খালেদা জিয়ার জামিন নিয়ে আমার আইনি ব্যাখ্যা

Send
রুমিন ফারহানা
প্রকাশিত : ১৮:৫২, ফেব্রুয়ারি ২৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৫৪, ফেব্রুয়ারি ২৯, ২০২০



রুমিন ফারহানা২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে আছেন সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। তারপর থেকেই আদালত চত্বর হতে সভা-সমাবেশ, গোলটেবিল, টকশো সর্বত্রই তার জামিনের আলোচনা। একজন অসুস্থ সিনিয়র সিটিজেন হওয়া সত্ত্বেও প্রতিবার প্রতি আদালত থেকেই তার জামিন আবেদন নাকচ করা হয়েছে। আইনের প্রথম পাঠ নেওয়া একজন নবীন ছাত্র থেকে শুরু করে সচেতন নাগরিক পর্যন্ত সকলেরই ধারণা আছে জামিন লাভের ক্ষেত্রে অভিযুক্তের বয়স, তিনি যদি নারী হন, সমাজে এমন একটি অবস্থানে তিনি থাকেন যেখানে তার পালিয়ে যাওয়া কিংবা সাক্ষীকে প্রভাবিত করা বা আলামত নষ্ট করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়, তাহলে এসকল বিবেচনায় আদালত অভিযুক্তকে তাৎক্ষণিক জামিন দিয়ে থাকেন। খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে এর সবকটি সমভাবে প্রযোজ্য।

আর যে যুক্তিতে একজন খুনের আসামিকেও জামিন দেওয়া হয়, তা হলো তার স্বাস্থ্যের অবস্থা। জীবন ও স্বাস্থ্যের অধিকার শুধু আমাদের সংবিধানই নয় (অনুচ্ছেদ ৩২), এটা সার্বজনীন মানবাধিকারেরও (আর্টিক্যাল ৩, ৫) অংশ। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য নিয়ে গত দুই বছরে সর্বত্র এত আলোচনা হয়েছে যে সেটি আর আলাদাভাবে উল্লেখ করার কোনও যৌক্তিকতা আছে বলে আমি মনে করি না। তার স্বাস্থ্যের অবস্থা বোঝাতে শুধু এটুকু বলাই যথেষ্ট হবে, যে মানুষটি আদালত থেকে হেঁটে গাড়িতে উঠেছিলেন, তিনি দুই বছরের মাথায় এখন কারও সাহায্য ছাড়া দাঁড়াতে পর্যন্ত পারেন না। তাকে খাইয়ে দিতে হয়, পোশাক পরিবর্তনে পর্যন্ত অপরের সাহায্য লাগে। সাধারণভাবে এর একটাই অর্থ দাঁড়ায়—এই দীর্ঘ সময়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে পরিবর্তন হয়েছে এটুকুই, তার স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে। আর ঠিক এই কারণেই ‘প্রপার ট্রিটমেন্ট’-এর যুক্তিতে বারবার নাকচ করা সত্ত্বেও আদালতের দারস্থ হয়েছে বিএনপি তার জামিনের আবেদন নিয়ে।
একজন কারাবন্দি হিসেবে চিকিৎসা সংক্রান্ত ন্যূনতম অধিকার খালেদা জিয়া পাননি বলেই তার অবস্থা এতটা খারাপের দিকে গেছে। একজন কারাবন্দির সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হবে, সেটা নিয়ে জাতিসংঘের বন্দিদের সঙ্গে আচরণের স্ট্যান্ডার্ড মিনিমাম রুলস (যা নেলসন ম্যান্ডেলা রুলস নামে পরিচিত) খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়নি। এর রুল ২৪ অনুযায়ী, ‘বন্দিদের স্বাস্থ্যসেবা রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং কমিউনিটিতে যে ধরনের স্বাস্থ্যসেবা আছে, সে মানের চিকিৎসা তার পাওয়া উচিত কোনও বৈষম্য ছাড়াই।’ তাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিএসএমএমইউতে নিয়ে আসার আগে দীর্ঘদিন তিনি ইউনাইটেড হাসপাতালে তার পুরনো পরিচিত চিকিৎসকদের কাছে চিকিৎসা নিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সরকার সেটা দেয়নি। ম্যান্ডেলা রুলস অনুযায়ী বাংলাদেশে খালেদা জিয়ার ‘কমিউনিটি’তে যে স্বাস্থ্য সুবিধা আছে, সেই একই সুবিধা তাকে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে। তিনি যে কমিউনিটির সদস্য, সেখানে অনেক সাধারণ অসুস্থতার চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর, লন্ডন কিংবা আমেরিকাকে বেছে নেওয়া হয়। সেই বিবেচনায় খালেদা জিয়ার পছন্দের ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে সরকার বাধ্য ছিল; এমনকি সরকারের হেফাজতে থাকলেও চিকিৎসার ব্যয়ভার তার দল নিতে প্রস্তুত ছিল। শুধু তাই নয়, তার পরিবারের সদস্যরা বলেছেন, খালেদা জিয়ার অনুরোধ সত্ত্বেও তার মেডিকেল রেকর্ডস দিতে রাজি হয়নি সরকার। এটাও ম্যান্ডেলা রুলসের পরিপন্থী (২৭ ধারা)। এই ধারা বলছে, ‘সব বন্দির স্বাস্থ্যসেবা এবং গোপনীয় মেডিকেল ফাইল যথাযথভাবে করা হবে এবং সব বন্দির সেগুলো পাওয়ার অধিকার থাকবে। একজন বন্দি তার মেডিক্যাল ফাইল পেতে তৃতীয় কাউকে নিয়োগ দিতে পারবেন।’
এখানে উল্লেখ্য, গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য এবং মামলায় তার প্রাপ্য অধিকার না পাওয়া নিয়ে এক রিপোর্ট প্রকাশ করে। সেখানে তারা খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে ম্যান্ডেলা রুলস অনুসরণ না করা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং দ্রুত তার অধিকার নিশ্চিতের আহ্বান জানায়। বলে রাখা ভালো, বাংলাদেশ জাতিসংঘের বন্দিদের সঙ্গে আচরণের স্ট্যান্ডার্ড মিনিমাম রুলসের অনুস্বাক্ষরকারী দেশ।
কারাবন্দি অবস্থায় বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে দেশের বিদ্যমান আইন কোনোভাবেই বাধা তৈরি করে না। কারাবিধির ৩৯ ধারা অনুযায়ী কারা হাসপাতালে কারও চিকিৎসা সম্ভব না হলে অন্য যে কোনও হাসপাতালে তাকে চিকিৎসার জন্য পাঠানোর অপশন আছে। এটা সরকারি হাসপাতাল হতে হবে, এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। কারাবন্দি অবস্থায় বেসরকারি হসাপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার অনেক নজির আছে। এক এগারোর সময়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে স্কয়ার হাসপাতালে, আবদুল জলিল ও মোহাম্মদ নাসিমকে ল্যাব এইড হাসপাতালে, শেখ ফজলুল করিম সেলিমকে বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী।
সরকারপক্ষীয় অনেক বুদ্ধিজীবী, দালাল, আইনজীবী দণ্ডপ্রাপ্ত এবং এখনও দণ্ড না পাওয়া ব্যক্তিদের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুবিধার মধ্যে পার্থক্য করার চেষ্টা করছেন। কারাবিধিতে এমন কোনও পার্থক্য করা হয়নি; কারাবন্দি যেকোনও মানুষই চিকিৎসার ক্ষেত্রে একইরকম সুবিধা ভোগ করবেন, কারাবন্দি দণ্ডপ্রাপ্ত কিংবা এখনও দণ্ড না পাওয়া, যা-ই হোক না কেন। তার চিকিৎসা নিয়ে সরকারের তরফে নানারকম টালবাহানার হিসাব চুকাতে গিয়ে তিনবারের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী আজ মৃত্যুর মুখোমুখি।
সর্বশেষ তার যে জামিন আবেদন করা হয়েছে, তাতে মূলত তিনটি প্রশ্ন আদালত থেকে উঠে এসেছে। ১) খালেদা জিয়া অ্যাডভান্সড ট্রিটমেন্টে সম্মত আছেন কিনা, ২) সম্মতি থাকলে সেই চিকিৎসা শুরু হয়েছে কিনা, ৩) চিকিৎসা শুরু হলে এখন কী অবস্থা? এই বিষয়ে জানতে চাইলে খালেদা জিয়ার অন্যতম আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, মেডিক্যাল বোর্ডের চিকিৎসকরাও স্বীকার করেছেন খালেদা জিয়ার যে অসুখ, সেটা খুব জটিল। এটা বাংলাদেশেও নতুন। এজন্যই তার অ্যাডভান্সড ট্রিটমেন্টের কথা আসছে। তিনি আরও যুক্ত করেন এই চিকিৎসার কিছু সাইড ইফেক্টও আছে, তাই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই সাইড ইফেক্টের ভার সামলাতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে খালেদা জিয়া সন্দিহান। আর এজন্যই তিনি সম্মতি দিচ্ছেন না। সহজ কথায় খালেদা জিয়ার বিএসএমএমইউ’তে অ্যাডভান্সড ট্রিটমেন্ট নেওয়ার ব্যাপারে সম্মতি নেই।
এখন ওনার শারীরিক যে অবস্থা, তাতে বাংলাদেশে এর কতটুকু সুচিকিৎসা সম্ভব, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। তার চেয়েও বড় বিষয় হলো, আন্তর্জাতিকভাবে এটি স্বীকৃত যে ডাক্তার-রোগী একটি বিশেষ আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক। একজন রোগী কার কাছে চিকিৎসা নেবেন কিংবা আদৌ চিকিৎসা নেবেন কিনা, সেটা একেবারেই তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কেবল অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তি, শিশু কিংবা অজ্ঞান ব্যক্তি এর আওতায় আসে না। সুতরাং যদি ধরেও নেই বিএসএমএমইউ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ হাসপাতাল, তারপরেও খালেদা জিয়ার পূর্ণ অধিকার আছে রোগী হিসেবে সেই হাসপাতালে চিকিৎসা না নেওয়ার। এই ব্যাপারে তিনি কোনও কৈফিয়ত দিতেও বাধ্য নন। সুতরাং তাকে জোর করে সরকার এবং আদালত মিলে অ্যাডভান্সড ট্রিটমেন্ট বা অন্য কিছুর নামে বিএসএমএমইউ’তে চিকিৎসা নিতে বাধ্য করতে পারে না।
আজকে খালেদা জিয়ার শারীরিক যে অবস্থা, তার জন্য দায়ী সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসাজনিত অবহেলা এবং একজন বন্দির জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত চিকিৎসার মানদণ্ড অনুসরণ না করা। খালেদা জিয়ার বর্তমান ভয়ঙ্কর শারীরিক অবস্থায় অ্যাডভান্সড ট্রিটমেন্ট খুবই জরুরি। কিন্তু সেই ট্রিটমেন্ট নেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে তিনি কোন চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করবেন, সেই চিকিৎসা নিলে কার অধীনে, কোন হাসপাতালে নেবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার একচ্ছত্র অধিকার তার। সরকারের কারণে স্বাস্থ্যগত যে মূল্য খালেদা জিয়াকে দিতে হয়েছে, সেটার ক্ষতিপূরণ হওয়ার নয়, কিন্তু আর এক মুহূর্তেও দেরি না করে জামিন দিয়ে তাকে তার যথাযথ চিকিৎসার অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব আদালতের।
সরকারের কিছু ‘পোষা বুদ্ধিজীবী’ খালেদা জিয়ার জামিনের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতে দণ্ডিত হওয়ার প্রসঙ্গটি আনেন। উচ্চ আদালতে দণ্ড পাওয়া কারও জামিন না পাওয়ার কোনও যুক্তি হতে পারে না। আদালত তার জামিনের মামলা শুনছেন, এর মানে তিনি জামিন পেতে পারেন। ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা দুদকের মামলায় হাইকোর্টে দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার পরও আপিল বিভাগ থেকে জামিন পেয়েছেন। তাকে জামিন দেওয়া বেঞ্চটি ছিল বর্তমান প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন। সুতরাং যে কথাটি বিএনপির তরফ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, কেবল খালেদা জিয়া হওয়ার কারণেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েই ন্যায়বিচার বঞ্চিত হচ্ছেন, এমনকি অন্যদের ক্ষেত্রে আইনের যে গতিপথ পরিলক্ষিত হয়, সেটাও তার ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না।
আমাদের স্মরণ রাখা উচিত, বাংলাদেশ International Covenant on Economic, Social and Cultural Rights (অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি)-কে র‍্যাটিফাই করেছে। তাই এর আর্টিক্যাল ১২(১) এ উল্লিখিত ‘The States Parties to the present Covenant recognize the right of everyone to the enjoyment of the highest attainable standard of physical and mental health’ অনুযায়ী খালেদা জিয়ার জন্য সর্বোচ্চ মানের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার আছে।
শুরু থেকেই এই আপসহীন নেত্রী ন্যায়বিচার বঞ্চিত হয়েছেন, হয়েছেন সুচিকিৎসা বঞ্চিত। সরকার তার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে তাকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে, কিন্তু আদালতের দায়িত্ব হলো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। চিকিৎসাসেবার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কী, ম্যান্ডেলা রুলস অনুযায়ী তিনি কী ধরনের সেবা পাওয়ার অধিকারী, কিংবা ডাক্তার রোগী সম্পর্ক যে আস্থা এবং বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যার কারণে চিকিৎসা ধরন, চিকিৎসা কেন্দ্র এবং চিকিৎসক বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে রোগীর ইচ্ছাই শেষ কথা, সেটা আদালত জানেন না, সেটা ভাবার কোনও কারণ নেই। সরকারের সঙ্গে যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের শিকার হয়ে খালেদা জিয়া আজ মৃত্যুর মুখোমুখি, তার আঁচ আদালতের গায়ে থাকবে নাকি আদালত নিজের স্বাধীন সত্তার জানান দেবেন, সেই সিদ্ধান্ত আজ আদালতকেই নিতে হবে।
লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ