নিভে গেছে দরদের প্রদীপ

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৭:৪৩, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৪৪, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২০

তুষার আবদুল্লাহদরদের প্রদীপ নাকি নিভে গেছে? রাজনীতি থেকে শুরু করে সেলুন—কোথাও দরদি নেই। চুল ছাঁটার সেলুনে প্রযুক্তি এসেছে। ঘামে ভিজে যেতে হয়। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে নাপিতের কাছে অনায়াসে মস্তক এলিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু সেই বটতলার বা গলির মুখের নাপিতের মতো কেশবিন্যাসে সৌন্দর্য আনতে পারছেন না আধুনিক নাপিতেরা। কারণ কেশবিন্যাসে তারা যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল। নিজের রুচি এখন আর কাঁচির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে না।
রিকশায় ব্যাটারি যোগ হয়েছে। চালককে শারীরিক শ্রম দিতে হচ্ছে না। কিন্তু শ্রমের মতো মনটাও ব্যাটারির ওপর যেন ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। রিকশা চলার যে ছন্দ ছিল, সেখানে চলে এসেছে বেপরোয়া গতি। এই বসন্তের দখিনা হাওয়া কিংবা বর্ষায় হুড ফেলে ঘুরতে গিয়েও রিকশার সেই রোমান্টিকতা ফিরে পাওয়া যায় না। কারণ রিকশা চালাতে চালক যে দরদ দিতেন, সেই দরদের প্রদীপ নিভে গেছে।
গণপরিবহনে তো আগেও চড়েছি। কিশোর, তরুণকালের স্মৃতির সঙ্গে মিশে আছে বিভিন্ন রুটের বাস টেম্পু। এখনও কত চালক, হেলপার, কন্ডাক্টরের মুখ জীবন্ত। গণপরিবহনে ওঠা-নামার সময় কত যত্ন নিতেন। পকেটে ভাড়া না থাকলেও আদর করে দিয়েছেন এমন অনেক কন্ডাকটরের কথা আজও ভুলে যেতে পারিনি। ডাকঘর ও ব্যাংকে যখন প্রযুক্তি ঢুকে পড়েনি, তখন দীর্ঘসারিতে দাঁড়িয়ে ঘামে ভিজেছি, বিরক্ত হয়েছি ঠিক, কিন্তু কতজন ছিলেন যারা নিজহাতে ফরম পূরণ করে দিতেন, হলুদ খামে ঠিকানা লিখে দিয়েছেন, কোনও কোনও দিন আদর করে বিস্কুট-চাও তো খাইয়েছেন।

এখন যন্ত্র এসেছে। ডাকঘর, ব্যাংকে ঢুকতে কত নিরাপত্তা, ক্যামেরা হাজত। সেবা দেওয়ার ভণিতায় বসে আছেন যারা, তারা পোশাক-আশাকে কত উজ্জ্বল। কিন্তু টাকা, চিঠি, খাম, কাগজ, কলম নেওয়া-দেওয়ার সময় তাদের আঙুল বা মনের যে স্পর্শ পাই, তা খরখরে। এক ফোঁটা জল নেই, যাতে মন ভেজে।

শিক্ষকদের চোখ রাঙানির কথা ভুলি কী করে? বেতের আঘাত, বেঞ্চির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা। কান ধরেই দাঁড়াতে হতো। এখন এই সময়ে শিক্ষার্থীদের শাস্তির বিষয়ে কত আইন, কত নির্দেশনা। আমরা এ ধরনের শাস্তি সইয়ে গেছি। ছোটবড় দুর্ঘটনাও যে হয়নি ওইসব শাস্তি থেকে, তা নয়। কিন্তু তারপরও কেমন এক মায়া, দরদ ঘিরে থাকতো আমাদের ওই শিক্ষকদের ঘিরে। আমাদের ওপরও মায়ার দীর্ঘ ছায়া ফেলে রাখতেন তারা। সেই ছায়া আজও সরেনি। বুঝতে পারি যখন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই শিক্ষকদের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। কিন্তু এখনকার শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে সম্পর্কটা শাসনের মধ্যেই রয়ে গেছে। ভালোবাসা, দরদ শুকিয়ে গেছে। বেসরকারি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের দেখলে মনে হয় তারা শিক্ষার্থীদের বেতনভুক্ত কর্মচারী। বড় মায়া হয় এমন শিক্ষকদের জন্য।

রোগী ও চিকিৎসকদের মধ্যে সম্পর্কটাও কাগজে নোটের হয়ে গেছে। চিকিৎসকদের সেবা, দরদ চলে গেছে প্যাথলজি ল্যাব এবং ওষুধ কোম্পানির দিকে। চিকিৎসকের হাত রোগীর শরীর স্পর্শ করা মাত্রই রোগের কষ্ট অনেকটাই কমে আসার কথা। বিশেষ করে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা পেরিয়ে মানসিক প্রশান্তি আসার কথা রোগীর। কিন্তু চিকিৎসকের হাতের স্পর্শ পাওয়া মাত্র রোগীর মধ্যে উদ্বেগ শুরু হয়—চিকিৎসক তার রোগটি চিহ্নিত করার জন্য কাজ শুরু করেছেন নাকি হিসাব কষছেন ল্যাব পরীক্ষা ও ওষুধের কমিশনের।

জনপ্রতিনিধিরা কবে কতটুকু জনদরদি ছিলেন, এ নিয়ে ময়নাতদন্ত হতে পারে। তবে একদা জনপ্রতিনিধিরা জনমানুষের দরজায় কড়া নাড়তেন। উঠানে তাদের হাতিসম পা রাখতেন, একথা সত্য। বিপদে-আপদেও দাঁড়াতেন আগামী দিনের ভোটের কথা ভেবে। ভোট কিনে নেওয়ার কালেও জনপ্রতিনিধিদের জনারণ্যে দেখা যেতো। এখন জনপ্রতিনিধি হতে আর মানুষের আনুকূল্যের প্রয়োজন পড়ে না। তাই মাঠে জনগণকে ঘিরে রাজনীতি নেই। রাজনীতিবিদ নেই। রাজনীতিবিদরা এসে বুকে জড়িয়ে ধরবেন, কাঁধে হাত রাখবেন, সেই অপেক্ষাটুকুও করেন না সাধারণ মানুষ ও ভোটারেরা। কারণ ভোট, রাজনীতি এখন ব্যবসায়ীদের করপোরেট বাণিজ্যের অংশ হয়ে গেছে। শিল্পগোষ্ঠীর শ্রমিকদের মতোই দরদ, ভালোবাসাহীন আনুষ্ঠানিক উন্নয়ন, সেবা পৌঁছে হয়তো জনগণের কাছে। কিন্তু সেই সেবা এখন আর জনগণকে আর্দ্র করে না।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

 

/এমএমজে/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ