কুড়িগ্রাম কি বাংলাদেশের বাইরে?

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৯:৩৬, মার্চ ১৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:০০, মার্চ ১৫, ২০২০

প্রভাষ আমিনএকসময় দেশে জমিদারি প্রথা ছিল। জনদরদী,প্রজাদরদী অনেক জমিদার যেমন ছিলেন; তেমনি ছিলেন অত্যাচারী, নিষ্ঠুর জমিদারও। অনেক জমিদারের বাড়ির সামনে জুতা পায়ে হাঁটা যেত না, মুখের ওপর কথা বলা বা প্রতিবাদ করা তো অনেক দূরে। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়ে গেছে অনেক আগেই। কিন্তু আমাদের কারও কারও অন্তরে এখনও সামন্ততন্ত্র, জমিদারি ভাবসাব রয়ে গেছে। বাংলাদেশে আধুনিক জমিদারদের পোশাকি নাম ‘জেলা প্রশাসক’। প্লিজ জেলা প্রশাসক মহোদয়রা, আপনারা কিছু মনে করবেন না,সব জমিদার যেমন খারাপ ছিলেন না; সব জেলা প্রশাসকও খারাপ নন। কুড়িগ্রাম বা জামালপুরের ডিসিরাই বরং ব্যতিক্রম। ভালো ডিসির সংখ্যাই বেশি। প্রশাসনের মাঝ পর্যায়ের এই কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ের সরকার সচল রাখেন। গ্রামের মানুষের কাছে ডিসিরাই সরকার। তবে ‘জেলা প্রশাসক’ নামটার মধ্যেই একটা সামন্ততান্ত্রিক ব্যাপার আছে।  প্রশাসক নয়, বাস্তবে তো তাদের জনগণের সেবক হওয়ার কথা। কিন্তু বেদনার কথা, কুড়িগ্রামের ডিসি সুলতানা পারভীন সেটা হতে পারেননি, বরং তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, ‘দেখ আমি কত বড় প্রশাসক’। একদম জমিদারি স্টাইলে লাঠিয়াল বাহিনী পাঠিয়ে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেছেন তিনি।

ঘটনা হলো, কাবিখার টাকায় জেলা প্রশাসক কুড়িগ্রামে একটি পুকুর খনন করেছিলেন। আদর করে সেই পুকুরের নাম তিনি রেখেছেন ‘সুলতানা সরোবর’। সব জায়গা থেকে যখন পুকুর ভরাটের খবর আসে,তখন কুড়িগ্রামে পুকুর খননের খবর অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার মতো। কিন্তু সেটি জেলা প্রশাসকের নামে হতে হবে কেন? সরকার বদলি করে দিলে তো কাল তিনি বান্দরবানের ডিসি হয়ে যাবেন। সেখানে গিয়ে কি তিনি সাজেক ভ্যালির নাম ‘সুলতানা ভ্যালি’ রাখবেন? এই নামকরণের মধ্যেও লুকিয়ে আছে সামন্ততান্ত্রিক মনোভাব। এখনও দেশে অনেক দিঘি বা সরোবর আছে বিভিন্ন জমিদার বা রাজা-রানির নামে। সুলতানা পারভীন বোধহয় ভুলেই গিয়েছিলেন, জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের টাকায় খনন করা পুকুর নিজের নামে করা যায় না।
বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম রিগ্যান সেটাই শুধু মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। সাংবাদিকের কাজই এটা। কোথাও কোনও অনিয়ম হলে তা বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরা। পুকুরের নামকরণ নিয়ে রিপোর্ট করার পর থেকেই আরিফুল ইসলাম রিগ্যানের ওপর ক্ষিপ্ত জেলা প্রশাসক। একাধিকবার ডিসি অফিসে ডেকে নিয়ে তাকে শাসানো হয়েছে। সবকিছুরই নিয়ম আছে। সুলতানা পারভীন যেমন যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারবেন না। আরিফুল ইসলাম রিগ্যানও যা ইচ্ছা তা-ই লিখতে পারবেন না। আর  সাংবাদিকরা কখনোই কারও বিরুদ্ধে লেখেন না। তার দায়িত্ব বস্তুনিষ্ঠভাবে তথ্য তুলে ধরা। সেটা কারও বিরুদ্ধে যেতেই পারে।

সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি যদি মনে করেন,কোনও ভুল আছে, তিনি প্রতিবাদ করতে পারতেন, প্রেস কাউন্সিলে মামলা করতে পারতেন। সুলতানা পারভীনও তা-ই করতে পারতেন। কিন্তু সেটা তিনি করেননি। অফিসে ডেকে শাসিয়েও সাংবাদিককে বাগে আনতে না পেরে তিনি মাঠে নামিয়েছেন লাঠিয়াল বাহিনী। শুক্রবার রাত ১২টায় একজন সাংবাদিকের বাসার দরজা ভেঙে তাকে তুলে এনে উলঙ্গ করে পিটিয়ে রাত দুইটায় মোবাইল কোর্ট বসিয়ে এক বছরের কারাদণ্ড দিয়ে আড়াইটায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আইনের এমন সুপারসনিক গতি কখনও কেউ দেখেছেন,শুনেছেন?

সুলতানা পারভীন ‘কামেল’ বটে। আলোচিত যুব মহিলা লীগ নেত্রী পাপিয়ার একটি ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, তিনি লাঠি হাতে বসে তার অধীনে থাকা মেয়েদের শাসাচ্ছেন। সুলতানা পারভীনের শাসন করার স্টাইলের সঙ্গে পাপিয়ার স্টাইলের মিল আছে। একজন জেলা প্রশাসকের এভাবে ম্যাজিস্ট্রেট আর আনসার পাঠিয়ে কাউকে ধরে আনার, শাস্তি দেওয়ার এখতিয়ার আছে কিনা জানি না। থাকলেও এক্ষেত্রে তার চরম অপপ্রয়োগ হয়েছে। কোনও অভিযোগ ছাড়া, কোনও মামলা ছাড়া, কোনও ওয়ারেন্ট ছাড়া, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে না জানিয়ে মধ্যরাতে দরজা ভেঙে সাংবাদিক হোক আর সাধারণ মানুষ; যে কাউকে গ্রেফতার করাই অন্যায়। কুড়িগ্রামের ডিসি দাবি করেছেন ‘আইন মেনেই করা হয়েছে’। এমন কোনও আইন বা ক্ষমতা যদি থাকেও,সেটা থাকা উচিত নয়। এটা কোনও সভ্য সমাজের আইন হতে পারে না। দেশটা মগের মুল্লুক নয়, কুড়িগ্রামও বাংলাদেশের বাইরের কোনও জেলা নয়। কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক চাইলেই যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারেন না। তারচেয়ে বড় কথা হলো, আরিফকে যে অভিযোগে মধ্যরাতে তুলে এনে তাৎক্ষণিক সাজা দেওয়া হয়েছে, তা ডাহা মিথ্যা। ডিসির লাঠিয়াল বাহিনী দরজা ভেঙে আরিফকে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় পেটাতে পেটাতে বলছিলেন, তুই অনেক জ্বালাচ্ছিস। কিন্তু তারা বাসায় কোনও তল্লাশি চালায়নি। কিন্তু ভ্রাম্যমাণ আদালতে তার বাসা থেকে ‘আধাবোতল মদ ও দেড়শ গ্রাম গাঁজা’ উদ্ধারের কল্পিত অভিযোগ আনা হয়েছে। কুড়িগ্রামের সাংবাদিকরা বলছেন, আরিফ অধূমপায়ী। তাই তার বাসায় গাঁজা উদ্ধারের গল্প আসলে গাঁজাখুরি। গাঁজাটা সম্ভবত সুলতানা পারভীনই খেয়েছেন। নইলে এমন উদ্ভট গল্প বানানো সম্ভব নয়। সেই বাঘ আর মেষশাবকের গল্পের মতো। মেষশাবক নিচে থাকলেও বাঘ তার বিরুদ্ধে ঝরনার পানি ঘোলা করার অভিযোগ আনে। এটা অসম্ভব বোঝার পর বাঘ বলে তাহলে তোর বাপ পানি ঘোলা করেছে। বাঘ মেষশাবককে খাবে, সেটাই আসল কথা। খলের কখনও ছলের অভাব হয় না। সাংবাদিক আরিফকে শায়েস্তা করতে হবে, এটা হলো সুলতানা পারভীনের সিদ্ধান্ত। অজুহাতটা পরে বানালেও চলবে। আর এভাবে কারও বাসা থেকে ‘আধাবোতল মদ ও দেড়শ গ্রাম গাঁজা’ উদ্ধারের স্টাইলটাও বহু পুরনো। আগে অনেকবার এই স্টাইল প্রয়োগ করা হয়েছে। সুলতানা পারভীন প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে কোনও নতুন গল্প বানাতে পারেননি।
গত ৮ মার্চ ছিল বিশ্ব নারী দিবস। সেদিনের এক লেখায় আমি দাবি করেছিলাম, পুরুষ নয়, নারীই শ্রেষ্ঠ। আমি বিশ্বাস করেই লিখেছি, এখনও বিশ্বাস করি। নারীরা অনেক দক্ষ, পরিশ্রমী, শৃঙ্খলাপরায়ণ, সময়ানুবর্তী। তারচেয়ে বড় কথা হলো, তাদের মা হওয়ার ক্ষমতা এবং মাতৃভাব,মাতৃরূপই তাদের শ্রেষ্ঠত্ব এনে দিয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, সুলতানা পারভীনের মধ্যে সেই মাতৃভাব নেই। থাকলে তিনি এতটা নিষ্ঠুর, প্রতিহিংসাপরায়ণ হতে পারতেন না। যুগ যুগ ধরে নারী অধিকার, নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলা হচ্ছে। একজন নারী জেলা প্রশাসক হয়েছেন, এটা অবশ্যই নারীর ক্ষমতায়নের একটি উদাহরণ হতে পারতো। কিন্তু হলো ক্ষমতার অপব্যবহারের উদাহরণ। একশ’ বছর আগে বেগম রোকেয়ার ‘সুলতানা’ নারীমুক্তির স্বপ্ন দেখতেন, আর এই আমলের ‘সুলতানা’ নিজের নামে পুকুরের স্বপ্ন দেখেন, কেউ বাধা দিলে তাকে নিষ্ঠুর কায়দায় দমনের চেষ্টা করেন।
এইমাত্র খবর পেলাম কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও হয়েছে। প্রত্যাহার করার বিষয়টি অনুমিত। এটাও পুরনো স্টাইল। প্রত্যাহার মানে কুড়িগ্রাম থেকে এনে সচিবালয়ের কোনও দায়িত্ব দেওয়া। কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি প্রশাসন সম্পর্কে যে ভুল বার্তা দিলেন, সরকারের ভাবমূর্তির যে ক্ষতি করলেন; তা পূরণ হবে কীভাবে? সুলতানা পারভীন যা করেছেন, তা অপরাধ। এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই, যাতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন তারা জনগণের শাসক নয়, সেবক।
সরকারের কেন্দ্রের বা মাঠপর্যায়ের আমলারা যখন কোনও অন্যায়ের শিকার হন, তখন সাংবাদিকরা তাদের পাশে থাকেন। সত্যিটা তুলে ধরেন। আশা করি একজন সাংবাদিকের প্রতি একজন জেলা প্রশাসক যে নিষ্ঠুর আচরণ করেছেন, প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তারা তার প্রতিবাদ করবেন। অন্যায় জেনেও যেন তারা সুলতানা পারভীনের পাশে না দাঁড়ান। আরিফুল ইসলাম সাংবাদিক বলেই কিন্তু আমি তার পাশে দাঁড়াচ্ছি, তা নয়। আমি যদি বুঝতাম আরিফ অন্যায় করেছে, আমি অবশ্যই তার প্রতিবাদ করতাম। কিন্তু সাংবাদিকতা করার কারণে, সত্য তুলে ধরার অপরাধে আরিফকে হেনস্তা করা হচ্ছে। আমি শুরুতেই বলেছি, আরিফের সঙ্গে যা হয়েছে, একজন সাধারণ মানুষের সঙ্গ হলেও সেটা অন্যায় এবং আমি তার প্রতিবাদ করতাম।
আইন সবার জন্য সমান হোক। কেউ যেন নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে মনে না করেন।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ