছিলেন। এরশাদের নানা পদক্ষেপ দেখে বোঝা যেতো, তিনি চাইতেন তার দলের নেতৃত্ব তার ভাই জিএম কাদেরের হাতে যাক। কিন্তু প্রতিবারই জাতীয় পার্টির একটি অংশ রওশন এরশাদের নেতৃত্বে এতে বাধ সেধেছে। বলা বাহুল্য, কিছুক্ষণ আগে বলা কৃতজ্ঞতার কারণে সরকার‌ও রওশনের পাশে থেকেছে। ফলে জাতীয় পার্টির মধ্যে একটা ক্রমাগত যুদ্ধ চলছিল। সেটি সম্ভবত শেষ হয়েছে। 

কয়েকদিন আগে জাতীয় পার্টির ‘কাউন্সিলে’ রওশন এরশাদকে ‘চিফ প্যাট্রন’ পদ দিয়ে পার্টির চেয়ারম্যান হয়েছেন জি এম কাদের। বলা যায়, পার্টির মোটামুটি নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ নিতে পেরেছেন তিনি। অন্য দুটি বড় দলে নেতৃত্ব নিয়ে কোনও গৃহদাহ অন্তত প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তাই সেই দলগুলোর নেতাদের সেই নিরঙ্কুশ ক্ষমতা স্মরণ করিয়ে দিতে হয় না বারবার। যেহেতু এতদিন জনাব কাদেরের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ছিল না, নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পাওয়ার পর তিনি জানিয়ে দিলেন, ‘লিডার ইজ নেভার রং, লিডার ইজ অলওয়েজ কারেক্ট।’

খুবই বড় পরিহাসের ব্যাপার হলো, যে অনুষ্ঠানে জিএম কাদের এই কথাগুলো বলেছেন, সেই অনুষ্ঠানেই তিনি এবং অন্য নেতারা গণতন্ত্রের পক্ষে খুব বড় বড় কথা বলেছেন। তাদের প্রয়াত নেতা মোহাম্মদ এরশাদ ‘ক্ষমতাসীন’ হওয়ার পর গণতন্ত্র রক্ষায় কী কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, সেগুলোর ব্যাপারে আলোকপাত করেছিলেন একাধিক নেতা। 

এই দেশের ‘বড়’ দুই দলে একের পর এক প্রধান এসেছেন দু’টি পরিবার থেকে। মাঝে মাঝে হয়তো কিছু ফিসফাস শোনা গেছে, কিন্তু এই দেশের বড় দুই দলের মধ্যে নেতৃত্ব নিয়ে লড়াইয়ের কথা আমরা প্রকাশ্যে অন্তত দেখি না। সেসব দলেও শুরু থেকেই ছিল, আছে ‘লিডার ইজ নেভার রং’ কনসেপ্ট।

এরশাদ বেঁচে থাকতে জাতীয় পার্টিতে ‘লিডার ইজ নেভার রং’ কনসেপ্ট নিয়ে আলোচনার দরকার হয়নি, এখন হয়েছে। কারণ এরশাদের পর কার হাতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা আছে, সেটি প্রতিষ্ঠিত ছিল না। এখন হওয়া মাত্রই জিএম কাদের সেটা দলের তৃণমূলকে জানিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন একেবারে খোলাখুলিভাবে। আর এতেই এই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধানদের মনের এই কথা আমাদের সামনে প্রকাশ্যে উচ্চারিত হলো। 

পরিবার থেকে রাজনৈতিক দলের প্রধান নির্বাচিত হওয়ার প্রবণতা ভারতেও দীর্ঘকাল থেকেই আছে, তবে সেখানকার পরিস্থিতিতে ‘লিডার’ অন্তত মাঝে মাঝে ভুল স্বীকার করেন। অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। তবে, সাম্প্রতিকতম উদাহরণটি দেওয়া যাক। রাহুল গান্ধী কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছেন পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকেই। কিছুদিন আগে ভারতের সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবি হয়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে আমাদের নেতাদের মতো তিনি মনে করেননি ‘লিডার ইজ নেভার রং’। বরং নেতা নিজে এই ব্যর্থতার দায়িত্ব নিয়েছেন, নিয়ে পদত্যাগ করেছেন। দলের ভেতর থেকে তাকে যাওয়ার চাপ দেওয়ার পরও তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকেছেন। 

বাংলাদেশের ইতিহাসে এক-এগারো নানা কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভবত সেই সরকারের বিরুদ্ধে বিরাজনীতিকরণের অভিযোগ। সমালোচিত হলেও সেই সময়ের এক উপদেষ্টার রাজনৈতিক দলগুলোকে যে উপমা দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন সেটা খুবই যৌক্তিক। তিনি বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে ‘প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি’র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। তার বক্তব্যের সত্যতা বোঝাতে কোনও গভীর ভাবনার প্রয়োজন হয় না, খুব সহজেই এটা বোঝা যায়। 

বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ কখনও খুব শক্তিশালী ছিল না। বরং আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে এই মূল্যবোধ ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়ছে। পরিবার থেকে শুরু করা যাক। এই রাষ্ট্রের প্রায় সব পরিবারেই দেখা যায় পরিবার প্রধান যিনি মূলত ওই পরিবারের কর্তা তার সিদ্ধান্তে পুরো পরিবার পরিচালিত হয়। পরিবারের অন্য সদস্যদের অভিমত না নিয়ে নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এই মানুষগুলোই যখন সমাজ, রাজনৈতিক দল কিংবা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যান, তখনও এই ব্যক্তি চরিত্রগুলো বেরিয়ে আসে।

গণতন্ত্রের অনেক বৈশিষ্ট্য আছে। এটা মানুষের মধ্যে সমতায় বিশ্বাস করে, বিশ্বাস করে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র কিংবা আর্থিক সামর্থ্যের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে কোনও বিভেদ থাকবে না। গণতন্ত্র মানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, অন্যের মতের প্রতি সহিষ্ণুতার বিষয়টিও নিশ্চিত করা। গণতন্ত্র মানুষের বেঁচে থাকার সব রকম অধিকার এবং সর্বজনীন মানবাধিকার নিশ্চিতের কথা বলে। গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত একটা রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্রের প্রশাসন, আইন প্রণয়ন ও বিচার ব্যবস্থা পরস্পর থেকে আলাদা থাকবে। তালিকা আরও দীর্ঘ কিন্তু আর দীর্ঘ করছি না। তবে, গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এই–এটি সংখ্যাগরিষ্ঠে অভিমতের ভিত্তিতে পরিচালিত একটি শাসন ব্যবস্থা। 

যে রাজনৈতিক দলগুলো অভ্যন্তরীণভাবে গণতন্ত্র চর্চা করে না সেই দলগুলো রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামো আরও শক্তিশালী করবে, এমন আশা করা ভুল। ‘গণতন্ত্র মানে শুধু একটি শাসনব্যবস্থা না, গণতন্ত্র একটা দর্শন, একটা মূল্যবোধ’–এই দর্শন ও মূল্যবোধে পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাসী হয়ে যতদিন আমরা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক পর্যায়ে আমাদের জীবনযাত্রাকে পরিচালিত না করবো, ততদিন এই রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর অসম্ভব। সেটা না হলে ‘লিডার ইজ নেভার রং’ মতাদর্শের নেতারা ক্ষমতায় আসবেন একের পর এক, আর এই দেশ আরও বেশি কর্তৃত্বপরায়ণ রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
লেখক: শিক্ষক, অ্যাকটিভিস্ট

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ