কোন পথে জাতি?

Send
বিভুরঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৮:১৮, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:২২, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২০

বিভুরঞ্জন সরকারঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফল যেমন হওয়ার কথা ছিল, তেমনই হয়েছে। দুই সিটিতেই মেয়র পদে জিতেছেন আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থী—উত্তরে আতিকুল ইসলাম, দক্ষিণে শেখ ফজলে নূর তাপস। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয় চেয়েছে, পেয়েছে। আবার বিএনপি পরাজিত হলেও তাদের ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। কারণ তারা জানতো নির্বাচনে তারা জিতবে না। পরাজয় নিশ্চিত জেনেও কেন তাহলে বিএনপি নির্বাচনে গেলো? গেলো, কারণ রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণের কোনও বিকল্প নেই। বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন যে সম্ভব নয়, বিএনপির এই বক্তব্য প্রমাণ করাও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার একটি অন্যতম কারণ ছিল। বিএনপি এক্ষেত্রে সফল হয়েছে। নির্বাচন নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক চলছে। চলতে থাকবে আরও বহুদিন।
ঢাকার দুই সিটির নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়ার কথা ছিল। প্রস্তুতিও ছিল। মেয়র পদে এক সিটিতে ছয়জন, আরেক সিটিতে সাতজন প্রার্থী লড়েছেন। আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি ছাড়াও এক সিটিতে সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির প্রার্থী ছিলেন। আরেক সিটিতে ছিলেন সিপিবির প্রার্থী। দুই সিটিতেই ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের প্রার্থী ছিলেন। ছোট আরও দুয়েকটি দলের প্রার্থীও ছিলেন। মোট কথা, নির্বাচনে রাজনীতির প্রায় সব ধারার প্রতিনিধিত্ব ছিল। তাই নির্বাচনটি অংশগ্রহণমূলক হয়েছে।

কিন্তু সব আয়োজন সত্ত্বেও নির্বাচনটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়নি। নগরবাসীর কান ঝালাপালা করে দিয়ে জমজমাট প্রচার চালিয়েছেন প্রার্থীরা। পোস্টারে ঢাকার আকাশ ঢেকে দেওয়ার অবস্থা হয়েছিল। তারপরও নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ না হওয়ার বড় কারণ আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি সমানভাবে জয়ের লক্ষ্যে ভোট করেনি। দুই দলের অবস্থা ও অবস্থানও সমান সমান ছিল না। আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন সরকারে আছে। দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন শেখ হাসিনার মতো বলিষ্ঠ এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন নেত্রী। আর, বিএনপি দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে। দলটি কার্যত নেতৃত্বহীন এবং ভঙ্গুর অবস্থায় আছে। তাছাড়া বিভিন্নভাবে এমন বার্তা ভোটারদের কাছে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, যাই হোক না কেন, ভোটে জিতবে নৌকা, আওয়ামী লীগ। এভাবে আগে থেকে যখন ফল নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, তখন আর সময় নষ্ট করে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ কয়জনের থাকে। খেলার মাঠে কোন দল জিতবে সেটা আগে থেকে জানা থাকে না বলেই না মানুষ মাঠে উপস্থিত হয়ে খেলা দেখতে আনন্দ পায়। সাজানো বা পাতানো ম্যাচ দর্শকদের হতাশ করে। গত কয়েক বছর ধরেই আমাদের দেশে নির্বাচনগুলো কিছুটা একপেশে হয়ে যাচ্ছে। আর সেজন্য মানুষও ভোট দেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এবার ঢাকার দুই সিটিতে যে ৭০/৭৫ শতাংশ মানুষ ভোট প্রদানে বিরত থেকেছে, সেটা কোনও সাধারণ ঘটনা নয়, আর এই অবস্থাটাও একদিনে তৈরি হয়নি। ভোট নিয়ে মানুষের অভিজ্ঞতা খুব মধুর বা সুখকর নয়। মানুষ যে আশা নিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা মানুষের সে আশা পূরণে যত্নবান না হয়ে নিজেদের আখের গোছানোর কাজে বেশি ব্যস্ত থাকেন। ভোটভিক্ষুকরা ভোটের আগে এবং পরে একরকম থাকেন না। বারবার আশাহত হওয়ার মর্মবেদনা এবং দেশের প্রতিহিংসাপরায়ণ ও বিদ্বেষী রাজনীতি মানুষকে ক্রমাগত ভোটবিমুখ করে তুলছে। কিছুমাত্রায় হয়তো রাজনীতিবিমুখও। এরমধ্যে গত কয়েকটি নির্বাচন যেভাবে, যে প্রক্রিয়ায় হয়েছে, মানুষের ভোটাধিকার নিয়ে একপ্রকার ছেলেখেলা হয়েছে, সেটা ভোটের ব্যাপারে মানুষকে চূড়ান্তভাবে নিরুৎসাহী করে তুলেছে।
ভোট নিয়ে মানুষের এই অনাগ্রহ ও অনীহা নিয়ে এখন অনেক ভাবুক, বিশ্লেষক এমনকি রাজনীতিবিদও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। এরমধ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের বক্তব্য নিয়ে একটু আলোচনা করা যেতে পারে। তারা দুজন দুই অবস্থানের মানুষ। তাদের রাজনৈতিক ভাবনাচিন্তাও একখাতে প্রবাহিত হওয়ার মতো নয়। কিন্তু তারা দুজনেই ভোটদানে মানুষের অনীহায় প্রায় অভিন্ন ভাষায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘ভোটের রাজনীতিতে অনীহা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়।’ আর মাহবুব তালুকদার বলেছেন, ‘নির্বাচনবিমুখতা গণতন্ত্রহীনতার নামান্তর। ভোটের প্রতি মানুষের অনীহা দেখে প্রশ্ন জাগে, জাতি কি ক্রমান্বয়ে গণতন্ত্রহীনতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?’

এই উদ্বেগ ও প্রশ্ন অমূলক নয়। গণতন্ত্র নিয়ে আমাদের অনেকের মধ্যেই এক ধরনের আবেগ কাজ করে। বাঙালি স্বাধীনতাহীনতায় যেমন বাঁচতে চায় না, তেমনি গণতন্ত্রহীনতায়ও নয়। অসাম্য ও গণতন্ত্রহীনতার কারণে পাকিস্তান রাষ্ট্র ভেঙেই স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটেছে। কিন্তু বাংলাদেশেও গণতন্ত্র নির্বিঘ্ন হয়েছে, এমন দাবি আমরা করতে পারি না। নানা সময়, নানাভাবে গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হয়েছে, হোঁচট খেয়েছে।

কেতাবি ধারণায় গণতন্ত্র হলো সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন। নির্বাচনের মাধ্যমেই এই গরিষ্ঠতা নির্ধারণ হয়। কিন্তু সমস্যাটা দেখা দেয় এই নির্বাচনটা যথাযথ না হলে। শতকরা ৫১ জন পক্ষে থাকলেই সেটা গণতন্ত্র। ৪৯ জনের বিরোধী অবস্থান মূল্যহীন। ফলে ৫১ জনের সমর্থন আদায়ের জন্য নানা রকম ফন্দিফিকির করা হয়। ভয়ভীতি দেখানো, লোভ-প্রলোভন দেখানো থেকে শুরু করে অনেক নীতিহীনতাই স্থান পায় ভোটের রাজনীতিতে। ভোট ব্যবস্থা যত পুরনো হচ্ছে, এটা তত স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু না হয়ে বরং এরমধ্যে কলুষতা বেশি ঢুকছে। গণতন্ত্র যে নিয়মিত অনুশীলন ও চর্চার বিষয়, সেটা আমরা উপেক্ষা করে একে সীমাবদ্ধ করে এনেছি একদিনের ভোটের মধ্যে। জীবনের আর কোনও ক্ষেত্রেই গণতন্ত্রের নামনিশানা নেই, চর্চা নেই, কেবল ভোট নিয়ে আমাদের গণতান্ত্রিক চেতনা টনটন করে ওঠে। আমাদের গণতন্ত্র হলো ভোটের গণতন্ত্র।
রাজনৈতিক দলগুলো সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কিংবা নেতৃত্ব নির্বাচন—কোনও ক্ষেত্রেই গণতান্ত্রিক রীতিপদ্ধতি মেনে চলে না, কিন্তু ভোটের ক্ষেত্রে পান থেকে চুন খসলে হইচইয়ের শেষ নেই। সাধারণ মানুষ অবশ্য এসব নিয়ে খুব মাথা ঘামায় বলে মনে হয় না। গণতন্ত্র যাদের ভাগ্য বদলের উপায়, কিংবা যারা এর পক্ষে নিজের অবস্থা চিহ্নিত করে অর্থাৎ ‘গণতন্ত্রী’ পরিচয়ে সমাজ-সংসারে আলাদা ধার এবং ভার অর্জন করতে চান, তারা ছাড়া একেবারে আমজনতার মধ্যে গণতন্ত্র থাকা না-থাকা নিয়ে খুব একটা হায়-আফসোস আছে বলে মনে হয় না। তাদের কাছে গণতন্ত্র হলো পেটের ভাত, পরনের কাপড়। মাথার ওপর আচ্ছাদন, রোগে চিকিৎসা। সন্তানের শিক্ষা এবং কাজের সুযোগ।
গণতন্ত্র না থাকলেই একটি দেশ রসাতলে যায় না। আবার গণতন্ত্রই সর্ব রোগের মহৌষধ নয়। তবে এযাবৎকাল যত শাসন বা সরকারব্যবস্থা চালু হয়েছে তার মধ্যে তুলনামূলকভাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই সেরা। তবে সর্বোত্তম হয়তো নয়। চিন্তাশীল মানুষ, রাষ্ট্রচিন্তকরা সর্বোত্তম ব্যবস্থার সন্ধানে আছেন। মনে রাখার বিষয় এটাই, বিশ্বে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চেয়ে গণতন্ত্রহীন রাষ্ট্রই বেশি। দুনিয়ার বেশিরভাগ মানুষই অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বসবাস করেছেন। তাদের সবাই একেবারে নিম্নমানের জীবন-যাপন করছেন তা-ও নয়। তার মানে কি আমরা গণতন্ত্রকে নির্বাসনে দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেবো? অবশ্যই তা নয়। তবে শুধু ভোটের গণতন্ত্রের জন্য হাহাকার না করে আমাদের সার্বিকভাবে ভালো ব্যবস্থাপনার দিকে মনোযোগ দেওয়া দরকার। আমাদের ভাবতে হবে, কেন আমরা যে বিজয় অর্জন করি, তা ধরে রাখতে পারি না? আমরা সামনে না এগিয়ে কেন পেছনে যাই? আমরা মানুষ হিসেবে নিকৃষ্ট হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে উৎকৃষ্ট শাসনব্যবস্থার সন্ধান করে সুফল পাবো কি?

ঢাকা সিটি নির্বাচনের ফল যদি সত্যি কারও মনে সামান্য অস্বস্তি তৈরি করে থাকে, তাহলে বিচ্ছিন্নভাবে, এলোমেলোভাবে উপরভাসা কিংবা চটকদার কথা না বলে উচিত গভীরভাবে পথের সন্ধান করা। এজন্য রাজনীতিক এবং সমাজচিন্তকদের একযোগে কাজ করতে হবে। বেরিয়ে আসতে হবে দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে।







লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ