আয়মান সাদিক, পাঠাও এবং বাঙালির তারুণ্য ভাবনা

Send
মো. সামসুল ইসলাম
প্রকাশিত : ১৫:২২, মার্চ ০৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৩, মার্চ ০৪, ২০২০

মো. সামসুল ইসলামএবারের বইমেলায় বেস্ট সেলার বইয়ের বেশিরভাগই তরুণ লেখকদের লেখা। আমাদের তরুণ পাঠকদের রুচির বেশ পরিবর্তন দেখছি। তারা সাহিত্য ছেড়ে মোটিভেশনাল বা আত্মউন্নয়নমূলক বা ক্যারিয়ার সংক্রান্ত বইয়ের ব্যাপারে ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়েছে। পাঠকদের এই চাহিদাকে ফেসবুকে অনেকেই বাঁকা চোখে দেখছেন। গেলো গেলো রব উঠিয়েছেন অনেকে।
তরুণদের ব্যাপারে আমি সব সময়ই আস্থাবান। আমি সবসময় তাদের লেখা পড়ি বা তাদের বক্তব্য শোনার চেষ্টা করি। কারণ তারাই তো সমাজে নতুন ধারণার প্রবর্তক। বইমেলার ক্ষেত্রে আমার যেটা খারাপ লেগেছে, তা হলো লেখকদের-তরুণ বা বয়স্ক নির্বিশেষে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মূলধারার গণমাধ্যম ব্যবহার করে আগ্রাসী মার্কেটিং পলিসি। এর ফলে সাধারণ পাঠকরা বইয়ের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তাদের পক্ষে মানসম্মত ও মানহীন বইয়ের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা দিনে দিনে কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেটা নেহাতই ভিন্ন প্রসঙ্গ।    
আমি কিন্তু এ লেখাটি লিখছি তরুণদের প্রতি জাতি হিসেবে আমাদের মনোবৃত্তি নিয়ে। কিছুদিন আগে দেশের একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় তাদের সমাবর্তন বক্তা হিসেবে দেশের দুই বিখ্যাত তরুণকে নিয়ে এসেছিল। তাদের একজন হচ্ছে টেন মিনিট স্কুলের ফাউন্ডার-সিইও আয়মান সাদিক, আরেকজন রাইড শেয়ারিং সার্ভিস পাঠাও লিমিটেডের সিইও হুসাইন এম ইলিয়াস। অবাক করা ব্যাপার হলো, সমাবর্তন বক্তা হিসেবেও তাদের আমন্ত্রণ জানানো নিয়ে ফেসবুকে অনেকেই সমালোচনা করেছেন। আমাদের শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

সবাই জানেন টেন মিনিট স্কুল বা পাঠাও দেশের অত্যন্ত সফল দুইটি কার্যক্রম। তরুণদের এ উদ্যোগ দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। দুই প্রতিষ্ঠানেরই সিইও প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সাময়িকী ফোর্বস অনূর্ধ্ব ৩০ বছর বয়সী ৩০ জন উদ্যোক্তার তালিকায় উঠে এসেছেন। সবচেয়ে বড় কথা তারা দেশের লাখ লাখ তরুণের আদর্শে পরিণত হয়েছেন।  তরুণদের মধ্যে তাদের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী।

টেন মিনিট স্কুলের আয়মান সাদিক তো একইসঙ্গে এবারের বইমেলার একজন বেস্ট সেলার লেখক। এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় টেন মিনিট স্কুলের কল্যাণে ছাত্রসংখ্যার দিক থেকে সে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিক্ষক। লাখ লাখ কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী তার শিক্ষার্থী। পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যক্রমবহির্ভূত তরুণদের স্কিল ডেভেলপমেন্টের বিভিন্ন ভিডিও দেখে  তারা হচ্ছে উদ্দীপ্ত।

আবার রাইড শেয়ারিং সেই সঙ্গে পার্সেল, ফুড ডেলিভারি সার্ভিস পাঠাও দেশের সফল একটি উদ্যোগ, যার ব্যবসা নেপালে পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে। গত বছরের হিসাব অনুযায়ী যার বাজারমূল্য ছিল ১০ কোটি ডলারের ওপর। আমার অবাক লাগছে, এত সফল দুজন মানুষকে সমাবর্তন বক্তা করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টি সমালোচিত হয়েছে। এই দুই ব্যক্তির একটিই দোষ—তাদের বয়স কম, তারা তরুণ।

ব্যক্তিগতভাবে আয়মান সাদিক বা হুসাইন এম ইলিয়াসের সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। আয়মান সাদিকের গোটা দুয়েক অনুষ্ঠানে আমার যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার মেয়েদের সুবাদে। এক মেয়ে স্কুলের বুক রিভিউ পুরস্কার পাওয়ার কারণে আমি তাদের নিয়ে গিয়েছিলাম। আমি পেছনে বসে  তরুণ শিক্ষার্থীদের প্রতি আয়মানের বক্তব্য ভালোভাবে শুনেছি। বাসায় আমার মেয়েদের সঙ্গে তার বিভিন্ন ভিডিও দেখেছি। তরুণদের জন্য তার লেখা বই পুরোটা না পড়লেও কিছুটা তো দেখেছি।

আমি নিজে কমিউনিকেশনের একজন শিক্ষক ও ছাত্র হিসেবে বলতে পারি যে তার বিভিন্ন বক্তব্য থেকে আমরাও অনেক কিছু শিখতে পারি। প্রথম কথা, আয়মান সাদিক পড়ালেখাকে চাকরির সঙ্গে সম্পর্কিত করেছে। শিক্ষার্থীরা কীভাবে ছাত্রাবস্থা থেকে কম্পিউটারের বিভিন্ন প্রোগ্রাম বা ইত্যাদি শিখে কীভাবে অর্থ উপার্জন করতে পারে, সেটা শেখানোর মাধ্যমে সে লাখ লাখ ছেলেমেয়েকে উদ্দীপ্ত করছে। কীভাবে উদ্যোক্তা হওয়া যায়, তা শেখাচ্ছে। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, যেটা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শেখানো হয় না।

সমাবর্তন অনুষ্ঠানে আয়মান সাদিক যখন জানিয়েছে তার এমনকি মাস্টার্স ডিগ্রিও নাই, তার উত্তরে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বলছিলেন, আয়মান মাস্টার্স না করলেও তার কাজ নিয়ে হয়ত অনেক পিএইচডি হবে। আমিও তা বিশ্বাস করি। আমি আমার নিজের বাসায় তার প্রমাণ পাই। পাঠ্যক্রমের কিছু না বুঝলে আমার মেয়েরা টেন মিনিট স্কুলের ভিডিও দেখে বা প্রোগ্রামিংয়ের বিভিন্ন টিপস শিখে বাসায় প্র্যাকটিস করে বা রকমারি থেকে তার বই এনে কমিউনিকেশন স্কিলস শেখে।

আর আমরা বয়স্করা তাদের নিয়ে মশকরা করছি! আমি বলব এতো আমাদের চিরাচরিত বাঙালি মানসিকতা।

তরুণদের প্রতি এ ধারণা আমাদের দেশের বয়স্কদের মজ্জাগত। আজ তরুণদের মতামত সবক্ষেত্রে উপেক্ষিত। পত্রিকান্তরে দেখলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা লাইব্রেরির বই বাদ দিয়ে সারাদিন বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এটা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক ট্রল করা হচ্ছে। কিন্তু কেন তারা এরকমটি করছে, তা নিয়ে কোনও আলোচনা নেই, তাদের কোনও বক্তব্য নেই।

দেশে এমনিতে পর্যাপ্ত চাকরি নেই। আবার প্রাইভেট সেক্টরে চাকরির কোনও নিশ্চয়তা নেই। সোশ্যাল সিকিউরিটির ব্যবস্থা নেই। আমলাদের ব্যাপক সুযোগ-সুবিধা দেখে তরুণরা সরকারি চাকরির প্রতিযোগিতাকে লটারির টিকিটের মতো মনে করছেন। একজন তরুণ ইউএনও যদি ৯৪ লাখ টাকা দামের গাড়ি পান, তখন তো সবাই সে পথেই হাঁটবে। মানুষ পড়াশোনা করে মূলত চাকরিপ্রাপ্তির জন্য, এটাতো সবাইকে বুঝতে হবে।                  

আমি নিজের লেখালেখির স্বার্থেই সবসময় তরুণদের কথা শুনি। ফেসবুকে তাদের লেখা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ি। তাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলি। পুরনো ছাত্রদের সঙ্গে দেখা করি। লেখালেখির ক্ষেত্রে তাদের মতামত নেই। আমি আসলে তরুণদের জন্যই লিখি। কিন্তু খুবই খারাপ লাগে যখন দেখি তাদের ব্যাপারে সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বয়স্করা।

যথেষ্ট সম্মান রেখেই বলছি, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বা কমিশনে অবসরপ্রাপ্ত আমলা, শিক্ষক বসে আছেন, যাদের অনেকেই সত্তরোর্ধ্ব। বয়স্কদের অভিজ্ঞতার মূল্য আমি অস্বীকার করছি না। কিন্তু তরুণদের তো সম্পৃক্ত করতে হবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শিক্ষাক্ষেত্রে, প্রাযুক্তিক উন্নয়নে সম্প্রতি ব্যাপক পরিবর্তন হচ্ছে। তত্ত্বীয়ভাবে, প্রায়োগিকভাবে। বয়স্কদের পক্ষে এতকিছু জানা সম্ভব নয়। তাই তাদের সিদ্ধান্তের বলি হতে হয় দেশের অগণিত তরুণকে।

তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা লড়াই করে, আত্মত্যাগের মাধ্যমে এদেশের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। সম্প্রতি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ক্রিকেটে আমাদের ছেলেরা চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশবাসীকে করেছে গর্বিত।  তরুণরাই আমাদের সম্পদ। তাদের কথা শুনুন। তাদের ব্যাপারে মনোভাব পাল্টান। শুধু তরুণ বলে তাদের কৃতিত্বকে খাটো করবেন না।

লেখক: কলামিস্ট

ইমেইল: [email protected]

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ