খালেদা জিয়ার মুক্তি ও শোভন রাজনীতির নতুন সুযোগ

Send
মো. জাকির হোসেন
প্রকাশিত : ১৫:৪৭, এপ্রিল ০২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০৯, এপ্রিল ০২, ২০২০

মো. জাকির হোসেননির্বাহী ক্ষমতাবলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত করে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে যান খালেদা জিয়া। এরপর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায়ও তার সাজা হয়। সব মিলিয়ে খালেদা জিয়া ১৭ বছর কারাভোগরত আছেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১(১) ধারার ক্ষমতা বলে মানবিক কারণে শর্তসাপেক্ষে ছয় মাসের জন্য দণ্ড স্থগিত করে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এ ধারার অধীনে সরকার চাইলে কারও দণ্ড বিনাশর্তে বা শর্তসাপেক্ষে দণ্ড স্থগিত, সম্পূর্ণ দণ্ড বা দণ্ডের অংশবিশেষ মওকুফ করতে পারেন। ৪০১ (৩) ধারায় উল্লেখ আছে, যে সকল শর্তে দণ্ড স্থগিত বা মওকুফ করা হয়েছে তার কোনোটি পালন করা হয়নি মর্মে প্রতীয়মান হলে সরকার দণ্ড স্থগিত বা মওকুফের আদেশ বাতিল করে দণ্ডের অনতিবাহিত অংশ ভোগ করার জন্য কারাগারে প্রেরণ করতে পারবেন। তবে ৪০১ ধারার বিধান অনুযায়ী সরকার দণ্ড স্থগিতের আদেশ দফায় দফায় বৃদ্ধি করতেও ক্ষমতাপ্রাপ্ত।

দেশ স্বাধীনের পর বিচারাধীন মামলায় আসামিদের প্যারোলে মুক্তির অনেক উদাহরণ থাকলেও সাজাপ্রাপ্ত আসামির দণ্ড স্থগিতের কোনও নজির ছিল না। সাজাপ্রাপ্ত খালেদা জিয়ার দণ্ড স্থগিতের ঘটনা বাংলাদেশে প্রথম নজির। খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন। আন্দোলন ছাড়াই প্রধান প্রতিপক্ষ কোনও রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেত্রীর মুক্তির এই বিরল ও নজিরবিহীন ঘটনা আবারও প্রমাণ করলেন যে শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর মানবিক হৃদয়ের উত্তরসূরি। নিন্দুকেরা যেভাবেই ব্যাখ্যা করুন না কেন এ মানবিক ও নজিরবিহীন ঘটনা বাংলাদেশে আবারও শোভন, সৌহার্দমূলক ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার রাজনীতির সুযোগ তৈরি করেছে, যা বলার অপেক্ষা রাখে না। বল এখন খালেদা জিয়া ও তার দলের কোর্টে। জীবনের এ অপরাহ্নে দাঁড়িয়ে মানব সভ্যতার বিপন্ন সময়ে করোনাকালে যেখানে জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য একটি মাত্র স্পর্শ, একটি মাত্র নিঃশ্বাস খালেদা জিয়া! আপনার কাছে অনুরোধ রাজনীতিতে পরিবর্তনের সূচনা করুন। একটা সময় ছিল যখন রাজনীতিতে যোগদান অত্যন্ত সম্মানজনক বিষয় ছিল, রাজনীতিবিদরা পূজনীয় ছিলেন। এখন রাজনীতি নিয়ে মানুষ যারপরনাই বিরক্ত। ক্ষুব্ধ-ক্রুদ্ধ মানুষ রাজনীতি ও রাজনীতিকদের কষে গালি দিতে দ্বিধাবোধ করেন না। রাজনীতির কারণেই রাজনীতিক বঙ্গবন্ধুর কল্যাণ কামনায় এ দেশের মানুষ নফল রোজা রেখেছে, পূজা-প্রার্থনা করেছে। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনা কর্তৃক বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের খবর জানার পর বঙ্গবন্ধুর মুক্তি কামনায় দেওয়ানগঞ্জের খড়মা গ্রামের জবু দোকানদার নফল নামাজ পড়া শুরু করেন এবং বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে না আসা পর্যন্ত তিনি নফল নামাজ পড়ে গেছেন। শুধু তাই নয়, প্রায় নিরন্ন সেই জবু দোকানদার মানত করেছিলেন, পাকিস্তান থেকে বঙ্গবন্ধু বেঁচে দেশে ফিরে এলে তিনি একটি গরু জবাই করে গরিবদের মধ্যে গোশত বিতরণ করবেন। প্রচণ্ড আর্থিক অনটনের মধ্যেও সে কাজটি তিনি সমাধা করেছিলেন। নড়াইলের সাত্তার মোল্লা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকালে নড়াইল বাজারে গিয়ে জানতে পারেন বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। খবর শুনেই তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। সুস্থ হয়ে জানতে পারেন নিজ বাড়ির সিঁড়িতে পড়ে থাকা মৃত বঙ্গবন্ধুর গায়ে চাদর ছিল না, পায়ে স্যান্ডেল ছিল না। তাই শুনে প্রতিজ্ঞা করেন আর কখনও স্যান্ডেল পায়ে দেবেন না, চাদরও গায়ে চড়াবেন না। এরপর ৩৫ বছর খালি পায়ে হেঁটেছেন সাত্তার মোল্লা। প্রচণ্ড শীতে রাস্তায় বের হতেন কাঁথা গায়ে দিয়ে, তবু চাদর পরেননি। ২০১০ সালে বঙ্গবন্ধুর পাঁচ খুনির ফাঁসি কার্যকর হওয়ার খবর শুনে স্যান্ডেল পায়ে দেন সাত্তার মোল্লা। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, কামারুজ্জামানের মতো নেতারা স্মরণীয়। রাজনীতিবিদদের প্রতি কী শ্রদ্ধা মানুষের। শেরে বাংলা সম্পর্কে তাঁর শিক্ষক বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমেদকে বলেছিলেন, ‘ফজলুল হক মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত খাঁটি বাঙালি। সেই সঙ্গে ফজলুল হক মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত খাঁটি মুসলমান। খাঁটি বাঙালিত্ব ও খাঁটি মুসলমানত্বের সমন্বয়ই ভবিষ্যৎ বাঙালির জাতীয়তা। ফজলুল হক ওই সমন্বয়ের প্রতীক। এ প্রতীক তোমরা ভেঙ্গোনা। ফজলুল হকের অমর্যাদা তোমরা করোনা। …বাঙালি যদি ফজলুল হকের মর্যাদা না দেয়, তবে বাঙালির বরাতে দুঃখ আছে।’ বঙ্গবন্ধু শেরে বাংলা সম্পর্কে লিখেছেন, ‘শেরে বাংলা মিছামিছিই শেরে বাংলা হন নাই। বাংলার মাটিও তাকে ভালবেসে ফেলেছিল। যখনই হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেছি, তখনই বাধা পেয়েছি।’ বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্মজীবনীতে আরও লিখেছেন, ‘একদিন আমার মনে আছে, একটা সভা করেছিলাম আমার নিজের ইউনিয়নে, হক সাহেব কেন লীগ ত্যাগ করলেন, কেন পাকিস্তান চান না এখন। কেন তিনি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর সাথে মিলে মন্ত্রীসভা গঠন করেছেন এই সমস্ত আলোচনা করছিলাম। হঠাৎ একজন বৃদ্ধলোক যিনি আমাদের বংশের সকলকে খুব শ্রদ্ধা করতেন, দাঁড়িয়ে বললেন—যাহা কিছু বলার বলেন, হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছুই বলবেন না। তিনি যদি পাকিস্তান না চান, আমরাও চাই না। জিন্নাহ কে? তার নামও তো শুনি নাই। আমাদের গরীবের বন্ধু হক সাহেব।’ কী ভালোবাসা, শ্রদ্ধা নেতার প্রতি। রাজনীতিবিদদের দল-মত-পথ ভিন্ন হলেও তখন রাজনীতিকদের মধ্যে সৌহার্দ ছিল, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ছিল। তাদের মধ্যে বিরোধিতা ছিল, প্রতিহিংসা ছিল না। একে অন্যকে বিনাশ করার, হনন করার জিঘাংসা ছিল না। খালেদা জিয়া, পরিবর্তনটা শুরু করুন বঙ্গবন্ধুকে আস্থায় নিয়ে, তাঁকে শ্রদ্ধা করার মধ্য দিয়ে। চাটুকার, তেলবাজদের হঠকারিতা থেকে মুক্ত হয়ে কোনও একান্ত নিজস্ব মুহূর্তে রাতের গভীরে চিন্তা করে দেখবেন বঙ্গবন্ধু খ্যাত শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির প্রতি অতল ভালোবাসায় ও বাঙালির সবটুকু কল্যাণের নিমিত্তে একবারের জন্য পাওয়া জীবনের সকল ব্যক্তিগত সাধ-আহ্লাদকে দু’পায়ে দলে কারাগারকে যদি ঠিকানা না বানাতেন, পরিবারের সুখ-স্বপ্নকে বিসর্জন না দিতেন, জেল-জুলুম, অত্যাচার, নিপীড়ন হাসিমুখে মেনে না নিতেন, বিশ্ব মানচিত্রে বাঙালির একটি স্থায়ী নিবাস হতো কি? বাঙালির মঙ্গল করতে নিজের জীবন নিয়ে জুয়া খেলেছেন বঙ্গবন্ধু। ফাঁসির রজ্জু মাথার ওপর ঝুলেছে, বুলেট তাড়া করেছে, রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়ার হুমকি তৈরি হয়েছে, কিন্তু কোনও কিছুই স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টি ও বাঙালির প্রতি বঙ্গবন্ধুর অদম্য ভালোবাসার পথে বাধা হতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু ৬-দফা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি নবাবজাদা নসরুল্লাহ খানের নেতৃত্বে পশ্চিম পাকিস্তানি আওয়ামী লীগের সকল নেতা এবং পূর্ব পাকিস্তানের আব্দুস সালাম খানের মতো অনেকেই দল থেকে বেরিয়ে নতুন রাজনৈতিক ফ্রন্ট পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (পিডিএম) গঠন করে। আর পূর্ব বাংলার সভাপতি মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ তার অনুসারীদের নিয়ে দলের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে দেন। ৬-দফার সঙ্গে মানুষকে সম্পৃক্ত না করা গেলে বঙ্গবন্ধু কি রাজনীতিতে টিকে থাকতে পারতেন? ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান না হলে বঙ্গবন্ধু হওয়া দূরে থাক নিশ্চিত ফাঁসিতে ঝুলতে হতো না কি তাঁকে? ’৭১-এ বিশ্ববাসী সোচ্চার না হলে জেলখানার পাশে যে কবর খোঁড়া হয়েছিল সেখানেই কি বঙ্গবন্ধুর শেষ ঠিকানা হতো না? চিকিৎসাকালীন সময়ে অখণ্ড অবসরে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়ে দেখুন কী গভীর মমতায় এ দেশকে ভালোবেসেছেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে কারাগারে অনশন বিষয়ে লিখেছেন, “আমাদের অবস্থা (বঙ্গবন্ধু ও বরিশালের আওয়ামী লীগ নেতা মহিউদ্দিন) এমন পর্যায়ে এসেছে যে, যে কোনও মুহূর্তে মৃত্যুর শান্তি ছায়ায় চিরদিনের জন্য স্থান পেতে পারি। সিভিল সার্জন সাহেব দিনের মধ্যে পাঁচ-সাতবার আমাদের দেখতে আসেন। ২৫ তারিখ সকালে যখন আমাকে তিনি পরীক্ষা করছিলেন হঠাৎ দেখলাম, তার মুখ গম্ভীর হয়ে গেছে। তিনি কোনও কথা না বলে, মুখ কালো করে বেরিয়ে গেলেন। আমি বুঝলাম, আমার দিন ফুরিয়ে গেছে। কিছু সময় পরে আবার ফিরে এসে বললেন, ‘এভাবে মৃত্যুবরণ করে কি কোনও লাভ হবে? বাংলাদেশ যে আপনার কাছ থেকে অনেক কিছু আশা করে।’ আমার কথা বলতে কষ্ট হয়, আস্তে আস্তে বললাম, ‘অনেক লোক আছে। কাজ পড়ে থাকবে না। দেশকে ও দেশের মানুষকে ভালবাসি, তাদের জন্যই জীবন দিতে পারলাম, এই শান্তি।’ ডেপুটি জেলার সাহেব বললেন, ‘কাউকে খবর দিতে হবে কি না? আপনার ছেলেমেয়ে ও স্ত্রী কোথায়? আপনার আব্বার কাছে কোন টেলিগ্রাম করবেন?’ বললাম, ‘দরকার নাই। আর তাদের কষ্ট দিতে চাই না।’ আমি আশা ছেড়ে দিয়েছি, হাত-পা অবশ হয়ে আসছিল। হার্টের দুর্বলতা না থাকলে এত তাড়াতাড়ি দুর্বল হয়ে পড়তাম না। একজন কয়েদি ছিল, আমার হাত-পায়ে সরিষার তেল গরম করে মালিশ করতে শুরু করল। মাঝে মাঝে ঠান্ডা হয়ে যচ্ছিল।” ১৯৮০ সালে মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মেমোরিয়াল লেকচারে জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক তার Bangladesh State of the Nation বক্তৃতায় বলেছেন, ‘এ বিষয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই যে, বঙ্গবন্ধু দেশপ্রেমে বিহ্বল ছিলেন। দেশপ্রেমের সংজ্ঞাকে যত ব্যাপক করে তোলা যাক না কেন, বঙ্গবন্ধু ততখানিই তাঁর দেশকে ভালোবাসতেন। যে প্রেম তাঁকে বিহ্বল করেছিলো, তা দেশের প্রতি যে হালকা আবেগ আমরা অনুভব করি এবং যাকে দেশপ্রেম হিসাবে চালিয়ে থাকি, তার থেকে অনেক বেশি আলাদা।…পৃথিবীর সেই ছোট্ট অংশটার প্রেমে তিনি বিহ্বল ছিলেন, যার নাম বাংলাদেশ। এ ধরনের ভালোবাসা বিপজ্জনক হতে পারে। বঙ্গবন্ধুই তার প্রমাণ।’

খালেদা জিয়া, আপনি পূর্ণ ওয়াকিবহাল যে, স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা ও যুদ্ধকালীন সরকারের আইনগত বৈধতার ভিত্তি ছিল ১৯৭১-এর ১০ এপ্রিল প্রণীত বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। এরই ভিত্তিতে পরিচালিত হয় মুক্তিযুদ্ধ। এই ঘোষণাপত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ তারিখে ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান ও সে ঘোষণাকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন ও অনুমোদনের বিষয় উল্লেখ রয়েছে। এই ঘোষণাপত্রকে মেনেই অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার ঘোষক মেনেই জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি যখন জিয়াউর রহমান ক্ষমতায়, সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যা, জেলে চার জাতীয় নেতাকে হত্যা ও নেতাকর্মীদের জেল-জুলুমের ফলে আওয়ামী লীগ যখন ভয়ঙ্কর রকম বিপর্যস্ত, সে সময় স্বাধীনতা যুদ্ধের লিখিত ইতিহাস প্রণয়নের জন্য ড. মফিজউল্লাহ কবিরকে চেয়ারম্যান ও কবি হাসান হাফিজুর রহমানকে সদস্য সচিব করে জিয়াউর রহমান একটি কমিটি গঠন করেছিলেন। কমিটি ১৯৮২ সালের নভেম্বর মাসে স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র শিরোনামে মোট ১৫ খণ্ডে স্বাধীনতা যুদ্ধের লিখিত ইতিহাস প্রকাশ করে। এ দলিলপত্র প্রকাশের সময় আওয়ামী লীগ দল হিসাবে পুনরায় সংগঠিত হবার সংগ্রাম করছিল। ’৮২ সালে প্রকাশিত স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস ২০০৩ সালে পুনর্মুদ্রিত হয়। ২০০৪ সালে ২য় সংস্করণ প্রকাশের জন্য তৎকালীন বিএনপি সরকার কমিটি গঠন করে। কমিটির সদস্যরা সত্যকে বিকৃত করে ২০০৪ সালে যে সংস্করণ প্রকাশ করে তাতে মূল দলিলপত্রের ৩য় অংশের প্রথম দলিল যেখানে লেখা ছিল ২৬ মার্চ স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করা হয়, তা বাদ দিয়ে নতুন দুটি ঘোষণা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রথম ঘোষণায় বলা হয় জিয়াউর রহমান ২৭ মার্চ বিপ্লবী বেতারকেন্দ্র থেকে প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা দেন আর ২৮ মার্চ স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবের নামে ২য় ঘোষণা দেন। মূল প্রকাশনায় ছিল জিয়া ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর নামে ঘোষণা দিয়েছিল। জিয়া বেঁচে থাকতে ১০ এপ্রিলের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র বতিল বা বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণার কোনোরূপ পরিবর্তন করেননি। নিজেকে কখনও স্বাধীনতার ঘোষক বলে দাবি করেননি। উপরন্তু, ১৯৭৪ সালের ২৬ মার্চের বিচিত্রায় প্রকাশিত একটি জাতির জন্ম শিরোনামে লিখিত প্রবন্ধে জিয়াউর রহমান দুইবার বঙ্গবন্ধুকে জাতির জনক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি আরও লিখেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু—এই তিনটি অবিচ্ছেদ্য শব্দ।’ ১৯৯১-৯৬ মেয়াদে বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময়ও স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র এর কোনও পরিবর্তন করেনি। কিন্তু কিছু নষ্ট বুদ্ধিজীবী সত্য বিকৃত করে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আর সেই থেকে আপনিও বিভ্রান্ত হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের সত্যিটা ভুলে গিয়ে। প্রয়াত সাহিত্যিক, সাংবাদিক আহমদ ছফা লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং শেখ মুজিবুর রহমান একটি যমজ শব্দ। একটাকে বাদ দিয়ে অন্যটার অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না। শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি। যারা এই সত্যকে অস্বীকার করবে, তাদের সঙ্গে কোন রকমের বিতর্ক, বাদ-প্রতিবাদ করতেও আমি রাজি হব না।…আজ থেকে অনেক দিন পরে হয়ত কোন কোন পিতা তার শিশুপুত্রকে বলবেন, জান খোকা! আমাদের দেশে একজন মানুষ জন্ম নিয়েছিল যাঁর দৃঢ়তা ছিল, তেজ ছিল…। কিন্তু মানুষটির হৃদয় ছিল, ভালোবাসতে জানতেন। দিবসের উজ্জ্বল সূর্যালোকে যে বস্তু চিকচিক করে জ্বলে তা হল মানুষটির সাহস। আর জ্যোৎস্নারাতে রুপালি কিরণ ধারায় মায়ের স্নেহের মত যে বস্তু আমাদের অন্তরে শান্তি এবং নিশ্চয়তার বোধ জাগিয়ে তোলে তা হল তাঁর ভালবাসা। জান খোকা তাঁর নাম। শেখ মুজিবুর রহমান।’

বিবেচনা করে দেখুন ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর তাঁকে একপ্রকার নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। নানা মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়েছিল, অপপ্রচার চালানো হয়েছিল। মৃত্যুর কয়েক দশক পর ২০০৪ সালে বিএনপি যখন ক্ষমতায়, সে সময় বিশ্বব্যাপী বিবিসি বাংলার জরিপে নিজেদের কালজয়ী কীর্তির কারণে অমর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুলকে ছাপিয়ে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হয়েছেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণের স্বীকৃতি পেয়েছে। মৃত্যুর ৪২ বছর পর এ ভাষণ বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত হয়েছে। কেন এত ভালোবাসা বঙ্গবন্ধুর প্রতি কখনও ভেবে দেখেছেন কি? কথায় আছে, ‘কিছু মানুষকে সবসময়ের জন্য বোকা বানানো যায়। সবমানুষকে কিছু সময়ের জন্য বোকা বানানো যায়, কিন্তু সব মানুষকে সবসময়ের জন্য বোকা বানানো যায় না।’ প্রচলিত আছে—‘মানুষের বিবেক পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আদালত’। বিবেকের আদালতে প্রশ্ন করুন, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা কে করেছে, কেন করেছে, রাজনীতিতে এর প্রভাব কীভাবে স্থায়ী বৈরিতা সৃষ্টি করেছে? এর কোনও কিছুই যদি বিবেচনায় না নেন, তারপরও বঙ্গবন্ধু যে আপনাকে কন্যাবৎ স্নেহ করতেন, সে সত্যিকে অস্বীকার করবেন কীভাবে? বহু বছর আগে মাস্টারদা সূর্য সেনের সহযোগী নির্লোভ ও সাদা মনের মানুষ হিসেবে খ্যাত আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা অধ্যাপক পুলিন দে-কে আমি এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম সত্যিটা জানার জন্য। আমার স্পষ্ট মনে আছে অধ্যাপক পুলিন দে বলেছিলেন, একদিন বঙ্গবন্ধু শাড়ি কেনার জন্য টাকা দিয়ে বললেন, আমার দুই মেয়ের জন্য দুইটা শাড়ি কিনে আন। আমি অধ্যাপক পুলিন দে-র কাছে জানতে চেয়েছিলাম দুই মেয়ে বলতে বঙ্গবন্ধু কাকে বুঝিয়েছেন? তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন, শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া।

কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন শোভন রাজনীতির কথা বলতে গিয়ে আমি বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ দীর্ঘ করছি কেন? এজন্য যে, বাংলাদেশ সৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধুর যে দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ, বাংলা ও বাঙালির প্রতি তাঁর যে নিখাদ, অতল ভালোবাসা, তা যদি খালেদা জিয়া ও বিএনপি অনুধাবন করে বঙ্গবন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞ ও শ্রদ্ধাবনত হয়, বাংলাদেশের রাজনীতির ম্যাজিক পরিবর্তন হবে আমি লিখে দিতে পারি। এর মাধ্যমে বিএনপিতে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকেন্দ্রিক রাজনীতি চর্চার সুযোগ সৃষ্টি হবে। আর রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হবে। বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে যে রাজনীতি, তা আর যাই হোক বাংলাদেশের পক্ষের রাজনীতি হতে পারে না। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শত্রুতা মানে বাংলাদেশের সঙ্গে শত্রুতা।

খালেদা জিয়া, অপনার মুক্তির পর আপনার দলের কিছু নেতা আপনার প্রিয়ভাজন হতে সরকারের বিরুদ্ধে, বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে, চিকিৎসার্থে আপনার বিদেশ যাত্রা নিয়ে বক্তব্য দিয়ে রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত করার চেষ্টা করছে, এটা শোভন রাজনীতির নতুন সুযোগকে বিনষ্ট করবে। আমরা চাই আপনার দণ্ড স্থগিতাদেশ দফায় দফায় বৃদ্ধি হোক, আপনাকে আর জেলে ফিরে যেতে না হোক। কিন্তু এসব চাটুকার নেতার মাঠ গরম করা বক্তব্য স্থগিতাদেশ বৃদ্ধির ব্যাপারে সরকারের মনোভাবকে বিরূপ করে তুলতে পারে। আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতা সাজা স্থগিত রেখে মুক্তি দেওয়ার ঘোষণাকে তাদের দলের রাজনৈতিক সুবিধা অর্জন হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। আওয়ামী লীগের কতিপয় মন্ত্রী-নেতা বলছেন, সরকারের দয়ায় খালেদা জিয়া মুক্তি পেয়েছেন। খালেদা জিয়াকে আন্দোলন করে বিএনপি মুক্ত করতে পারেনি। এখানে বিএনপির কোনও অবদান বা অর্জন নেই। ফলে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার কোনও কৃতিত্ব বিএনপি নিতে পারবে না। এছাড়া এই মুক্তির পরও আইনিভাবে খালেদা জিয়া দুর্নীতির দায় থেকে মুক্ত নন। প্রধানমন্ত্রীর মানবিক সিদ্ধান্তে খালেদা জিয়ার মুক্তির পর এমন বক্তব্য দুর্ভাগ্যজনক। এটি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন ও প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতাদের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কাউকে দয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিলে দয়ার মাহাত্ম্য পরাজিত হয়, এটি সংকীর্ণ মনের পরিচয়। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করে এবং কষ্ট দিয়ে নিজেদের দান-বদান্যতা বরবাদ করো না…।’ (সূরা বাক্বারাহ: আয়াত ২৬৪-২৬৬) হজরত আবদুল্লাহ বিন আমর (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘উপকার করে খোঁটা দানকারী, মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান, সর্বদা মদপানকারী–এই তিন শ্রেণির মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’(সুনানে নাসায়ি : ৫৫৭৭)

বঙ্গবন্ধু তাঁর চরমতম শত্রুকেও অমর্যাদাকর কথা বলেননি। এমনকি বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুর চরমতম শত্রু ভুট্টোকেও সম্মানজনক ভুট্টো সাহেব বলে সম্বোধন করেছেন। বঙ্গবন্ধুর কট্টর সমালোচক মওলানা ভাসানীকে বঙ্গবন্ধু নিয়মিত অর্থ সাহায্য ও জিনিসপত্র পাঠাতেন। অপরাধের অভিযোগে বিরোধী দলের যারা গ্রেফতার হয়ে কারাবন্দি ছিলেন, বঙ্গবন্ধু তাদেরও পরিবারের খোঁজ-খবর রেখেছেন, এমনকি আর্থিক সহায়তা করেছেন। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের প্রতি উদারতার বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য অধ্যাপক আনিসুর রহমান তার আকরগ্রন্থ Through Moments in History: Memoris of Two Decades of Intellectual and Social Life (1970-1990) এ লিখেছেন ১৯৭৩ সালের এপ্রিল মাসে জাসদের সাধারণ সম্পাদক তাকে জাসদের এক জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার অনুরোধ করে। অধ্যাপক আনিসুর রহমান বলেন, তিনি পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হওয়ায় সমাবেশে যোগদানের জন্য কমিশনের চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর অনুমোদন প্রয়োজন। অধ্যাপক আনিসুর রহমান লিখেছেন, ‘জাসদের সমাবেশে যোগদানের জন্য বঙ্গবন্ধুর অনুমতি চাইলে বঙ্গবন্ধু কিছুক্ষণ ভাবলেন। সামনের কাগজগুলোতে কিছু একটা আঁকাজোকা করলেন। তারপর বললেন, ‘You … may...go. There are some good boys and girls in their party, no harm if they hear some good words from you on nation building’. অধ্যাপক রহমান জাসদের সভায় যোগদান করেছিলেন। রাস্তায় যারা বঙ্গবন্ধুর রক্ত চাচ্ছে, তাদের সমাবেশে যোগদানের জন্য তাঁরই পরিকল্পনা কমিশনের একজন দায়িত্বশীল সদস্যকে অনুমতি দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। যে সাংবাদিকরা তাদের লেখনীতে বঙ্গবন্ধুর চরিত্র হনন করেছেন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, নীতি-আদর্শের সমালোচনার বাইরেও তাঁর সম্পর্কে কুৎসাপূর্ণ লেখা লিখেছেন, তাদের বিরুদ্ধেও বঙ্গবন্ধু কোনও প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। পাকিস্তানি মালিকানার পত্রিকা ‘মর্নিং নিউজ’-এর সম্পাদক এস জি এস বদরুদ্দিন অহর্নিশ বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে কুৎসা প্রচার করতেন। আগরতলা মামলার সময় তাঁর ফাঁসি দাবি করেছিলেন এ সাংবাদিক। অথচ স্বাধীনতার পর বদরুদ্দিনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন বঙ্গবন্ধু বিহারি হিসেবে পরিত্যক্ত বদরুদ্দিনের বাড়ি বিশেষ ব্যবস্থায় বিক্রির ব্যবস্থা করে বিক্রিত অর্থ বিদেশি মুদ্রায় রুপান্তর করে নেপাল হয়ে পাকিস্তান ফেরত যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।

প্রিয় জন্মভূমি করোনাভাইরাসের কবল থেকে পরিত্রাণের পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজনীতি ‘প্রতিহিংসার ভাইরাস’ মুক্ত হোক। রাজনীতির হারানো গৌরব ফিরে আসুক। খালেদা জিয়ার মানবিক মুক্তি শোভন রাজনীতির শুভ সূচনা করুক।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: [email protected]

/এসএএস/এমএমজ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ
X