আইনের শাসন বুঝতে সূচক লাগে?

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ১৪:৩৮, মার্চ ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪০, মার্চ ২২, ২০২০

আমীন আল রশীদক্যাসিনোকাণ্ডে গ্রেফতার প্রভাবশালী ঠিকাদার জিকে শামীম রাষ্ট্রপক্ষের অগোচরে জামিন নিয়েছেন বলে একটি রোমহর্ষক খবর গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় চাউর হওয়ার দিন কয়েকের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা দ্য ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট (ডব্লিউজেপি)-এর বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইনের শাসন সূচকে গত এক বছরে বাংলাদেশের অবনতি হয়েছে। বিশ্বের ১২৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৫তম। দক্ষিণ এশিয়ার ছয়টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ চতুর্থ অবস্থানে। গত বছরের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ১২৬টি দেশের মধ্যে ১১২তম অবস্থানে ছিল।
ডব্লিউজেপির প্রতিবেদন বলছে, আইনের শাসনের এই সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে আছে নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও ভারত। আর বাংলাদেশের পেছনে রয়েছে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান। এই প্রতিবেদন প্রকাশের অব্যবহিত পরেই আইনের শাসনের এক ভয়াবহ ব্যত্যয় দেশবাসী দেখেছে কুড়িগ্রামে। সেখানে মধ্যরাতে একজন সাংবাদিকের বাসায় ঢুকে তাকে মদ ও গাঁজা রাখার দায়ে সাজা দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। পুরো ঘটনাটিই যে পরিকল্পিত এবং জেলা প্রশাসনের প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ, তা এরইমধ্যে দেশবাসী জেনেছে। যারা রাষ্ট্রে আইনের শাসন নিশ্চিত করবেন, তারাই যখন কোনও সংবাদে ক্ষুব্ধ হয়ে ওই সংবাদকর্মীর বাসায় গিয়ে ফিল্মি কায়দায় তাকে ধরে নিয়ে আসে এবং নিজেদের ক্ষমতাবলে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে সাজা দিয়ে দেয়, সেটা কোনও সভ্য সমাজে কল্পনাও করা যায় না। 

শুধু আইনের শাসন নয়, এরকম আরও অনেক বিষয়ে সূচক তৈরি হয়। যেমন, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল প্রতি বছর দুর্নীতির ধারণাসূচক তৈরি করে। যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য ইকোনমিস্ট প্রকাশ করে বৈশ্বিক গণতন্ত্রের সূচক। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস প্রকাশ করে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ সূচক। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম বা ডব্লিউইএফ প্রকাশ করে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচক। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নাগরিকত্ব ও পরিকল্পনা বিষয়ক ফার্ম ‘হেনলি’ প্রকাশ করে বৈশ্বিক পাসপোর্ট সূচক ইত্যাদি।  প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের আইনের শাসনের গতিপ্রকৃতি অথবা তার অগ্রগতি-অবনতি কিংবা গণতন্ত্রের চেহারা বুঝতে কোনও সূচক লাগে কিনা—যেখানে প্রতিনিয়তই দেশের মানুষ তাদের নিজের জীবন-অর্থ ও সময় দিয়ে এই রূঢ় বাস্তবতা হাড়ে হাড়ে টের পায়!

দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে কার শাসনের কথা বলা হবে—আইনের নাকি আইন প্রয়োগকারীর? কেননা, যখনই ‘আইনের শাসন’ শব্দযুগল উপস্থাপন করা হয়, তখন সেখানে অবশ্যম্ভাবীরূপে হাজির হয় আইন প্রয়োগকারীর কর্তৃত্বের বিষয়টি, যার একটি বড় উদাহরণ তৈরি করলেন কুড়িগ্রামের সদ্য প্রত্যাহারকৃত জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন। কাবিখার টাকায় পুকুর নির্মাণ করে সেই পুকুর নিজের নামে করেছেন—এই সংবাদ প্রকাশের জেরে যিনি অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের স্থানীয় প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম রিগানকে এক ভয়াবহ কায়দায় ‘শিক্ষা’ দিলেন। এটা যে খুব বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা, এমনটি ভাবার কোনও কারণ নেই। সংবাদে ক্ষুব্ধ হয়ে সাংবাদিককে এরকম শিক্ষা দেওয়া, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করে নাজেহাল করা, এমনকি তাকে গুম করে দেওয়ার নজিরও এ দেশে আছে। ‍সুতরাং আইনের শাসনের কথা বলার আগে আমাদের পরিষ্কার হওয়া দরকার, আইন প্রয়োগের দায়িত্ব আমরা যাদের হাতে দিয়েছি, তারা কারা? তারা কতটা জনবান্ধব। জনগণের করের পয়সায় বেতন হলেও সেই জনগণকে তারা যে নিয়মিত হয়রানি করেন, নাজেহাল করেন, ব্ল্যাকমেইল করেন, পকেটে ইয়াবা ঢুকিয়ে দিয়ে মাদক আইনে মামলার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করেন, তারা কী আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবেন? সুতরাং, বাংলাদেশে আইনের শাসন আছে কী নেই বা কতটুকু আছে, তা বোঝার জন্য ডব্লিউজেপির গবেষণা প্রতিবেদনে চোখ না বুলালেও চলে।

তবে তারপরও এসব প্রতিবেদনের একটা অ্যাকাডেমিক ও আন্তর্জাতিক মূল্য আছে। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের আইনের শাসনের ক্ষেত্রে একমাত্র শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার দিক থেকে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। অন্য সূচকগুলোর মধ্যে ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতি, উন্মুক্ত সরকার, মৌলিক অধিকার, নিয়ন্ত্রণমূলক ক্ষমতার প্রয়োগ, নাগরিক ন্যায়বিচার এবং ফৌজদারি বিচারে বাংলাদেশের অবস্থার অবনতি হয়েছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা মৌলিক অধিকারের দিক থেকে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ১২৮টি দেশের মধ্যে ১২২তম অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের পরে রয়েছে তুরস্ক, ভেনেজুয়েলা, মোজাম্বিক, চীন, মিসর ও ইরান।

বাংলাদেশে যখনই আইনের শাসনের প্রসঙ্গ ওঠে, সেখানে সঙ্গত কারণেই সামনে আসে বিচার ব্যবস্থার কথা। রাষ্ট্রপক্ষের অগোচরে হাইকোর্ট থেকে জিকে শামীমের জামিন পাওয়া একটি বড় উদাহরণ। গণমাধ্যমের খবর বলছে, যুবলীগ থেকে বহিষ্কৃত ঠিকাদার এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমকে অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে করা পৃথক দুই মামলায় ৪ ও ৬ ফেব্রুয়ারি জামিন দেন হাইকোর্ট। তবে রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, হাইকোর্টে জামিন আবেদন মঞ্জুরের তথ্য তারা জানে না।  ফলে প্রশ্ন উঠেছে, রাষ্ট্রপক্ষের শুনানি ছাড়া উচ্চ আদালত কোনও আসামির জামিন দিয়েছেন, এটি বিশ্বাসযোগ্য কিনা? অ্যাটর্নি জেনারেল সাংবাদিকদের বলেছেন, এই জামিনের কোনও তথ্য এর আগে তাকে জানানো হয়নি। সংশ্লিষ্ট আদালতে দায়িত্বরত রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর কোনও গাফিলতি রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, তথ্য গোপন ও নামবিভ্রাটে জি কে শামীমের জামিন হয়েছিল। কারণ অস্ত্র মামলায় জামিন আবেদনকারীর নাম লেখা আছে এস এম গোলাম কিবরিয়া। কিন্তু আদালতের ওই দিনের কার্যতালিকায় নাম ছিল এস এম গোলাম। অর্থাৎ শামীমের আইনজীবী সচেতনভাবেই এই চালাকিটা করেছেন।  যদিও পরে উচ্চ আদালত শামীমের জামিন বাতিল করেন।

কুড়িগ্রামে সাংবাদিক রিগানকে সাজা দেওয়া হয়েছে যে মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে, সেই আদালতের এখতিয়ার ও ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। প্রশ্ন তুলেছেন খোদ সর্বোচ্চ আদালতই। ভেজাল খাদ্য, বাল্যবিয়ে, মাদক প্রতিরোধ, সড়কে বিশৃঙ্খলাসহ নানা অপরাধ তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের প্রয়োজনীয়তা আছে বটে। কিন্তু মধ্যরাতে যখন জোর করে একজন সাংবাদিকের বাসায় ঢুকে, তার কাছে আধা বোতল মদ ও কিছু গাঁজা থাকার দায়ে কারাদণ্ড দেওয়া হয়, তখন ভ্রাম্যমাণ আদালতের পুরো প্রক্রিয়াটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। কুড়িগ্রামের সাংবাদিক আরিফের বাসায় ঢুকে যারা মদ ও গাঁজা পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন, তারা নিজেরাই যে ওই মদ ও গাঁজা সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন—সেটি বোঝার জন্য খুব বেশি শিক্ষিত হওয়ার দরকার নেই। এই ঘটনা সম্পূর্ণতই আইনের শাসনের পরিপন্থী। যে জেলা প্রশাসক নিজের ক্ষমতাবলে তার ম্যাজিস্ট্রেট ও অন্যান্য কর্মচারীকে পাঠিয়ে একজন সাংবাদিককে শায়েস্তা করেন—তার মতো লোকজনকে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে রেখে আইনের শাসন নিশ্চিত করা আদৌ সম্ভব কিনা, সে প্রশ্ন তোলাই সঙ্গত।

এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণের সুযোগ কম যে, বাংলাদেশের যে প্রশাসন, পুলিশিং ও বিচার ব্যবস্থার বিদ্যমান কাঠামোই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথে বড় অন্তরায়। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে কাজ করলেও পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা ও ভরসা শূন্যের কোঠায়। বহুদিন ধরেই জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার গালভরা কথা শোনা গেলেও এবং ছোটখাট কিছু জায়গায় যেমন সাধারণ ডায়েরি করা, ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার—ইত্যাদি উদ্যোগের পরেও বৃহত্তর অর্থে পুলিশ কতটা জনবান্ধব হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই। এর প্রধান কারণ দুর্নীতি এবং পুলিশকে রাজনৈতিক বাহিনীতে পরিণত করা। পুলিশ নিজের মতো কাজ করতে পারলে, তাদের নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতি দুর্নীতিমুক্ত করা গেলে জনবান্ধব হয়ে ওঠার পথ সহজ হতো। কিন্তু সেই ক্ষেত্রে অগ্রগতি যে খুব বেশি নেই, তা চারিদিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়।

ডব্লিউজেপির গবেষণাও বলছে, বাংলাদেশের মাত্র ২৫ শতাংশ মানুষ মনে করে পুলিশ আইন মেনে কাজ করে। ২৬ শতাংশ মনে করে, সন্দেহভাজন আসামিদের মৌলিক অধিকার পুলিশ রক্ষা করে। আর মাত্র ১৮ শতাংশের ধারণা হলো, আইন ভঙ্গ করলে পুলিশ শাস্তি পায়। প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির গ্লোবাল করাপশন ব্যারোমিটারেও বলা হয়, বাংলাদেশের ৬৪ শতাংশ মানুষ পুলিশ বাহিনীকে দুর্নীতিগ্রস্ত বলে মনে করে। আর ২০১২ সালে সেবা খাতে দুর্নীতি নিয়ে টিআইবির করা জাতীয় খানা জরিপে বলা হয়, দেশের ৭৫ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সেবা নিতে গিয়ে কোনও না কোনোভাবে দুর্নীতির শিকার হয়েছে। সুতরাং রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দুর্নীতিমুক্ত এবং জনবান্ধব করে গড়ে তোলা না গেলে আইনের শাসনে প্রতি বছরই বাংলাদেশে পেছাতে থাকবে, তাতে দেশের জিডিপি ও মাথাপিছু আয় যতই বাড়ুক না কেন, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো বিশাল অবকাঠামো গড়ে উঠুক না কেন, এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল মানুষের চলাচল যতই সহজ করুক না কেন। কারণ সাধারণ মানুষ যদি তার করের পয়সায় পরিচালিত গণকর্মচারী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে গিয়ে বিনা হয়রানি আর বিনা ঘুষে সেবা না পায়, তাতে কোনও সাফল্যই টেকসই হবে না।

লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, রংধনু টেলিভিশন।

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ