অন্য রকম এক ভোটবিপ্লব

Send
রুমিন ফারহানা
প্রকাশিত : ১৮:২৮, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৩০, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২০

রুমিন ফারহানাঢাকা সিটি নির্বাচনের প্রার্থীরা তাদের ইশতেহারে কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেটা কেউ জানেন? তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতির কোনটি আদৌ সিটি করপোরেশনের দায়িত্বের চৌহদ্দিতে পড়ে আর কোনটি পড়ে না, আমরা কি জানি? কেউ কি বলতে পারেন, বিগত সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলোয় জয়ী প্রার্থীরা তাদের দেওয়া ইশতেহারের কত শতাংশ বাস্তবায়ন করেছেন? আমরা কি আদৌ দেখেছি ঢাকা সিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে এই শহর কেমন হওয়া উচিত, এই শহরের সমস্যা সমাধানে মেয়রদের কী কী কর্তব্য, সেসব নিয়ে পত্রিকায় কোনও গুরুত্বপূর্ণ লেখা অথবা টিভিতে কোনও টকশো হয়েছে? সব প্রশ্নের উত্তর প্রায় সব ক্ষেত্রেই হবে ‘না’।
মিডিয়ার আচরণ মানুষের চাহিদা সম্পর্কে আমাদের খুব ভালো ধারণা দেয়। প্রার্থীদের ইশতেহার, ঢাকাকে সমস্যামুক্ত করা নিয়ে তাদের অঙ্গীকার, ঢাকা শহরকে তিলোত্তমা করা নিয়ে তাদের স্বপ্ন—এসব নিয়ে হাতেগোনা দুই-একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে পত্রিকায়। এর মানে হচ্ছে মিডিয়া খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিল, তাদের পাঠকদের কাছে এসব বিষয় এখন একেবারেই মূল্যহীন। তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনি প্রচারণার পুরোটা সময়, নির্বাচনের দিন মিডিয়া ব্যস্ত ছিল ইভিএম, প্রার্থীদের নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গ, ভোটের পরিবেশ এসব নিয়ে। এমনকি প্রার্থীদেরও তাদের প্রচারণায় তাদের মূল কাজ নিয়ে কথা বলতে দেখা গেছে খুব কমই।

নির্বাচনের দিন থেকে সব আলোচনা ছাপিয়ে প্রধান হয়ে ওঠে এই নির্বাচনকে ভোটারদের প্রত্যাখ্যান করা। এমনকি এখন নির্বাচন শেষ হওয়ার কয়েকদিন পরও একই আলোচনা চলছে। সরকারি দল বলছে গত ১০০ বছরে এত ভালো নির্বাচন হয়নি,  বিরোধীরা বলছেন ঢাকায় সিটি করপোরেশন নির্বাচন বলতে আদতে কিছুই হয়নি। ভোটাররা দেখলাম ফেসবুকে নির্বাচনের আগেই সরকারি দলের দুই প্রার্থীকে শুভেচ্ছা দিচ্ছেন। অর্থাৎ তারা আগেভাগেই জানেন কে নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। এর কারণ কারও অজানা নয়। গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা বলে সরকারি দলের প্রতীক পাওয়াটাই মূল বিষয়। প্রতীক পাওয়া মানেই নির্বাচিত, এর কোনও ব্যত্যয় নেই। প্রতীক পেলে ভোট এমনই আসে। ভূতে জোগায় ভোট। ভোট যে ভূতে জোগাবে সেটা কি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নব নির্বাচিত মেয়র আতিকুল ইসলামও জানতেন? তা না হলে তিনি কীভাবে অর্ধেকেরও কম কেন্দ্রের ফল প্রকাশিত হওয়ার আগেই প্রতিদ্বন্দ্বী তাবিথ আউয়ালকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার অঙ্গীকার করেন?  

তরুণ প্রজন্মের দেরিতে ঘুম থেকে ওঠা, বাসায় বসে ফেসবুক চালানো, সরকারের ওপর আস্থা থাকার কারণে বাসায় পোলাও রান্না করে খাওয়া—এমন সব অতি সৃজনশীল,  অকল্পনীয়,  চমকপ্রদ  ব্যাখ্যা আমরা পেয়েছি। তবে  সবচেয়ে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ব্যাখ্যাটি দিয়েছেন সম্ভবত নবনির্বাচিত ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, দেশ উন্নত হচ্ছে, উন্নত দেশেও ভোটার উপস্থিতি কম থাকে। দেশ উন্নতির দিকে যাচ্ছে, তার প্রমাণ হলো ভোটার উপস্থিতি কম হওয়া। এই দেশের তথাকথিত উন্নয়নের প্রমাণ হিসেবে সরকার জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি কিংবা মাথাপিছু আয় নিয়ে প্রচণ্ড প্রপাগান্ডা চালায়। তাদের আমি পরামর্শ দেই, এখন থেকে তারা এর সঙ্গে বুক ফুলিয়ে যুক্ত করুক– আমাদের দেশের রাজধানীর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এক মেয়র ১৫ আর অন্যজন ১৭ শতাংশ ভোটে নির্বাচিত হয় (যাও আবার প্রশ্নসাপেক্ষ), অর্থাৎ আমরা অনেক উন্নত হয়েছি। মজা মন্দ নয়।

ক্ষমতাসীন দলের একেবারে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা নির্বাচনে ভোটার অনুপস্থিতির নানা ব্যাখ্যা হাজির করেছেন। আনিসুল হকের মৃত্যুর কারণে শূন্য হাওয়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের যে উপনির্বাচনে আতিকুল ইসলাম নির্বাচিত হয়েছিলেন, সেই নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৩১ শতাংশ। আর এবার বিএনপির অংশ নেওয়ায় একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে ভোট চেয়েও অনেক কমে গেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা করলে ক্ষমতাসীনদের যাবতীয় ব্যাখ্যাকে এক ধরনের মুখ রক্ষার চেষ্টার বেশি কিছু বলে মনে করার কোনও কারণ নেই।

এই দেশের সচেতন মানুষ প্রকৃত কারণটা অনুধাবন করেছেন। ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, এম সাখাওয়াত হোসেন, সৈয়দ আবুল মকসুদের মতো মানুষ এই কারণটা আমাদের সামনে ব্যক্ত করেছেন। এই মানুষরা আর যাই হোক বিএনপি’র প্রতি সহানুভূতিশীল নয়, এটা এই দেশের জনগণ জানে। তাদের মতে, দেশের মানুষ পুরো নির্বাচন ব্যবস্থা থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ঠিক এই কারণটাই আরেকজন মানুষের বয়ান থেকে এসেছে, যিনি জন্মলগ্ন থেকে আওয়ামী লীগের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবেই পরিচিত। আমি তার কথা উদ্ধৃত করতে চাই।

সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে লেখা কলামে তিনি নির্বাচনে ভোট কম পড়ার চারটি কারণ উল্লেখ করেন। যার মধ্যে প্রথম কারণ হিসেবে তিনি চিহ্নিত করেছেন ইভিএমের ফলে জাল ভোট প্রয়োগের সুযোগ না থাকাকে। দ্বিতীয় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ভোটের দিন গাড়ি বন্ধ থাকায় হেঁটে আসার ভয়ে ভোটারদের কেন্দ্রে না আসাকে। তৃতীয় কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন, ভোট সম্পর্কে বিএনপির ঋণাত্মক প্রচারণাকে। তার মতে, ‘ভোটের আগের রাতেই আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা ছাপ্পা ভোটে ভোট বাক্স পূর্ণ করে রাখবে’—এই কথার ব্যাপক প্রচারের কারণে ভোটাররা কেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

এরপর চতুর্থ কারণে হিসেবে তিনি যা বলেছেন তা তার কলাম থেকে হুবহু কোট করছি– 

‘প্রকৃত ভোটদাতাদের মনে ভোটদানে অনীহা। এটি নির্বাচন কমিশন বা ক্ষমতাসীন সরকার বা নির্বাচনি ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা নয়, এটি এক ধরনের অনীহা। যেসব দেশে দীর্ঘকাল ধরে সামরিক অথবা স্বৈরাচারী শাসন কায়েম থাকে, সেসব দেশের নাগরিকদের মনে নির্বাচনে ভোটদানে এক ধরনের অনীহা বা অনাগ্রহ জন্মে। তারা ভাবে, ভোট দিয়ে কী হবে? ভোট দিয়ে তো তারা সরকারের পরিবর্তন ঘটানো বা নিজেদের পছন্দের দলকে ক্ষমতায় আনতে পারছে না। এ ধরনের নির্বাচনভীতি বা ভোটদানে অনীহা রোগ লাতিন আমেরিকার ডিক্টেটর শাসিত কয়েকটি দেশে দেখা দিয়েছিল।’ 

এই কলামটির লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরী। আমাদের দেশে এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবী তৈরি হয়েছেন, যারা পরেন এক ধরনের নিরপেক্ষতার মুখোশ, কিন্তু তাদের লেখায় বক্তব্যে প্রধান কাজ থাকে ক্ষমতাসীনদের যাবতীয় অপকর্মকে বৈধতা দেওয়া। এই কাজে তাদের ব্যুৎপত্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেক সময় তাদের বক্তব্যের কাছে আওয়ামী লীগের বড় নেতার বক্তব্যকেও শিশুতোষ বলে মনে হয়। আবদুল গাফফার চৌধুরী তাদের চেয়ে আলাদা। কারণ তিনি কোনও ভনিতার ধার ধারেন না। তিনি ঘোষিতভাবে আওয়ামী লীগের শুভাকাঙ্ক্ষী, আওয়ামী লীগকে ডিফেন্ড করেন তিনি ঘোষণা দিয়ে। এই কারণে আবদুল গাফফার চৌধুরীর বক্তব্যের সঙ্গে আমার চরম দ্বিমত থাকলেও অন্য বুদ্ধিজীবীদের মতো তার প্রতি অশ্রদ্ধা নেই।

তিনি যেহেতু ঘোষিতভাবে আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলেন, সেহেতু এখানে উদ্ধৃত করা তার এই বক্তব্যে ‘অনাস্থা’ শব্দটিকে ইউফেমিস্টিক ভাষায় ‘অনীহা’ বলেছেন। তাই যে কেউ অনীহা শব্দটিকে অনাস্থাই পড়তে পারেন। কারণ বক্তব্যের পরবর্তী অংশে  আবদুল গফফার চৌধুরী যা বলেছেন, তা স্রেফ অনাস্থারই শক্ত বহিঃপ্রকাশ। আমি বিশ্বাস করি, তার এই বক্তব্যের পর ভোটার অনুপস্থিতির আর কোনও কারণ খুঁজতে যাওয়ার দরকার নেই। এটিই আসলে একমাত্র কারণ।  একটি স্বৈরতান্ত্রিক সরকারে এমনটিই হয়, এমনই হওয়ার কথা।

ভোটবিপ্লব কথাটা মাঝেমাঝেই শোনা যায়। বহু ভোটার ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে বিরোধী শক্তিকে ক্ষমতায় আনার ক্ষেত্রে আমরা এই শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করি। ২০১৪ সাল থেকে আজ পর্যন্ত পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে সরকার এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে যে, সেই ধরনের প্রথাগত ভোটবিপ্লব এই মুহূর্তে জাতীয় নির্বাচন তো বটেই এমনকি  ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য অনুসারে ‘সরকারের ওপর আকাশ ভেঙে পড়ে না’ জাতীয় স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও আর সম্ভব না।

মানুষ সৃজনশীল, তাই সে থেমে থাকে না। সে নতুন ধরনের এক ভোট বিপ্লবের পথ ঠিকই বের করে নিয়েছে। ঠিক যেমন সরকার আবিষ্কার করেছে অভিনব কায়দায় ভোট ডাকাতির নতুন পন্থা। নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার যতই বলুন এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় পাওয়া হলো রাতে ব্যালট বাক্স পূর্ণ না হওয়া কিংবা কোন কেন্দ্রে ১০০ পারসেন্ট ভোট না পড়া, কিন্তু ভোটাররা ঠিকই বুঝতে পেরেছে ভোট দিয়ে বিএনপির প্রার্থীকে এই ধরনের নির্বাচনে জেতানো সম্ভব নয়। বিএনপি প্রার্থীকে জিতিয়ে দেওয়া গেলে তারা সেটাই করতো; সেভাবেই সরকারের প্রতি অনাস্থা জানাতো। কিন্তু সেটা যেহেতু সম্ভব হচ্ছে না তারা ভোট কেন্দ্রে না গিয়ে এক অসাধারণ ভোটবিপ্লব করেছে, যা দিয়ে পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাটির প্রতি তীব্র অনাস্থা প্রদর্শন করেছে। এই বীভৎস অনাস্থা এখন একেবারে দগদগে ঘা-এর মতো জ্বলছে। এই ঘায়ে মলম লাগাতে নেমে পড়েছেন আওয়ামী লীগ প্রধান, দলটির সাধারণ সম্পাদক, আরও সব বড় বড় নেতা এবং সরকারি ‘নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীরা’।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ