আবরারের মৃত্যু ও সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ

Send
মো. জাকির হোসেন
প্রকাশিত : ১৭:০৬, জানুয়ারি ২০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২০, জানুয়ারি ২০, ২০২০

মো. জাকির হোসেনরেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র নাইমুল আবরারের মৃত্যুর ঘটনায় প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, সহযোগী সম্পাদক আনিসুল হকসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাকে কেন্দ্র করে বিভক্ত জাতি আরেক দফা বিভক্ত হয়েছে। বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক উদ্বেগ প্রকাশ করে অভিযুক্তদের পক্ষে বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতিতে বিশিষ্ট নাগরিকরা মামলাটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। বিশেষ করে এই মামলায় প্রথম আলো সম্পাদককে সম্পৃক্ত করায় মামলাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাক্‌স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে রুদ্ধ করার চেষ্টা বলে মনে করছেন বিশিষ্ট নাগরিকেরা। বিবৃতিতে তারা আরও দাবি করেছেন, দেশে বাক্‌স্বাধীনতার ওপর একের পর এক যেসব আঘাত আসছে, তা থেকে মামলাটিকে পৃথক করে দেখার কোনও অবকাশ নেই। তারা এই মামলায় প্রথম আলো সম্পাদকসহ সব অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিপূর্ণ আইনগত প্রতিকার ও সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার অবারিত রাখার দাবিও জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, দেশে বিশিষ্টজনদের পাশাপাশি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিদেশি এএফপি, নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, বিবিসি বাংলা, আইএএনএস, ভয়েস অব আমেরিকাসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম। এই পরোয়ানাকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে একটি ভয়ানক ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছে ওয়াশিংটনভিত্তিক মার্কিন সংবাদমাধ্যম বেনার নিউজ।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে,  গত বছরের ১ নভেম্বর রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজে প্রথম আলো আয়োজিত কিশোরদের ম্যাগাজিন কিশোর আলোর বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যায় নাইমুল আবরার। গত ৬ নভেম্বর নাইমুল আবরারের বাবা মজিবুর রহমান বাদী হয়ে অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগ এনে প্রথম আলো সম্পাদকসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে ঢাকার অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন। আদালত গত বছরের ১ ডিসেম্বরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে মোহাম্মদপুর থানার ওসিকে নির্দেশ দেন। তদন্ত শেষে চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি মোহাম্মাদপুর থানার তদন্ত কর্মকর্তা প্রথম আলো সম্পাদকসহ ১০ জনের নামে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। এরপর ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত বাদীপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। আসামিরা গ্রেফতারি পরোয়ানার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হলে আদালত প্রথম আলো সম্পাদককে চার সপ্তাহের জামিন দেন। আর আগাম জামিনের আবেদন করা বাকি পাঁচজনকে এ মামলায় অভিযোগ আমলে না নেওয়া পর্যন্ত হয়রানি বা গ্রেফতার না করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

আবরারের মৃত্যু, তার বাবার মামলা দায়ের, সংবাদপত্রের স্বাধীনতাহরণের অভিযোগ, বিশিষ্টজনের উদ্বেগ এবং আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা জারিসহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ে নানা প্রশ্ন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে। আবরারের মৃত্যু নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে বক্তব্য হলো ‘মঞ্চের পাশে জরুরি চিকিৎসাশিবির ছিল, যেখানে দুজন এফসিপিএস চিকিৎসক কর্মরত ছিলেন। আইসিইউ সুবিধাসংবলিত অ্যাম্বুলেন্স সেখানে প্রস্তুত ছিল। অনুষ্ঠানস্থলে স্থাপিত চিকিৎসা শিবিরে আবরারকে নিলে দুজন এফসিপিএস চিকিৎসক তাকে চিকিৎসা দেন। এরপর অবস্থা গুরুতর বিবেচনায় তাকে হাসপাতালে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাকে কোন হাসপাতালে নেওয়া হবে, এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন চিকিৎসকেরা, যা তাদের এখতিয়ারভুক্ত। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা হাসপাতালে আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর প্রস্তুত রেখেছিল। হাসপাতালে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই  তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়েছে।’ অন্যদিকে, ইউনিভার্সেল হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. আশিস কুমার চক্রবর্তী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, কিশোর আলোর অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎস্পর্শে নিহত নাইমুল আবরারকে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত ঘোষণার জন্য তার লাশ মহাখালীর ইউনিভার্সেল হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আবরার স্কুলের মাঠেই মারা গিয়েছিল। তবে একজনকে মৃত ঘোষণা করতে হলে কিছু প্রক্রিয়া রয়েছে, সেগুলো সম্পন্ন করতেই সেখানে থাকা দুজন চিকিৎসক তাকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন’। ডা. আশিস বলেন, ‘আবরারের সঙ্গে কিশোর আলোর দুজন স্বেচ্ছাসেবীও ছিলেন। তাকে মেডিক্যাল ক্যাম্পেই চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেছিলেন। সেখানে কিশোর আলোর যে স্বেচ্ছাসেবীরা ছিলেন, তারা তা জানতেন।’

কার বক্তব্য সত্য, প্রথম আলো নাকি ইউনিভার্সেল হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. আশিস কুমার চক্রবর্তীর বক্তব্য? যদি ডা. আশিস কুমার চক্রবর্তীর বক্তব্য সত্য হয়, তাহলে আয়োজকরা এর দায় এড়াবেন কী করে? অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্ব বা পুরো আয়োজন শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা খবরটি চেপে গেছেন। উপস্থিত শিক্ষার্থীদের জানাননি। হই-হুল্লোড়, উল্লাস-আনন্দের আড়ালে আবরারের মৃত্যুকে ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করা হলো। যারা ওই অনুষ্ঠানে ছিল, সেই শিক্ষার্থীরা সন্ধ্যা সাতটার দিকে খবরটি জানে। কী মর্মান্তিক? আয়োজনে অংশগ্রহণকারীদের অভিযোগ বিদ্যুৎ সরবরাহের জেনারেটরের তার উন্মুক্ত ছিল এবং এলোমেলোভাবে ছড়ানো ছিল। আবরারের মৃত্যুর ঘটনাকে চেপে গিয়ে এই যে অনুষ্ঠান চালিয়ে যাওয়া হলো উন্মুক্ত তারে জড়িয়ে আরও দুর্ঘটনা ঘটতে পারতো। একটি পক্ষের বক্তব্য হলো—আবরারের বাবা অভিযোগ করতে চাননি। ১ তারিখ আবরারের মৃত্যু হলো, আর ৩ তারিখে প্রকাশিত অনেক পত্রিকায় শিরোনাম হলো, নাইমুল আবরার রাহাত নিহতের ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়েছেন তার বাবা মজিবুর রহমান। তার মানে ১ তারিখে আবরারের বাবা অভিযোগ দায়ের না করলেও মৃত্যুর পরদিন তিনি আবরার হত্যার শাস্তি দাবি করেছেন।

একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত আবরারের বাবা মজিবুর রহমানের বক্তব্য ছিল এমন, ‘আমার ছেলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে আহত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্দেশ্যমূলকভাবে কালক্ষেপণ করে নিকটস্থ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে না নিয়ে মহাখালীর ইউনিভার্সাল হাসপাতালে নেয়। সেখানে উপযুক্ত চিকিৎসা না পেয়ে কিছুক্ষণ পর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। ছেলের লাশ ময়নাতদন্ত না করে আমাকে দিয়ে দেয়। বাবার কাঁধে ছেলের লাশ কত যে ভারী, তা একমাত্র আমিই বলতি পারি। এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।’ মজিবুর রহমান আরও বলেন, ‘অনুষ্ঠান শুরু হয় সকাল ৮টায়। রাহাত বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয় বিকাল ৪টায়, তার মৃত্যু হয় সন্ধ্যা ৭টায়। খবর মোবাইল ফোনে তার সহপাঠী লাভিব আমাদের জানায়। আমরা হাসপাতালে গিয়ে তার লাশ দেখতে পাই।’

প্রথম আলোর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের জন্য সরকার যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে আবরারের বাবাকে প্ররোচিত করে থাকে, তাহলে সরকারের পরামর্শদাতারা এ মামলায় কমপক্ষে দু’টি ভুল করেছেন। প্রথম ভুল হলো যে অপরাধের কারণে মামলা হয়েছে তা দণ্ডবিধির ৩০৪(ক) ধারায় বলা হয়েছে। এ ধারায় অপরাধের শিরোনাম হলো ‘অবহেলার ফলে ঘটিত মৃত্যু’। দণ্ডবিধিতে উল্লিখিত এ অপরাধ ও শাস্তির বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি দণ্ডার্হ নরহত্যা বলিয়া গণ্য নহে এরূপ কোনও বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত কাজ করিয়া কোনও ব্যক্তির মৃত্যু ঘটায়, সে ব্যক্তি যেকোনো বর্ণনার কারাদণ্ডে– যার মেয়াদ পাঁচ বৎসর পর্যন্ত হতে পারে বা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’ ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ি এটি আমলযোগ্য অপরাধ। যে অপরাধের কারণে ফৌজদারি কার্যবিধি আইনের দ্বিতীয় তফসিলে অনুসারে বা অন্য কোনও আইন অনুসারে পুলিশ বিনা পরোয়ানায় কাউকে গ্রেফতার করতে পারে তাকে আমলযোগ্য অপরাধ বলে। আমল যোগ্য অপরাধের সংবাদ মৌখিক বা লিখিতভাবে থানায় পৌঁছালে মামলা দায়ের করা হয়। ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ছাড়াই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা  এই অপরাধের তদন্ত করতে পারেন বা অন্য কোনও কর্মকর্তা দিয়ে তদন্ত করাতে পারেন। অন্যদিকে, যে অপরাধের জন্য ফৌজদারি কার্যবিধি আইনের দ্বিতীয় তফসিল অনুসারে বা অন্য কোনও আইন অনুসারে পুলিশ বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার করতে পারে না তাকে আমলের অযোগ্য অপরাধ বলে। এই অপরাধের জন্য থানায় মামলা দায়ের করা হয় না, শুধু জিডি এন্ট্রি করা হয়। ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ বা অনুমতি ছাড়া পুলিশ কর্মকর্তা এই অপরাধের তদন্ত করতে পারেন না। আবরারের মৃতুর ঘটনাটি আমলযোগ্য অপরাধ হওয়ায় তার বাবা ছাড়াও পুলিশ বা অন্য কেউ মামলা করতে পারতো।

প্রথম আলোর সম্পাদককে হয়রানি করতে চাইলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা না করে সরকার ভুল করেছে। পুলিশ বাদী হয়ে থানায় মামলা করলে অপরাধটি আমলযোগ্য হওয়ায় ম্যাজিস্ট্রেটের গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়াই ঘটনার পরপরই নভেম্বর মাসেই গ্রেফতার করতে পরতো পুলিশ। অন্যদিকে আবরারের বাবাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রেও সরকার ভুল করেছে। কারণ মামলাটি নালিশি মামলা হিসেবে আদালতে দায়ের না করে থানায় দায়ের করলে পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি ছাড়াই গ্রেফতার ও তদন্ত পরিচালনা করতে পারতো।

প্রথম আলোর সম্পাদক ওই অনুষ্ঠানের কিছুদিন আগে থেকেই  অসুস্থ ছিলেন। এ জন্য ঘটনার দিন তিনি ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। তাহলে তার বিরুদ্ধে কেন মামলা দায়ের হবে? ‘ডাল ম্যা কুছ কালা হ্যায়’। কিছুদিন আগে আদালতের রায়ে দেখলাম গ্রিনলাইন পরিবহনের চাপায় পা হারানো প্রাইভেটকারচালক রাসেল সরকারকে ৫০ লাখ টাকা, দুই বাসের চাপায় হাত হারানোর পর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া শিক্ষার্থী রাজীব হোসেনের দুই ভাইকে ২৫ লাখ করে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একইভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদের মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারকে ৪ কোটি ৬১ লাখ ৭৫ হাজার ৪৫২ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। বাসের মালিক, চালক ও সংশ্লিষ্ট বিমা কোম্পানিকে এই টাকা পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যে বাস চালক ৩০ লাখ, বাস মালিক ৪ কোটি ৩০ লাখ ৯৫ হাজার ৪৫২ এবং রিলায়েন্স ইনস্যুরেন্স ৮০ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হবে। এই তিনটি ঘটনার কোনোটিতেই বাসমালিক ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না কিন্তু অন্যের অপরাধের দায় তাদের বহন করতে হচ্ছে। আইনের ভাষায় একে পরার্থ দায় বলে।

অর্থাৎ এজেন্টের কাজের জন্য প্রধান দায়ী হবেন। যেহেতু প্রথম আলো অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছে এবং এজেন্টের অবহেলার জন্য অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সেজন্য প্রধান হিসাবে সম্পাদককেও দায় বহন করতে হবে, তিনি সেখানে উপস্থিত থাকুন আর না থাকুন।

এবার আসি সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কণ্ঠরোধ। সরকারের দুর্নীতি, এ সরকারের আমলে বিদেশে অর্থপাচার, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নানা অপরাধ, অন্যায়ের খবর সংবাদপত্রের পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে। সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা, ড. আসিফ নজরুলসহ কট্টর সরকারবিরোধী কিছু লেখক যতভাবে সরকারের সমালোচনা করা যায়, রাগ-ক্ষোভ-বিদ্বেষ উগরে দেওয়া যায়, তার সবটুকুই করছেন; তারপরও বলছেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নেই। রুমিন ফারহানা বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত তার কলামে লিখছেন, ‘‘প্রথম আলো ‘বশ’ মানলে সরকারের ভীষণ লাভ আছে সন্দেহ নেই, কিন্তু এতে এই রাষ্ট্রে টিমটিম করে জ্বলতে থাকা স্বাধীন সাংবাদিকতার শেষ বাতিটি এর সঙ্গে নিভে যাবে।’’ প্রথম আলোর মাধ্যমে যদি স্বাধীন সাংবাদিকতার শেষ বাতিটিও নিভে যায় তাহলে তার এ বক্তব্যটি যে পত্রিকা প্রকাশ করলো, তার মর্যাদা কী? যে ৪৭ জন বিশিষ্ট নাগরিক বিবৃতি দিয়েছেন, তাদের মধ্যে এমন মানুষ রয়েছেন যে, আমার মতো মানুষ কয়েকটা জীবন তপস্যা করলেও তাদের ধারে-কাছে যেতে পারবো না। তারা আমার নমস্য। তাদের বিবৃতিতে স্বাক্ষরদান বিষয়ে অনুমান করি সামাজিকতা, বিশেষ পরিস্থিতি লোকলজ্জার ভয়ে এমন কিছু করতে হয় যা মন সায় দেয় না। ডাক্তার নিষেধ করেছে তারপরও অনুরোধে ঢেঁকি গিলতে স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক খাবারও গ্রহণ করতে হয় কাউকে সন্তুষ্ট করতে। তারপরও কথা থেকে যায়, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কণ্ঠরোধ ভয়াবহ অভিযোগ। দেশের বাইরে এর নানারূপ সংশ্লেষ রয়েছে। কোনও কোনও বিশিষ্টজনের লবিং এ বিশ্বব্যাংক পদ্মাসেতুর অর্থায়ন বন্ধ করেছে। পদ্মাতেু না হলে, ক্ষতিটা যতটা না সরকারের হতো, তার চেয়ে বেশি হতো ১৭ কোটি মানুষের। বিশ্বখ্যাত অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিষয়ক সাময়িকী ফোর্বস ম্যাগাজিন লিখেছে, ‘এশিয়ার প্রবৃদ্ধির শীর্ষে থাকবে বাংলাদেশ।’ যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘দ্য ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট’ সংক্ষেপে ‘আইআরআই’  বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থা বিচার-বিশ্লেষণ করে কয়েক সপ্তাহ ধরে বলছে, বাংলাদেশ ঠিক পথেই আছে। বিশ্বব্যাংক তাদের ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টে’ বাংলাদেশের গত এক বছরে সার্বিক আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি বিচার-বিশ্লেষণ করে ঠিক একই রকম মন্তব্য করেছে। তবে এ কথা অনস্বীকার্য দুর্নীতি ও অর্থপাচার রোধ করা গেলে প্রবৃদ্ধি আরও বেশি অর্জিত হবে। সরকারের সঙ্গে রাগ করে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা বলে এমন কিছু করা উচিত হবে না যেন বাংলার ১৭ কোটি মানুষ শাস্তি পায়।

তবে, আবরারের মৃত্যু নিয়ে সরকারের বিভিন্ন ব্যক্তিরা যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা অনাকাঙ্ক্ষিত। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। তদন্ত ও বিচার নিষ্পত্তির আগে এ ধরনের বক্তব্য কাম্য নয়। আমার অনুমান আওয়ামী লীগ ও তার নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছ থেকে মানুষ অতিকথন পছন্দ করে না এবং এর ফলে একটা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোটার বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নেন।

আমাদের অনেকের মধ্যে একধরনের মানসিকতা কাজ করে দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ চাই, কিন্তু কিছু মানুষ দুর্নীতি করলেও তাদের বিচার মেনে নিতে পারি না। আইনের শাসন, সুশাসন চাই, তবে কিছু মানুষের ওপর আইনের প্রয়োগ দেখতে কষ্ট পাই। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান ও আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। বাক্‌স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আমাদের মৌলিক অধিকার। এ স্বাধীনতাকে যেমন কোনও বিশেষ উদ্দেশ্যে ব্যবহার দেশের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করে, তেমনি এর ওপর রাষ্ট্র ও সরকারের হস্তক্ষেপ গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতার পথকে ধ্বংস করে।

মহান সৃষ্টিকর্তা আবরারকে জান্নাতবাসী করুন। আমরা সবাই ধৈর্যধারণ করি, যেন আবরারের মৃত্যুর সত্যিটা উদঘাটিত হয় ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: [email protected]

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ