নজরদারিহীন শিক্ষাব্যবস্থা ও এনসিটিবির ‘লোকবল সংকট’

Send
কাজী নুসরাত শরমীন
প্রকাশিত : ১৯:১০, ফেব্রুয়ারি ০১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:১২, ফেব্রুয়ারি ০১, ২০২০

কাজী নুসরাত শরমীনমানহীন অহেতুক পাঠ্যবইয়ের ভারে নুয়ে পড়েছে আমাদের সন্তানদের শিক্ষাজীবন, গত কয়েক বছর ধরে বহুবার এ বিষয়টি এসেছে গণমাধ্যমে। কিন্তু এরপরও আসেনি তেমন কোনও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। আমাদের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর এ বিষয়ে কোনও নজরদারি  নেই। একটি রাষ্ট্রে শিক্ষাব্যবস্থা হয় সুপরিকল্পিত, যা শিশুদের পরিপূর্ণ বিকাশ ও মনন তৈরির ভিত রচনা করে। আমাদের দেশে এই  নজরদারির দায় হচ্ছে, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের। কিন্তু কার্যত আমরা কী দেখছি?
উচ্চ মাধ্যমিকে আইসিটি বিষয়ে যে বইটি শিক্ষার্থীরা পড়ছে, বাজারে থাকা এমন ১৯টি বইয়ের ২০১৬ সাল থেকে এর বর্ধিত সংস্করণগুলো এনসিটিবি অনুমোদিত নয়। শুধু তাই নয়, বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়ে চিহ্ন, সংকেত, যুক্তি ও নির্দেশনায় ভুল আর ভুল। এছাড়া, একটি বইয়ের যুক্তি একই টপিকে অন্য বইয়ের যুক্তির সঙ্গে কোনও মিল নেই। বহু পুরনো সফটওয়্যার উপযোগী কোড দেওয়া আছে বইগুলোতে। যেখানে এনসিটিবির কোনও নজরদারি নেই। একটি রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা কি এত জোড়াতালি দিয়ে চলতে পারে? যে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি, সেখানে আইসিটি বিষয়টি তো শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত ভিত রচনা করার কথা, কিন্তু এমন হতাশাজনক পরিস্থিতিতে এই সাবজেক্টটি চোখ বন্ধ করে মুখস্থ করা ছাড়া ছাত্রছাত্রীদের কী কাজে আসছে?

এনসিটিবি পাঠ্যপুস্তক মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান, তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষের সরকার একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে বাংলা ও ইংরেজির মতো অত্যাবশ্যকীয় বিষয় হিসেবে ২০১৩ সালে আইসিটি বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে।  আইসিটি বিষয়ে  বাজারে যে ১৯টি বই পাওয়া যায়, সেগুলো এনসিটিবি নিজে প্রকাশ করে না। এনসিটিবি কেবল বাংলা ও ইংরেজি বই প্রকাশ করে। বাকি বইগুলো কয়েকধাপে পাণ্ডুলিপি জমাদান ও যাচাই-বাছাইয়ের পর অনুমোদন ও শর্তসাপেক্ষে  বেসরকারি প্রকাশকরা প্রকাশ করেন। এমন ১৯টি বইয়ের মধ্যে থেকে কলেজগুলোর পছন্দের বিবেচনায় পাঠ্য হিসেবে একটি বই অন্তর্ভুক্ত হয়। শুধু অনুমোদনই নয়, প্রকাশের পর শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত অননুমোদিত অধ্যায় সংযোজন ও বিয়োজন হলো কিনা, তা দেখভালের দায়ও তাদের। নিয়ম অনুযায়ী বেসরকারি প্রকাশকদের জন্য এনসিটিবির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হচ্ছে, এক. পাঠ্যবইয়ে কোনও বিষয়বস্তু ঢোকানো বা বাদ দেওয়া যাবে না। দুই. বইয়ের মূল্য, আকার ও পৃষ্ঠা সংখ্যা বাড়ানো যাবে না। তিন. তিনটি শিক্ষবর্ষ পরপর নতুন করে অনুমোদন নিতে হবে। কিন্তু বর্তমানে পাঠ্য হিসেবে কলেজগুলোয় পড়ানো আইসিটি বিষয়ে বইগুলোর বর্ধিত সংস্করণ সম্পর্কে এনসিটিবির সদস্যদের (শিক্ষাক্রম) সুপারিশ পাল্টে দিয়েছে খোদ আইসিটিবি নিজেই! শুধু তাই নয়, পাঠ্যসূচির মান নিয়ন্ত্রণে গঠিত দুই সদস্যের কমিটিও এ বিষয়ে কোনও আলাপ আলোচনায় বসেছেন বলে মনে করতে পারছেন না গণমাধ্যমে জানিয়েছেন।  তবু শর্ত ভঙ্গ করে কয়েক গুণ মূল্য বাড়িয়ে চলছে বর্ধিত সংস্করণ।

কার্যত মানা হচ্ছে না কোনও শর্ত। লাগামহীন দৌরাত্ম্যে ২০১৬ সালের পর থেকে এই প্রকাশকগণ জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক  বোর্ডের নীতিমালার কোনোরকম তোয়াক্কা না করে, আইসিটি বিষয়ে আমাদের শিশুদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে মানহীন, অসম ও দুর্বোধ্য অধ্যায়গুলো। বইয়ের কলেবর বাড়িয়ে, এনিসিটিবির নজরদারি না থাকায় এই প্রকাশকগণ শিক্ষা ব্যবস্থাকে পণ্যে পরিণত করছেন, নিজেদের আখের গুছিয়ে নিচ্ছেন। ফলে, আমাদের ছেলেমেয়েদের পাঠ্যবইয়ের প্রতি  তৈরি হচ্ছে অনীহা। দুর্বোধ্য হওয়ার কারণে আইসিটি বিষয়টি তারা না বুঝে, মুখস্থ প্রবণতার দিকে ঝুঁকছে, যা আদতে শিক্ষা হিসেবে তাদের কোনও কাজে আসছে না। দুর্বোধ্য পাঠ্যপুস্তক তাদের প্রাইভেট টিউশনের চাপে  ফেলছে। এই প্রকাশকরা এনিসিটিবির নজরদারিতে না থাকায়, উচ্চ মাধ্যমিকে আইসিটির পাঠ্যপুস্তকে জুড়ে দিচ্ছেন স্নাতক পর্যায়ের পড়ার অধ্যায়গুলো। শুধু তাই নয়, ওই অননুমোদিত অধ্যায়গুলো থেকেই প্রশ্ন আসছে পরীক্ষায়। অসহায়ত্ববোধ করছেন অভিভাবকসহ শিক্ষার্থীরা। ‘লোকবল সংকট’, এনসিটিবি কর্তৃপক্ষ এই কানা-খোঁড়া যুক্তিতে নজরদারির দায় এড়াতে চাইছে। তথ্যপ্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় পড়ার প্রতি চরম অনীহা তৈরি হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। এর ওপর গাইড বইয়ের দৌরাত্ম্য তো রয়েছেই। ফলে শিক্ষার্থীরা অন্য সব বিষয়ে ভালো ফল করলেও, আইসিটিতে তুলনামূলকভাবে ভালো করতে পারছে না।

কেবল এনসিটিবি নয়, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্ম-পরিকল্পনা, নীতিমালা প্রণয়ন, নজরদারি—এরকম বেশ কয়েকটি স্তর থাকে। নজরদারি না থাকলে, যেকোনও পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে বাধ্য। কিন্তু এই নজরদারির জায়গাটিতে রাষ্ট্রায়ত্ত বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের সীমাহীন দুর্বলতার ছাপ মিডিয়ার কল্যাণে সর্বজনবিদিত। আর যেখানে শিক্ষাব্যবস্থায় পাঠ্যপুস্তক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক—মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তর আমাদের শিশুদের শিক্ষার ভিত তৈরি করে, সেখানে শিক্ষাব্যবস্থায় আইসিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সাবজেক্টে নজিরবিহীন খামখেয়ালি চলছে দিনের পর দিন।

শুধু তাই নয়, ২০১৬ সালের পর থেকে বর্ধিত সংস্করণের নামে চলছে বইয়ের মূল্য বাড়ানো। অনুমোদন নীতিমালার মূল শর্ত ভাঙা হচ্ছে অবলীলায়। এরপরেও বইগুলো বাজেয়াপ্ত হয়নি। বরং এই চাপিয়ে দেওয়া দুর্বোধ্য অধ্যায়গুলো থেকেই বেশি প্রশ্ন এসেছে পরীক্ষায়। এনসিটিবি কর্তৃপক্ষ ‘লোকবল সংকট’কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চাইলেও এর মাসুল গুনছেন আমাদের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

এনসিটিবি ২০১৩, ২০১৬ ও ২০১৮ সালে আইসিটির যে বইগুলো অনুমোদন দিয়েছে, বাজারে এখন যে সংস্করণ পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো এনসিটিবিতে অনুমোদনের সময় জমা দেওয়া পাণ্ডুলিপি নয়। এখানেও রয়েছে ‘উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে’ ফেলার সংস্কৃতি। গণমাধ্যমে দেখা যায়, এনসিটিবি এই দায় চাপাচ্ছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি)-এর ঘাড়ে। আর মাউশি বলছে, এনসিটিবি কেন অনুমোদন বাতিলের চিঠি দিলো না! এই দুই প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতার দায় কে নেবে ? এত গেলো শুধু একটি অব্যবস্থাপনার কথা।

২০১৭ সালে এনসিটিবির বিতরণ করা প্রথম, তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণির বাংলা ও ইংরেজি পাঠ্য বইয়ে বানান, ছবি, লেখা বিকৃতি ও ভুল তথ্যের কারণে শাস্তির মুখে পড়তে হয়েছিল এনসিটিবির ছয় কর্মকর্তাকে। তখন বছরের ছয় মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর তারা শুদ্ধিপত্র প্রকাশ করেছিল। কিন্তু শিক্ষাসংশ্লিষ্ট এই প্রতিষ্ঠানটি যতটা তৎপর হওয়ার কথা ছিল, বাস্তব অবস্থা ঠিক উল্টো। বইয়ের মান যাচাইয়ে গঠিত কমিটিগুলোর তদারকি ও সমন্বয় নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।

একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের স্বপ্নে এই দেশ স্বাধীন হয়েছিল। কিন্তু দিন দিন আমরা সাম্প্রদায়কিতার পথেই হাঁটছি এবং শুধু কর্ম আর নীতিতেই নয়, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও ঠেলে দিচ্ছি সেই অন্ধকারের দিকে।  পাঠ্যবই থেকে অসাম্প্রদায়িক চেতনা তৈরিতে ভূমিকা রাখা অধ্যায়গুলো ও বিশেষ করে অমুসলিম কবি ও লেখকদের লেখা বাদ দিয়ে সাহিত্যকে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে ধর্মের আচ্ছাদনে। ২০১৭ সালে বাংলা ট্রিবিউনেই প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সাহিত্যে বাদ পড়ছেন, রবীন্দ্রনাথ, মাইকেল, সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ভারতচন্দ্র, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র, সত্যেন সেন ও হুমায়ুন আজাদ। অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তচিন্তা-চেতনার বিষয়গুলো বাদ দিয়ে সাহিত্যে যুক্ত হচ্ছে, ‘বন্দনা’, ‘হামদ’, ‘বঙ্গবাণী’, ‘জীবন বিনিময়’, ‘উমর-ফারুক’, ‘মরুভাস্কর’। যা কেবল  মুসলমান কবি ও লেখকদের লেখা ইসলাম ধর্ম ভিত্তিক গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ।

এক্ষেত্রে মনে করতে চাই, ২০১৬ সালের  মে মাসে  হেফাজতে ইসলাম প্রধানমন্ত্রী ও জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়ে এবং ইসলামী ঐক্যজোট সংবাদ সম্মেলন করে পাঠ্যবই ‘সংশোধনে’র দাবি জানিয়েছিলো। পাঠ্যবই সংশোধন না হলে আন্দোলনের হুমকি দিয়েছিল কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড। ভাবতে অবাক লাগে কারা কুক্ষিগত করেছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে? শিক্ষাব্যবস্থা কেন রাজনীতির অংশ হবে?

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা থেকে অসাম্প্রদায়িক শব্দটি দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ কবে তা অনুধাবন করবে? সাম্প্রদায়িকতার আঘাত বারবার এসেছে এই জাতির ওপর। সাম্প্রদায়িকতায় অন্ধকারাচ্ছন্ন পাকিস্তান, সংস্কৃত থেকে আসা বাংলা ভাষাকে কেড়ে নিতে চেয়েছিল, আর উর্দুকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল আরবি ভাষার সঙ্গে সহ-অবস্থানের অপব্যাখ্যা দিয়ে। এই বাঙালি বুকের রক্তে প্রতিষ্ঠিত করেছে বাংলা ভাষার মর্যাদা অসাম্প্রদায়িক চেতনা থেকে। মানহীন, ভুলেভরা শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের ছেলেমেয়েদের অতিরিক্ত মানসিক চাপ দিচ্ছে। সাম্প্রদায়িক শক্তিতে ভারানত নজরদারিহীন শিক্ষাব্যবস্থা কোন অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে, রাষ্ট্র ভেবে দেখেছে কি?

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ