করোনা দেখালো আমাদের ‘গরিবি’ শুধু টাকার না

Send
ডা. জাহেদ উর রহমান
প্রকাশিত : ১৯:২২, এপ্রিল ০৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:২৪, এপ্রিল ০৩, ২০২০

ডা. জাহেদ উর রহমান২০০৫ সালে হ্যারিকেন ‘ক্যাটরিনা’ আমেরিকার নিউ অরলিন্স এবং এর আশপাশের এলাকায় আঘাত করে। এটার প্রভাবে ১২৫ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়। ঝড়টা প্রচণ্ড শক্তিশালী ছিল, তাই এই ক্ষয়ক্ষতি ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু সেই ঝড়েই ১২০০ মানুষ মারা যায়। আমেরিকার মতো দেশে একটা ঝড়ে, যেটার অগ্রিম সঠিক পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, তাতে এত মানুষের মৃত্যু নিয়ে ভীষণ সমালোচনা হয়েছিল, এমনকি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের উদাহরণ‌ও এসেছিল। ‌তদন্তে দেখা গিয়েছিল ওই এলাকায় এই মাত্রায় ঝড় নিকট অতীতে আর হয়নি বলে এ ধরনের ঝড়ে করণীয় সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি ওই এলাকায় সরকারি কর্তৃপক্ষ।
৩১ ডিসেম্বর চীন অফিসিয়ালি করোনাভাইরাসের ঘোষণা দেওয়ার পর বাংলাদেশ অফিসিয়াল স্বীকৃতি দেওয়ার মাঝে দুই মাস আট দিন সময় পাওয়া গিয়েছিল। এর আগেই করোনা ছড়িয়েছিল ১০১টা দেশে।  পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশগুলো আমাদের আগেই এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। ফলে আমরা খুব স্পষ্টভাবেই দেখতে পাচ্ছিলাম কোন‌ও দেশ করোনা আক্রান্ত হলে কী পরিস্থিতি তৈরি হয়। আমরা এটাও দেখতে পাচ্ছিলাম সেই পরিস্থিতি ঠেকানোর জন্য কোন কোন পদক্ষেপ কোন কোন সময়ে নিতে হয়।
অবকাঠামো আর অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রচণ্ড প্রপাগান্ডা সরকার করে প্রতিনিয়ত, কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের এই প্রপাগান্ডা যে অসার, সেটা বোঝার জন্য অর্থনীতিবিদ হতে হয় না। তার ওপরে গত বছরটা দেশের অর্থনীতি তুলনামূলক অন্য সব বছরের চেয়ে খারাপ ছিল। তাই অনেক বেশি আর্থিক সামর্থ্য প্রয়োজন করোনার সঙ্গে যুদ্ধে এমন কাজ সরকারের জন্য করা কঠিন, এটা মানি। সেজন্য উন্নত বিশ্বের নেতারা কে কী করছেন, কী বলছেন, সামাজিক মাধ্যমে সেসবের লিংক ঘুরে বেড়ালেও আমি সেদিকে তাকাই খুব কমই। আমাদের জন্য মর্মান্তিক ব্যাপার হচ্ছে, যেটুকু সম্পদ আছে সেটা ঠিকমতো ব্যবহার করতে আমরা কি আদৌ আন্তরিকতা এবং সদিচ্ছা দেখিয়েছি? শুধু সদিচ্ছা আর আন্তরিকতা দিয়ে আমাদের আশপাশেই করোনা নিয়ন্ত্রণ করার অসাধারণ নজির আছে। সেই প্রসঙ্গে পরে আসছি।
করোনার প্রকোপ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাথে এই রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনাগত সংকট খুব স্পষ্টভাবে আমাদের সামনে এসেছে। এই দেশের জিডিপির তুলনায় খুব সামান্য টাকা খরচ করলে, এমনকি কোনও টাকা খরচ করা ছাড়াও নেওয়া যেত এমন সব পদক্ষেপ‌ও নিতে গিয়ে চরম সমন্বয়হীনতা এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা দেখা গেছে। নাগরিক হিসাবে এটা দেখা খুবই হতাশার ব্যাপার আমাদের জন্য। যে দেশের আর্থিক সামর্থ্য কম সেই দেশ ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা দিয়ে আর্থিক দুর্বলতা অনেকটাই কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করবে এটাই প্রত্যাশা থাকে, কিন্তু হয়নি সেটা। দুই একটা উদাহরণ দিয়েই দেখা যাবে আমরা কী ভীষণ ঔদাসীন্য দেখিয়েছি ব্যবস্থাপনাগত দিকে।
শুরুতেই কথা বলা কোয়ারেন্টিন নিয়ে। বিমান যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া উচিত ছিল আরও অনেক আগেই, কিন্তু সেটা চালু রাখায় জানুয়ারি থেকে লক্ষ লক্ষ বিদেশি দেশে ফিরেছে করোনা আক্রান্ত দেশগুলো থেকে। বিদেশ ফেরতদের ব্যাপারে পুলিশের বরাত দিয়ে দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা জানায়, জানুয়ারি থেকে সাড়ে ছয় লাখ মানুষ দেশে এসেছেন। এরমধ্যে মার্চ মাসের ২০ দিনেই এসেছেন ২ লাখ ৯৩ হাজার। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এসেছেন করোনা আক্রান্ত দেশগুলো থেকে। আর গতকাল পর্যন্ত কোয়ারেন্টিনে গেছেন মাত্র ১৭ হাজার ৭৯০ জন। এমনকি যারা কোয়ারান্টিনে আছেন তারাও সঠিকভাবে এর নিয়ম পালন করছেন না। দেশে আসার সময় সঠিক ঠিকানা না দেওয়া এবং পাসপোর্টের ঠিকানায় অবস্থান না করার কারণে ফিরে আসা এসব লোককে খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ।
বিদেশ ফেরতদের শনাক্ত করে কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে, এটা গত জানুয়ারি থেকেই একজন সচেতন মানুষও জানে। সরকারও পরে চেষ্টা করেছিল তাদের কোয়ারান্টিনে নেওয়ার জন্য, কিন্তু যখন চেষ্টা করছিল তখন আর তাদের হদিস পাওয়া যায়নি। এই মানুষগুলো নানারকম জমায়েতে গিয়ে ঘুরে বেড়িয়ে করোনা ছড়িয়েছেন। বিদেশ ফেরতদের ভারত হাতে সিলমোহর দিয়ে চিহ্নিত করে দিয়েছিল, এটা দেখলেও আমরা করিনি, করলাম অনেক পরে। সেটা করলে এদের চিহ্নিত করা কঠিন হতো না। শুধু আগেভাগে ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে বিদেশ ফেরতদের কোয়ারেন্টিন নিয়ে এই সমস্যাটা হয়েছে। দেশের বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামোতে এ ব্যবস্থাপনাটা এখনকার তুলনায় অনেক কম লোকবল দিয়ে করা যেত, কিন্তু করা হয়নি। ‌
শুধু কি তা-ই? আইইডিসিআরের সতর্কবাণী সত্ত্বেও ঢাকাসহ তিনটি সংসদীয় আসনে উপনির্বাচন হয়েছিল। এরপর সাধারণ ছুটি শুরুর প্রাক্কালে মানুষ যেভাবে ভীষণরকম ভিড় করে বাসে ট্রেনে লঞ্চে করে বাড়ি ফিরেছে সেটাও সরকারের অসচেতনতার প্রভাব। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যখন জনগণের কাছে এরকম বার্তা পৌঁছে তখন জনগণও অসচেতন থাকবে এটাই স্বাভাবিক।
অথচ এদের কারণেই আমরা বিপর্যয়ের মুখে পড়তে যাচ্ছি। অনিয়ন্ত্রিত মানুষ কী ভয়াবহ পরিমাণ করোনা সংক্রমণ ঘটাতে পারে, তার অসাধারণ উদাহরণ ভারতের পাঞ্জাবের বলদেব সিং। ইতালি-জার্মানি থেকে ফিরে তিনি ধর্মীয় জমায়েত এবং অন্যান্য সামাজিক মেলামেশার মাধ্যমে ৪০ হাজার মানুষের দেহে করোনা সংক্রমণ ঘটিয়েছেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এবং সেই কারণেই ওইসব এলাকা পুরো লকডাউন করা হয়েছে।
ডাক্তারদের জন্য সুরক্ষা পোশাক (পিপিপি), আইইডিসিআর ছাড়াও আর‌ও বেশ কিছু টেস্ট সেন্টার আগে থেকেই বানিয়ে রাখা, পর্যাপ্ত টেস্ট কিট সংগ্রহ করে রাখা, এসব করা যেত খুব সামান্য টাকায়। এখন সবকিছু খুবই বাজে অবস্থায় চলে যাওয়ার পর তড়িঘড়ি করে করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এগুলো স্রেফ ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা। রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য দেশের খুব গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রতিষ্ঠান সিডিসি এবং আইইডিসিআর-এ কাজ করা একজন বিশেষজ্ঞ একটি টিভি চ্যানেলকে জানান, দেড় মাস আগেই সরকারকে টেস্ট কিট এবং পিপিই সংগ্রহের তাগিদ দিয়েছিলেন তিনি। তখন সামান্য বিনিয়োগ আজকের ভয়ঙ্কর ক্ষতি রোধ করতে পারতো।
পিপিই’র এই আকালে যখন আমরা ডাক্তারদেরও পিপিপি দিতে পারছি না, তাদের পিপিপি ছাড়াই রোগী দেখার প্রজ্ঞাপন জারি করা হচ্ছে, তখনই দেখা যায় প্রশাসনের কর্মকর্তারা এবং ব্যাংক কর্মকর্তা পিপিপি পরে রীতিমতো ফটোসেশন করছেন।
ডাক্তার এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরাই করোনা আক্রান্তের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে থাকেন। সব রকম সুরক্ষা থাকার পরও তাদের ঝুঁকি থাকে অনেক বেশি। ইতালিতেই সব রকম সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকার পরও ৪৫ জন ডাক্তারের মৃত্যু হয়েছে এবং আরও ৬ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী করোনা আক্রান্ত হয়েছে।
আমরা কি কল্পনাও করতে পারছি এসব তথ্য মাথায় রেখে যেসব ডাক্তার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রোগীর সংস্পর্শে আসছেন তাদের প্রশাসন আর ব্যাংক কর্মকর্তাদের ফটোসেশন দেখতে কেমন লাগছে? রোগী দেখার মতো ন্যূনতম মোটিভেশন কি তাদের থাকার কথা? এটা চরম অব্যবস্থাপনার আরেক নজির।
সাম্প্রতিকতম সমস্যা হচ্ছে, গত কয়েকদিন ধরে রাস্তায় পুলিশি অ্যাকশন। রাস্তায়‌ বেরোনো মানুষকে কনস্টেবল পর্যায়ের পুলিশ পিটিয়েছে, কান ধরে উঠবস করিয়েছে কিংবা তপ্ত রাস্তায় হামাগুড়ি দিতে বাধ্য করেছে এমন সব তথ্য সামাজিক মিডিয়ায় তো বটেই, মূল ধারার মিডিয়া এসেছিল। সবশেষ দেখা গেল যশোরের মনিরামপুরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইয়েমা হাসান ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে গিয়ে মাস্ক না পরার অপরাধে তিন জন বয়োবৃদ্ধ মানুষকে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন। তিনি কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখার ছবি মোবাইলে ধারণ করেন। শুধু সেটাই না, তিনি সেটা সরকারি ওয়েবসাইটে তার পেজে আপলোড করেছেন। সরিয়ে ফেলার আগ পর্যন্ত ছবিটা বেশ কিছুক্ষণ সেখানে ছিল।
খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো এটা কি লকডাউন ছিল? জনগণকে কি যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে জানানো হয়েছিল এই অবস্থায় বেরোতে হলে কী করা যাবে বা কী করা যাবে না? কেউ বের হলে তাকে কীভাবে সামলাতে হবে কিংবা কোন শাস্তিই বা দিতে হবে সেসব ব্যাপারে প্রশাসন এবং পুলিশকে কি যথেষ্ট পরিমাণ তথ্য বা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে? রাস্তায় বেরোলেই যে মাস্ক পরতে হবে এমন কোনও নিয়ম যে নেই সেটা কি এদের জানানো হয়নি? অবশ্য মোবাইল কোর্টে কাউকে কান ধরানো যে যায় না সেটা ওই এসিল্যান্ডের না জানার কোনও কারণ নেই।
ওদিকে বিবিসি বাংলা রিপোর্ট করে দেখিয়েছে নিষেধাজ্ঞার আওতায় নেই এমন দোকান খোলা নিয়ে পুলিশ ঝামেলা করেছে। নিষেধাজ্ঞা নেই এমন পণ্য পরিবহন গাড়ি ট্রাক যেতে দেয়নি পুলিশ, এমন সব ঘটনা অহরহ ঘটছে গত কয়েকদিন। ‌
এগুলো ঘটেছে শুধু ব্যবস্থাপনাগত অদক্ষতার জন্য। শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রশাসন যথেষ্ট পরিমাণ দক্ষতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামলাতে পারেনি বলেই এই বীভৎসতা, অসম্মানজনক নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ পুলিশের আইজিপিকে পুলিশের প্রতি নির্দেশ দিতে হয়েছে তারা যেন জনগণের সঙ্গে 'বিনয়ী, সহিষ্ণু ও পেশাদার' আচরণ করে।
একটা অনুন্নত অর্থনীতির দেশ হওয়া সত্ত্বেও ভারতের রাজ্য কেরালার উন্নয়ন দর্শন নিয়ে সারা পৃথিবীতে আলোচনা আছে। এটা 'কেরালা মডেল' নামে বিখ্যাত। কেরালা আবার মডেল হিসাবে আমাদের সামনে এসেছে করোনা প্রতিরোধের সাফল্যের জন্য। এই সাফল্য নিয়ে বিশ্বখ্যাত পোর্টাল হাফিংটন পোস্ট-এর ভারতীয় ভার্সন  '15 Ways Kerala Is Fighting The Good Fight Against Coronavirus' শিরোনামে রিপোর্ট করেছে। এই শিরোনামে সার্চ করে যে কেউ পড়ে দেখতে পারেন। তবে আমি একটা বিষয় উল্লেখ করতে চাই। কেরালা হোম কোয়ারেন্টিনের সময় ১৪ দিন না, করেছে ২৮ দিন। এরমধ্যে তাদের পছন্দসই খাবার সরবরাহ, ওয়াইফাই সুবিধা দিয়েছে। আমাদের হয়তো অবিশ্বাস্য লাগবে শুনতে, কিন্তু সত্য কথা হচ্ছে এই মানুষগুলোকে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। উন্নত দেশগুলোর মতো অঢেল টাকা কেরালার ছিল না, শুধু সদিচ্ছা আর আন্তরিকতা দিয়েই তারা এই চরম বিপদের দিনে জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে।
করোনা একদিন চলে যাবে এটা নিশ্চিত। মানুষের জীবন-জীবিকার ওপরে প্রভাবটা কত বড় হবে সেটাই হয়তো অনিশ্চিত। কিন্তু করোনা এই দেশের জনগণকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেল আমাদের গরিবি মানে শুধু টাকার অভাব না, আমাদের গরিবি মানে সদিচ্ছা আর ব্যবস্থাপনার অভাব‌ও। পরের দুটো গরিবি না থাকলে আমরা টাকার গরিবিকে ছাপিয়ে অনেক ভালোভাবে করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারতাম।

লেখক: শিক্ষক ও অ্যাকটিভিস্ট

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ