ভালো নির্বাচনের অন্তরায়গুলো

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ১৭:৪০, জানুয়ারি ২৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৪১, জানুয়ারি ২৪, ২০২০

আমীন আল রশীদনির্বাচনে যে প্রার্থীর জেতার সম্ভাবনা কম, তিনি নির্বাচনের প্রতিটি ধাপেই জালিয়াতি করতে চান। তাতে তিনি সরকারি দলের প্রার্থী হোন কিংবা বিরোধী দলের। অনেক সময় সরকারি দলের প্রার্থীর চেয়ে বিরোধী তথা সরকারের বাইরে থাকা দলের কোনও প্রার্থীও স্থানীয়ভাবে বেশি ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী হতে পারেন এবং তিনি যদি জানেন যে, সুষ্ঠু ভোটে তার জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম, তখন তিনি হয় ভোটে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন, নয়তো তিনি চান কোনও না কোনোভাবে ভোট ব্যবস্থাটি বিতর্কিত হোক। ফলে একটি নির্বাচন কেমন হবে, সেটি যেমন নির্বাচন কমিশন, সরকার ও সরকার পরিচালনার দায়িত্ব থাকা দলের ওপরে নির্ভর করে, তেমনি ভোটে অংশগ্রহণকারী সব দল ও প্রার্থীর ভূমিকাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এই নিবন্ধে আমরা দেখার চেষ্টা করবো, একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের অন্তরায়গুলো কী কী এবং ভালো নির্বাচন বলতে আসলে কী বোঝায়।
ভালো নির্বাচন মানে ১. তফসিল ঘোষণার পর আগ্রহী সব প্রার্থী (দলীয় নির্বাচন হলে দলের অন্যথায় স্বতন্ত্র) নির্বিঘ্নে মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারবেন; ২. তার মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা রাজনৈতিক কারণ বা অন্য কোনোভাবে প্রভাবিত হবেন না; ৩. প্রতীক বরাদ্দের পরে প্রার্থীরা আচরণবিধি মেনে প্রচার-প্রচারণা চালাবেন এবং সেখানে সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকবে যা নিশ্চিত করবে নির্বাচন কমিশন; ৪. কোনও প্রার্থীকে তার প্রার্থিতা প্রত্যাহার বা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে সরকার, সরকারি দল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা কোনও এজেন্সির তরফে চাপ প্রয়োগ করা হবে না; ৫. নির্ধারিত সময় পর্যন্ত ভোটের একটি সুন্দর ও উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় থাকবে; ৬. ভোটের দিন ভোটাররা নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাবেন এবং পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নির্ভয়ে ফিরবেন; ৭. জাল ভোট, কেন্দ্র দখল বা সহিংসতা হবে না; ৮. ভোট গণনায় কোনও ধরনের কারচুপি করা হবে না; ৯. কোনও নির্দিষ্ট প্রার্থীকে জয়ী করার ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্তরা উৎসাহ দেখাবেন না বা তাদের ওপর কোনও ধরনের রাষ্ট্রীয় চাপ থাকবে না; ১০. ভোটের ফল ঘোষণার পরে প্রতিদ্বন্দ্বী সব প্রার্থী সেটি মেনে নেবেন। মোটা দাগে এই শর্তগুলো পূরণ হলে সেটিকে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বলা যেতে পারে।

অনেক সময় সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য ভোটকে গুলিয়ে ফেলা হয়। পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াটি শান্তিপূর্ণ হওয়ার পরও সেই ভোট গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। যেমন, একটি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোটের ফল ঘোষণা পর্যন্ত কোনও হানাহানি হলো না, কোনও প্রার্থীর প্রচারে বাধা দেওয়া হলো না, কাউকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে চাপ দেওয়া হলো না, কিন্তু দেখা গেলো মানুষ ভোটকেন্দ্রে যায়নি বা ভোটার উপস্থিতি খুবই কম। যেহেতু আমাদের সংবিধানে এটি বলা নেই যে, ন্যূনতম কত শতাংশ ভোট পেতে হবে। বরং ২০ শতাংশ ভোট পেয়েও যেহেতু জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়া যায়, সুতরাং কোনও একটি ভোটে যদি ২০ শতাংশ মানুষও ভোট দেয়, তারপরও ওই ভোটকে অবৈধ বলার সুযোগ নেই। ওই সামান্য সংখ্যক ভোট পেয়ে যিনি নির্বাচিত হয়েছেন, তাকেও অবৈধ বলা যাবে না। কিন্তু এই নির্বাচনটি কি গ্রহণযোগ্য হলো? আবার পুরো নির্বাচনটি শান্তিপূর্ণ হলো, প্রচুর মানুষ ভোট দিলো, কিন্তু ফল পাল্টে দেওয়া হলো, সেটিকে সুষ্ঠু নির্বাচন বলা গেলেও গ্রহণযোগ্য বলার সুযোগ নেই। অর্থাৎ সহিংসতামুক্ত নির্বাচন মানেই সেটি গ্রহণযোগ্য ভোট নয়। বরং একটি ভোটকে গ্রহণযোগ্য হতে গেলে তার কিছু মানদণ্ড রয়েছে এবং সেগুলো নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের।

কিন্তু নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের পারসেপশন বা ধারণা কী? সংবিধানের ১১৮ (৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন এবং কেবল সংবিধান ও আইনের অধীন। কিন্তু তাদের আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত হলেও এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা এরকম যে, নির্বাচন কমিশন সরকারের অধীন এবং সরকার ও সরকারি দল যা চায় তার বাইরে গিয়ে কিছু করা কমিশনের পক্ষে অসম্ভব। এর একটি বড় কারণ নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক পদে যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়, অনেক সময়ই সেখানে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পায়। তাদের যোগ্যতা কী হবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় নিয়োগ করা হবে, সে সম্পর্কে এখনও কোনও আইন প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি। ফলে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের পারসেপশনও একটি বড় অন্তরায়। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করবে, সব প্রার্থীর জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সমান সুযোগ নিশ্চিত করবে, সরকারি দলের প্রভাবশালী প্রার্থী আচরণবিধি লঙ্ঘন করলেও তাকে শাস্তির আওতায় আনবে বা নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়ায় তারা নিরপেক্ষ থাকবে বা থাকতে পারবে—সাধারণ মানুষ এটি এখনও বিশ্বাস করে না। এই যে জনআস্থা ও বিশ্বাসের সংকট, এটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে একটি বড় অন্তরায়।

এটিও ঠিক যে, নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নেই। ভোট পরিচালনায় যে বিপুল সংখ্যক জনবল দরকার, সে পরিমাণ লোক তার নেই। ফলে তাকে পুরো নির্বাচন পরিচালনার জন্য নির্ভর করতে হয় নির্বাহী বিভাগ তথা সরকারের ওপর। সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ বলছে, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপালনে সহায়তা করা সব নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হইবে। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন ভোট পরিচালনার জন্য সরকারের কাছে যে সহায়তা চাইবে, সরকার সেটি দিতে বাধ্য। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে যারা থাকেন তারা সরাসরি নির্বাচন কমিশনের কর্মী নন। বরং তারা সরকারের বিভিন্ন দফতরে নিয়োজিত এবং সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্তা ব্যক্তিরা যা বলবেন, যে নির্দেশনা দেবেন, তার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। ধরা যাক, একজন কলেজশিক্ষক কোনও একটি কেন্দ্রের প্রিজাইডিং কর্মকর্তা। তিনি নিজে হয়তো কোনও একটি দলের সমর্থক এবং সঙ্গত কারণে তিনি একজন ভোটারও। তা সত্ত্বেও তিনি চাইলেন যে নির্বাচনি দায়িত্ব পালনে তিনি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকবেন। কিন্তু তার ওপর যদি বিশেষ কোনও প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার নির্দেশনা বা চাপ থাকে, তাহলে তিনি নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। কারণ তার কাছে একদিনের পালনের চেয়ে ক্যারিয়ার ও জীবনের মূল্য বেশি। ফলে প্রিজাইডিং অফিসারদের নির্ভয়ে কাজ করতে না পারাও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে একটি বড় অন্তরায়।

নির্বাচনে হারতে ভয় পাওয়া বা হারতে না চাওয়াও গ্রহণযোগ্য বা ভালো ভোটের অন্তরায়। দেখা যায়, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কোনও দল সরকার গঠন করলেও তারা ছোটখাটো উপনির্বাচন এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে ভয় পায়। যদিও দুয়েকটি উপনির্বাচন অথবা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের সাথে সরকার বদলের কোনও সম্পর্ক নেই। কিন্তু তারপরও সরকার বা সরকারি দল এসব নির্বাচনে হারতে চায় না। কারণ তাদের মধ্যে এরকম একটি ভয় থাকে যে, ছোটখাট নির্বাচনে হেরে গেলে মানুষ মনে করবে সরকারের জনপ্রিয়তা কমে গেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলেও এর ফল জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলে। সরকারি দলের প্রার্থীরা হেরে গেলে এটি সরকারবিরোধী মনোভাব জোরালো হতে সহায়তা করে। অর্থাৎ নির্বাচনে যদি সরকারি দলের প্রার্থীদের হেরে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে সেই নির্বাচনে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে তারা প্রভাব বিস্তার করতে চায়। সব সময় সেই প্রভাবটি দৃশ্যমান নাও হতে পারে। অর্থাৎ দলীয় সরকারের অধীনেও সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে, যদি সরকার নির্বাচনে কোনও ধরনের প্রভাব বিস্তার না করে। কিন্তু আমাদের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতায় যাওয়া এবং আঁকড়ে থাকার যে উদগ্র বাসনা, তাতে যার হাতে ক্ষমতা আছে, ভোটের মাঠে সে সেটি প্রয়োগ করবে না, সেটিই বরং অস্বাভাবিক। ফলে বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিও ভালো নির্বাচনের পথে একটি বড় অন্তরায়।

ঢাকা সিটি নির্বাচনে সরকারি দল আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির তরফে শুরু থেকেই বলা হচ্ছে যে, এই নির্বাচনটি যেহেতু পুরোপুরি ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) হবে। ফলে এই মেশিনে কারসাজি করে ভোটের ফল পাল্টে দেওয়া হবে। একটি বড় দল বা নির্বাচনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে যদি ভোট ব্যবস্থাটি নিয়ে শুরু থেকেই এরকম অনাস্থার জন্ম হয়, তাহলে সেই নির্বাচন যত শান্তিপূর্ণই হোক না কেন, শেষমেষ গ্রহণযোগ্য হবে না। গ্রহণযোগ্য হবে না এই অর্থে যে, যদি বিএনপি মনোনীত মেয়র ও সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীরা হেরে যান, তাহলে বিএনপি অভিযোগ করবে, ভোটের ফল পাল্টে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যদি বিএনপি প্রার্থীরা জিতে যান, তখন তারা কী বলবে, সেটি এখনই বলা মুশকিল। হতে পারে এটিও তাদের একটি কৌশল যে, তারা জানে যে, নিরপেক্ষ ভোট হলেও তাদের প্রার্থীরা জিতবেন না, তাই আগেভাগেই একটি ডিফেন্সিভ অবস্থান নিয়ে রেখেছে। আবার যেহেতু একটি বড় পক্ষ ইভিএমএর ব্যাপারে আস্থাশীল নয় এবং ঢাকা সিটির ভোটাররাও এই মেশিনের সঙ্গে পুরোপুরি পরিচিত নন, সুতরাং নির্বাচন কমিশন কেন অতি উৎসাহী হয়ে ইভিএমে ভোটের আয়োজন করলো, সেই প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

পরিশেষে, পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ায় গণমাধ্যম কতটা স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছে, তার ওপরে অনেকখানি নির্ভর করে সেই নির্বাচনটি কেমন হবে। অর্থাৎ সব প্রার্থীর জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ রয়েছে কিনা, সেটি মূলত ধরা পড়ে সাংবাদিকের চোখে। গণমাধ্যম যদি সেই বাস্তবতাটি নির্ভয়ে প্রচার ও প্রকাশ করতে পারে, তাহলে নির্বাচন কমিশন তো বটেই, সরকারও চাপের মধ্যে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতার চেয়ে এখন সেলফ সেন্সরশিপের বিষয়টি এতটাই মুখ্য হয়ে উঠছে যে, তারা নিজেরাই সব তথ্য প্রচার ও প্রকাশ করে না অথবা ঘটনার পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করে না। ফলে গণমাধ্যমের এই সেলফ সেন্সরশিপও ভালো ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে বড় অন্তরায় সৃষ্টি করে।

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর।

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ