ছোটরা পারে বড়রা কেন পারে না?

Send
রেজানুর রহমান
প্রকাশিত : ১৬:২৩, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২৫, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২০

রেজানুর রহমানএকটা গল্প বলি। ছোট ভাই ফাইভে বৃত্তি পেয়েছে। গোটা পরিবারে শুরু হয়েছে আনন্দের বন্যা। পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, পরিচিত, অপরিচিত অনেকেই বাড়িতে এসে শুভেচ্ছা জানিয়ে যাচ্ছেন। মিষ্টির পাহাড় জমেছে ডাইনিং টেবিলের ওপর। সবার মনোযোগ ছোটভাইয়ের দিকে। বড় ভাইকে যেন কেউ পাত্তাই দিচ্ছে না। আমাদের ক্রিকেট পরিবারে এমনটাই যেন দেখতে পাচ্ছি। বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দল ভারতকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ায় গোটা দেশ আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠেছে। এটাই তো হওয়ার কথা। বিশ্বকাপ বলে কথা। হোক সেটা অনূর্ধ্ব ১৯। বাংলাদেশই তো এখন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। বৈশ্বিক পর্যায়ে এটাই বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ অর্জন। কাজেই গোটা দেশে আনন্দের ঢেউ তো উঠবেই। এছাড়া বাংলাদেশে ক্রিকেট, একমাত্র ক্রিকেটই একটি খেলা, যার বিজয়ের জন্য দেশের সব মানুষ একসঙ্গে, এক কাতারে দাঁড়িয়ে যায়। সেখানে ক্রিকেটে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের যোগ্যতা অর্জন, উৎসব তো হবেই।
হ্যাঁ, গোটা দেশে ক্রিকেট উৎসব চলছে। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বিশ্বকাপ জয়ী বাংলাদেশের তরুণ ক্রিকেটারদের বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনার মাধ্যমে বরণ করে নিয়েছে বাংলাদেশে ক্রিকেট বোর্ড। তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন বিশ্বজয়ী এই তরুণ ক্রিকেটারদের ব্যাপারে সুদূর প্রসারী একটা পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছেন। বিশ্বকাপ জয়ী অনূর্ধ্ব ১৯ দলের সব ক্রিকেটার প্রত্যেক আগামী দুই বছর প্রতি মাসে এক লাখ টাকা ভাতা পাবেন। অর্থাৎ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড আগামী দুই বছর তরুণ ক্রিকেটারদের দেখভাল করার দায়িত্ব নিয়েছেন। বিগত দুই বছরের মতো আগামী দুই বছরও তারা বোর্ডের একটি নির্ধারিত পরিকল্পনার মধ্যেই ক্রিকেট চর্চা করবেন।

ক্রিকেট বোর্ডের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাতেই হচ্ছে। কারণ সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দল বিশ্বকাপ জয়ের পর দেশের ক্রিকেটে একটা সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। তাদের জন্য নতুন পরিকল্পনা সত্যি প্রশংসার দাবিদার। একথা তো সত্য, অনূর্ধ্ব-১৯ এর এই দলটি বিগত দুই বছর ক্রিকেটের মধ্যেই ছিল। ক্রিকেটের বাইরে অন্যকিছু ভাবার সময় ছিল না তাদের। ফলে দলগত একটা শক্তি তৈরি হয়েছে তাদের মাঝে। বিশ্বকাপ জয়ের পর বোর্ড যদি তাদের একটা নিয়মের মধ্যে না রেখে হঠাৎ স্বাধীনভাবে ছেড়ে দিতো, তাহলে নতুন সম্ভাবনার কোনও ক্ষেত্র হয়তো তৈরি হতো না। আবারও ক্রিকেট বোর্ডকে ধন্যবাদ জানাই।

এবার একটি দৃশ্যের প্রতি আপনাদের মনোযোগ দিতে অনুরোধ করবো। ওই যে ছোট ভাইয়ের কথা তুলেছিলাম, বৃত্তি পাওয়া ছোট ভাই। সে যেহেতু বৃত্তি পেয়েছে। বাবা-মা তার প্রতি অধিক মনোযোগী হয়ে উঠলেন। তার জন্য প্রতি সাবজেক্টে টিচার রাখা হলো। গোটা পরিবারের ব্যস্ততা যেন তাকে ঘিরেই। সংসারের বড় ছেলেটির প্রতি কারও কোনও আগ্রহ নেই। বরং বাবা-মা তার প্রতি রুষ্ট। এমন ঘটনা বোধ করি আমাদের ক্রিকেট পরিবারেও শুরু হয়েছে। সম্প্রতি পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রিকেটের লজ্জাজনক পরাজয়ের পর বোর্ড সভাপতি যেদিন বললেন, এভাবে তো চলতে দেওয়া যায় না। আমাদের একটা অ্যাকশনে যেতে হবে। সেদিন থেকেই ক্রিকেট বাংলাদেশের নিয়ে বিভিন্ন মহলে ফিসফাস শুরু হয়েছে। তবে সৌভাগ্য এই যে অনূর্ধ্ব-১৯ দল বিশ্বকাপ জিতে এসেছে। তা না হলে ক্রিকেটে ব্যর্থতার অনেক অভিযোগই হয়তো এতদিনে ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়াতো।

আমি ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ নই। তবে ক্রিকেটকে প্রচণ্ড ভালোবাসি। সে কারণে কয়েকটি জরুরি বিষয় তুলে ধরতে চাই। বিশ্বকাপ ক্রিকেটের পর আমরা কি সত্যিকার অর্থে জাতীয় ক্রিকেট দলকে নিয়ে ভেবেছি? এর আগে কী হলো? বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে খেলতে যাবে। প্রচার মাধ্যমে শোনা যাচ্ছিল বাংলাদেশ ভারতে খেলতে যাবে! কিন্তু ভারতের সঙ্গে ভারতের মাটিতে খেলতে যাওয়ার আগে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলকে কি সেভাবে তৈরি করা হয়েছিল? ভারত বলে কথা। ক্রিকেটের পরাশক্তি। ভারতের সঙ্গে খেলতে যাবে বাংলাদেশ! অথচ এক মাস আগেও দল গঠন সম্ভব হয়নি। উপরন্তু জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা শুরু করলো ধর্মঘট। বোর্ড সভাপতি আগের দিন ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধে কড়া মন্তব্য করলেন। পরের দিনই আবার প্রায় সব দাবিই মেনে নিলেন। সাকিব আল হাসান আইসিসির নিষেধাজ্ঞার শিকার হলেন। ফলে প্রায় ভঙ্গুর একটা দল নিয়ে ভারতে খেলতে গিয়েছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। যা হওয়ার তাই হয়েছে। শোচনীয় হারের লজ্জা নিয়ে ফিরে এসেছে দেশে। এরপর শুরু হলো পাকিস্তান সফর প্রসঙ্গ। বাংলাদেশ পাকিস্তানে যাবে কি যাবে না, এই নিয়ে চলল অনেক কথাবার্তা। অবশেষে আইসিসির মধ্যস্ততায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ঠিকই পাকিস্তানে খেলতে গেলো।  কিন্তু পাকিস্তানে খেলতে যাওয়ার আগে এবারও কি সুদুর প্রসারী পরিকল্পনার মাধ্যমে জাতীয় দলকে প্রস্তুত করা হয়েছিল? মুশফিকুর রহীম জাতীয় দলের নির্ভরযোগ্য ক্রিকেটার। তিনি পাকিস্তানে খেলতে যাবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। ইনজুরির কারণে তামিম ইকবাল পাকিস্তানে খেলতে যাবেন না বলে খবর চাউর হয়ে গিয়েছিল। সঙ্গত কারণে একথা বলাই যায়, পাকিস্তানে খেলতে যাওয়ার আগে জাতীয় দলকে সেভাবে গোছানো সম্ভব হয়নি। অথবা অতি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল। কিন্তু পাকিস্তান ক্রিকেট দল বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে মাঠের লড়াইয়ে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে। পাকিস্তান থেকে মাথা নিচু করে এসেছে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সদস্যরা। এটাই কি হওয়ার কথা ছিল?

আবারও ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের সেই হুঁশিয়ারি বক্তব্যটি উল্লেখ করতে চাই। তিনি বলেছেন, এভাবে তো আর চলতে দেওয়া যায় না। আমাদের একটা অ্যাকশনে যেতে হবে। বোর্ড সত্যি সত্যি কোনও অ্যাকশনে যাবে কিনা, সেটা সময়ই বলে দেবে। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের ব্যর্থতার জন্য শুধু খেলোয়াড়রাই দায়ী কিনা, এটাও একটি বড় প্রশ্ন। ক্রিকেটের স্বার্থে সত্যি সত্যি বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের পোস্টমর্টেম জরুরি।

আবারও জুনিয়র ক্রিকেটারদের প্রসঙ্গ তুলতে চাই। বিশ্বকাপ জয়ের পর তাদের জন্য একটা সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়েছে ক্রিকেট বোর্ড। কিন্তু সত্যিকার অর্থে জাতীয় দলের ব্যাপারে বোর্ডের আছে কি কোনও সুদুর প্রসারী পরিকল্পনা? প্রশ্নটা কি কঠিন হয়ে গেলো?

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ