‘ট্রাম্পেমেরিকা’!

Send
আহসান কবির
প্রকাশিত : ১৮:০৪, জানুয়ারি ১৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৫৫, জানুয়ারি ১৯, ২০২০

আহসান কবিরআমেরিকা নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত কথাটা হচ্ছে—আমেরিকা যার বন্ধু তার শত্রুর প্রয়োজন হয় না! ট্রাম্প ২০১৬ সালে নির্বাচনে জিতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর সেখানকার এক বিখ্যাত লেখকের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল ট্রাম্পের ব্যাপারে তিনি কোনও প্রতিক্রিয়া জানাবেন কিনা। লেখক উত্তর দিয়েছিলেন, এর চেয়ে আমার পোষা কুকুরটা নিয়ে সময় কাটানো অনেক ভালো! তবে মার্কিন এক সাংবাদিকের ভাষ্য হচ্ছে, সারা পৃথিবী এখন কোনও না কোনোভাবে ‘ট্রাম্প ম্যানিয়া’য় ভুগছে। বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে নিচের বিষয়গুলো খেয়াল করে পড়ুন।
এক. যে ইরান ১৯৭৯ সাল থেকে ঠান্ডামাথায় আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিরদ্ধে সব ধরনের যুদ্ধ, উসকানি ও অর্থনৈতিক অবরোধ মোকাবিলা করে আসছিল, সেই ইরান তাদের রেভল্যুশনারি গার্ডের কুদস ফোর্সের প্রতিষ্ঠাতা ও কমান্ডার কাসেম সোলাইমানি হত্যার (আমেরিকা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল) সাত দিনের ভেতর মাথা গরম করে ‘ট্রাম্পে’র মতো একটা কাজ করে ফেলেছে। তাদের ‘ভুল’ নিক্ষেপিত ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ইউক্রেনের একটি বিমান তেহরান বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পর বিধ্বস্ত হয় এবং ১৮০ জন আরোহীর সবাই মারা যান। যদিও ইরান এই ঘটনার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষমা চেয়েছে এবং যারা মারা গিয়েছেন তাদের জন্য ‘সর্বোচ্চ’ কর্তব্য করার ঘোষণা দিয়েছে। তারপরও! সব ভুলের জন্য কি মানুষ ক্ষমা করে? ইউক্রেনসহ কয়েকটি দেশে বিক্ষোভ হয়েছে, দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি দাবি করা হয়েছে। খোদ ইরানে মানুষ রাস্তায় নেমেছেন, তারা ইরানি প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ দাবি করেছেন। হয়তো আরও বড় কোনও কিছু অপেক্ষা করে আছে ইরানিদের কপালে!

দুই. আমেরিকায় শিশুদের মধ্যে মিথ্যা বলার প্রবণতা বাড়ছে। কারণ কী? কারণ হচ্ছে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মিথ্যা কথা বলায় বিশ্বরেকর্ড করেছেন। ওয়াশিংটন পোস্টের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ছয়টা মিথ্যা কথা বলে থাকেন ট্রাম্প! ২০১৮ ও ২০১৯-এ ট্রাম্প যত মিথ্যা বলেছেন তার রেকর্ড এই পৃথিবীর কেউ ভাঙতে পারবে না!

তিন. রাশিয়ার পুতিন, ভারতের নরেন্দ্র মোদি, উত্তর কোরিয়ার কিম জং উন, সৌদির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মাদ বিন সালমানের মতো নেতাদের সংখ্যা বাড়ছে পৃথিবীতে। কারণ কী? কারণ, ট্রাম্পের রাজনৈতিক আচরণ ও উন্মাদনা তাদের উসকে দেয়, ট্রাম্পের মতো তারা উন্মাদনা ও উসকানি তৈরি করেন নিজের দেশে, আতঙ্কিদ হন সাধারণ মানুষ। ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন—সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও মুসলমানকে আমেরিকায় ঢুকতে দেওয়া হবে না! তিনি আরও ঘোষণা দিয়েছিলেন—আমেরিকার সব মুসলমানের নামের তালিকা করতে হবে এবং মসজিদগুলো যেহেতু সন্ত্রাসের আখড়া, প্রয়োজনে মসজিদ বন্ধ করে দেওয়া হবে! নাগরিক তালিকাপঞ্জি সংশোধনের নামে ইন্ডিয়া যে আইন করেছে তাতে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নেপাল আর বাংলাদেশ থেকে যে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানরা ভারতে গিয়েছে তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে, শুধু নাগরিকত্ব হারাতে পারেন মুসলমানরা! যারা ধীরস্থির আর দেশের জন্য কাজ করে যেতে পছন্দ করেন, এমন রাষ্ট্রনায়করাই হয়তো ভবিষ্যতে আমেরিকার বিরোধিতার মুখে পড়বেন। এমন একজন মালয়েশিয়ার বর্ষীয়ান প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ তাই বলতে পারেন—হয়তো আমাকে হত্যার জন্য ছুটে আসছে কোনও ঘাতক ড্রোন!

চার. দশ জনে একজন মার্কিন নারী ইদানীং ট্রাম্পকে নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে খুব বেশি সোচ্চার হতে পারেননি তার স্বামী বিল ক্লিনটনের কারণে। ক্লিনটন মনিকা লিউনেস্কিসহ যেসব নারীকে নিগ্রহ করেছিলেন, ট্রাম্প তাদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। নির্বাচনি প্রচারণায় কোনও কোনও নারীকে দিয়ে ট্রাম্প বলানোর চেষ্টা করেছিলেন, তারা প্রেসিডেন্ট খুঁজছেন, কোনও স্বামী খুঁজছেন না। স্বামী হিসেবে ক্লিনটনের চেয়ে নাকি ট্রাম্পই ভালো! মার্কিন নারীদের হীনমন্যতার কারণ, তারা একজন উন্মাদকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় এনেছিলেন। নারীরাই উন্মাদ ট্রাম্পকে বেশি ভোট দিয়েছিলেন। অথচ ট্রাম্প নারীদের উদ্দেশ করে বলেছিলেন—আমি সুন্দরী মেয়ে দেখামাত্র চুম্বকের মতো আকৃষ্ট হয়ে পড়ি। সামান্য অপেক্ষাও করি না! তাদের সঙ্গে যা ইচ্ছা তাই করা যায়, গায়ে হাত দিয়ে আদর করলেও অসুবিধা নাই। হিজাব পরা নারীদের ট্রাম্প বলতেন—‘লেটার বক্স’ আর ‘চলমান ব্যাংক ডাকাত’। কালো মেয়েদের হাসি তার কাছে ‘তরমুজ’-এর মতো!

হুমায়ুন আজাদ লিখেছিলেন—মানুষ প্রশংসা করে সিংহের, কিন্তু ভালোবাসে গাধাকেই। আমেরিকানরা সম্ভবত সবচেয়ে খারাপ গাধাটাকেই প্রেসিডেন্ট বানিয়েছে। জানি না এরপর আর কী আছে আমেরিকানদের কপালে।

পাঁচ. অভিবাসী আইনের প্রয়োগ এবং আমেরিকায় যারা স্থায়ীভাবে থাকার ইচ্ছা পোষণ করছেন, ট্রাম্প তাদের প্রতি নির্দয় ব্যবহার করেছেন। মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তোলার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ইরাক দখল ও সেখানে আমেরিকান সৈন্য রাখা, সিরিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, ইরানে অর্থনৈতিক অবরোধ, ইয়েমেনের সঙ্গে যুদ্ধে সৌদি আরবকে সমর্থন, আফগানিস্তানে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা জিইয়ে রাখাসহ সারা পৃথিবীতে অশান্তি ও অস্থিরতা তৈরির জন্য এককভাবে দায়ী আমেরিকা ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের মতো আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রের এমন রূপকার এর আগে এসেছেন কিনা সন্দেহ।

এতকিছুর পরেও হয়তো উগ্র জাতীয়তাবাদের কারণে আমেরিকায় ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা বাড়বে। ট্রাম্প ম্যানিয়ায় ভুগবে কিছু মানুষ। কিন্তু এর পরিণতি শেষমেশ কী হবে?

এক. ট্রাম্পের বিপরীতে কাসেম সোলাইমানির মতো মানুষ সৃষ্টি হবে। যারা আমেরিকার কর্তৃত্বের ভেতরেও নিজগুণে তাদের উপস্থিতি জানান দেবে। আমেরিকার জন্য ক্রমশ কঠিন হবে পৃথিবী। সিরিয়া, ইরান, এই সময়ের ইরাক, যারা সংসদে আইন পাস করেছে আমেরিকান সৈন্য ফেরত পাঠানোর, লেবানন, ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহী, যারা সৌদির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, তারা তাদের অবস্থান সংহত করবে, জনপ্রিয় হয়ে উঠবে আমেরিকাবিরোধী নতুন বলয়।

দুই. সারা পৃথিবী ‘মুসলিম ভার্সাস অ্যান্টি মুসলিম’ সেন্টিমেন্টে বিভাজিত হতে পারে।

তিন. আমেরিকা ও অন্যান্য শক্তির বাস্তবতায় মুসলিমদের মধ্যে বিভাজনটাও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে।

লেখাটা শুরু করেছিলাম ট্রাম্পকে নিয়ে। ট্রাম্পকে দিয়েই শেষ করি। ট্রাম্প নিয়ে বর্তমান বাস্তবতা—

এক. আমেরিকার একাধিক ব্যক্তি ট্রাম্পকে নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। একজনের মতে—ট্রাম্পের পরিবারে মদপান ও ‘উন্মাদনা’ নতুন কিছু নয়। ট্রাম্পের সহোদর ফ্রেড জুনিয়রের মৃত্যু হয়েছিল অতিরিক্ত মদপান এবং উন্মাদ অভিব্যক্তির কারণেই!

দুই. মিথ্যাচারের অভ্যাসটাও  ট্রাম্প পরিবারের পুরনো। ট্রাম্পের বাবা ফ্রেড ট্রাম্প দাবি করতেন তিনি সুইডিশ বংশোদ্ভূত। ১৯৮৭ সালে ট্রাম্প নিজেও একটা বইয়ে এমন লিখেছিলেন। পরে ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন, তার পূর্বপুরুষ জার্মানি থেকে আমেরিকায় এসেছিলেন!

তিন. তিন পুরুষ আগে ট্রাম্পরা অভিবাসী হয়ে আমেরিকায় এসেছিলেন। আর ট্রাম্প নিজে এখন অভিবাসীদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। বারাক ওবামার পরিবার অভিবাসী হলেও তিনি আমেরিকায় ‘আগত’দের প্রতি নির্দয় ছিলেন না।

চার. নির্বাচনি প্রচারণার সময়ে হিলারির কারণে ট্রাম্প সবচেয়ে বেশি সরব ছিলেন বিল ক্লিনটনের বিরুদ্ধে। প্রায় একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে এখন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে। পর্নো তারকা স্টর্মি ড্যানিয়েলসের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন, টাকা-পয়সার লেনদেন, অনৈতিক সম্পর্ক ও এটা নিয়ে সত্য না মিথ্যা বলেছেন ট্রাম্প, সেই বিষয়ে তদন্ত, এমনকি ইমপিচমেন্টেরও মুখোমুখি হতে পারেন তিনি! ইতিহাস ফিরে ফিরে আসে। শিক্ষা নেয় না কেউ?

পাঁচ. আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে মামলাবাজ এবং কোটিপতি প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন ট্রাম্প। এখন পর্যন্ত ট্রাম্প নিজে করেছেন অথবা তার বিরুদ্ধে করা হয়েছে এমন মামলার সংখ্যা ৭৫টি! এই মামলার জন্য প্রেসিডেন্ট হওয়া সত্ত্বেও তাকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতে পারে।

ট্রাম্প যুগ শেষ হওয়া পর্যন্ত তার এমন পাগলামি বিশ্ববাসীকে সহ্য করতেই হবে। কী আর করা? ট্রাম্পকে নিয়ে প্রচলিত একটা কৌতুক শুনে বিদায় নেই।

ভবিষ্যতের একযুগে এক লোক দোকানে গেছে  ‘মেমোরি’ কিনবে বলে। দোকানে গিয়েই তার মাথা নষ্ট। বিজ্ঞানীদের মেমোরির দাম সবচেয়ে কম। মাত্র পঞ্চাশ ডলার। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী কিংবা শিক্ষকদের মেমোরির দাম একশ’ ডলার। রাজনীতিবিদদের মধ্যে ট্রাম্পের মেমোরির দাম সবচেয়ে বেশি, পাঁচশ ডলার। লোকটা দোকানির কাছে জানতে চাইলো কারণ কী? দোকানির উত্তর—বিজ্ঞানীরা জীবদ্দশায় তাদের মেমোরি প্রায় শেষ করে ফেলেন গবেষণার কাজে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষকদের মেমোরিরও অনেকটা ব্যয় হয় তাদের পেশায়। রাজনীতিবিদদের মেমোরি শুধু ‘ইনটেক’ থাকে। সবচেয়ে বেশি ইনটেক ট্রাম্পের মেমোরি! জীবদ্দশায় সেটা কোনও কাজেই লাগেনি!

লেখক: রম্যলেখক

/এসএএস/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ