অসহিষ্ণু ভারতের কারণে অস্থির হবে উপমহাদেশও

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৪:৩১, জানুয়ারি ৩০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩৩, জানুয়ারি ৩০, ২০২০

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীভারত স্বাধীন হওয়ার পর একটানা ভারতের শাসন ক্ষমতায় ছিল কংগ্রেস। বিজেপি এখন ক্ষমতায়। ভারতীয় ভোটারেরা হিন্দুত্বের প্রতি মমত্ববোধের কারণে বিজেপিকে ভোট দেয়নি। কংগ্রেসের একটানা শাসনের প্রতি বিরক্ত হয়ে বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। এটা ভারতীয় ভোটারদের অমনোযোগী, আবেগপ্রসূত একটি সিদ্ধান্ত ছিল। ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে ‘সংঘ পরিবার’-এর কোনও নেতাকর্মী একদিনের জন্যও জেল খাটেনি। সমগ্র স্বাধীনতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে সংঘ পরিবার স্বাধীনতার জন্য একটা মিছিল করেনি, মিটিং করেনি বা এক পয়সার ত্যাগও স্বীকার করেনি।
হিন্দু মহাসভা, আরএসএস, বজরং দল এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদ—সংঘ পরিবারের এই দলগুলো সবারই জন্ম স্বাধীনতাপূর্বকালে। কিন্তু স্বাধীনতার জন্য তাদের কোনও ত্যাগ তিতিক্ষা নেই।  দেশ স্বাধীন হলে তারা রাষ্ট্রধর্ম প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে সংগঠন করেছে মাত্র। আর কোনও কোনও সময় কিছু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা করেছে।
বালগঙ্গাধর তিলক মহারাষ্ট্রের বড় প্রতিপত্তিশালী নেতা ছিলেন। তিনিই প্রথম দ্বিজাতিতত্ত্বের কথা বলে মুসলমানদের আত্মসচেতন করেছেন। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে সরোজিনী নাইডু হিন্দু-মুসলমানের মিলনের দূত বলে অভিহিত করেছিলেন। সেই জিন্নাহ মুসলমানদের জন্য ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে পৃথক রাষ্ট্রের দাবি তোলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামে সংঘ পরিবারের কোনও অবদান না থাকলেও পাকিস্তান সৃষ্টিতে তাদের পরোক্ষ অবদান রয়েছে।

নিম্নবর্ণের হিন্দুদের নেতা ড. ভীমরাও রামজি  আম্বেদকরের সঙ্গে হিন্দু মৌলবাদী নেতা বিনায়ক দামোদর সাভারকরের ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি বলতেন, সাভারকর মূলত জিন্নাহকে সাহায্য করছেন। তিনি বলতেন, সাভারকর এবং জিন্নাহর খেলার মাঝে কোনও তফাৎ নেই। প্রকৃতপক্ষে সাভারকরও দ্বিজাতিতত্ত্বের ধারক।

বালগঙ্গাধর তিলক বেনারসে পৃথক হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আর হিন্দি ছিল একটি কথিত ভাষা, তাকে পরিপূর্ণ ভাষার আঙ্গিক প্রদান করেছিলেন বালগঙ্গাধর তিলক। তিনি সুপরিকল্পিত লোক ছিলেন। হিন্দুরাষ্ট্র ভারতের জন্য একটি কমন ভাষা প্রয়োজন, সেজন্যই তিনি হিন্দিকে পরিচর্চা করে একটি সমৃদ্ধ ভাষায় রূপ দিয়েছিলেন, যেন হিন্দি মুসলমানদের উর্দু ভাষার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে। উর্দু আর হিন্দি বলার ঢং এক, কিন্তু উর্দু আরবি হরফে লিখিত। আর হিন্দি দেবনাগরি হরফে লেখার ব্যবস্থা করেছিলেন তারা। উর্দু মোগলদের সৃষ্টি। তারাই এই ভাষার জন্ম নিয়েছিলেন।

আবার সাভারকর তিলকের মতো কোনও গঠনমূলক কাজে ছিলেন না। তিনি হিন্দুত্বকে প্রবল থেকে প্রবলতর করার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তার মতে হিন্দুত্বকে রাজনৈতিকভাবে মজবুত ও স্থিতিশীল করতে একটি প্রতিদ্বন্দ্বী হাজির করা দরকার। ঐতিহাসিক পরিস্থিতি অনুযায়ী এখানে প্রতিদ্বন্দ্বীটি হচ্ছে মুসলমান। এটাই ছিল সাভারকরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। মুসলমানকে টার্গেট করে সাভারকরের কর্মকাণ্ড আবর্তিত। তাই সাভারকরের দশ খণ্ডে রচিত পুস্তক পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তার লেখার পরতে পরতে মুসলমান বিদ্বেষের ছড়াছড়ি। অটল বিহারি বাজেপেয়ি, লালকৃষ্ণ আদভানি, মুরলি মনোহর যোশী, নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ প্রমুখ নেতার সাক্ষাৎ গুরু হচ্ছেন সাভারকর। সাভারকর ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন।

সাভারকর ব্রিটিশের সময় থেকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। তাই তার দীর্ঘ জেল হয়েছিল। সাভারকর দীর্ঘ কারাবাসে আন্দামানের সেলুলার জেলে ছিলেন। বিজেপি যখন প্রথমবার ক্ষমতায় আসে তখন অটল বিহারি বাজপেয়ি যে কক্ষে সাভারকর ছিলেন সেই কক্ষে তার একটি মূর্তি স্থাপন করেছিলেন। ২০১৮ সালের নরেন্দ্র মোদি আন্দামানের সেলুলার জেলে গিয়ে তীর্থযাত্রার প্রচলিত রীতি অনুযায়ী সাভারকরের অনুস্মৃতিতে ধ্যান করেছিলেন। সাভারকরের তত্ত্বের প্রতি মোদির একনিষ্ঠতার সীমা নেই। তাই তিনি নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী প্রণয়ন করেছেন, নাগরিকপঞ্জির কথা বলছেন। এসব তার গুরু সাভারকরের হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আয়োজন। সাভারকরের মতে হিন্দুত্বের লক্ষণ হলো— ‘সিন্ধু তীর থেকে সমুদ্র পর্যন্ত ভারত ভূমিকে যে ব্যক্তি পিতৃভূমি ও পুণ্যভূমি রূপে স্বীকার করে সেই হিন্দু।’

ভারতীয় মুসলমান এবং খ্রিষ্টানদের ক্ষেত্রে ভারত পিতৃভূমি কিন্তু পুণ্যভূমি নয়। তাদের পুণ্যভূমি জেরুজালেম বা মক্কা-মদিনা। এইভাবে তারা হিন্দু বর্গভুক্ত নন। হিন্দুত্বের দাবি তাদের নেই। এইভাবে কারা ভারতের চৌহদ্দির মধ্যে থাকবে আর কারা থাকবে না—তা সাভারকর নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

নরেন্দ্র মোদি মহারাষ্ট্রের জনসভায় বলেছেন, সাভারকরের সংস্কার বা নৈতিক মূল্যবোধই ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তি। নরেন্দ্র মোদি সরকার হিন্দু মৌলবাদী সাভারকর এবং গোলওয়ালকারের সিদ্ধান্ত মতে ভারতকে পুনর্বিন্যাস করতে গিয়ে নাগরিকত্ব আইনে সংশোধনী, নাগরিকপঞ্জি ইত্যাদি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী করতে গিয়ে তারা বাংলাদেশ-পাকিস্তান আর আফগানিস্তানের নন-মুসলিমদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন। আর এর মাধ্যমে মোদি সরকার ভারতের সেক্যুলার চরিত্রে কালিমা দিয়েছে, সংবিধান লংঘন করেছে, তাই নয় শুধু, প্রতিবেশী ওই তিন দেশে সূক্ষ্মভাবে সাম্প্রদায়িকতাকে আরও উসকে দিয়েছে।

সাভারকরের ঊনবিংশ শতাব্দীর পরিকল্পনা নরেন্দ্র মোদি বাস্তবায়ন করতে এসেছেন একবিংশ শতাব্দীতে। নির্বাচনে আত্মচেতনা ত্যাগ করে ভোট প্রদান করলেও এখন পুরনোকালে ফিরে যেতে নারাজ ভারতীয় ভোটাররা। তাই এখন সমগ্র ভারতে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। মিছিলে মিটিংয়ে সমগ্র ভারত মুখরিত।

ভারত বিশ্বের প্রাচীনতম জনপদ। সেখানে যদি হঠাৎ করে কে নাগরিক আর কে নাগরিক নয় সেটি প্রমাণের জন্য চৌদ্দপুরুষ আগের প্রপিতামহের নাম-গোত্র সবকিছু মোদি সরকারকে জানাতে হয়, তবে তা মানবে কে! এ পর্যন্ত পাঞ্জাব, কেরালা, পশ্চিমবাংলা এবং রাজস্থান—এই চারটি রাজ্য বিধানসভা প্রস্তাব নিয়েছে যে তারা নাগরিক সংশোধনী বিল তাদের রাজ্যে কার্যকর করবে না। আর নাগরিক গণনাপঞ্জি ও নাগরিকপঞ্জি কার্যকর করতে দেবে না। এই অবস্থায় তো কেন্দ্র আর রাজ্যের মাঝে বিরোধ লেগে গেলো। কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে বিরোধ তো ভারত ভাঙার লক্ষণ। পূর্বে যারা ভারত শাসন করেছে, তারা বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সূত্র ধরে গত ৭১ বছর চলছে। এখন নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী সরকার হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে ভারতকে ভয়াবহ ঝুঁকির মাঝে ফেলে দিয়েছে।

বিনোদ কুমার নামের একজন অ্যাডভোকেট ও সাবেক এমপি নাগরিকত্ব আইন ও নাগরিকপঞ্জিকে সাংবিধানিক আইন আখ্যায়িত করার জন্য ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছেন। চিফ জাস্টিস বিচারপতি শরদ অরবিন্দ বোবদে, বিচারপতি গাভাই ও বিচারপতি সূর্যকান্ত আবেদনের দাবিগুলোর ব্যাপারে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, পার্লামেন্ট অনুমোদিত আইনকে সাংবিধানিক আইন বলেই মেনে নেওয়া হয়। তবে আদালতের কাজ এই আইনের সাংবিধানিক বৈধতা পরখ করা। তারা আবেদনকারীকে ধমক দিয়ে বলেন, ভারত এখন কঠিন সময় পার করছে। দেশব্যাপী শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা উচিত। এই ধরনের আবেদনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হবে না বরং বাড়বে (উর্দু টাইমস, মুম্বাই)।

সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি পর্যন্ত বলেছেন, ভারত এখন কঠিন সময় পার করছে। ভারতের এই আইনের হুমকি সম্পর্কে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ভারতকে সতর্ক করেছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও আইনটি অপ্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বলে মন্তব্য করেছেন। গত ২৬ জানুয়ারি ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে আমেরিকায় ভারতীয় বংশোদ্ভূত লোকেরা পুরো আমেরিকায় বিক্ষোভ করেছে।

এই আইন যদি কার্যকর হয় তবে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের চেয়ে বড় সমস্যার সম্মুখীন হবে। আসামের ছয় লাখ মুসলমানকে নাগরিকত্বহীন কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে নিচ্ছে। বিজেপি নেতারা বলছেন, ওই ৬ লাখকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবেন। আর পশ্চিমবাংলায় এক কোটি মুসলমানকে নাগরিকত্বহীন করার পরিকল্পনা নিয়ে সেখানকার বিজেপি নেতারাও বলছেন ওই এক কোটি মুসলমানকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবেন। তা যদি হয় এবং তারা যদি বিতাড়িত হয় তবে বাংলাদেশে উদ্বাস্তুর ঢল নামবে। তখন বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে।

সুতরাং বাংলাদেশ সরকার যেন এসব বিষয়ে সতর্ক হয় এবং পূর্ব থেকেই যেন প্রতিরোধের ব্যবস্থা করে। সম্প্রতি খাদ্যমন্ত্রী সীমান্তে বিএসএফের গুলি করে মানুষ হত্যা সম্পর্কে যা বলেছেন তা দেশের স্বার্থের বিপরীত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে মন্ত্রীদের লাগামহীন বক্তব্যের প্রতি মনোযোগী হওয়ার অনুরোধ জানাবো।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ