‘ফ্যামিলি নিডস ফাদার…’

Send
সৈয়দা আখতার জাহান
প্রকাশিত : ১৮:৩০, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৩২, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২০

সৈয়দা আখতার জাহানএই শহরের ডাস্টবিনে এবং তার আশপাশে প্রায়ই জীবিত কিংবা মৃত শিশু পাওয়া যায়। সম্প্রতি চট্টগ্রামের ভাগাড়ে জুতার বাক্সে ভোরবেলায় পথশিশুরা কুড়িয়ে পায় এক কন্যাশিশুকে। ভৈরবে নবজাতককে ভিক্ষুকের কাছে রেখে পালিয়ে গেছেন মা। ফেনীর জেনারেল হাসপাতালের সিঁড়ির নিচে এক শিশুকে ফেলে যায় পরিবার। তবে, গত বছর ১৬ মার্চ শনিবার ট্রাংকবন্দি নবজাতক উদ্ধার হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা ছাত্রী হল থেকে। কান্নার আওয়াজ শুনে ট্রাংকের তালা ভেঙে শিশুটিকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও সেখানে সে মারা যায়। শিশুটির মা জাবির উদ্ভিতবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী, বাবা একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী। বাবা রনি মোল্লার দেওয়া তথ্যানুযায়ী, তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ। সেলফোন নষ্ট থাকায় যোগাযোগ সাময়িক বন্ধ ছিল। ছাত্রীটি সদ্যপ্রসূত নবজাতকটিকে ট্রাংকে লুকিয়ে রাখেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় সাত বছর রোকেয়া হলের আবাসিক ছাত্রী ছিলাম। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, আবাসন সমস্যা কিংবা পড়াশোনার সুবিধার্থে হলে বিবাহিত মেয়েরা থাকেন। তবে সন্তানসম্ভবা এবং এত অ্যাডভান্স স্টেজে এসে হলে থাকার কথা নয়। কারণ, এ সময়ে মেয়েদের প্রয়োজন পারিবারিক আবহ ও বাড়তি যত্ন। সন্তান জন্মদানের মতো প্রাকৃতিক বিষয় লুকানো সম্ভব নয়। রুমমেটদের কাছ থেকে তো একেবারেই নয়। তারপরও কেন এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা?

যদিও মহাভারতে কুমারী কুন্তীর গর্ভে সুর্যদেবের সন্তান আসে। কৌশলে আপন বস্ত্রাঞ্চলে গর্ভাবস্থাকে ঢেকে রেখেছিলেন কুন্তী। জন্মের পর ধাত্রীর পরামর্শে একটা বড়োসড়ো স্বর্ণপেটিকার মধ্যে নবজাতকটিকে ভাসিয়ে দেওয়া হয় অশ্বনদীর জলে। শিশুটি পরবর্তীতে কর্ণ নামে বেড়ে ওঠে অন্য এক নিঃসন্তান দম্পতির কাছে। বলা হয় মা তো মা-ই। মায়ের আবার ধরন হয় নাকি? মায়ের ধরন না হলেও মাতৃত্বের ধরন আছে। বিবাহিত মাতৃ্ত্ব এবং কুমারি মাতৃ্ত্ব। বিবাহিত মাতৃ্ত্ব সমাজের চোখে বিশুদ্ধ মাতৃত্ব হলেও কুমারি মাতৃত্বকে স্বীকৃতি দিতে সমাজের রয়েছে কার্পণ্য। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান শুতম্যাকার ইনস্টিটিউট ২০১৪ সালে এদেশে প্রজনন স্বাস্থ্যের উপর একটি জরিপ করেন। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এদেশে বছরে ১১ লাখ ৯৪ হাজার স্বপ্রণোদিত গর্ভপাতের ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ দৈনিক গড়ে এ ধরনের গর্ভপাতের সংখ্যা ৩ হাজার ২৭১টি। এদেশে ২০০৫ সালে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে করা আরেক গবেষণায় গবেষক আহমদ দেখতে পান, আমাদের দেশে বিবাহিতদের চেয়ে অবিবাহিত কিশোরীদের গর্ভপাত করানোর হার পঁয়ত্রিশ ভাগ বেশি। অনেক ক্ষেত্রে দেরি হয়ে যাওয়ায় গর্ভপাত আর করানো সম্ভব হয় না, তাই ‘অনাকাঙ্ক্ষিত সন্তান’ বলে যাদের জন্ম হয় সেই সব নবজাতকের শরীর পাওয়া যায় ডাস্টবিনে কিংবা নর্দমায় কখনও জীবিত কখনও বা মৃত।

পরিবার যখন থেকে প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা পেয়েছে তখন থেকে শিশু পালনের যাবতীয় দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে নারীর কাঁধে। যদিও সন্তান নারীর নিজস্ব সম্পদ নয়, বরং পরিবারের সদস্য এবং রাষ্ট্রের নাগরিক। ‘মেটারনিটি নেসেশিয়েটস উইড্রয়াল ফ্রম ওয়ার্ক’ বইয়ে জুলিয়েট মর্মান্তিক সত্যিটা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেন। তিনি বলেন, ‘শিশু এক মধুর অভিজ্ঞতা কিন্তু শিশুপালন যখন বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে সেটা বড় মর্মান্তিক’। নারীর কাঁধে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে শিশু পালনের একচ্ছত্র দায়। ব্যক্তিগত আবেগজনিত সম্পর্কগুলো দেখাশোনার ভার সম্পূর্ণভাবে মেয়েদের দায়িত্ব বলে মনে করা হয়। মায়ের সঙ্গে সন্তানের যে অদৃশ্যবন্ধন তাকে সমাজের চোখ নাড়ির টান বলে অভিহিত করলেও এই কিংবদন্তি মতামতের পেছনে কোনও জৈবিক শব্দ নেই, যা আছে তার পুরোটাই শিশুর সঙ্গে মায়ের গড়ে তোলা ব্যক্তিগত সম্পর্ক। মাতৃত্বের যে দায়-দায়িত্ব সামাজিকভাবে নির্মিত, প্রতিটি মেয়েকে শৈশব থেকেই তা শিখিয়ে দেওয়া হচ্ছে পরিবারের অগ্রজ নারীদের মাধ্যমে। বলে দেওয়া হচ্ছে নারীর প্রধান কাজ বিবাহ নামক প্রথার মধ্য দিয়ে সন্তানের জন্মদান, ধারণ, পালন এবং সামাজিকীকরণ। নারী সন্তান ধারণ করে প্রত্যক্ষভাবে প্রতি মুহূর্তে ভোগ করে গর্ভধারণের ঝুঁকি ও আশা-আশঙ্কা। জরায়ু শাসিত মানবজাতির প্রথম শিক্ষক নারীরাই সন্তানের জন্ম দিয়ে খালাস নয়। মায়ের দায়িত্ব বা কাজ আট ঘণ্টা করলেই শেষ হয়ে যায় না। পছন্দ না হলে ধর্মঘটও করা যায় না।

নারীদের মা হওয়ার শারীরিক অভিজ্ঞতা এক হলেও পারিবারিক বা সামাজিক অভিজ্ঞতায় রয়েছে ভিন্নতা। এঙ্গেলসের মতে, ৮০০০ খ্রিষ্ট-পূর্বাব্দের কাছাকাছি সময়ে পিতৃতান্ত্রিক পরিবারের উদ্ভব হয়েছিলো বলে ধারণা করা হয়। এর আগে আদিম সাম্যবাদী যে সমাজ প্রচলিত ছিল সেই সমাজ ছিল মাতৃতান্ত্রিক। সেখানে পরিবার ছিল না, ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি, রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ছিল না। ব্যাকোফেন প্রথম বলেন, মানুষের গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনের শুরু হয়েছিল মাতৃতন্ত্র দিয়ে। সন্তানের জননী হিসেবে মেয়েদের স্বাভাবিক বাড়তি শক্তি তাদের অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিল। কারণ, তখনও মানুষ প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিকতাতে অভ্যস্ত ছিল। যেহেতু মায়ের ভূমিকা প্রত্যক্ষ স্পষ্ট, শিশু তার শরীর থেকে উৎপন্ন হয়, এবং বাবার ভূমিকাটি সংযোজিত, তাই সন্তান লালন পালনের যাবতীয় দায়িত্ব তুলে দেওয়া হলো নারীর কাঁধে। শিল্প বিপ্লবের পর যৌথ পরিবার ভেঙে যায়। গ্রাম থেকে দলে দলে পুরুষ কারখানায় যোগ দিতে শহরের দিকে পা বাড়ালে পুরনো বন্ধন ভেঙে তৈরি হলো দম্পতি কেন্দ্রিক অনুপরিবার। নগরীর কিশোর-কিশোরীরা সবাই হঠাৎ অনুভব করলো সমাজের চোখ তাদের আর শাসন করছে না। চটজলদি আবেগের চরম প্রকাশ ঘটেছিল। ক্ষণস্থায়ী প্রেম ও স্বল্পকালীন বিয়ের মধ্য দিয়ে ইতোমধ্যে সন্তান জন্মালে সম্পর্কচ্ছেদের পর তার দায়িত্ব একজনের ঘাড়ের ওপর চেপে বসে।

আমেরিকার একটি নতুন আন্দোলনের নাম ‘ফ্যামিলি নিডস ফাদারস’ (FNF)। যে জীবনে বাবা নেই; আমেরিকার বৃহত্তম সামাজিক দুর্যোগ’ নামক একটি লেখায় নিকোলাস ডেভিডসন জানাচ্ছেন, ব্রিটেনের প্রায় ১৫ মিলিয়ন ছেলেমেয়ে, যারা অনূর্ধ্ব-১৮, তারা জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ, বাবা ছাড়াই বেড়ে উঠেছে। পশ্চিমা সমাজে নতুন এক সমস্যা পিতৃত্ব, সেখানে কিশোর পিতৃত্ব আরও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। উন্নত বিশ্বে কিশোর পিতৃত্ব যেমন একটা বিশেষ সমস্যা, সেটা তৃতীয় বিশ্বে কিশোরী মাতৃত্ব। উন্নত দেশে যেহেতু স্কুলগুলোতে সেক্স এডুকেশন রয়েছে, তাই ধরে নিতে পারি সেখানে যেটা হয় জেনেবুঝেই হয়, তবে তৃতীয় বিশ্বে সেটা হয় না জেনেবুঝে। মার্কিন ও ইউরোপীয় সরকার আবার একক মাতৃত্বের জন্য বিশেষ ভাতা দেন সন্তানের ভরণপোষণে সুবিধার জন্য। রাষ্ট্রের বন্ধুত্বের ওপর ভরসা করে অনেক নারীই সিঙ্গেল প্যারেন্ট হওয়ার সাহস দেখাচ্ছেন। অথচ এই এ শহরে একজন একা নারী বাসা ভাড়া নিতে গেলে সবাই ভুলে যান একা মানুষেরও একটা সংসার দরকার, ছাদ দরকার, সমাজ দরকার।

সন্তানের দায়িত্ব কার? যে শরীরে বহন করে তার; না যিনি বায়োলজিক্যাল ফাদার তার? নাকি দুজনেরই? এ প্রশ্নের মীমাংসা আজও আমরা করতে পারিনি। বাচ্চার দায়িত্ব নিয়ে ত্যাগ স্বীকার শুধু নারী করবে কেন? বাচ্চাটি তো সমাজেরও ভবিষ্যৎ নাগরিক। কল্যাণ রাষ্ট্রের কি দায়িত্ব নয় শিশু ও তার জনস্বার্থ সংরক্ষণ করা?

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা এবং গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।

/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ