‘বস্তি কিংবা ফ্ল্যাট প্রকল্পের নির্ধারিত স্থান’

Send
রুমিন ফারহানা
প্রকাশিত : ১৯:০৯, মার্চ ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৪৬, মার্চ ১৪, ২০২০





রুমিন ফারহানাধারাবি বস্তিতে কি আগুন লাগে? মুম্বাইয়ে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ এই বস্তিতে মাত্র ২.১ বর্গকিলোমিটারের একটা এলাকায় সাত লাখের বেশি মানুষ বসবাস করে। গুগল করে দেখলাম, ধারাবিতে সর্বশেষ আগুন লেগেছিল প্রায় ২ বছর আগে, ২০১৮ সালের জুন মাসে। আর একটু খোঁজাখুঁজি করে দেখলাম, তার আগেও ছোটখাট আগুন লেগেছে।

শুধু ধারাবি বস্তিই না, গত কয়েক বছরে মুম্বাইয়ের বান্দ্রা, লালমাটি, ধোবিঘাট এলাকার বস্তিতে কখনও কখনও আগুন লেগেছে। ভারতের বস্তিতে আগুন লাগার খবর খুঁজতে যাওয়ার কারণ এটা না যে সেখানে অগ্নিকাণ্ড হয় কিনা সেটা দেখা। কাণ্ডজ্ঞান বলে, অত্যন্ত ঘিঞ্জি এবং দাহ্য উপকরণে তৈরি বলে বস্তিতে আগুন লাগা খুব স্বাভাবিক। আমি মুম্বাইয়ের বস্তিতে অগ্নিকাণ্ড বিষয়ক কয়েকটা সংবাদ পড়ে একটা জিনিস খোঁজার চেষ্টা করেছি একটা ভিন্ন উদ্দেশ্যে, সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।
‘বস্তিতে আগুন লাগে নাই, লাগাইয়া দিছে’—আগুনে পুড়ে যাওয়া ঘরের টিন সরাতে সরাতে এভাবেই অভিযোগ করছিলেন মো. আবদুল মান্নান শেখ। এই বছরের ২৪ জানুয়ারি ভোরে হঠাৎ মিরপুরের রূপনগরের সেকশন-৬ এর চলন্তিকা বস্তিতে আগুন লাগার পরের ঘটনা এটি। মান্নান শেখ ৪০ বছর ধরে পরিবার নিয়ে সেই বস্তিতে বসবাস করছিলেন। মান্নান পেশায় একজন ভ্যানগাড়ি চালক। আগুনে তার ঘরটি পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। ঘরের কিছুই বের করতে পারেননি তিনি। সেই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে এভাবেই এসেছিল মান্নান শেখের কথা।

শুধু মান্নান শেখই নয়, মিরপুরের সবচেয়ে বড় বস্তি চলন্তিকায় এই আগুনের ঘটনার পর অনেক বাসিন্দা কেরোসিনের গন্ধ পেয়েছিল বলে অভিযোগ করেছিল। পারিপার্শ্বিক ঘটনা মেলালে এই দাবির সত্যতা পাওয়া যায়। চলন্তিকা বস্তির জায়গা গণপূর্তের। তারা দীর্ঘদিন থেকে জমিটি খালি করতে চেয়েছিল। সেটা পেরে ওঠেনি বলেই....। আগুন লাগার দুই ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিস এসেছিল আগুন নেভাতে, এই তথ্য আমাদের বুঝিয়ে দেয় ঠিক কী ঘটেছিল এখানে। এই ঘটনায় স্থানীয় এমপির নাম যুক্ত হয়েছে, যার বিরুদ্ধে মিরপুরের কালশীর বিহারি ক্যাম্পে বীভৎস অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়ে ১০ জনকে পুড়িয়ে মারার অভিযোগ আছে।

এই বছরের ঘটনা বলে চলন্তিকা বস্তির কথা লিখলাম, কিন্তু এই শহরে খুব নিয়মিতভাবেই বস্তিতে আগুন লাগে, আর প্রতিবারই অনেক মান্নান শেখ আমাদের জানান, বস্তিতে ইচ্ছা করে আগুন দেওয়ার কথা। সেইসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, কারণ দেখা যায় বস্তির পুড়ে যাওয়া অংশে অনেক ক্ষেত্রেই নতুন করে আর ঘর তৈরি হয় না, উঠে অট্টালিকা। আবার কখনও কখনও নতুন করে কোনও প্রভাবশালী ঘর তৈরি করে ভাড়া দেয় অন্য কারও কাছে।

বস্তি নোংরা, আমাদের অনেকের চোখেই ‘নোংরা’ এর মধ্যে বসবাস করা মানুষগুলো। জানি, পৃথিবীর অতি ধনী ব্যক্তি বৃদ্ধির হারে প্রথম আর ধনী ব্যক্তি বৃদ্ধির হারে তৃতীয় দেশটির রাজধানীতে ‘নোংরা’ মানুষের পরিপূর্ণ নোংরা বস্তিগুলো খুবই বেমানান। কিন্তু এই যে কিছু মানুষ ধনী হয়ে উঠছে কিছু মানুষ হচ্ছে মধ্যবিত্ত এবং উচ্চ মধ্যবিত্ত, তাদের তো আরাম আয়েশের জন্য বাসায় ‘ছুটা বুয়া’ লাগে, অনেকেরই লাগে রিকশাওয়ালা, বাসার কাছে ফেরি করে যাওয়া ফেরিওয়ালা। আমাদের আরও লাগবে অতি সস্তায় শ্রম বিক্রি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে মালিকদের ভীষণ ধনী বানিয়ে দেওয়া পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। তাদের থাকার জন্য বস্তি তো লাগবেই। এই শহরের এমন মানুষ আছে আনুমানিক ৪০ লাখ, যা মোট বাসিন্দার এক-চতুর্থাংশ।

আমাদের মতো জীবনযাপন যেসব শহরে হয় সেসব শহরে বস্তি এক অচ্ছেদ্য অংশ। বস্তি থাকে এবং বস্তির অস্তিত্ব স্বীকার করে নেয় সেসব রাষ্ট্র। সে কারণে আমাদের দেশের মতো ইচ্ছাকৃত আগুন লাগিয়ে দেওয়ার অভিযোগ শোনা যায় না সেসব জায়গায়। ভারতের বস্তির আগুনের রিপোর্ট পড়ে আমি দেখতে চেয়েছিলাম সেখানে কেউ এ ধরনের কোনও অভিযোগ করেছে কিনা। আমি পাইনি। সেখানে অগ্নিকাণ্ড প্রকৃতই দুর্ঘটনা, কিংবা অবহেলাজনিত কারণে হয়, কিন্তু কেউ সেই আগুন লাগিয়ে দেয় না।

ভারতের বস্তিগুলোতে সরকার নিজ উদ্যোগে নানারকম নাগরিক সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করে। ধারাবি বস্তিতে পানি, গ্যাস, বিদ্যুতের মতো সেবাগুলো সরকার নিজ উদ্যোগে দিয়েছে সাশ্রয়ী মূল্যে। সেখানে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা আছে। এতে সরকারের লাভ হয়েছে, জনগণের উপকার হয়েছে। আমাদের দেশে বস্তিতে এসব অসুবিধার বিনিময়ে কিছু স্থানীয় প্রভাবশালী লোক উপকৃত হয়। আবার অনেক সময় আগুন জ্বালিয়ে বস্তি উচ্ছেদ করে পোয়াবারো হয় তাদেরই।

এই শহর যেভাবে চলে তাতে এই পেশার মানুষগুলো ছাড়া শহর অচল। এই মানুষগুলোকে এরকম পরিবেশে না রেখে একটা বিকল্প ব্যবস্থার চিন্তা করাই উচিত। ধীরে ধীরে তাদের পুনর্বাসন করে বস্তিগুলো থেকে মুক্ত হতে পারলে সেটাই সবচেয়ে ভালো হতে পারতো। কিন্তু এই দেশটা বাংলাদেশ, বস্তি পুনর্বাসনও হয়ে ওঠে এক যাচ্ছেতাই দুর্নীতির আখড়ায়।

খুব হাঁকডাক করে মিরপুরের ভাষানটেকে বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনের জন্য প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল এক যুগ আগে। গরিব মানুষগুলোকে প্রাথমিক মূল্যের দ্বিগুণ টাকা দিতে হয়েছে, কিন্তু তবুও সময়মতো ফ্ল্যাট বুঝে পাননি তারা (প্রথম আলো, ২০১৭ )। ওদিকে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তাতে উপেক্ষিত বস্তিবাসীরা। অধিকাংশ ফ্ল্যাট পেয়েছেন সচ্ছলরা। যাদের ৭০ শতাংশই গাড়ি-বাড়ির মালিক। আবার কোনও কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তি নিয়ম ভেঙে নিজের ও পরিবারের নামে একাধিক ফ্ল্যাট বরাদ্দ নিয়েছেন। বরাদ্দপ্রাপ্ত এসব অধিকাংশ ফ্ল্যাটে এখন বসবাস করছে ভাড়াটিয়ারা (ভোরের কাগজ, ২০১৭)।

ভাষানটেক প্রকল্প আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় এই ধরনের সরকার থাকলে এই দেশের প্রকৃত বস্তিবাসীদের পুনর্বাসন কার্যত অসম্ভব। তাই বস্তিগুলো থাকবে। বস্তিগুলোকে ক্রমাগত পুড়িয়ে দেওয়া হবে। এই ‘নোংরা’ মানুষগুলোর কবল থেকে নোংরা বস্তিগুলোকে উদ্ধার করে গগনচুম্বী অট্টালিকা বানাতে হবে তো, যেগুলো উঁচু গলায় উন্নয়নের গল্প বলবে।

১১ মার্চ রূপনগরের রজনীগন্ধা অ্যাপার্টমেন্টের পেছনে ‘ট’ ব্লক বস্তিতে আগুন লেগে যায় (পড়ুন লাগিয়ে দেওয়া হয়)। নানা অ্যাঙ্গেল থেকে তোলা সেই অগ্নিকাণ্ডের ছবি পত্রিকায় এবং সামাজিকমাধ্যমে আসতে থাকে। দাউ দাউ আগুনে জ্বলতে থাকা বস্তির ধোঁয়ায় আকাশ কালো করে দিচ্ছে, এমন একটা দৃশ্যপটের সামনে একটা সাইনবোর্ডের ছবি ভাইরাল হয়ে পড়ে। সেই সাইনবোর্ড আমাদের বলে দেয় সেই পুরনো গল্প। এবার আর ফিসফাস না, এবার আর কারও মতে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব না, এবার একেবারে লিখিত সাইনবোর্ড, যাতে লেখা—‘ফ্ল্যাট প্রকল্পের নির্ধারিত স্থান’।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ
X