মুজিববর্ষ: বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতা এবং বর্তমান রাষ্ট্রধর্ম

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৬:২০, জানুয়ারি ১৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২১, জানুয়ারি ১৬, ২০২০

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীএই বছর বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ। আগামী ১৭ মার্চ ২০২০ থেকে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত পালিত হবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের নানা অনুষ্ঠান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মাত্র ৫৫ বছর বয়সে তিনি প্রয়াত হয়েছেন। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ার এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ইতিহাসের এই বরপুত্র। ইতিহাসের বেশিরভাগ মহানায়কেরা জন্মেছেন সাধারণ পরিবারে।
ফরাসি যখন ব্রিটিশরা প্রায় গ্রাস করে ফেলেছিল, তখন সুদূর পাড়াগাঁও থেকে ফ্রান্সের কিংবদন্তি নেত্রী জোয়ান অফ আর্ক এসে পলায়নপর রাজা থেকে কিছু সৈন্য চেয়ে নিয়ে ব্রিটিশ বাহিনীকে প্রতিরোধ করেছিলেন। আর তাদের হটিয়ে ফ্রান্সের স্বাধীনতা রক্ষা করেছিলেন। জোয়ান অফ আর্কও ছিলেন এক কৃষক পরিবারের সন্তান। তাকেও প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা আর খ্রিষ্টান মোল্লারা পুড়িয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। নিয়তির এই বিচিত্র পরিহাস বোঝা মুশকিল।
১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ক্ষণগণনা আরম্ভ হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ছিল জাতির প্রতি দিকনির্দেশনা। তিনি সেদিন আর কোনও রাখঢাক রেখে কথা বলেননি। তিনি জাতিকে মুক্তির সংগ্রাম আর স্বাধীনতার সংগ্রামের প্রস্তুতি নিতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। কী অবস্থায় কী করতে হবে, তার নির্দেশনাও দিয়েছিলেন। ২৫ মার্চ রাত্রি দ্বিপ্রহরে পাকিস্তানি সেনারা তাকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে যায় এবং সেখানে তিনি দীর্ঘ নয় মাস মিয়ানওয়ালি জেলে নির্জন কারাবাসে দিন কাটান।

এই নয় মাসের মধ্যে তার সঙ্গে পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো একবার দেখা করেছিলেন। ভুট্টোই নাকি বঙ্গবন্ধুকে প্রবাসী সরকার গঠিত হওয়ার কথা বলেছিলেন এবং বঙ্গবন্ধুকে যে সেই সরকারের রাষ্ট্রপতি করা হয়েছিল তাও অবহিত করেছিলেন। এছাড়া যুদ্ধের তেমন আর কোনও খবর তার কাছে পৌঁছায়নি।

মুক্তিযুদ্ধের শেষে বঙ্গবন্ধুকে ৮ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে পাকিস্তানিরা মুক্তি দিয়েছিল এবং একটি বিমানে করে বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছায় লন্ডন পাঠিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতার পরে লন্ডনই ছিল মুক্তিযুদ্ধের কর্মকাণ্ডে প্রধান কেন্দ্র। লন্ডনে যখন বঙ্গবন্ধু পৌঁছলেন, তখন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী লন্ডনে ছিলেন না। তিনি তড়িঘড়ি করে সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরে আসেন এবং বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে যথাযথ মর্যাদা প্রদান করেন।

বঙ্গবন্ধু মার্চ মাসে ইয়াহিয়া খানসহ পাকিস্তানি নেতাদের সঙ্গে আলোচনার সময় টের পেয়েছিলেন, বাঙালিদের জন্য স্বাধীনতা ছাড়া বিকল্প কোনও পথ উন্মুক্ত নেই। তাই তিনি সেভাবেই সবকিছু প্রস্তুত করে ফেলেছিলেন। তিনি সিরাজগঞ্জের বেলকুচি আসনের সংসদ সদস্য ডাক্তার আবু হেনাকে কলকাতা পাঠিয়েছিলেন ঘর ভাড়া করে রাখার জন্য। নেতারা দেশ ত্যাগ করে চলে গেলে যেন থাকার কোনও অসুবিধা না হয়।

বঙ্গবন্ধু ২৩ মার্চ থেকে সবাইকে দেশ ত্যাগের প্রস্তুতি নিতে বলেন। ২৫ মার্চের সন্ধ্যা থেকে শত অনুরোধের পরও ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে সরে যেতে সম্মত হননি বঙ্গবন্ধু। অবশেষে তাজউদ্দীন আহমদ বিফল মনোরথ হয়ে বঙ্গবন্ধুকে ছাড়াই ৩২ নম্বরের বাড়ি ত্যাগ করেছিলেন। আর রাত্রি দ্বিপ্রহরে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানিরা গ্রেফতার করে নিয়ে যায়।

আন্দোলনের মূল নেতা ভারতে পালিয়ে গেলে দেশের মানুষ কী বিবেচনায় নেবে, সেই সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা না থাকায় বঙ্গবন্ধু ভারতে না যাওয়াই উত্তম মনে করেছিলেন। কিছু বাজে রাজনীতিবিদ বলে থাকেন বঙ্গবন্ধু নাকি আত্মসমর্পণ করেছিলেন। বিদ্বেষেরও একটা সীমা আছে। আত্মসমর্পণ করে কেউ কখনও কি ফাঁসির কাষ্ঠে যায়? তখনকার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার তার বইতে লিখেছেন—ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসিতে ঝুলানোর সব ব্যবস্থা করে ফেলেছিলেন। তার হস্তক্ষেপে বঙ্গবন্ধু বেঁচে যান। তিনি নাকি ইয়াহিয়াকে বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করলে সমাধানের সব পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে।

১০ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীন দেশে ফিরে এসেছিলেন। লন্ডন থেকে ঢাকা ফেরার পথে তিনি দিল্লিতে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী দিল্লিতে তাকে বীরোচিত সংবর্ধনা দিয়েছিলেন। বাঙালি জাতির স্বাধীনতার ইতিহাসে এই মহীয়সী মহিলার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয়। বঙ্গবন্ধু সংবিধান রচনার শুরুতে সংবিধানের মূল চার নীতির কথা বলেছিলেন। এই চার নীতিকে ভিত্তি করে সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে বাম দলগুলো তখনও প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল। আবার ধর্মপন্থীরাও নানা কথা বলেছিলেন। কিন্তু পশ্চিমা ধ্যান-ধারণার ধর্মনিরপেক্ষতাকে নাকচ করে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। প্রত্যেক মানুষ তার নিজ নিজ ধর্ম পালনের ও প্রচারে পরিপূর্ণভাবে স্বাধীনতা ভোগ করবে। শুধু রাষ্ট্র ও রাজনীতি ধর্মের ব্যাপারে নিরপেক্ষ থাকবে। কোনও বিশেষ ধর্মকে প্রশ্রয় দেবে না। ধর্মভিত্তিক দল গঠনের বিষয়েও নিষেধাজ্ঞা ছিল। পুরো স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি। ইসলাম ও পাকিস্তানকে সমার্থক করে স্বাধীনতারবিরোধী শক্তি পুরো ধর্মটারই বিকৃত রূপ পেশ করেছিল।

১৯২০ সালে কলকাতা কংগ্রেসের সম্মেলনের পর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কংগ্রেস থেকে সরে যান। তিনি যদি তখন মুসলিম লীগের নেতৃত্ব না নেন তবে তিনি সৈন্যহীন সেনাপতির মতো হয়ে যেতেন। মুসলিম লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করে তিনি তা থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন। মাওলানা আশরাফ আলী থানবী মাহমুদাবাদ এর রাজার ঘরে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে শেরওয়ানি, পায়জামা আর জিন্নাহ টুপি পরিয়ে মুসলিম নেতা বানিয়েছিলেন। জিন্নাহর ইসলাম প্রেম ছিল অতটুকুই। ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মের প্রতি তার কোনও অনুরাগই ছিল না।

গান্ধীর রাজনীতিতে জিন্নাহ আক্ষরিক অর্থে হতাশ হয়ে দ্বিজাতি তত্ত্ব উত্থাপন করেছিলেন। যেই মুসলিম লীগকে একসময় তিনি সাম্প্রদায়িক দল মনে করতেন, শেষ পর্যন্ত তারই তিনি প্রধান হলেন। হিন্দু-মুসলমান জিন্নাহর কাছে কোনও ধর্ম নয়, ছিল দুটি জাতি। এই জাতি ভাবনা ইউটোপিয়ান ট্র্যাজেডি।

গান্ধী মনে করতেন গীতা সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি নয়, মানুষের সৃষ্ট গ্রন্থ। তিনি মনে করতেন, মানুষের মনের নিবিড় পর্যবেক্ষণ হলো গীতা। মহাভারতকে গান্ধী ঈশপের গল্প বলে মনে করতেন। গান্ধী ইতিহাসের দেহ থেকে পুরান ধর্ম বিযুক্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার উপমা আশ্রিত নীতি শাস্ত্রীয় অভিমুখে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। লোকে ভুল বুঝেছে। তার রামরাজ্য যে ইউটোপিয়া, সে কথা পরিষ্কার হয়ে ওঠেনি যথাসময়ে। মহাত্মা গান্ধীর সীমাহীন ট্র্যাজেডি এটাই।

আম্বেদকরের সঙ্গে গান্ধীসহ হিন্দু নেতাদের বিরোধ হয়েছিল দলিতদের মন্দিরে প্রবেশ নিয়ে। আসলে আম্বেদকর মেটেরিয়াল দৃষ্টিভঙ্গির লোক ছিলেন। তিনি যে দলিতদের পূজারী বানাতে চেয়েছিলেন তা নয়, বরং সমাজে দলিতদের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন করার জন্য আর স্বাভাবিক সামাজিক কাঠামোতে তাদের যুক্ত করানোর জন্য আন্দোলন করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তার এই উদ্যোগও ভুল বোঝাবুঝিতে পরিসমাপ্তি ঘটে। শেষ পর্যন্ত তিনি হিন্দু ধর্মই ত্যাগ করেন। এটি ছিল আম্বেদকরের করুণ ট্র্যাজেডি।

বঙ্গবন্ধু এইসব ইতিহাস জানতেন। তাই তিনি ধর্ম নিয়ে বেশি কথা বলতে চাননি। ধর্মনিরপেক্ষতার একটা বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণ দিয়ে ট্র্যাজেডির হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করেছিলেন। প্রকৃত প্রস্তাবে সেটাই ছিল বাস্তব ও সমন্বিত ব্যবস্থা।

সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদ নিজের স্বার্থে সংবিধানে বঙ্গবন্ধুর রাখা ধর্মনিরপেক্ষতাকে খর্ব করে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করেছেন। বাকিরাও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করাতে ইসলামের কোনও উপকার হয়নি, রাষ্ট্রেরও কোনও উপকার হয়নি। বরং বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে বিতর্কিত করা হয়েছে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ