মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতন্ত্র

Send
মো. আবুসালেহ সেকেন্দার
প্রকাশিত : ১৯:৩১, জানুয়ারি ২৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৩৩, জানুয়ারি ২৭, ২০২০

মো. আবুসালেহ সেকেন্দাররাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার ইতিহাস পেরিয়ে আজ আমরা গণতন্ত্রের যুগে বাস করছি। দুঃখজনক হলেও সত্য ‘বাংলাদেশে আজও  পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নি’।  এমন কথা শুনে গণতন্ত্রপ্রেমীরা অবাক হতে পারেন। রাজনীতিবিদরা মাতম তুলতে পারেন। তবে একথা সত্য, সে বিষয়ে ভূরি ভূরি প্রমাণ আছে। রাজনীতিবিদরা গণতন্ত্রকে মনে-প্রাণে ধারণ করতে পারেননি বলেই বার বার এদেশের গণতন্ত্র সামরিকতন্ত্রের যাঁতাকলে পিষ্ঠ হয়েছে।
অন্যদিকে, পরিবারতন্ত্রের বেড়াজাল ডিঙিয়ে সব মানুষের জন্য রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার দিন এখনও সুদূরপরাহত। অন্যদিকে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে প্রধান দুই দলই পরিবারতন্ত্রকে প্রাধান্য দিয়েছে। অনেক আসনেই অন্য যোগ্য প্রার্থী থাকার পরও বাবা অথবা মায়ের পরিচয়ই অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থী মনোনয়নের মূল মাপকাঠি হিসেবে কাজ করেছে। যা প্রমাণ করছে যে, যোগ্যতা বা দলের প্রতি শ্রম নয়, এখনও রাজনীতিতে বাবা-মায়ের পরিচয়ই মুখ্য।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্য রাষ্ট্রগুলো বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকায়ও দীর্ঘদিন বংশ পরম্পরার রাজনীতির প্রভাব ছিল। ভারতে বিজেপির উত্থান ও পরবর্তী সময়ে কংগ্রেসের জয় লাভের পরও সোনিয়া বা রাহুল গান্ধীর বদলে মনমোহন সিংহের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রভাবশালী পদে সাধারণ মানুষের নিযুক্ত লাভের দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য রাষ্ট্র শ্রীলংকাও একইপথ অনুসরণ করেছে। সম্প্রতি পাকিস্তানে ইমরান খানের জয়লাভও প্রমাণ করছে, উত্তরাধিকারভিত্তিক রাজনীতির প্রভাব এই অঞ্চলে কমছে। তবে, নানা কারণে বাংলাদেশের রাজনীতি ভারত, পাকিস্তান বা শ্রীলংকার পথে হাঁটেনি। সেই কারণে আমাদের দেশে দুটি প্রধান দলের বাইরে রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেওয়ার চিন্তা করা কঠিন।

যদিও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার অনেক বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন, আজকের শিশুরা ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বড় বড় বিজ্ঞানী, সাংস্কৃতিককর্মী হতে পারবে। যা ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের মনোভাব পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। অবশ্যই এ কথা ঠিক যে, এখনও বাংলাদেশে বিশেষ করে আওয়ামী লীগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিকল্প যোগ্য নেতা খুঁজে পাওয়া কঠিন। বিএনপির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোয্য। বেগম খালেদা জিয়ার বিকল্প ওই দলে নেই। মুজিব ও জিয়া পরিবারের বাইরে দলীয় প্রধান নির্বাচন করলে ওই দুই দলের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখা কতটুকু সম্ভব হবে–সেটাও একটি প্রশ্ন।

তাই আপাতত বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া বা তাদের পরিবারের সদস্যদের বাইরে রাজনৈতিক নেতৃত্বের শীর্ষ পদে চিন্তা করার সময় আসেনি। তবে কি তৃতীয় কোনও রাজনৈতিক বলয় কখনও গড়ে উঠবে না এদেশে? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রকৃত সময় এখন না হলেও এক কথায় বলা যায়, সেই সম্ভবনা নেই, এমন নয়। বরং সময়, বাস্তবতা ও চাহিদা থাকলেও বাংলাদেশে তৃতীয় ধারার কোনও রাজনৈতিক দলের উত্থানের কোনও সম্ভাবনা আপাতত নেই। ওই ধরনের তৃতীয় ধারার রাজনৈতিক বলয় তৈরি করতে হলে দরকার ক্যারিশমেটিক নেতৃত্ব। আপাতত এমন কোনও নেতা আমি দেখি না।

দুই.

সিটি নির্বাচনকে ঘিরে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জোরালো দাবি বিরোধী দল বারবার করছে। বিভিন্ন স্থানে বিরোধী দলের প্রার্থী, কর্মী ও সর্মথকদের ওপর হামলা এই বার্তা দিচ্ছে যে, এখনও নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়নি। যদিও প্রধান নির্বাচন কমিশনার দাবি করছেন, বিরোধী দলের দাবিগুলো সত্য নয়।

তবে সম্প্রতি সরকার যে পরিছন্ন রাজনৈতিক বলয় তৈরি করার ইঙ্গিত দিচ্ছে, তার প্রথম বাস্তব পরীক্ষা সিটি করপোরেশন নির্বাচন বলে মনে হয়। তাই সরকারি বা বিরোধী দল তথা যে দলেরই হোক না কেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী কোনও প্রার্থী, তার কর্মী ও সমর্থকদের ওপর হামলা-মামলা কাম্য নয়। নির্বাচন হবে সহিংসতামুক্ত। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। এর বাইরে কোনও ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়। আর তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। এক্ষেত্রে ব্যর্থতার দায়ভার অবশ্যই নির্বাচন কমিশনের ওপর বর্তাবে।

গণতন্ত্রের চেয়েও মানুষের জীবনের মূল্য অনেক বেশি। তাই নির্বাচনে সহিংসতার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই ‘জিরো টলারেন্সনীতি’ অনুসরণ করতে হবে। সাধারণ মানুষের জীবনের বিনিময়ে নির্বাচন নয়। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অবশ্যই নির্বাচন কমিশনের প্রথম কাজ হবে। অন্য কোনও বিকল্প গ্রহণযোগ্য নয়।

নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দলই নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি দাবি করছে। যদি সত্যিকার অর্থে সবাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হয়, তাহলে স্বাধীন বাংলাদেশে নির্বাচনে সহিংসতা হওয়ার কথা নয়। একাত্তরে ত্রিশ লাখ মানুষ প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন শুধু একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য নয়। একটি সুখী, সমৃদ্ধশালী এবং নিরাপদ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্যও। নির্বাচনে সহিংসতায় জড়িয়ে সাধারণ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমে রাজনীতিবিদরা বাংলাদেশকে অনিরাপদ করে তুলছে। প্রতিদিন সাধারণ মানুষকে আতঙ্কে ঠেলে দিচ্ছে। অবশ্যই সত্যিকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারণকারী কোনও মানুষ সহিংসতায় জড়াতে পারে না। রক্তের হোলি খেলা স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, আল-বদর, আল শামসদের মস্তিষ্কপ্রসূত। তাই যদি কোনও ব্যক্তি বা সংগঠন খুনের নেশায় মেতে ওঠে, তবে তিনি বা তারা আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নেই। স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রেতাত্মা তার বা তাদের ওপর ভর করেছে।

অন্য আর একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, একাত্তরে এদেশের ত্রিশ লক্ষ প্রাণ উৎসর্গিত হয়েছিল মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণ ছিল ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চালু করা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সেই নির্বাচনি ফলকে উপেক্ষা করে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে জনগণের কণ্ঠস্বরকে রুদ্ধ করার চেষ্টাই এদেশের শান্তিকামী-মুক্তিকামী মানুষকে স্বায়ত্তশাসনের বদলে স্বাধীনতার দাবি তোলার দিকে ঠেলে দেয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফল মেনে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরণ করলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পথ আরও দীর্ঘ হতো। ইতিহাসের পথ পরিক্রমা ভিন্ন হতো। তাই সত্যিকারের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হচ্ছে—মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ও দাবিকারী সব রাজনৈতিক দল সেই বিষয়টি মনে রাখবে বলে আমরা আশা করি।  

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

 

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ