ভোট না দেওয়াও হতে পারে কর্তব্য পালন

Send
ডা. জাহেদ উর রহমান
প্রকাশিত : ১৬:০৭, ফেব্রুয়ারি ০৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৫২, ফেব্রুয়ারি ০৯, ২০২০

ডা. জাহেদ উর রহমানভাগ্যিস অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনাসহ দক্ষিণ আমেরিকার আরও কয়েকটি দেশের মতো ভোট দেওয়াকে বাধ্যতামূলক করার আইন নেই বাংলাদেশে। তাই আমি বেঁচে গেলাম জরিমানা থেকে। হ্যাঁ, ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমি ভোট দেইনি। জরিমানার বিধান বাংলাদেশে থাকলে জরিমানাই দিতাম, কিন্তু ভোট দিতাম না।
ছোটবেলা থেকে শুনেছি, ভোট নাকি নাগরিকদের কাছে রাষ্ট্রের ‘পবিত্র’ আমানত। এটাও স্বীকৃত ব্যাপার, ভোটাধিকার প্রয়োগ করা প্রত্যেক নাগরিকের খুব গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। কথাটা আংশিক সত্য বলে বিশ্বাস করি। কারণ কখনও এর উল্টোটা অর্থাৎ ভোট না দেওয়াটাও নাগরিকের কর্তব্য হয়ে উঠতে পারে। 
ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জিতেছে কে? যখন প্রধানমন্ত্রীকেও এই নির্বাচনে ভোটারের আকাল নিয়ে ব্যাখ্যা দিতে হয়, তখন বোঝা যায় সবকিছু ছাপিয়ে ভোটারের অনুপস্থিতিই প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। সেই বিবেচনায় বলা যায়, এই নির্বাচনে জিতেছে ‘ভোটার অনুপস্থিতি’। সবমিলিয়ে ২৫ শতাংশের কিছুটা বেশি ভোট পড়েছে এই নির্বাচনে। যদিও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক জনাব বদিউল আলম মজুমদার তার একটা লেখায় বলেছেন, ‘আমার অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ঘোষিত ভোটের হার সঙ্গতিপূর্ণ নয়।’

ভোটার অনুপস্থিতি এই নির্বাচনের প্রধান আলোচনার বিষয়ে পরিণত হওয়ায় এই অনুপস্থিতির ব্যাখ্যা হিসেবে নানা কারণ আমাদের সামনে এসেছে। সেইসব বচনামৃত থেকে বাছাই করা কয়েকটি নিচে দিলাম—

১. পরিকল্পনামন্ত্রী বলেছেন, ‘সিটি নির্বাচনে যারা ভোট দিতে আসেনি তাদের একটি বড় অংশ খুব আরাম আয়েশে আছে। বাসায় বসে খুব আরামে বসে পোলাও খাচ্ছে। সরকারের ওপর আস্থা বেশি আছে বলেই মানুষ আরামে থাকছে।’

২. ইসি সচিব বলছেন, ‘জনগণ ছুটি পেয়েছে, অনেকে ছুটি ভোগ করেছে। কেউ কেউ ফেসবুক নিয়ে ব্যস্ত ছিল।’

৩. ঢাকা উত্তরের রিটার্নিং কর্মকর্তা  বলেছেন, ‘ইয়াং জেনারেশন একটু দেরিতে ঘুম থেকে ওঠে। আমার মনে হয় একটু পরে হয়তো ভোটার উপস্থিতি বাড়বে।’

৪. ঢাকা উত্তরের মেয়র বলেছেন, ‘দেশ উন্নতির দিকে যাচ্ছে তার প্রমাণ হলো ভোটার উপস্থিতি কম হওয়া। উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখবেন, সেখানে মানুষের ভোট দেওয়ার হার কম হয়ে থাকে।’

একজন সচেতন মানুষ মন্তব্যগুলোকে হেসে উড়িয়ে দিতে চাইবেন। এগুলো নিয়ে অনেকেই নানা ট্রলও করছেন। কথাগুলো আসলেই এমন, যেগুলোকে সিরিয়াস বিবেচনায় নেওয়ার কোনও কারণ আপাতদৃষ্টিতে নেই। কিন্তু আমরা কি এভাবে ভাবতে পারি, এই দেশের অত্যন্ত উঁচু পদে বসে থাকা মানুষ আমাদের এতটাই তুচ্ছ মনে করেন, তারা এটা ভাবতে পারেন, আমাদের সামনে অত্যন্ত সিরিয়াস বিষয় ভোট নিয়ে এমন কথা বলা সম্ভব। ভোটকে ‘সিরিয়াস বিষয়’ কথাটা লেখার স্বাভাবিক ফ্লো-তে বেরিয়ে গেলো, কিন্তু এই দেশে ভোট আদৌ কি আর কোনও সিরিয়াস বিষয় আমাদের কাছে?

সরকারের দিক থেকে তো বটেই, কিছু ‘সরকারি সুশীল’ এই নির্বাচনে মানুষের অংশগ্রহণ কম হওয়ার কারণ হিসেবে কিছু সিরিয়াস বিষয় খতিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। নির্বাচনের তারিখ পেছানো, ছুটিতে ঢাকার বাইরে চলে যাওয়া, শীত, ঢাকায় মোটরচালিত যানবাহন বন্ধ থাকা, ইভিএম নিয়ে বিএনপির নেতিবাচক প্রচারণা—এসবকে কারণ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন তারা।

এই মুহূর্তে দেশে অসাধারণ এক আবহাওয়া বিরাজ করছে, যেটা বরং মানুষের চলাচল এবং ভোটের জন্য লাইনে দাঁড়ানোর হিসেবে অনেক বেশি সাহায্য করেছে। যানবাহনের জন্য মানুষ দূরবর্তী ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেনি—এর বিরুদ্ধে এটুকুই বলা যথেষ্ট, এদেশের মানুষ সাধারণ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য ঢাকা থেকেও নিজ জেলায় গেছে অতীতে।

বিএনপির পক্ষ থেকে যুক্তি হিসেবে এসেছে সকাল থেকে নির্বাচন কেন্দ্রগুলোয় এজেন্টদের বের করে দেওয়া, কেন্দ্রগুলোয় আওয়ামী লীগের কর্মীদের মহড়া—এসব বিএনপির ভোটারদের মনে ভীতি তৈরি করেছে।

বিএনপির অভিযোগের কিছু সত্যতা আছে তো বটেই। কিন্তু এসব কারণে এতো কম ভোটার ভোটকেন্দ্রে গেছেন, এই যুক্তি মানা কঠিন। বিএনপি বলেছে, তারা ‘আন্দোলনের অংশ’ হিসেবে এই নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। সেই নির্বাচনের দিন বিএনপির বডি ল্যাঙ্গুয়েজ কোনোভাবেই বলেনি, তারা কোনও আন্দোলন করছে।

দুই পক্ষই চেষ্টা করেছে তাদের মতো করে মুখ রক্ষা করার জন্য। ‌সত্য হলো এই নির্বাচনে দুই দলের সমর্থকরাই ভোট দিতে যায়নি; তারা নিজ থেকেই ভোটকে প্রত্যাখ্যান করেছে।

মানুষ যেকোনও কাজ করার আগে তার উপযোগ বিবেচনা করে। সেই উপযোগ যদি তার কাছে সন্তোষজনক হয়, তাহলে সেটা এমনকি কষ্টকর কাজ করতেও মোটিভেশন দেয়। এই হিসাবের কারণেই কৈশোরে আমার মতো দুষ্টুরা পড়াশোনা না করে মাঠে ফুটবল খেলতেই বেশি পছন্দ করতো। যদিও মাঠে রোদের মধ্যে ফুটবল খেলা বাসায় বসে আরামে পড়াশোনার চাইতে অনেক বেশি পরিশ্রমসাধ্য কাজ।

ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন হওয়ার দুই সপ্তাহ আগে অন্য একটি পত্রিকার একটা কলামে লিখেছিলাম এই নির্বাচন নিয়ে সামাজিকমাধ্যমে সবাই যে ধরনের কথা বলছে, সেটা আমাদের কাছে খুব স্পষ্ট বার্তা দেয়, নির্বাচন ব্যবস্থা বলে কোনও কিছুর অস্তিত্ব যে আছে, এটা বেশিরভাগ জনগণ আর বিশ্বাস করে না। নানা দিক থেকেই এই কথা আসছে। এমন অনেক মানুষ এই কথা বলছেন যাদের আর যাই হোক বিএনপির ট্যাগ লাগানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
আওয়ামী লীগের ভোটাররা জানে, তারা ভোটকেন্দ্রে না গেলেও তাদের প্রার্থী জিতবে, তাই তারা বাসায় ফেসবুকিং করা কিংবা পোলাও রেঁধে খাওয়াকেই শ্রেয় বলে মনে করেছেন হয়তো। বিএনপির ভোটারদের ক্ষেত্রে এই কারণ তো আছেই, সঙ্গে সম্ভবত আছে—এই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ। আমার পরিচিত কয়েকজন বিএনপির ভোটারের সঙ্গে আলোচনা করে আমি বুঝতে পেরেছি, তারা কোনোভাবেই এসব নির্বাচনের নামে প্রহসনে অংশ নেওয়ার পক্ষপাতী নন।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সাধারণ জনগণের কী করার ছিল? কেউ বলবেন, দলে দলে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে চাপ তৈরি করে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করা উচিত ছিল। এক বিরাট সংখ্যার ভোটার উপস্থিত হয়ে ভোট বিপ্লব করে নির্বাচন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে পারতো তারা। আমি সেটাকে সঠিক পথ বলে মনে করি না।

ধরে নেওয়া যাক, সিটিতে অসাধারণ অবাধ-সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ নির্বাচন হলো। তাতে সরকারদলীয় প্রার্থীরা বিএনপির প্রার্থীদের কাছে বিপুল ভোটে হারলেন, তবু কি এরকম একটা নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যুক্তি থাকতে পারে? আমি বিশ্বাস করি, পারে না। 

এই রকম একটা পরিস্থিতিও প্রমাণ করে এই দেশে স্বাধীন নির্বাচন ব্যবস্থার কোনও অস্তিত্ব আসলে নেই। সরকার চাইলে এই দেশে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে, আবার না চাইলে এই দেশে রাতের বেলা ব্যালট বাক্স ভরার মতো অভাবনীয় কাণ্ডও ঘটতে পারে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আরেকটি অবাধ, সুষ্ঠু অংশগ্রহণমূলক সংসদ নির্বাচন ছাড়া নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর ভোটারদের আস্থা ফিরে আসবে না।

রাষ্ট্র পরিচালনাকে, রাষ্ট্রের নির্বাচন ব্যবস্থাকে স্রেফ একটা ছেলেখেলায় পরিণত করা হয়েছে বহুদিন আগেই। এসব তথাকথিত নির্বাচনে ভোট দিতে গিয়ে আমরা আদতে সেসব ছেলেখেলার অংশ হই। তাই আমার মতো যারা এই ছেলেখেলার অংশ হননি, তাদের ধন্যবাদ জানাই আমি। আমি বিশ্বাস করি, কখনও কখনও ভোট না দেওয়াটাও কর্তব্য হয়ে দাঁড়াতে পারে। আমি ও অসংখ্য ভোটার সেই দায়িত্ব পালন করেছি বলেই আজ দেশের ভেঙেপড়া নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে চারপাশে এতো কথা হচ্ছে।

লেখক: শিক্ষক, অ্যাকটিভিস্ট

/এমএনএইচ/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ