ধর্ষণকারীর একমাত্র ‘ওষুধ’ আর ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে দ্বিচারিতা

Send
ডা. জাহেদ উর রহমান
প্রকাশিত : ১৬:৫১, জানুয়ারি ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৪, জানুয়ারি ২২, ২০২০

ডা. জাহেদ উর রহমানবিনা বিচারে হত্যাকাণ্ড নিয়ে হঠাৎ দেখছি সবার ঘুম ভেঙে গেলো। ধর্ষণের অভিযুক্তদের বিনা বিচারে হত্যার জন্য সংসদে আহ্বান দেখে মনে হলো সবাই যেন খুব ধাক্কা খেয়েছেন। কেন এমন হলো? মাদক ও জঙ্গি এসব ক্ষেত্রে ক্রসফায়ারকে ‘জায়েজ’ মনে করলেও ধর্ষণের ক্ষেত্রে কি এটাকে ‘না জায়েজ’ বলে মনে করছেন সবাই? আমাদের কারোই কি চোখে পড়েনি গত সংসদ অধিবেশনে পেঁয়াজের উচ্চমূল্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে পেঁয়াজ সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে ক্রসফায়ারে হত্যার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের দাওয়াই দেওয়া হয়েছিল? যিনি এবার সংসদে এই আলোচনা শুরু করেছিলেন, সেই মুজিবুল হক চুন্নুই এই দাওয়াই দিয়েছিলেন সেদিনও।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের রিপোর্ট বলছে ২০১৯ সালের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ৩৮৮ জন। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ৪৬৬ জন। গত কয়েক বছরই প্রতিদিন গড়ে ১ জনের বেশি এরকম হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে। গত ১০ বছরে এই সংখ্যা ২০০০-এর মতো। এটা নাগরিকদের গা-সওয়া হয়ে গেছে, এমনকি তারাও এখন আর তেমন উচ্চবাচ্য করেন না যারা একসময় এটা নিয়ে কথা বলতেন। আমি মানবাধিকার সংস্থা এবং নাগরিক সমাজের সদস্যদের কথা বলছি।
এবার কেন তাহলে আমরা এত সংবেদনশীল হয়ে উঠলাম মানবাধিকারের প্রতি। এমন তো না, এই বারই সংসদে প্রথম এমন কথা বলা হয়েছে। এবার সংসদে সংসদ সদস্য মুজিবুল হক চুন্নু ধর্ষণে অভিযুক্তদের ক্রসফায়ারে হত্যার কথা তুললেন। তার দলেরই আরেক সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ সেটাকে নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করলেন। আমাদের অনেকেরই চোখ এড়িয়ে গেছে, ২০১৬ সালে একবার এবং ২০১৯ সালে আরেকবার ফিরোজ রশীদ ধর্ষণে অভিযুক্তদের ক্রসফায়ারে হত্যার দাবি তুলেছিলেন। এতে কোনও সন্দেহ নেই, তার এবারকার আলোচনা অনেক বেশি দীর্ঘ এবং অনেক বেশি আক্রমণাত্মক ছিল। তিনি বলেছেন, ‘এই মুহূর্তে সমাজকে ধর্ষণমুক্ত করতে হলে এনকাউন্টার মাস্ট। ধর্ষককে গুলি করে মারতে হবে। একমাত্র ওষুধ পুলিশ ধরার পর ধর্ষককে গুলি করে মেরে ফেলা।’
এই পর্যন্ত হলেও হয়তো অনেকেই মেনে নিতেন, কিন্তু দেখা গেলো সরকারি দলের অত্যন্ত প্রভাবশালী সদস্য, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ  তোফায়েল আহমেদ তাদের দু’জনকে সমর্থন করে বক্তব্য দিলেন। বললেন, ‘এখানে দরকার কঠোর আইন করা। আর দ্বিতীয়ত হলো, যে এই কাজ করেছে, তার আর এই পৃথিবীতে থাকার কোনও অধিকার নেই।’ সবশেষে নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী ক্রসফায়ারকারীদের বেহেশত নিয়ে দুশ্চিন্তা মুক্ত করতে ‘ফতোয়া’ দেন,  ‘আল্লাহকে হাজির-নাজির জেনে বলছি, এদের (ধর্ষকদের) ক্রসফায়ার করলে কোনও অসুবিধা নেই।’
সাম্প্রতিক অতীতে এই সংসদে এই ঘটনার আগে আরও অন্তত তিনবার প্রকাশ্যে বিনা বিচারে হত্যার আহ্বান জানানো হয়েছিল, কিন্তু তখনো তো কেউ কোনও প্রতিবাদ করেনি। সংসদে প্রতিবাদ হয়নি, সংসদের বাইরেও না। এবারও সংসদে শুধু একজন সংসদ সদস্য বিএনপি’র ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা এটার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন সংসদের ভেতরে এবং বাইরে। সংসদে চার এমপির ওই ভয়াবহ দাবির মধ্যে রুমিন ফারহানার এই প্রতিবাদ কতটা ফল আনবে সেটা তর্কসাপেক্ষ, কিন্ত এই এক টুকরো, কিন্তু ভীষণ দৃঢ়, শক্তিশালী প্রতিবাদই তাদের আশা জোগাবে, যারা এখনও বিশ্বাস করেন সর্বজনীন মানবাধিকারে, বিশ্বাস করে একটা উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায়। ভবিষ্যতের কোনও গবেষক সংসদের কার্যক্রম নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখবে বাংলাদেশের এই সময়ের সংসদে সব চুপ থাকা মানুষের মধ্যে একটা কণ্ঠস্বর প্রতিবাদী হয়েছিল, দাঁড়িয়েছিল মানুষের অধিকারের পক্ষে।
ট্রাম্পের কথা বলা যাক। একটি বিশেষ কারণে ট্রাম্প অনেক আমেরিকানদের প্রিয় পাত্র, আবার অজনপ্রিয়ও হয়েছেন। ট্রাম্প খুব ‘জেনুইন’। তার মধ্যে রাখঢাক নেই। আমেরিকার নিকট অতীতের সব প্রেসিডেন্ট যাচ্ছেতাই করেছেন যদিও মুখে নানা রকম ‘পলিটিক্যালি কারেক্ট’ বয়ান দিয়েছেন। ট্রাম্প মোটাদাগে যা করতে চান, বলে ফেলেন সেটা। সেদিন সংসদে ৪ জন সংসদ সদস্য আসলে ‘ট্রাম্প’ হয়ে উঠেছিলেন। সে কারণেই আমাদের অনেক লিবারেল সেটাকে মেনে নিতে পারেননি,‌ কথা বলে ফেললেন।
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এই পর্যায়ে পৌঁছাতে পেরেছে মূলত নাগরিকদের কারণে। এটা যখন শুরু হয়েছিল তখন অসংখ্য মানুষ এর পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। সেই সংখ্যাটা এখন কমেছে, কিন্তু এখনও সমাজের সম্ভবত বেশিরভাগ মানুষই এই বর্বরতার পক্ষে দাঁড়ায়। আর এই যুগটা পপুলিস্ট পলিটিক্সের চৌহদ্দি পেরিয়ে হয়ে দাঁড়িয়েছে ডেমাগগদের যুগ, তাই রাজনীতিবিদরা এই বর্বরতা নিয়ে এভাবে বলবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নাগরিকদের অনেকেই বিষয়টিকে খুব সিরিয়াসলি সমর্থন করছেন, কেউ পছন্দ না করলেও মেনে নিয়েছেন, আর কিছু মানুষ মেনে না নিলেও চুপ থাকছেন।
আমরা এখনও যখন সরব হলাম, তখনও কেউ কেউ ভীষণ ভুল পথে আছেন। মিডিয়ায় অনেকের অভিমত এবং কলামের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সমস্যার সমাধান করে না, এই জাতীয় তত্ত্ব এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে যুক্তি হিসেবে আনার চেষ্টা করছেন। বিচারবহির্ভূত তো বটেই, বিচারিক হত্যাকাণ্ড, মৃত্যুদণ্ড‌ও অপরাধ কমাতে পারে না— এটা প্রমাণ করার পক্ষে আমাদের হাতে যুক্তি এবং তথ্য আছে যথেষ্টের বেশি কিন্তু তর্কের খাতিরে ধরে নেই, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড অপরাধের স্থায়ী সমাধান করে। তাহলেও কি আমরা এই হত্যাকাণ্ড মেনে নেবো?
আমাদের সরকার ক্ষমতায় থাকা দলটিও এটা জানে না বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড প্রকারান্তরে তাদের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। হত্যা করার ক্ষমতা আসলে ক্ষমতা নয়। হত্যা যে কেউ করতে পারে। সুযোগ এবং ভালো কৌশল অবলম্বন করলে যে কোনও একজন মানুষ এমনকি খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষকেও হত্যা করতে পারে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা নির্দেশ করে বিচার করার ক্ষমতাকে, তাই যখন বিচারের মাধ্যমে কোনও অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করা হয়, তখন সেটা রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে। যারা বিচারবহির্ভূত হত্যাকে অব্যর্থ দাওয়াই মনে করে সমর্থন দিতে চাই, তাদের মনে রাখা দরকার—এর মাধ্যমে আমরা আদতে রাষ্ট্র ব্যবস্থাকেই ভেঙে ফেলি।
সংসদে সংসদ সদস্যরা প্রকাশ্যে বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্ররোচনা দিচ্ছেন, এটি আলাদা গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে, সন্দেহ নেই। কিন্তু এই ঘটনা না ঘটলে কি আমরা একের পর এক বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড মেনে নিতাম? আসলে মেনেই নিচ্ছিলাম। সংসদের এই ঘটনার পর তৈরি হওয়া ডামাডোলে শেষ হয়ে যাবে অচিরেই। এরপরও চলতে থাকবে বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নামের এই বিভৎস ঘটনা। আমরাও থাকবো প্রতিবাদহীন। শুধু কোনও ঘটনা প্রচণ্ড ডামাডোলের মাধ্যমে একটি ট্রেন্ড তৈরি করলে তখন তাতে তাল মেলাই আমরা। অন্য সময় থাকি একেবারেই নিশ্চুপ। এটা আমাদের ভয়ঙ্কর দ্বিচারিতা। দ্বিচারিতা মাত্রই খারাপ। আর বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে আমাদের এই দ্বিচারিতা আরও ভয়াবহ, কারণ, এটি ভেঙে ফেলে আমাদের রাষ্ট্রটির মূল কাঠামোকেই।
পাদটিকা: এমপিদের এই ধরনের বক্তব্যের বিরোধিতা করেছে  টিআইবি। একইসঙ্গে এই বক্তব্য সংসদ থেকে এক্সপাঞ্চ করারও দাবি জানিয়েছে। কিন্তু আমি বুঝলাম না তারা কেন তাদের এই বক্তব্য সংসদ থেকে এক্সপাঞ্চ করার কথা বলছেন। সংসদে কোনও বক্তব্য, সেটা যেমনই হোক না কেন নীতিগতভাবে সেটা এক্সপাঞ্চ করার বিরোধী আমি। এই দেশের সংসদে এমপিরা কী বলেছিলেন কোনও এক সময়, সেটা ভবিষ্যতের জন্য রেকর্ড হয়ে থাকা দরকার। সুতরাং তাদের এই বক্তব্য থাকুক এবং আমরা ভবিষ্যতে কোনোদিন দেখবো সংসদে  এমপিরা কীভাবে রাষ্ট্রের মূল কাঠামোটা ভেঙেচুরে ফেলার আলোচনা প্রকাশ্যে করেছিলেন।
লেখক: শিক্ষক, অ্যাকটিভিস্ট

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ