উদারবাদ থেকে সংরক্ষণবাদিতার পথে বিশ্ব রাজনীতি?

Send
রুমিন ফারহানা
প্রকাশিত : ১৪:০১, জানুয়ারি ১২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:০৩, জানুয়ারি ১২, ২০২০

রুমিন ফারহানাআজকের বিশ্বে রাজনীতিতে ঠিক কোনটা ডান, কোনটা অতি ডান কিংবা মধ্য-ডান (সেন্টার রাইট), সেই বিভেদ রেখাগুলো কি ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়ছে? গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি এবং ক্ষমতায় আরোহণের পর তাদের আচরণ দেখে এমন প্রশ্ন জন্ম নিয়েছে অনেকেরই মনে। রক্ষণশীল রাজনৈতিক দলগুলো একটা যুগসন্ধিক্ষণে আছে, এটি আমার বারবার মনে হচ্ছিল ইন্টারন্যাশনাল ডেমোক্র্যাট ইউনিয়ন (আইডিইউ)-এর ওয়াশিংটন ফোরামে। কিছু দিন আগে ওয়াশিংটন গিয়েছিলাম এই ফোরামের একজন আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে। আমার দলের মহাসচিব ও আমি আমন্ত্রিত হয়েছিলাম এই ফোরামে, দলীয় ব্যস্ততার কারণে মহাসচিব যাননি।
এই সংগঠনটি মধ্য-ডান রাজনৈতিক দলগুলোর একটা আন্তর্জাতিক সংগঠন, যার বর্তমান সভাপতি কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপার। সংগঠনটি প্রতিষ্ঠায় মূল ভূমিকা পালন করেছিল আমেরিকার রিপাবলিকান ও ব্রিটেনের কনজারভেটিভ পার্টি। বিশ্বের ৬৩ দেশের ৭৩টি মধ্য-ডান রাজনৈতিক দল এই সংগঠনের পূর্ণ ও সহযোগী সদস্য। তবে, দল হিসেবে আমন্ত্রিত হলেও বিএনপি এই সংস্থার সদস্য নয়।

বছরে দুই বার এই সংগঠনটি আলোচনায় বসে। ডিসেম্বরে বসেছিল ২০১৯ সালের দ্বিতীয় ফোরাম। অনেক প্যানেল আলোচনা ছিল আর আলোচকের প্যানেলে ছিলেন— ম্যাসাচুসেটসের সাবেক গভর্নর ও রিপাবলিকান পার্টি মনোনীত ২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী, বর্তমানে সিনেটর মিট রমনি, আমেরিকার বর্তমান পরিবহনমন্ত্রী এলিন এল চাও, কানাডার ওন্টারিওর প্রধানমন্ত্রী দাগ ফোর্ড, জন বারাসো, প্যাট টুমি, টড ইয়াংসহ কয়েকজন সিনেটর, ইউএসএআইডি-এর প্রশাসক, হাঙ্গেরির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রমুখ।

এই ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলো বাণিজ্য উদারীকরণের কথা বলে। কিন্তু সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তিগুলো পারস্পরিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চরম রক্ষণশীল পদক্ষেপ নিচ্ছে। ওই আলোচনা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে প্যানেলিস্টদের আলোচনায়। তাদের এই সংক্রান্ত আলোচনায় খুব বড় অংশজুড়ে ছিল বিশ্ব অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীনের উত্থান। আলোচকরা চীনের সমালোচনার ক্ষেত্রে মূল যে বিষয়গুলোর প্রতি আলোকপাত করেছেন, সেটি হচ্ছে দেশটির নিজস্ব মুদ্রা ইউয়ান-এর মান ইচ্ছাকৃতভাবে অনেক কমিয়ে রাখা, আন্তর্জাতিক কপিরাইট আইন অমান্য করে অনেক পশ্চিমা কোম্পানির ব্যবসায়িক ক্ষতিসাধন করা, দেশের অভ্যন্তরে সর্বজনীন মানবাধিকারের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং ফাইভ-জি (হুয়াওয়ের মাধ্যমে) এবং অন্যান্য প্রযুক্তি পণ্যের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে গোয়েন্দাগিরির চেষ্টা করা। 

আধুনিক বিশ্বে একেকটি বিশ্বব্যবস্থা একটি বা কয়েকটি দেশের প্রাধান্যের ওপরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যখনই এমন একটি বিশ্বব্যবস্থা পাল্টে নতুন বিশ্বব্যবস্থা আসতে চেয়েছে, তখনই সেটি খুব বড় ধরনের দ্বন্দ্ব-সংঘাত তৈরি করেছে। অনেক ক্ষেত্রেই সেটি ভয়ঙ্কর সামরিক‌ সংঘাতে রূপ নিয়েছে। প্রথম বা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের কারণ হিসেবে বেশ কিছু বিষয় আমাদের সামনে আসে, কিন্তু সেগুলো আদতে ছিল বাহানা। বিশ্বযুদ্ধগুলো আসলে হয়েছিল আগের বিশ্বব্যবস্থাটির পরিবর্তে নতুন একটি বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থা কায়েম আছে। মাঝে কিছুদিন সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে কিছুটা প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হলেও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর একচ্ছত্র নেতৃত্বে ভোগ করেছে আমেরিকা। এই পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে ‌চীনের ক্রমাগত উত্থান একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা তৈরি হওয়ার প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করেছে। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্যযুদ্ধের ব্যাপ্তি বাড়তে আমরা দেখেছি। সেটি পুরোপুরি সামরিক সংঘাতে জড়াবে কিনা, তা বলার সময় এখনও আসেনি।

চীনের উত্থান এই সময়টায় যে ভীষণরকম সংঘাতময় হবে, সেটি এবারের এই ফোরামে স্পষ্টভাবে দেখলাম। মাত্রাগত পার্থক্য ছিল হয়তো, কিন্তু প্রায় সব আলোচক নানাভাবে চীনের সমালোচনা করছিলেন। সব সংকটের জন্য মূলত চীনকে দায়ী করছিলেন। তাই অনুমান করা যায়, সামনের দিনগুলোতে এই সংঘাত বাড়বে। এটি সারা পৃথিবীর জন্য একটি ভয়ের ব্যাপার নিশ্চয়ই। বিশ্বমন্দার এক যুগ পেরোতে না পেরোতেই ২০২০ সালে পৃথিবীতে আরেকটি মন্দার পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। অন্য কোনও কারণ থাকলেও চীন-আমেরিকা বাণিজ্যযুদ্ধ এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে। এটি এড়ানোর তেমন কোনও দিক-নির্দেশনা আমি এই আলোচনায় দেখিনি।

সারা পৃথিবীতে নানাভাবে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার প্রত্যক্ষ প্রভাব হিসেবে শরণার্থী সমস্যা তৈরি হওয়ার কথা ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সংঘাতের কারণে উদ্ভূত শরণার্থী সমস্যায় আক্রান্ত হওয়া ইউরোপ এবং আমেরিকার প্রতিনিধিরা এই ব্যাপারে যথেষ্ট উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, এখানে তারা নিজেদের দায় সেভাবে দেখছেন না। শরণার্থীকে আশ্রয় দেবো কিনা, সেটি এই মুহূর্তে রক্ষণশীল ও উদার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আমি খেয়াল করলাম, শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া বা না-দেওয়ার ক্ষেত্রে আলোচনাটা যত হয়েছে, শরণার্থী সমস্যা সৃষ্টি যেন না হয় সেই আলোচনা কিন্তু ততটা হয়নি। এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য জায়গায় শরণার্থী সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার পেছনে পশ্চিমা দেশগুলোর ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছে।

বর্তমানে ডিজিটাল প্রযুক্তির ফলে সরকার এবং নাগরিকদের মধ্যে সম্পর্কের ধরন পাল্টে গিয়ে যে নতুন ধরনের মিথস্ক্রিয়া তৈরি হচ্ছে সেটা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ফলে সরকারের নানা কর্মকাণ্ড, সিদ্ধান্ত খুব সহজে নাগরিকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যাচ্ছে। ডিজিটালাইজেশনের কারণে সরকারি বিভিন্ন সেবাও জনগণের হাতের নাগালে নিয়ে যাওয়া যায় খুব দ্রুত এবং স্বল্প ব্যয়ে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, এই ডিজিটাল প্রযুক্তির কারণেই জনগণের ওপর সরকারি নজরদারির অনেক বেশি সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাই নাগরিকের ব্যক্তিজীবনে ঢোকার চৌহদ্দিটা রাষ্ট্রের যতটুকু হওয়ার কথা, সেই জায়গায় রাষ্ট্রগুলো থাকছে না, রাষ্ট্র এখন অনেক বেশি নাগরিকের ব্যক্তিজীবনে প্রবেশ করতে পারছে। বর্তমানে চীন একটা অরওয়েলিয়ান সার্ভেল্যান্স স্টেটের খুব কাছাকাছি পর্যায়ে চলে গেছে। এই কারণে চীনের সমালোচনা হয়েছে, কিন্তু পশ্চিমা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোও যে এখন একই প্রবণতায় হাঁটছে, সেই ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা ছিল না।

প্যানেল আলোচনার বাইরেও বেশ কিছু গ্রুপ ডিসকাশন ছিল, ছিল সাইডলাইনে ও ডিনারের টেবিলে আলোচনাও। এইসব আলাপচারিতায় আমি সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছি মধ্য-ডান এবং ডান আর উগ্র ডানের মাঝে একটা স্পষ্ট সীমারেখা টানার ব্যাপারে। বিশ্বের রাজনীতির দিকে তাকালে আমার কাছে এখন মনে হয়, সীমারেখাটা এখন ভীষণ অস্পষ্ট। মধ্য-ডান দলগুলোতে এখন কিছু জননায়ক তৈরি হয়েছে, যারা এমন কিছু বলে ভোট চাইছেন এমনকি নির্বাচিত‌ও হচ্ছেন, সেগুলো কিছুকাল আগেও উগ্র ডানপন্থীদের বক্তব্য বলেই আমরা জানতাম। এই প্রবণতা থেকে মুক্তি পাওয়া না গেলে এই ধারার রাজনীতির ভবিষ্যত খুব বড় সংশয়ে থাকবেই।

ঠিক একইভাবে আমি বিশ্বাস করি মধ্য-ডান দলগুলো ক্ষমতায় আসলে ব্যবসা-বাণিজ্যে কতটুকু সংরক্ষণবাদ থাকবে, তাও নির্ধারিত হওয়া উচিত। গ্লোবালাইজেশনের পথে বেশ অনেকটা সময় হেঁটে পৃথিবী এখন আগের সংরক্ষণবাদী বাণিজ্য ধারায় ফিরে আসতে পারে না, সেই বাস্তবতা সবাইকে বুঝতে হবে। এই প্রবণতা বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমার মধ্যে যথেষ্ট ভীতি তৈরি করে কারণ এই সংরক্ষণবাদিতা এবং বিশ্বায়নবিরোধী পদক্ষেপ সবচেয়ে ভয়াবহভাবে প্রভাবিত করবে বাংলাদেশের মতো গরিব দেশগুলোকে।

জনগণের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা মধ্য-ডান রাজনৈতিক ধারার খুব গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এটা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আমি আমার আলাপচারিতায় বলেছি, যে অজুহাতই থাকুক না কেন, রাষ্ট্র জনগণের জীবনে কতটুকু ঢুকবে, তারও একটা সুনির্দিষ্ট সীমারেখা থাকা উচিত। বিভিন্ন পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে এটা নির্ধারণ করা উচিত এবং রাষ্ট্রকে জনগণের ব্যক্তি জীবনে প্রবেশ থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখা দরকার।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মধ্য-ডান দলগুলোর ডান দিকে আরও সরে যাওয়া পৃথিবীতে নানা সংকট তৈরি করছে। এর‌ মধ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আর্থিক সংকট। সমস্যা হচ্ছে আর্থিক সংকট থেকে জনগণের দৃষ্টি ফেরানোর জন্য এই রাজনৈতিক দলগুলো আগের চেয়ে আরও বেশি ডানে সরে গিয়ে মানুষের মধ্যে ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী, শ্রেণি, লিঙ্গের ভিত্তিতে নানারকম বিভাজন তৈরি করে ক্ষমতায় যাওয়ার বা ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করবে। সার্বিক অবস্থায় মনে হয়, ডানপন্থী রাজনীতি আর আর্থিক সংকট একটা দুষ্টচক্রে পরিণত হচ্ছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সামনের সময়টা নিয়ে আমার মধ্যেও শঙ্কা তৈরি হয়েছিল বেশ আগেই। মধ্য-ডান দের ওয়াশিংটন সম্মেলন আমার শঙ্কা কমায়নি মোটেও, আশাবাদ তৈরি করেনি; আমার হতাশা আরও কিছুটা বেড়েছে বরং।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ