করোনা, সন্দেহ করো না

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ২০:১৫, মার্চ ০৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৪৫, মার্চ ০৯, ২০২০

আমীন আল রশীদদেশে ব্যাপক আকারে করোনা আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া গেলেও ১৭ মার্চ মুজিববর্ষের অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার আগে সরকার এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনও ঘোষণা দেবে না—এমন কথা শোনা যাচ্ছিলো বেশ কয়েকদিন ধরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকও নিজের ফেসবুক ওয়ালে এ কথা লিখেছেন। সাধারণ মানুষের অনেকেই এ ধরনের কথায় বিশ্বাস করেছেন এবং এখনও অনেকের মনে প্রশ্ন—সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) করোনায় আক্রান্ত রোগীর যে সংখ্যা বলছে, সেটি সঠিক কিনা বা তারা কতটা গোপন করছে?
প্রশ্ন হলো, মানুষের মনে কেন এ ধরনের সন্দেহ বা অবিশ্বাস তৈরি হয়? তার চেয়ে বড় কথা, সরকারপ্রধান হিসেবে শেখ হাসিনাকে এতটা অমানবিক ভাবার কী কারণ আছে যে, তিনি জাতির জনকের অনুষ্ঠান করার জন্য করোনার মতো একটি রোগের কথা গোপন করবেন বা সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোকে চেপে যাওয়ার নির্দেশ দেবেন? যে ভাইরাসটি নিয়ে সারা বিশ্ব উদ্বিগ্ন এবং যার প্রভাবে সারা বিশ্বের অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটে পড়তে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, সে রকম পরিস্থিতিতে শুধু একটি অনুষ্ঠান করার জন্য সরকার তথ্য গোপন করবে—শেখ হাসিনা নিশ্চয়ই এতটা অবিবেচক নন। এরইমধ্যে দেশে করোনায় আক্রান্ত রোগীর কথা আইইডিসিআর স্বীকার করেছে এবং মুজিববর্ষের অনুষ্ঠান পুনর্বিন্যাস তথা সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় কথা, এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে কোনও তথ্যই কি গোপন রাখা যায়? যে চীনকে বলা হয় চরম রক্ষণশীল এবং যেখানে সোশ্যাল মিডিয়া যথেষ্ট নিয়ন্ত্রিত—সেই দেশও কি করোনার কথা গোপন রেখেছে? এর আগে সেখানে যখন সার্স ভাইরাস আক্রমণ করলো, তার অনেক তথ্য চীন গোপন করেছিল বলে অভিযোগ উঠলেও এবার করোনা ভাইরাস নিয়ে তারা সেরকম গোপনীয়তার পথে হাঁটেনি। কারণ, তারা জানে এখন স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের দুনিয়ায় কোনও কিছুই গোপন থাকার নয়। বরং কেউ কোনও কিছু গোপন করলে বা করতে চাইলে সেটি প্রকাশের জন্য মানুষের মধ্যে অধিকতর স্পৃহা তৈরি হয়। সুতরাং বাংলাদেশেও যদি করোনায় আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া যায় তাহলে সরকার চাইলেও সেটি খুব বেশি দিন গোপন রাখতে পারতো না। কারণ, এটা কোনও না কোনোভাবে প্রকাশ পেয়ে যেতো এবং তখন সরকারের, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তিই বরং প্রশ্নের মুখে পড়তো। শেখ হাসিনার মতো একজন দূরদর্শী রাজনীতিবিদ সেই ঝুঁকি কেন নেবেন?

প্রশ্ন হলো, মানুষ কেন এ ধরনের কথায় কান দেয় বা বিশ্বাস করে? এর একটি বড় কারণ অবিশ্বাস। নানা কারণেই এই অবিশ্বাসের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মানুষ যখন দেখে যে সোশ্যাল মিডিয়ায় সরকারের বিরুদ্ধে কোনও কথা বললে তার জন্য তাকে মূল্য দিতে হয় বা গ্রেফতার হতে হয়, তখন অন্যান্য লোকদের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হয়, সরকার যা বলে তা সঠিক নয়। একটি ঘটনা তখন অন্য সব ঘটনার সঙ্গে মানুষ মিলিয়ে ফেলে বা ‘জেনারেলাইজ’ করে।

কোনও ইস্যুতে মানুষ যদি মনে করে সরকার বা তার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিছু গোপন করছে, সেটি একজন মানুষের কাছ থেকে বহু মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে যায় এবং মানুষের মনে একটা গড়পরতা ধারণা তৈরি হয়ে যায় যে বিষয়টি বোধহয় তাহলে এরকমই। তার মানে ১৭ মার্চের আগে করোনা ভাইরাস সম্পর্কে সরকার সঠিক তথ্য দেবে না বা বিষয়টি গোপন রাখবে বলে মানুষের মনে যে ধারণা তৈরি হয়েছে বা কেউ একজন এ রকম একটি ধারণা দিয়েছেন বলে যে অনেকেই সেটি বিশ্বাস করেছেন এবং সোশ্যাল মিডিয়া ও চায়ের দোকানে বিষয়টি আলোচনার খোরাকে পরিণত হয়েছে, তার পেছনে অতীতের নানা অভিজ্ঞতা কাজ করেছে। যদিও অনেক সময়ই মানুষের এসব ধারণার সঙ্গে বাস্তবতার পার্থক্য থাকে ঢের।

এই সন্দেহ ও অবিশ্বাসের সঙ্গে আরেকটি বিষয় এখন যুক্ত হয়ে যায়, তা হলো গুজব ও হুজুগ। গুজব তৈরি হলেই সেখানে আতঙ্ক তৈরি হয় এবং এই আতঙ্কের ফলে তৈরি হয় কোনও একটি নির্দিষ্ট পণ্য কেনার হিড়িক। কারণ, মানুষ মনে করে সে আগেভাগে ওই পণ্যটি না কিনলে পরে গিয়ে বাজারে সেটি আর পাবে না। এই ভয়ে সে তার প্রয়োজনের তুলনায় দশ বিশগুণ বেশি পণ্য কিনে মজুত করতে চায়। ৪ সদস্যের একটি পরিবারে মাসে যেখানে এক প্যাকেট লবণ যথেষ্ট, সেখানে সম্প্রতি লবণ সংকটের হুজুগ তৈরির ফলে অনেকে বাজারে গিয়ে ১০ প্যাকেট লবণ কিনেছেন বলেও গণমাধ্যমে খবর এসেছে। লবণের ইস্যুটি সরকার বেশ শক্ত হাতেই মোকাবিলা করেছে বলে সে যাত্রা লবণকাণ্ড থেকে দেশবাসী রক্ষা পায়। ওই কাণ্ডটি শুরু হয়েছিল মূলত তার অব্যবহতি পূর্বে পেঁয়াজকাণ্ডের বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে। পেঁয়াজের দাম ইতিহাসের সব রেকর্ড ভঙ্গ করায় একটি মহল লবণেও সেরকম সংকট হতে যাচ্ছে বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব তৈরি করে দিয়ে তাদের স্টকে থাকা বিপুল পরিমাণ লবণ বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করে রাতারাতি মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার যে দুরভিসন্ধি করেছিল, সেটি সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় দ্রুতই রোধ করা সম্ভব হয়।

মোটামুটি একই সময়ে মশানিরোধক স্প্রে এবং অডোমাস নামে একটি ভারতীয় ক্রিমও বাজার থেকে উধাও হয়ে যায়। দেড়শ’ টাকার ক্রিম অনেক দোকানে এক হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। যার একটি লাগবে, তিনি দশটি কিনে স্টক করেছেন। হয়তো অনেকের বাড়িতে এখনও ওই ক্রিমের মজুত আছে। শুধু তা-ই নয়, মশার স্প্রে ও কয়েলের দামও আকাশচুম্বী হয়ে যায় এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি মহল।

এটি অর্থনীতির খুব সাধারণ সূত্র যে, চাহিদা বাড়লে পণ্যের দাম বাড়বে। কিন্তু আমাদের দেশে চাহিদাটা অনেক সময় ব্যবসায়ীরা নানারকম গুজব ও হুজুগ তৈরির মাধ্যমে সৃষ্টি করে। এবার যখন চীনে করোনা ছড়িয়ে পড়লো এবং রাতারাতি বিশ্বের বহু দেশে বিস্তৃত হতে থাকলো, তখন মাস্ক এবং স্যানিটাইজার কিনতে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়লো। বিশ টাকার মাস্ক বিক্রি হচ্ছে একশ’ দুইশ’ টাকায়। এ বিষয়ে হাইকোর্ট থেকে নির্দেশনাও এসেছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানও চলছে। রাজধানীর ফুটপাতে এখন আর মাস্ক পাওয়া যায় কিনা সন্দেহ। সুপারশপে যে স্যানিটাইজার সারা বছর অবহেলায় পড়ে থাকে এবং অনেক পণ্য মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যায়, সেটি এখন বহু কাঙ্ক্ষিত এবং ভুক্তভোগীরা জানেন অল্প দামের এই পণ্যটি তাদের কত চড়া দামে কিনতে হয়েছে।

যদিও চিকিৎসকরা বারবার বলছেন, গণহারে মাস্ক পরে ঘুরে বেড়ানোর কোনও প্রয়োজন নেই। ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে সেন্ট জর্জেসের ড. ডেভিড ক্যারিংটন বিবিসিতে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্ক বায়ুবাহিত ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে যথেষ্ট নয়। বেশিরভাগ ভাইরাসই বায়ুবাহিত। তিনি বলেন, এই মাস্কগুলো এতই ঢিলেঢালা থাকে যে এটা বায়ুকে সঠিকভাবে ফিল্টার করতে পারে না। তাছাড়া যিনি এই মাস্ক ব্যবহার করছেন, তার চক্ষু থাকছে উন্মুক্ত। সুতরাং পকেটে স্যানিটাইজার নিয়েও ঘোরা কতটা আবশ্যক—তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। বরং করোনা ভাইরাস যদি ছড়িয়ে পড়েও, তারপরও এখানে ব্যক্তিগত সুরক্ষাই প্রধান। খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের না হওয়া, বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, গরম পানি, লেবু ও ভিটামিন সি-যুক্ত ফল খাওয়া—এসব মেনে চলাই প্রতিরোধের উপায়। বাজার থেকে মাস্ক কেনারও প্রয়োজন নেই। বরং আমরা সাধারণভাবে যেসব স্যান্ডো গেঞ্জি পরিধান করি, পুরনো সেসব গেঞ্জি কেটে ঘরে বসেই মাস্ক তৈরি করে নেওয়া যায় এবং এটি বাজার থেকে কেনা মাস্কের চেয়ে বেশি কার্যকর বলেও চিকিৎসকরা বলছেন। সুতরাং করোনা এসেছে বলে মাস্ক ও স্যানিটাইজার কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়তে হবে—সেটির যৌক্তিকতা নেই।

সামনে যে ঘটনাটি ঘটবে বলে আশঙ্কা করা যায় তা হলো, দেশে যদি সত্যিই করোনা ভাইরাস আরেকটু বড় পরিসরে বিস্তৃত হয়ে যায়, তখন মানুষ ভয়ে আতঙ্কে বাজারে গিয়ে চাল ডাল তেল নুন আলু বিস্কুট মাছ সবজি কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়বে এবং মাসে যার ১০ কেজি চাল লাগে, তিনিও দুই মণ চাল কিনবেন; এক মণ আলু কিনবেন; ২০ প্যাকেট বিস্কুট কিনবেন। আর ব্যবসায়ীরা এই সুযোগটিই নেবে এবং তারা ২০ টাকার আলু একশ টাকা, ৬০০ টাকার তেলের বোতল দুই হাজার টাকায় বিক্রির ধান্দা করবে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় এই যুগে যেকোনও একটি তথ্য বা অপতথ্য মুহূর্তের মধ্যে চাউর করে দেওয়া যায়। কেউ একজন যদি লিখতে পারেন যে, নিজের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় খাদ্য মজুত করে রাখুন—দেখবেন লাইন দিয়ে লোকজন বাজারে ছুটছে। অথচ সবার মনে এই ভাবনাটি থাকা দরকার, যদি সত্যিই করোনা ভাইরাসের কারণে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়, তাহলে সেই সংকট থেকে একজন ব্যক্তি বা একটি পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে ভালো থাকতে পারবে না। আপনি আপনার বাসায় পর্যাপ্ত খাদ্য মজুত করলেন, কিন্তু পাশের বাসার লোকটি তা পারলেন না। সংকটের মুহূর্তে আপনি একা খাবেন? আপনার প্রতিবেশী তখন না খেয়ে থাকবে? সুতরাং হুজুগ তুলে তা গুজব ছড়িয়ে যা পাই সব কিনে ফেলবো ধরনের মানসিকতা সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রের জন্য বিপদ ডেকে আনে এবং কিছু ব্যবসায়ীর পোয়াবারো হয়। ফলে এরকম পরিস্থিতিতে মানুষ যাতে কোনও ধরনের গুজবে কান না দেয় এবং হুজুগে মেনে বাজার অস্থির করে না তোলে, সেজন্য সরকারের কঠোর পদক্ষেপ দরকার। সেই সঙ্গে মানুষ যাতে কোনও বিষয়ে সন্দেহ না করে বা তাদের মধ্যে কোনও অবিশ্বাস তৈরি না হয়, সেজন্য প্রতিটি বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি।

লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, রংধনু টিভি

 

/এসএএস/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ