করোনা টেস্ট কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

Send
ডা. মালিহা মান্নান আহমেদ
প্রকাশিত : ১৬:১৮, এপ্রিল ০৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০১:১৬, এপ্রিল ০৪, ২০২০

ডা. মালিহা মান্নান আহমেদ১ মার্চ বিশ্বজুড়ে কোভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৮৮ হাজার ৫৮৫ জন। এখন এক মাস পর সেই সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, ভাইরাসটির কেন্দ্রস্থল তিনবার পরিবর্তিত হয়েছে। শুরুতে ছিল চীন, এরপর ইতালি, এখন স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বব্যাপী আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতার দিকে খেয়াল করলে দেখা যাবে যে এখন আমরা ক্রমবর্ধমান বক্ররেখার কোথাও অবস্থান করছি। এটা ধারণা করা মুশকিল যে দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকায় বিস্তারের অপেক্ষায় থাকা এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে কত বেশি ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াবে। প্রতিটি দেশই নিজেদের বিদ্যমান সামর্থ্য দিয়ে ভাইরাসের বিস্তার ঠেকানোর চেষ্টা করছে। এই ভাইরাস দেখিয়ে দিয়েছে অল্প কয়েকটি ছাড়া কোনও দেশেরই এই মহামারি মোকাবিলার, এই যুদ্ধের জন্য উপযুক্ত সরঞ্জাম নেই। সম্ভাব্য সামর্থ্যের বিবেচনায় বাংলাদেশ তালিকার তলানিতেই আছে। সৌভাগ্যবশত আমরা পর্যবেক্ষণের জন্য সময়ের সুবিধা এবং রোগটির বিস্তারের হার কমাতে উন্নত দেশগুলো কেমন পদক্ষেপ নিচ্ছে—তা থেকে শেখার সুযোগ পেয়েছি।

কয়েকটি দেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কৌশল—‘চিহ্নিত, পরীক্ষা, চিকিৎসা, বিচ্ছিন্ন ও সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ’ সংক্রমণের হার কমাতে ইতিবাচক প্রভাব রেখেছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আক্রান্তদের পরীক্ষা ও হাজারো মানুষের ফলাফল একদিনে প্রকাশের অভূতপূর্ব উদাহরণ রেখেছে। তাদের উদ্যোগের মধ্যে ছিল—ল্যাবগুলোর নেটওয়ার্ক তৈরি, মানুষের চলাচলের মানচিত্র তৈরি এবং সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে আক্রান্তদের উৎসাহ প্রদান। শুরুতে হাসপাতালগুলোতে উপচেপড়া রোগীর ভিড় থাকলেও প্রাথমিকভাবে আক্রান্তরা বাসায় থাকার ফলে তা হ্রাস পায়। সিঙ্গাপুর আরও একধাপ এগিয়ে দুটি ক্লাস্টার শনাক্ত করে কোভিড-১৯-এর সেরোলজিক অ্যান্টিবডি পরীক্ষা চালায় এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সন্দেহভাজন আক্রান্তদের চিহ্নিত করে। দক্ষিণ কোরিয়ার পদ্ধতি অনুসরণ করে জার্মানি এবং তাদের মৃত্যুর হার এক শতাংশ। অথচ দেশটির প্রতিবেশী ইতালি ও স্পেনে মৃত্যুর হার যথাক্রমে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ ও ৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ সরকার ১১ এপ্রিল পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে এবং জনগণ যাতে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলেন, তা নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নিচ্ছে। এখন পর্যন্ত দেশে আক্রান্তের সংখ্যা ৫৬ ও মৃতের সংখ্যা ৬। আমাদের মৃতের হার ১০ দশমিক ৭১ শতাংশ, যা ভয়াবহ। সত্যিকার আক্রান্তের সংখ্যা জানা যাবে শুধু পরীক্ষার মাধ্যমে। যাতে করে হালকা ও গুরুতর আক্রান্তদের বিপরীতে মৃত্যুর হার উঠে আসবে। ব্যাপক আকারে পরীক্ষা শুধু যে আইসোলেশনে নেওয়ার মতো ক্লাস্টার চিহ্নিত করবে তা নয়—এতে স্বচ্ছতা তৈরি হবে এবং আতঙ্ক ও জল্পনা হ্রাস করবে।

১. কেন পরীক্ষা এত গুরুত্বপূর্ণ?

রোগের বিভিন্ন পর্যায়ে ভাইরাল ঘনত্ব এবং ভাইরাল শেডিংয়ের সময়কাল রোগের প্রাগনোসিস, রোগের বিস্তার, রোগের ফলাফল এবং বিচ্ছিন্নতার সময়কালের একটি গুরুত্বপূর্ণ মার্কার। দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত সুনির্দিষ্ট ক্লিনিক্যাল ফলাফলসহ দুটি প্রত্যাবর্তনমূলক কেস স্টাডিতে উল্লেখ করা হয়েছে—কোভিড-১৯-এ আক্রান্তদের ভাইরাল শেডিংয়ের গড় সময়কাল ১৮-২০ দিন।

কোভিডে সামান্য আক্রান্ত ব্যক্তিদের যদি লক্ষণ দেখা দেওয়ার প্রথম দুই দিনের ভেতরে পরীক্ষা করা হয়, তাহলে তাদের শ্বাসনালীর ওপরের অংশে ভাইরাল ঘনত্ব বেশি দেখা যায়। এটি সম্ভাব্য সংক্রমিত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকির ইঙ্গিত। পাঁচ থেকে ৯ দিনের মধ্যে ভাইরাল শেডিং কমে আসে।

ভর্তি হওয়ার সময় হালকা আক্রান্ত কিছু ব্যক্তির ক্ষেত্রে ১০ দিনের দিকে তা গুরুতর হয়। শ্বাসকষ্টের জন্য তাদের আইসিইউ’র সহযোগিতা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে লক্ষণ দেখা দেওয়ার পাঁচ দিনের মাথায় পরীক্ষা করা হয়েছে এবং ওই সময় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে নাক ও গলার পেছনের অংশ থেকে। তবে লক্ষণ কমে আসতে থাকলেও ভাইরাল শেডিং অব্যাহত ছিল।

একাধিক অঙ্গে জটিলতা থাকা গুরুতর রোগীদের ক্ষেত্রে রোগ থাকার সময়ে শ্বাসনালীর ওপরের অংশে ভাইরাল নিঃসরণ উচ্চ ছিল বলে দেখা গেছে। এসব ক্ষেত্রে রক্ত ও ফুসফুস থেকে নিঃসৃত তরলেও ভাইরাস শনাক্ত পাওয়া গেছে।

গবেষণায় লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব পরীক্ষার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংক্রমণ শুরুর পর্যায়ে নাক ও গলার পেছনের অংশের নমুনায় শুধু ভাইরাল উপস্থিতি বেশি থাকে তা নয়, সংগ্রহ করাও সহজ। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে রোগের সম্পূর্ণ লক্ষণ দেখা দেওয়ার পরও শ্বাসনালীর ওপরের অংশে ভাইরাল উপস্থিতি থাকে বলে প্রমাণিত হয়েছে। ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল পরামর্শ দিয়েছে—২৪ ঘণ্টার মধ্যে দুইবার পরীক্ষার পরই ভাইরাসের শূন্য উপস্থিতি থাকলে হাসপাতাল থেকে রোগী ছাড়পত্র দেওয়ার জন্য।

শ্বাসনালীর ওপরের অংশে কম ভাইরাল উপস্থিতি এবং উচ্চ ভাইরাল রেপ্লিকেশন ও সিস্টেমিক ভাইরাস সংক্রমণের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হয়। কোভিড রোগীদের কতদিন আইসোলেশনে রাখতে হবে, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভাইরাল শেডিং।

দ্রুত পরীক্ষা করার ফলে শুরুতেই আইসোলেশন, বিস্তার রোধ ও ত্বরিত চিকিৎসা প্রদানের ফলে রোগীর অবস্থার উন্নতি হয় তাড়াতাড়ি। গবেষণায় কয়েকজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে শুরুর দিকে আক্রান্তরা পরিবারের সদস্য ছিলেন। এতে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা ও তাদের কোয়ারেন্টিনে রাখার গুরুত্ব তুলে ধরে।

২. রোগের লক্ষণ ও প্রতিরোধ?

ল্যাবে শনাক্ত ও ক্লিনিক্যালি পরীক্ষা করা চীনের ৭০ হাজার ১১৭ জন আক্রান্তের ওপর ভিত্তি করে ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের এক গবেষণায় নিশ্চিত আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যু হার ১ দশমিক ৩৮ শতাংশ বলে ধারণা করা হয়েছে। যা এর আগে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির এক প্রতিবেদনেও উঠে এসেছিল। এই গবেষণায় আক্রান্ত হওয়ার পর হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তার ক্ষেত্রে বয়সের ভিন্নতার বিষয়টিও উঠে এসেছে। কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন হয়েছে ষাটোর্ধ্বদের ক্ষেত্রে ১২ শতাংশ, পঞ্চাশোর্ধ্বদের ৮ দশমিক ২ শতাংশ, চল্লিশোর্ধ্বদের ৪ দশমিক ৩ শতাংশ, ত্রিশোর্ধ্বদের ৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং বিশোর্ধ্বদের ক্ষেত্রে ১ দশমিক ১ শতাংশ।

আশির ঊর্ধ্ব বয়সীদের ক্ষেত্রে রোগটি সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী। মধ্য বয়সীদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হওয়া মানুষের বয়স ৫৬ বছর এবং ৮০ শতাংশের হালকা সংক্রমণ। বয়স্কদের রোগ নিরূপণ ও প্রতিকার দুর্বল হলেও অনেক তরুণ আক্রান্তেরও কিছু সময়ের জন্য ভেন্টিলেটরের সহযোগিতা লাগতে পারে।

হালকা সংক্রমিত ৮০ শতাংশের নিউমোনিয়া বা হালকা নিউমোনিয়া, হালকা জ্বর, কাশি, গলা ব্যথা, নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া, মাথাব্যথা, পেশীতে ব্যথা বা শ্বাসকষ্ট ছিল না।

আশঙ্কাজনক রোগী যাদের হাসপাতালে ভর্তি প্রয়োজন হয় তাদের জ্বর, কাশি, ভয়ানক শ্বাসকষ্ট, শ্বাসনালীতে ব্যথা, শ্বাস প্রশ্বাসের ফ্রিকোয়েন্সি বৃদ্ধি ≥ ৩০/মিনিটে সঙ্গে নিম্ন অক্সিজেন সম্পৃক্তি ≤ ৯০ শতাংশ।

বুকের এক্স-রে, সিটি স্ক্যান বা ফুসফুসে আলট্রাসাউন্ডে বাইলিটারেল ওপাসিটিজ দেখা যেতে পারে এবং আইসিইউ সাপোর্টের ক্ষেত্রে মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশন প্রয়োজন হতে পারে।

গুরুতর আক্রান্তদের হয়তো শ্বাসযন্ত্র বিকল, সেপটিক শক এবং/অথবা একাধিক অঙ্গের বিকলতা (এমওডি) বা অকেজো (এমওএফ) দেখা দিতে পারে। এসব ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বলের মতো পূর্বের কোমরবিডিটি থাকতে পারে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জরুরি ক্ষেত্রে রোগের গতি নির্দেশক হিসেবে চিকিৎসকরা সিকুয়েনশিয়ান ওরগান ফেইলিউর অ্যাসেসমেন্ট (এসওএফএ) স্কোর ব্যবহার করছেন। তারা লক্ষ করেছেন, কোমরবিডিটি থাকা ৮০ বছরের বেশি বয়স্ক রোগীদের এসওএফএ স্কোর বেশি এবং ডি-ডিমার অত্যধিক, যা জমাটবদ্ধতার বর্ধমান কর্মকাণ্ডের ইঙ্গিত দেয়, আরোগ্য লাভের সম্ভাবনা খুব কম এবং হয়তো মৃত্যু হতে পারে।

৩. কোভিড-১৯-এর জন্য কোন ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা?

মানবদেহে কোভিড-১৯-এর উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার জন্য দুই ধরনের মলিকিউলার পরীক্ষা রয়েছে। এগুলো হলো পিসিআর ও আরটি-পিসিআর। শ্বাসনালীর ওপর ও নিচের অংশ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে এই পরীক্ষায় ভাইরাসের জিনগত উপাদান শনাক্ত করা হয়। এই পরীক্ষায় পজিটিভ ফল আসবে ভাইরাস এখনও বিদ্যমান এমন আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে। সংক্রমিত হয়েছেন, সুস্থ হয়েছেন বা শরীর ভাইরাসমুক্ত হয়েছে—এমন ক্ষেত্রে এই পরীক্ষায় পজিটিভ ফলাফল আসবে না। এটি একটি স্পর্শকাতর পরীক্ষা এবং নমুনা সংগ্রহ থেকে শুরু করে ফলাফল পর্যালোচনা পর্যন্ত প্রশিক্ষিত লোকদের দিয়ে করানো উচিত। অন্যথায় ভুয়া নেগেটিভ ফল আসতে পারে।

কোভিড-১৯ আক্রান্ত কোনও রোগী সুস্থ হয়ে উঠলে সেরোলজিক্যাল টেস্ট করা হয়। এতে ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর অ্যান্টিবডি শনাক্ত করা হয়। উপসর্গ আছে বা হালকা লক্ষণ আছে—এমন আক্রান্তদের ক্ষেত্রে এই শনাক্তকরণ কাজে লাগতে পারে।

সম্প্রতি অ্যাবোট ল্যাবরেটরিজ ৫ মিনিটে কোভিড-১৯ পরীক্ষার কিট উদ্ভাবনে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) অনুমোদন পেয়েছে। জটিল পরীক্ষাগার ছাড়াই ডাক্তারের চেম্বার বা ছোট হাসপাতালে এই কিট দিয়ে পরীক্ষা করা যাবে। এই কিট মাত্র ৫ মিনিটে পজিটিভ ফলাফল জানাতে পারবে এবং নেগেটিভ রেজাল্টের ক্ষেত্রে ১৩ মিনিটের মতো সময় লাগবে।

ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার ব্যয়, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং সেল্ফ-আইসোলেশন স্বল্পমেয়াদে যেকোনও দেশের জন্যই অনেক বেশি। দীর্ঘমেয়াদে, আরও দ্রুত নিয়ন্ত্রণ সামাজিক দূরত্ব পদক্ষেপের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যয় হ্রাস করবে। যা বাণিজ্য, কমিউনিটি ও ব্যক্তিপর্যায়ে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

৪. কেন বয়স্ক রোগীদের জন্য কোভিড-১৯ এত প্রাণঘাতী?

করোনাভাইরাসের প্রতিক্রিয়া আক্রান্ত ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও ভাইরাসের সংস্পর্শে থাকার সময়কালের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। এখন পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া গেছে তাতে দেখা গেছে, ভাইরাল সংক্রমণ আক্রান্ত ব্যক্তির (হোস্ট) দেহে অত্যধিক প্রদাহ প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে সক্ষম। কোমরবিডিটি থাকা বয়ষ্ক রোগীদের হয়তো ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে। যাতে করে ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করার জন্য সক্রিয় লিউকোসাইটস দ্বারা অত্যধিক সাইটোকাইনস তৈরি হয়, যা হয়তো শেষ পর্যন্ত কোষের মারাত্মক ক্ষতি করে। এটি কয়েকটি শ্রেণির কোষের বৃদ্ধি দ্রুততর করে এবং অপরগুলোর বিকাশে বাধা দেয়।

এই সময় প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখার জন্য সুষম খাদ্য, সম্পূরক, ভিটামিন সি ও ডি, জিংক ও যথেষ্ট পরিমাণ গরম তরল পান করা উচিত।

৫. বাংলাদেশ কি নাগরিকদের সহযোগিতায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে পারবে?

সারা বিশ্ব ভার্চুয়াল কর্মক্ষেত্র ও ভার্চুয়াল শিক্ষা কার্যক্রমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাতেও রোগীদের ভার্চুয়াল পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে।

বাংলাদেশে রয়েছেন ৯ কোটি ৫ লাখ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং এরমধ্যে ৮ কোটি ৪৬ লাখ মানুষ তাদের মোবাইল থেকে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারেন। ডিজিটাল কানেক্টেভিটির এই অগ্রসরতা এখন রোগী দেখার ক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। একাধিক স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক স্টার্টআপ, টেলিকম কোম্পানি ও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপসে ভিডিও কনফারেন্স সুবিধা রয়েছে, যা ডাক্তার-রোগী পরামর্শের ক্ষেত্রে জরুরি সময়ে কাজে লাগানো যেতে পারে। যদি মহামারি ঘটে তাহলে স্বাস্থ্যসেবা দাতারা জরুরি অবস্থায় সামনের সারিতে থাকেন, আশঙ্কাজনকদের কেয়ার ইউনিট এবং ওয়ার্ডগুলোতে অতিরিক্ত সরঞ্জামের প্রয়োজন হবে। ওই সময় নন-ইন্টারনাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, মেডিক্যাল কর্মকর্তা, চতুর্থ ও চূড়ান্ত বর্ষের মেডিক্যাল শিক্ষার্থী ও অন্যদের কাজে লাগানোর জন্য টেলিমেডিসিন একটি দারুণ সুযোগ হতে পারে। যাতে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় সামনের সারিতে থাকা স্বাস্থ্যকর্মীদের চাপ কিছু লাঘব হয়।

হটলাইন নম্বর #৩৩৩২-এর মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য কর্তৃপক্ষ কর্তৃক উপযুক্ত নির্দেশনার ভিত্তিতে যাচাই এবং সন্দেহভাজন কোভিড আক্রান্তদের জন্য চিকিৎসাসেবা দেওয়া যেতে পারে। দেশের ভেতরে তদারকি ও আইসোলেশনের জন্য হটস্পটগুলোকে চিহ্নিত করতে ইন্টারনেটকে উদ্ভাবনী উপায়ে ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে। জনগণকে কোভিড সংশ্লিষ্ট তথ্য জানানোর জন্য এমহেলথ ইতোমধ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটাকে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন নয় এমন রোগীদের পরামর্শ দিতে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।

ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা সম্পর্কে ধারণা পেতে আমরা জনতত্ত্ব পর্যালোচনা করছি এবং আশা করছি, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বিস্তার হয়তো দুর্বল হয়ে পড়বে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—আমরা জানি না। রোগটি যদি বাংলাদেশেও একই প্রবণতা বজায় রাখে তাহলে এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে আক্রান্তের সংখ্যায় উল্মফন দেখার আশঙ্কা করতে পারি। তবে সংক্রমণের প্রবণতায় এটাও দেখা গেছে যে ঘনবসতিপূর্ণ যেসব শহরে লকডাউন বিলম্বে জারি করা হয়েছে, সেখানে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশে সরকার দ্রুতই সামাজিক দূরত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছে, যা নিশ্চিতভাবেই সংক্রমণ কমিয়ে দেবে। যদি দ্রুত পরীক্ষা শুরু হয়, আমরা আশা করতে পারি এপ্রিলের মাঝামাঝিতে সর্বোচ্চ সংখ্যক আক্রান্ত দেখতে পাবো।

এই মহামারি নিজেদের চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রস্তুত করতে বাধ্য করেছে। এই মুহূর্তে অস্থায়ী ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটের সংখ্যা বাড়ানো, স্বাস্থ্যসেবা দাতাদের সুরক্ষা প্রদান, লাখো পরীক্ষার কিটের প্রাপ্তি নিশ্চিত করা এবং গুজব ছড়ানো উপায়ে নিজে নিজে চিকিৎসা না গ্রহণের জন্য সচেতনতা তৈরিতে সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় প্রয়োজন।

এছাড়া, এটি সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান যে ন্যায্য স্বাস্থ্যসেবা বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের উন্নতি ও স্বাস্থ্যের ডাটা ইন্টিগ্রেশনের জন্য আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বড় ধরনের সামর্থ্য গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় আমরা এখন যে হুমকি মোকাবিলা করছি, সেই ঝুঁকি সব সময় থাকবে।

লেখক: উদ্যোক্তা এবং স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞ

/এএ/এসএএস/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ