কোবি মানে ‘ডিয়ার বাস্কেটবল’, খেলার পৃথিবী

Send
পবিত্র কুন্ডু
প্রকাশিত : ১৫:৩৩, জানুয়ারি ২৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:০৯, জানুয়ারি ৩১, ২০২০

পবিত্র কুন্ডুটেনিসের সঙ্গে মিললো বাস্কেটবল। এক খেলার সঙ্গে আরেক খেলা। মানুষের সঙ্গে মানুষ। জীবনের সঙ্গে জীবন। শোকের মধ্যে ভালোবাসা। বেদনায় শ্রদ্ধার্ঘ্য। এক গোলার্ধের অভিন্ন অনুভূতির অনুরণন অন্য গোলার্ধে।
সোমবার টেলিভিশনে রাফায়েল নাদাল বনাম নিক কিরিয়স টেনিস ম্যাচটি দেখতে বসে বারবারই আমার মনে হচ্ছিল এসব।
খুব ভোরে এসেছে সেই দুঃসংবাদ। বাস্কেটবল কিংবদন্তি কোবি ব্রায়ান্ট নেই। বাস্কেটবলের সোনালি উত্তরাধিকার মেয়ে জিয়ান্নাকে দিয়ে যাবেন বলে সব আয়োজন সাজাচ্ছিলেন একটু একটু করে। মেয়েকে পাশে বসিয়েই হেলিকপ্টারে উড়ে যাচ্ছিলেন তার মাম্বা একাডেমিতে। যেখানে ছিল জিয়ান্নার প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ। হঠাৎই মেঘ-কুয়াশার বেশে মৃত্যু এসে দাঁড়ালো সামনে। কুয়াশায় বিভ্রান্ত পাইলটের অসতর্কতায় পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে বিধ্বস্ত অভিশপ্ত হেলিকপ্টার। দুর্গম গিরিখাতে শেষ অধ্যায় লেখা হয়ে গেল ৯টি জীবনের। যেখানে ৪১ বছর বয়সী বিখ্যাত বাবার সঙ্গে পুড়ে ছাই তার ১৩ বছরের স্বপ্নময়ী আত্মজা।

আর এর কয়েক ঘণ্টা পরে মেলবোর্নের রড লেভার অ্যারেনাকে যেন প্রয়াত মহান বাস্কেটবল তারকার শেষকৃত্যের মঞ্চ বানিয়ে বসলেন এক তরুণ। সেই তরুণের নাম নিক কিরিয়স। যিনি যতটা না নন্দিত, তার চেয়ে বেশি নিন্দিত। যতটা না তার খ্যাতি তার চেয়ে বেশি কুখ্যাতি। যিনি কোর্টের মধ্যে রাগের মাথায় র‌্যাকেট ভাঙেন অবলীলায়। চেয়ার আম্পায়ারকে গালাগালি করেন। গালাগালি করেন দর্শকদের। প্রতিপক্ষকে অশ্লীল যৌনভঙ্গিতে করেন অপমান।

খেলা শুরুর আগে এই অস্ট্রেলীয় তরুণ কোবি ব্রায়ান্টের অবসরে যাওয়া এলএ লেকার্সের ৮ নম্বর জার্সি পরে অভিবাদন জানান দর্শকদের। দুহাতে মুখ ঢাকেন, আসলে আড়াল করেন অশ্রু। সেই অদৃশ্য অশ্রু বাষ্পাকুল করে তোলে গ্যালারির হাজার চল্লিশেক চোখকে। কিরিয়স আজ অস্ট্রেলীয় ওপেনের চতুর্থ রাউন্ডের ম্যাচটি জিতে নিবেদন করবেন তার আত্মার আত্মীয়কে।

হ্যাঁ, কোবি ব্রায়ান্ট আত্মার আত্মীয়ই বটে। যে আত্মীয়তার যোগসূত্র বাস্কেটবল নামের এক মোহনীয় খেলা। হতে চেয়েছিলেন বাস্কেটবল খেলোয়াড়, কিন্তু নিয়তি কিরিয়সকে এনে ফেলেছে টেনিস কোর্টে। তাই বলে বাস্কেটবলকে ভোলেননি। চোখ দিয়ে বাস্কেটবল গেলেন গোগ্রাসে। এনবিএ লিগ বুকের মধ্যে শাশ্বত সানাই বাজায়। বোস্টন সেল্টিকসকে ভালোবাসেন পাগলের মতো। তাহলে কোবি ব্রায়ান্টের ভক্ত হলেন কী করে? কোবি তো বোস্টনের শত্রুপক্ষের সেনানী! শত্রু হোক, মিত্র হোক, খেলাটি যখন বাস্কেটবল, কোবিকে কেউ কি ভালো না বেসে পেরেছে?

নেটের ওপাশে কিরিয়সের যিনি মুখোমুখি, তার মধ্যে কোনও আবেগ নেই। তার পাথুরে চোয়ালে যেন জিগীষার নেশা। রাফায়েল নাদাল। ১৯ বারের গ্র্যান্ড স্লামজয়ী এসেছেন রজার ফেদেরারকে ছুঁয়ে সর্বকালের সেরা হওয়ার পথে আরেক ধাপ এগিয়ে যেতে। তাকে অত আবেগ-টাবেগ দেখালে চলে না।

গ্যালারির গর্জন কিন্তু অন্য কথা বলছে। নাদাল সার্ভ করেন। কিরিয়সের রিটার্নের অর্ধেক শক্তিই যেন জুগিয়ে চলে জনতা। ‘রাফা’ বলে একবার চিৎকার ওঠে তো ‘নিক’ কিংবা ‘কোবি’ বলে দশবার। আজ  স্পেনের দিন নয়, অস্ট্রেলিয়ার। আজ রাফায়েল নাদালের পরাজয়ের দিন। আর নিক কিরিয়সের রূপে কোবি ব্রায়ান্টের বিজয়ের দিন। ধারাভাষ্য শুরু হওয়ার আগে পিটার ম্যাকেনরো বলেছিলেন, কিরিয়স জিতেও যেতে পারেন। তিনি যে খেলবেন কোবির হয়ে!

জনতা কিরিয়সের র‌্যাকেটে শোকের শক্তিতে রূপান্তর যতটা আশা করেছিল, ততটা বাস্তবে দেখে না। নাদাল এমনিতেই এবারের অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে খেলছেন সত্যিকারের চ্যাম্পিয়নের মতো। প্রথম সেটটা প্রায় নির্মমভাবে জিতে নিলেন ৬-৩ গেমে। কী তার ফোরহ্যান্ড শট, কী ব্যাক হ্যান্ড, কী সব উইনার। বেসলাইন ভলি যেন সেই তারুণ্যদীপ্ত নাদালকে টেনে আনে। একটি ২৪ বছরের শরীর যতটা না দৃঢ়তায় লড়াই করে, তার চেয়ে বেশি কাঠিন্যে তাকে আঘাত করে একটি ৩৩ বছরের শরীর। তবুও ভরা গ্যালারি আশায় থাকে। আর এরই মধ্যে একই ব্যবধানে দ্বিতীয় সেট জিতে ঘুরে দাঁড়ান কিরিয়স। নাদালের মধ্যে এই প্রথম দেখা গেল ক্লান্তির ছাপ। ক্লান্তি, না ক্যালিফোর্নিয়ার কালাবাসাস পাহাড়ের সানুদেশে অকালপ্রয়াত এক কিংবদন্তির অতৃপ্ত আত্মার অভিশাপ? রড লেভার অ্যারেনা রীতিমতো ফুঁসে ওঠে অমিত সুন্দর এক অঘটনের সম্ভাবনায়। পরের সেট টাইব্রেকারে জিতে এগিয়ে যান নাদাল। চতুর্থ সেট সরাসরি হারের কিনারায় গিয়ে টাইব্রেকারে নিয়ে যান কিরিয়স। না, শেষ পর্য়ন্ত ‘ডিউস’ আর ‘অ্যাডভান্টেজে’র পেন্ডুলামের দোলায় দুলতে থাকা ম্যাচটি জিতে নেন রাফায়েল নাদালই। কিন্তু স্প্যানিশ চ্যাম্পিয়নের মুখের হাসি এত ফ্যাকাশে কেন? আরও নির্মমতায় প্রতিপক্ষকে হারাতে পারেননি বলে?

কারণ একই। যে কারণে কিরিয়স খেলার আগে কোবি ব্রায়ান্টের জার্সি পরেন, আর দুহাতে চোখ ঢেকে অশ্রু আড়াল করেন, একই কারণে খেলার পরে নাদালের মুখের হাসি হারিয়ে যায়। কোবি যে নাদালেরও ভালোবাসার মানুষ।

কোবি ব্রায়ান্টই শিখিয়ে গেছেন, যেভাবেই হোক জিততে হবে। খেলার কোর্টে জয়ই সত্য ও সুন্দর। সেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে বিষধর সাপের মতো দেহভঙ্গিতে চলতে হবে, ফনা তুলে নির্মাণ করতে হবে বিজয়ের মুহূর্ত। একারণেই কোবির নাম হয়ে গিয়েছিল ব্ল্যাক মাম্বা। নিজেও পছন্দ করতেন এই নাম। চার মেয়ের মধ্যে দ্বিতীয় জিয়ান্নির মধ্যে বাস্কেটবল অনুরাগ দেখতে পেয়ে তাকেই মনপ্রাণ ঢেলে গড়ে তুলছিলেন। নিজেই যার নাম দিয়েছিলেন ‘মাম্বাচিতা’।

কোবি ব্রায়ান্ট তার পেশাদার বাস্কেটবলের ২০ বছরই খেলেছেন লস অ্যাঞ্জেলেস লেকার্সে। যেখান থেকে জিতেছেন পাঁচটি এনবিএ শিরোপা, ১৮ বার জায়গা করে নিয়েছেন অল-স্টার একাদশে, ১৫ বার অল-এনবিএ টিমে, ১২ বার অল-ডিফেন্সিভ টিমে। ২ বার জিতেছেন অলিম্পিকের সোনা। ৩০ বছর বয়সেই ৩০ হাজার স্কোর করে বিস্ময়াভিভূত করেছেন বাস্কেটবল জগতকে। মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগে লেব্রন জেমসের কাছে এনবিএ ইতিহাসের তৃতীয় সর্বোচ্চ স্কোরারের(৩৩,৬৪৩) আসনটি হারিয়েছেন ২০১৬ সালে অবসরে যাওয়া বাস্কেটবলের ‘বিস্ময়’।

কোবি নামটি একাকার হয়ে গেছে লেকার্সের সঙ্গে। কোবি মানেই বাস্কেটবল, ‘ডিয়ার বাস্কেটবল’। কোবি মানেই খেলার পৃথিবী, খেলোয়াড়ি চেতনা। কোবি মানে বিজয়ের চিরআকাঙ্ক্ষা। কোবির মধ্যে ভাসে হলিউড। কোবি নামে ছড়িয়ে থাকে সংগীত। কোবি মানে প্রেমিক ও বিদ্রোহী। কোবির মধ্যে বাঁচে মন কেমন করা আপন ভাইয়ের মুখ।

কোবির জন্য আজ তাই সারা পৃথিবীর প্রাণ কাঁদে।

লেখক: স্পোর্টস এডিটর, বাংলা ট্রিবিউন

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ