লিবার্টিবিহীন গণতন্ত্র অর্থহীন

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৭:৫৯, মার্চ ১৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:০০, মার্চ ১৯, ২০২০

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীনির্বাচিত সরকার হলেই গণতান্ত্রিক সরকার হয় না। বর্তমান বিশ্বের দেশে দেশে অনেক নির্বাচিত সরকার আছে। তারা নির্বাচিত সরকার সত্য কিন্তু রাষ্ট্র চালায় স্বৈরাচারী সরকারের কায়দায়। গণতন্ত্রের অর্থ সংখ্যাগরিষ্ঠের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসন নয়। শুধু প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য ভোট প্রদান কখনও সুষ্ঠু গণতন্ত্র হতে পারে না, গণতন্ত্রের সঙ্গে লিবার্টি সম্পর্কযুক্ত। লিবার্টিবিহীন গণতন্ত্র অর্থহীন।
রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুরাতন হলেও এখনও তৃতীয় বিশ্বে এর প্রয়োগ ও প্রবণতা পরিষ্কারভাবে স্বচ্ছতার রূপ পরিগ্রহ করতে পারেনি। আমাদের দেশেও নির্বাচন হয় এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই দেশ শাসন করেন। তবে তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মানুষ লিবার্টি থেকে বঞ্চিত থাকেন। তৃতীয় বিশ্বের দেশে দেশে নির্বাচন হয়, সাধারণ মানুষ ভোটও প্রদান করে। মিসরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক, আনোয়ার সাদাত, ইরাকের সাদ্দাম হোসেন বারবার নির্বাচন করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। মানুষও তাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন। অথচ এটাতে মানুষের ইচ্ছার কোনও প্রতিফলন ছিল না। ভোটটা ছিল একটি সুন্দর মেকানিজম।

গত পাঁচ দশকব্যাপী আমাদের দেশেও অনুরূপ ব্যবস্থা কায়েম রয়েছে। অনুরূপ ব্যবস্থা সফল করার জন্য নিরপেক্ষ প্রশাসন রাখা যায় না। সরকারে যে থাকে তার ইচ্ছাকে বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনকে দলীয়করণ বা সরকারিকরণ করতে হয়। এখানে লিবার্টি সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করে দিতে হয়। লিবার্টির কোনও চর্চা থাকে না। দলীয়করণকৃত প্রশাসন প্রতিষ্ঠা হলে জবাবদিহি দুর্বল হয়ে যায়। তখন প্রশাসনিক কর্মকর্তারা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এই উপমহাদেশের তিনটি রাষ্ট্র ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা এমন যে ‘বাটি চালান’ দিয়েও সৎ কর্মকর্তা পাওয়া মুশকিল।

গত সপ্তাহে কুড়িগ্রামের ডিসি সুলতানা পারভীন বাংলা ট্রিবিউনের স্থানীয় সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগানকে মধ্যরাতে মারধর করে বাসা থেকে তুলে নিয়ে মোবাইল কোর্টে সাজা দেওয়ার মাধ্যমে যে ঘটনার অবতারণা করলেন, দলীয়করণকৃত প্রশাসন থেকে এর চেয়ে উত্তম আচরণ আশা করা যায় না। আরিফুলের ভাগ্য ভালো যে তাকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়নি। একজন ডিসি প্রতিশোধপরায়ণ হলে ক্রসফায়ার মামুলি বিষয়। ক্রসফায়ারের জন্য জবাবদিহি করতে হচ্ছে না এখন। গত দুই দশক ধরে এর জন্য প্রশাসনের একটি গৎবাঁধা ভাষা আছে। হত্যার পরে প্রশাসন সেই বুলি আওড়ে হত্যাকে জায়েজ করে নেয়।

আরিফুলের গ্রেফতারের পর ডিসি সুলতানা পারভীনকে তার সাঙ্গাতরা জিজ্ঞেস করেছিল এখন কী করা হবে তাকে। একটি মামলা সাজিয়ে গভীর রাতে আদালত বসিয়ে আরিফুলকে সাজা দিয়ে জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সুলতানা পারভীনকে নিয়ে, তার প্রশাসনের দুর্নীতি নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশের জন্য এটাকে উপযুক্ত শাস্তি বলে মনে করেছিলেন ডিসি। দলীয়করণকৃত প্রশাসনে এক একজন কর্মকর্তা তাদের নিজস্ব ক্ষমতাবলে এক একটা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বৈরাচার। এক জেলা জজ রেল স্টেশনে আদালত বসিয়েছিলেন। যতদূর মনে পড়ে, জেলা জজকে মর্যাদা প্রদানের শীতলতা ছিল বলে তিনি আদালত বসিয়েছিলেন। এখন আদালত বসিয়ে শিশুদের সাজা দেওয়া হচ্ছে, কারও চুল কেটে দেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন ডিসি-ওসি বা ম্যাজিস্ট্রেট। এসবও এখন দেখতে হচ্ছে। কে কতটুকু চুল রাখবে সেটাও প্রশাসনের দেখার বিষয় হয়েছে!

তৃতীয় বিশ্বের নির্বাচিত সরকারগুলো নির্বাচন করে নির্বাচিত হন সত্য, কিন্তু তারা জনগণ কর্তৃক সমাদৃত হন না। ১৯৯৯ সালের অক্টোবর মাসে বিশ্ব আশ্চর্য হয়ে দেখলো যে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ১১ বছরের নির্বাচিত সরকারকে বিতাড়িত করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। অধিকাংশ পাকিস্তানি গণতন্ত্রের ভান ধরে চলা এই কুশাসনের কবল থেকে মুক্তি পেয়ে আনন্দিত হয়েছিল তখন। বেনজির আর নেওয়াজ শরীফ নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করতেন। বিচারালয়কে তাদের রাজনীতির আওতায় এনে আইনকে ব্যবহার করতেন। তারা রাষ্ট্রকে লুটপাটের অবাধ বিচরণক্ষেত্র বানিয়েছিলেন। তাই বলছি, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে নির্বাচন হচ্ছে সত্য কিন্তু সবকিছু চলছে একটা নকশার ছাঁচে।

আমাদের দেশে যে তিনটি বৃহৎ দল রয়েছে—আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, তারা প্রত্যেকে ক্ষমতায় ছিল। ক্ষমতায় যখন থাকে তখন তাদের চরিত্র এক ও অভিন্ন। নির্বাচন হয় সত্য কিন্তু নির্বাচন অবাধ হয় না। নকশার নির্বাচন যেভাবে হয় ঠিক সেভাবে হয়ে থাকে। একবার দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। তখন কিন্তু দুই একটা নির্বাচনে জনমতের প্রতিফলন হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু শাসনতন্ত্রের স্পিরিটের সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সাংঘর্ষিক একথা বলে সুপ্রিম কোর্ট তা বাতিল করে দিয়েছেন। নির্বাচনকে যা স্বচ্ছতা প্রদান করেছিল তাকে সুপ্রিম কোর্ট অনির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বাতিল করে পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাকে দলীয় রাজনীতির কাছে পুনরায় সোপর্দ করলেন। সুপ্রিম কোর্টের এই বিবেচনায় অনেকে নাখোশ হয়েছেন।

আওয়ামী লীগ দাবি করে তারা দেশের প্রচুর উন্নয়ন করছে। উন্নয়ন কিছু যে হচ্ছে, তা অসত্য নয়। এর সবটা আওয়ামী লীগের প্রচেষ্টার কারণে নয়, মূলত এই শতাব্দীতে হচ্ছে উন্নয়নের শতাব্দী। বিশ্বের সর্বত্র উন্নয়নের জোয়ার এসেছে। তাই বাংলাদেশেও উন্নয়ন হচ্ছে, হবে। তবে গণতন্ত্র, লিবার্টি থেকে দেশের মানুষ যে বঞ্চিত হয়েছে তার উপায় কী? ১৯৭৭ সালে ইমারজেন্সির পর ইন্দিরা গান্ধী ইমারজেন্সি প্রত্যাহার করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে গিয়েছিলেন। দেশের মানুষকে আরও অধিক গণতন্ত্র ও লিবার্টি ফিরিয়ে দিতে শেখ হাসিনাকেও নতুন করে ভাবা দরকার।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ