প্রথম বই ও ভূতলেখক

Send
আহসান কবির
প্রকাশিত : ১৭:৩৯, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:০৮, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২০

আহসান কবিরবইয়ের দুনিয়াটা আলাদা। বই পড়ে কেউ কখনও পথভ্রষ্ট হয় না। বই নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত একটা প্রবাদ হচ্ছে—বই নিজ সন্তানের মতো। হাসান আজিজুল হকের প্রথম বই ‘সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য’ বের হলে হাসান আজিজুল হক বই হাতে নিয়ে যখন দেখছিলেন, তখন তার মনে হচ্ছিল তিনি তার সন্তানের মুখ দেখছেন!
বাবা-মা কখনও নিজ সন্তানকে বিক্রি করতে চান না। তবে বই নামের সন্তানটা যত বেশি বিক্রি হবে ততই মঙ্গল প্রকাশক আর লেখকের!
সেদিক দিয়ে জনপ্রিয় লেখক হ‌ুমায়ূন আহমেদের শুরুটা ভালো ছিল না।হ‌ুমায়ূন আহমেদের প্রথম বই বেরিয়েছিল ১৯৭২ সালে খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি থেকে। হ‌ুমায়ূনের লেখা পড়ে মুগ্ধ হয়ে আহমদ ছফা বই প্রকাশের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। প্রথম প্রচ্ছদ করেছিলেন শামীম সিকদার এবং মুহম্মদ জাফর ইকবাল মিলে। ছাপা শুরু হওয়ার আগেই অবশ্য খান ব্রাদার্সের মালিক খান সাহেব (মোসলেম খান) হ‌ুমায়ূন আহমেদকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন উপন্যাস ছোট হওয়ার কারণে। তখন সেটা ছিল তিন ফর্মা নয় পাতা অর্থাৎ ৫৭ পাতা। খান সাহেব হ‌ুমায়ূনকে বলেছিলেন এটা ৬৪ পাতা করে দেওয়ার জন্য এবং হ‌ুমায়ূন তা-ই করেছিলেন। বই মাত্র চল্লিশ পঞ্চাশ কপি বিক্রি হওয়ার কারণে খান সাহেব আবারও হ‌ুমায়ূনকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন ‘পুশ সেল’ করতে। সেটাতেও ব্যর্থ হলেন হ‌ুমায়ূন। এরপর তারা বইয়ের প্রচ্ছদ পাল্টানোর সিদ্ধান্ত নিলেন এবং কাইয়ুম চৌধুরী প্রচ্ছদ করতে রাজি হলেন।হ‌ুমায়ূন আহমেদ পরে এক লেখায় লিখেছিলেন—কাইয়ুম চৌধুরীর কাছে গিয়ে প্রচ্ছদের জন্য অপেক্ষা করে আছেন তারা (তিনি ও খান সাহেব)। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরেও বের হলেন না কাইয়ুম সাহেব। বের হলো তার দশাশই সাইজের কুকুর এবং কুকুর কামড়ে দিলো প্রকাশক খান সাহেবের পায়ে। খান সাহেবকে কুকুরের মুখে রেখে দৌড়ে পালিয়েছিলেন হ‌ুমায়ূন আহমেদ! যদিও কাইয়ুম চৌধুরী পরে প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছিলেন এবং এরপরে হ‌ুমায়ূন আহমেদের ইতিহাস সবার জানা।

প্রথম বই নিয়ে এমন স্মৃতি অনেকেরই আছে। আল মাহমুদের প্রথম বইয়ের নাম ছিল ‘লোক লোকান্তর’। বই বের করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন কবি রফিক আজাদ, সঙ্গে ছিলেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, শামসুর রাহমানসহ অনেকে। অনেকে মিলে প্রথম বইয়ের জন্য তহবিল সংগ্রহ করেছিলেন। লোক লোকান্তর বই নিয়ে যখন প্রকাশনা উৎসব হয় তখনও আল মাহমুদ পড়েছিলেন অর্থ সংকটে। কী আর করা? গিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের স্বত্বাধিকারী মধুদা’র কাছে। তিনি বাকিতে শিঙাড়া, সন্দেশ আর চা দিতে রাজি হয়েছিলেন! এমন মনে রাখার মতো প্রকাশনা উৎসবে বাকিতে এসব দিতে পারার জন্য মধুদা’দের দরকার হয়! স্যালুট রফিক আজাদসহ সব তহবিল সংগ্রহকারী আর স্যালুট মধুদা।

প্রথম বই ছাপা হওয়ার স্মৃতি কোনও লেখকই ভুলতে পারেন না। হয়তো এই অনুভূতি প্রথম সন্তানের মুখ দেখার মতো। বিখ্যাত লেখক সেলিনা হোসেনের প্রথম বইয়ের নাম ‘উৎস থেকে নিরন্তর’। প্রথম বই ছাপার খরচ সেলিনা হোসেনকে দিয়েছিলেন তার মা। পত্রিকায় চিঠি পাঠানোর টাকাও দিতেন এই মা। প্রথম বইয়ের জন্য মা, মধুদা কিংবা বন্ধুদের তহবিল গঠনের কোনও বিকল্প ছিল না একসময়ে। আল মাহমুদের মতো ভাগ্যবান ছিলেন কবি শামসুর রাহমান। তার প্রথম বই প্রকাশ করার টাকা দিয়েছিলেন তার এক বন্ধু। আবদুল মান্নান সৈয়দ তার প্রথম কবিতার বই ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’ বের করেছিলেন নিজের টাকায়।

সেদিক দিয়ে কবি নির্মলেন্দু গুণ অনেক ভাগ্যবান। বেশ আয়োজন করেই তার প্রথম কবিতার বই ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ বের হয়েছিল খান ব্রাদার্স থেকে। ১৯৭০ সালের জুলাইতে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে এক কবিতা পাঠের আসরে নির্মলেন্দু গুণ আবৃত্তি করেছিলেন তার বিখ্যাত ‘হুলিয়া’ কবিতাটি। কবিতাটি দারুণ আলোচিত হলে এটা নিয়ে বড় ধরনের মন্তব্য লিখেছিলেন আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী। হুলিয়া কবিতাটা পাঠ করে প্রকাশনী সংস্থা খান ব্রাদার্সের মালিক মোসলেম খান তার ছেলেদের ‘হুলিয়া’র কবিকে খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। মোসলেম খানের ছেলেরা নির্মলেন্দু গুণকে খুঁজে বের করার পর পরই বের হয়েছিল তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’। নির্মলেন্দু গুণের মতো জনপ্রিয় লেখক ইমদাদুল হক মিলনের প্রথম বই নিয়ে তেমন বেগ পেতে হয়নি। তার প্রথম বই ‘ভালোবাসার গল্প’ বেরিয়েছিল ১৯৭৭ সালে। মুহম্মদ জাফর ইকবাল ঢাকা কলেজে পড়ার সময় একটা কিশোর উপন্যাস লিখে পাঠিয়েছিলেন এক প্রকাশকের কাছে। সেই প্রকাশক কিছু দিন পর মুহম্মদ জাফর ইকবালকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন, কাগজের খরচ বাবদ তিনশত টাকা পাঠালেই বইটি প্রকাশিত হবে। তবে লেখা পড়ে মনে হয়েছে ভবিষ্যতে আপনি একজন খুব ভালো শিশুসাহিত্যিক হবেন! মুহম্মদ জাফর ইকবাল তিনশত টাকা পাঠাননি, আর বইটাও প্রথম হিসেবে প্রকাশিত হয়নি। তবে প্রকাশকের ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলেছে!

ছাপাখানা থেকে আনা প্রথম বইয়ের ঘ্রাণ আর সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানের শরীরের ঘ্রাণ নাকি ভোলার নয়। ভোলার নয় নতুন ধানের ঘ্রাণ কিংবা মায়ের হাতের মজাদার রান্নার ঘ্রাণ। প্রথম বই নিয়ে লেখকের পাগলামি তাই অন্যরকম। প্রথম বই প্রেস থেকে বাসায় নেওয়ার পথে বৃষ্টি নামলে নিজের গায়ের জামা দিয়ে সেটা পরম মমতায় ঢেকে রাখতে চান লেখক। প্রথম বই নিয়ে এমন আবেগ জানা যায় না একশ্রেণির লেখকদের কাছ থেকে। এই লেখকদের বলা হয় ‘ভূতলেখক’। ইংরেজিতে বলা হচ্ছে ‘ঘোস্ট রাইটার’। ঘোস্ট রাইটাররা হচ্ছেন এক ধরনের ‘রাইটার অন পেমেন্ট’। বিশেষ করে নামিদামি রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী, তারকা খেলোয়াড়, গায়ক, অভিনেত্রী বা অভিনেতাদের জীবন ও কর্মভিত্তিক বই লিখে এ ধরনের লেখকরা পারিশ্রমিক নিয়ে থাকেন। ভূতলেখকদের বই সাধারণত তাদের নামে প্রকাশিত হয় না। একদার পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের ‘ফ্রেন্ডস নট মাস্টার’ হোক আর বারাক ওবামার ‘চেঞ্জ উই ক্যান বিলিভ ইন’, ‘ওডাসিটি’ (২০০৮, ২০১৭) হোক কিংবা হিলারি ক্লিনটনের ‘স্ট্রংগার টুগেদার’ (২০১৬) হোক, এসব বই কিন্তু লিখে দিয়েছিলেন ভূতলেখকরাই। হিলারির বই নিয়ে একবার দারুণ সমালোচনা হয়েছিল। সাংবাদিকরা ফাঁস করে দিয়েছিলেন যে বই বাবদ হিলারি ক্লিনটন পাবেন সতের মিলিয়ন ডলার আর ঘোস্ট রাইটার পাবেন তের মিলিয়ন ডলার!

ভূতলেখকদের কল্যাণে এ দেশে একদা চিত্রনায়িকাদের নামে বই ছাপানোর প্রচলন ছিল। তো একবার এক নায়িকার নামে সিনে পত্রিকায় উপন্যাস ছাপা হলো, যার নাম ‘মিলির চোখে জল’। বইমেলায় যখন সেটা বই হিসেবে প্রকাশিত হলো, তখন বইয়ের মলাট উল্টানোর পর দেখা গেলো সেখানে বইয়ের নাম ছাপা হয়েছে মিলির চোখে পানি! এভাবে জল পানি হয়ে যাওয়ায় সেবার দারুণ সমালোচনা হয়েছিল। বাংলাদেশের জনপ্রিয় থ্রিলার সিরিজ মাসুদ রানা ছাপা হয় কাজী আনোয়ার হোসেনের নামে। শুধু তিনি নন, আরও কয়েকজন লিখে থাকেন ‘মাসুদ রানা’ ভূতলেখক হিসেবে। কোনও এক ভূতলেখক আইয়ুব খানের বই লিখে দিলেও এই বইয়ের বাংলা অনুবাদ করেছিলেন এই দেশের একজন প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী (?)। কথিত আছে, স্বৈরশাসক এরশাদের কবিতা ও গান লিখে দিতেন যে ভূতলেখকরা, ক্ষমতা হারানোর পর তারা আর এরশাদমুখো হননি! ফলাফল ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়ার পর জেলের মতো ‘লেখাউর্বর’ জায়গায় গেলেও এরশাদের কলম থেকে আর কোনও কবিতা বা গান বের হয়নি। প্রথম বইয়ের অনুভূতি থেকে বঞ্চিত হন ভূতলেখকরা, যারা ভূতলেখকদের ভাড়া করেন তাদের অনূভূতি কখনও আসল লেখকদের মতো হয় না। একজন ভূতলেখকের অক্ষমতা এই যে তারা কেউ রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ কিংবা হ‌ুমায়ূন আহমেদের বই লিখে দিতে সক্ষম নন। গত কয়েক বছরে কয়েকজন শিল্পপতির দেখা মিলেছে যাদের বই বের হয় বইমেলায়, কিন্তু এসব লিখে দেন ভাড়াটে ভূতলেখকরা। জমি দখল, নদী দখল, সিন্ডিকেটবাজি, খুনোখুনি, ভূমি ডাকাতির চেয়ে ভূতলেখক হওয়াও অনেক গর্বের!

লেখক: রম্যলেখক

 

/এসএএস/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ