করোনার থাবার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনা মূলত একটি যুদ্ধ

Send
স্বদেশ রায়
প্রকাশিত : ১৭:৫২, এপ্রিল ০৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৫৪, এপ্রিল ০৫, ২০২০

স্বদেশ রায়এ মুহূর্তে পৃথিবীর সাড়ে সাত বিলিয়নের বেশি মানুষকে এটা মেনে নিতে হচ্ছে, তারা এক ধরনের ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের’ মধ্যে বাস করছে। তবে কোভিড-১৯ আক্রান্ত এ পৃথিবীকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পৃথিবী বললে বিপদকে সঠিক উপলব্ধি করতে পারছি বলে মনে হবে না। বাস্তবে পৃথিবী তার ৭০ হাজার বছরের সভ্যতার ইতিহাসে এমন সংকটে এর আগে কখনও পড়েনি। আগের অনেক মহামারি বা বৈশ্বিক মহামারিতে এর থেকে বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে, মারা গেছে, কিন্তু তার কোনোটার ধরন কোভিড-১৯-এর মতো এত ছোঁয়াচে ছিল না। এত ব্যাপকভাবে সারা পৃথিবীকে আক্রান্ত করেনি। অন্যদিকে, পৃথিবী তখন এতটা প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানে অগ্রসর ছিল না। তাই প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের প্রায় সর্বোচ্চ উন্নতির এ সময়ে কোভিড-১৯ এর কাছে অসহায় পৃথিবীকে সভ্যতার ইতিহাসে এ যাবৎকালের সব থেকে বড় সংকটই ধরতে হবে। এই সংকটে মানুষের নিজে বাঁচা ও অন্যকে বাঁচানোর জন্য ‘ঘরে থাকা’ ছাড়া কার্যকর কোনও কিছু করার নেই। এখন পর্যন্ত বিজ্ঞান ভিত্তিক যে পরিসংখ্যান পাওয়া যাচ্ছে তাতে সকলে ঘরে থাকলে কোভিড-১৯ (করোনা) বৃদ্ধির এ ঊর্ধ্বগতি নেমে মে মাসের মাঝামাঝি সমান্তরালে আসতে পারে। যদি তার আগে আসে তাহলে বলতে হবে, প্রকৃতি মানুষকে সহায়তা করেছে। আমেরিকার অনেক রাজ্য ইতোমধ্যে মে মাসের ৫ তারিখ অবধি লকডাউন ঘোষণা করেছে। আমাদের সার্কভুক্ত দেশ শ্রীলংকা মে মাসের মাঝামাঝি অবধি তাদের লকডাউনের সীমারেখা বাড়িয়েছে। উপমহাদেশে ভারত ও পাকিস্তানে আক্রান্তের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। তাই স্বাভাবিকই ধরে নেওয়া যায়, একটি দীর্ঘমেয়াদি বিপদকে মোকাবিলা করার প্রস্তুতি এখন প্রতিটি পরিবার ও প্রতিটি রাষ্ট্রকে নিতে হবে। এখন কোনও রাষ্ট্রেরই আগামী দিনের পরিকল্পনা ছাড়া বসে থাকার সময় নেই।

এদিক থেকে বিবেচনা করলে, দেশের মানুষের ও আগামী দিনের অর্থনীতির জন্য আজ (৫.৪.২০২০) সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে রাষ্ট্রীয় সহায়তার পরিকল্পনা ঘোষণা করলেন, তা বিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়োকচিত। কারণ, কোনও দেশেরই সময় নষ্ট করার মতো কোনও সময় হাতে নেই। ধরে নেওয়া হচ্ছে করোনার কারণে পৃথিবীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী মন্দার আকারে মন্দা আসবে। বাস্তবে মন্দাটা কত বড় হবে, তা এখনও ধারণা করা যাচ্ছে না। তবে যদি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী মন্দার হারে হয়, তাহলেও মোট অর্থনীতির ক্ষতির পরিমাণ সেখানে অনেক বেশি থাকবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী অর্থনীতির আকার থেকে বর্তমান পৃথিবীর অর্থনীতি এখন কয়েক হাজার গুণ বড়। এখানে শুধু একটা উদাহরণই যথেষ্ট, তখন চীন কোনও অর্থনৈতিক শক্তিই ছিল না। আর এখন চীনসহ পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতির আকারটাই বলে দেয় পৃথিবীর মোট অর্থনীতি কত বড় হতে পারে। এডিবির অনুমান অনুয়ায়ী পৃথিবীর অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ যদি ৪.১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার হয়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতির ক্ষতির আকারটি কী হবে তা সহজে অনুমান করা যায়। এই যে হিসাব করা হচ্ছে, এখানে ক্ষতি থেমে থাকলে অনেক রক্ষা। বাস্তবে বাড়তে পারে। প্রধানমন্ত্রীও তার সংবাদ সম্মেলনে সে শংকার কথা বলেছেন। এই শংকা থেকেই প্রধানমন্ত্রী সাড়ে ৭২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দিয়েছেন। কিন্তু তার আগে তিনি যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন, তা পণ্য সরবরাহ চ্যানেলে বাধাগ্রস্ত হওয়া।

বাস্তবে গোটা পৃথিবী বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার দিকে তাকিয়ে বোঝা যাচ্ছে, করোনাকাল দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তাই এখানে অন্যতম বিষয় পণ্য সরবরাহ চ্যানেল চালু রাখা। কোনোক্রমেই যেন সরবরাহ চ্যানেল ভেঙে না পড়ে। আমাদের পেট্রোল বোমার সেই ভয়াবহ দিনের সরবরাহ চ্যানেল বজায় রাখার অভিজ্ঞতা আছে। সে সময়ে অভিজ্ঞ ও দৃঢ় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে প্রধান করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কমিটি গঠন করে কাজ করা হয়েছিল। ওই কমিটি সারা দেশের দলীয় নেতাকর্মীদের তাদের সঙ্গে সংযুক্ত করে সরবরাহ চ্যানেল ঠিক রেখেছিল। এবারও তেমনি এ সরবরাহ চ্যালেন ঠিক রাখার জন্য একটি শক্তিশালী কমিটি করা দরকার। কারণ, করোনার লকডাউন ও রমজান একই সঙ্গে থাকতে পারে। তাই এ সময়ে পণ্য সরবরাহ চ্যানেল যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, তার জন্য আগেই ব্যবস্থা নিতে হবে। এই ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এ মুহূর্তে কতকগুলো কাজ দ্রুত করা দরকার। নিত্যপণ্য যে সকল ব্যবসায়ীরা আমদানি করে, তাদের লিস্ট সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক থেকে নিয়ে তারা কী পরিমাণ আমদানি করেছে, তার সঠিক তথ্যটি নেওয়া। এই পণ্য কোথায় আছে, তা চিহ্নিত করা। ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজ নিয়ে যে কাজ করেছে তাতে তাদের ওপর বিশ্বাস রাখার কোনও কারণ নেই। বরং তারা যাতে কোনোরূপ কৃত্রিমভাবে পণ্য সংকট তৈরি করতে না পারে, সেদিকে কঠোর দৃষ্টি রাখতে হবে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম পোর্টে যেন পণ্য খালাস ও পণ্য সরবরাহ আটকে না থাকে, এজন্য পোর্টকে মনিটর করার কাজ করতে হবে। একজন সৎ রাজনৈতিক নেতার নেতৃত্বে শক্তিশালী কমিটি করার দরকার এক্ষেত্রে। এই কমিটির কাজ কিন্তু মোটেই সহজ নয়। কারণ, পোর্টের এই খালাস ও সরবরাহে বিঘ্ন ঘটিয়ে বাজারে দাম বাড়িয়ে ব্যবসায়ীদের যে সুবিধা দেওয়া হয়, এখানে বড় কমিশন কাজ করে। আর এই কমিশন বাণিজ্য ও পোর্ট নিয়ন্ত্রণ কয়েকটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও সরকারি দলের কয়েক নেতাই করছে। এরা অনেক শক্তিশালী। তাদের অর্থের কাছে অনেকেই পরাজিত। প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে তাদের একজনকে আংশিক সাজা দিয়েছেনও। তবে এখনই পুরো সিন্ডিকেটকে নিষ্ক্রিয় করতে হবে। এভাবে আপৎকালীন সরবরাহ চ্যানেল চালু করা ও পোর্টের সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলতে পারলে সারা দেশে পণ্য সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হবে না। পণ্যমূল্যও মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।

পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে আপৎকালীন ব্যবস্থায় পণ্য পরিবহন চালালে কৃষি পণ্যের দাম ঠিক থাকবে। গ্রামেও বড় আকারের কোনও অভাব দেখা দেবে না। অন্যদিকে, আমদানিনির্ভর পণ্য অর্থাৎ ভোজ্যতেল (বিশেষ করে সয়াবিন ও পাম ওয়েল), চিনি, লবণ, এগুলো যেসব ব্যবসায়ী আমদানি করে তাদের সঠিক তালিকা ব্যাংক থেকে নিয়ে তাদের মনিটর করা ও বিশেষ করে তারা যাতে কোনোরূপ গোপন মজুত বা অন্য কোনও প্রকারে কৃত্রিম সংকট ঘটাতে না পারে, সে ব্যবস্থা নিতে হবে। এখানে কোনও মুখ চেনা ব্যবসায়ী বিশেষ সুযোগ না পায়, সেদিকে খেয়াল রাখা হবে অন্যতম জরুরি কাজ। এর পাশাপাশি এবারের রমজানে সত্যি অর্থে কৃচ্ছ্রতা সাধনের দিকে যাতে মানুষ মনোযোগী হয়, সেভাবেই মোটিভেট করার কাজটি এখন থেকে করা প্রয়োজন।

পণ্য সরবরাহ লাইন ঠিক থাকলে করোনাকাল ও রমজান মাসে মানুষ কষ্ট পাবে না। কিন্তু ততদিনে দেশের অর্থনীতিতে অনেক ক্ষতির কারণ দেখা দেবে। এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রধানমন্ত্রী তার সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জিডিপির প্রায় ২.২ শতাংশ আকারের একটি প্রণোদনা দিয়েছেন। যার আকার সাড়ে বাহাত্তর হাজার কোটি টাকা। এর ভেতর ৫০ হাজার কোটি টাকা শিল্পে ও ব্যবসায়ে, বাকিটা সামাজিক সুরক্ষায়। সামাজিক সুরক্ষায় সরকারের অনেক কর্মসূচি রয়েছে, তার সঙ্গে সাড়ে বাইশ হাজার কোটি টাকা যোগ হলে দেশের দরিদ্র ও বয়স্ক নাগরিকরা সুরক্ষিতই থাকবেন। কারণ, এখানে একটি সাহস সবার মনে থাকা দরকার, করোনায় পৃথিবীতে যাই ঘটুক না কেন, বাংলাদেশে কোনও দুর্ভিক্ষ হবে না। বাংলাদেশের কৃষি অনেক শক্তিশালী। কৃষি উৎপাদন যেখানে গিয়েছে, তাতে বাংলাদেশের মানুষের ভাত ও আলু ভর্তা খেয়ে থাকার ক্ষেত্রে কোনও অভাব হবে না। খাদ্যের ক্ষেত্রে সংকট একান্ত হলে হয়তো শহরে উন্নতমানের ব্রেড, বিদেশি বাটার, সিরিয়াল, স্কিম মিল্ক এগুলোর দাম বাড়তে পারে। এর বেশি খাদ্য সংকটে পড়বে না বাংলাদেশ। তবে এখন থেকেই কৃষিকে মনিটর করতে হবে এবং কৃষি মন্ত্রণালয়কে আগামী সংকট কাটানোর জন্য ‘বিশেষ মন্ত্রণালয়’ মনে করতে হবে। অবশ্য এখানে অর্থ, কৃষি, বাণিজ্য ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের একটি কার্যকর সমন্বয়ের দরকার দেখা দেবে। কৃষিকে প্রধান রেখে সেটা করতেই হবে।

অন্যদিকে বৃহৎ শিল্প ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের জন্য ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। যেখানে ঋণ গ্রহীতাকে সুদ দিতে হবে মাত্র ৪.৫ শতাংশ, বাকি ৪.৫ শতাংশ সুদের টাকা সরকার ভর্তুকি দেবে। এই ঋণ দেওয়া হবে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসেবে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, আমাদের বড় শিল্প মালিক ও ব্যবসায়ীদের একটি অংশের ব্যাংকের ঋণ নিয়ে সেটা ফেরত না দেওয়ার কালচার। এ কারণে এখানে সবার আগে দেখতে হবে, কোনও ‘ঋণ খেলাপি’ যেন এই ৩০ হাজার কোটি টাকা থেকে কোনও ঋণ না পায়। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন তাদের এই ঋণ দেওয়ার নীতি তৈরি করবে। তাদের এদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এই সকল খেলাপির ঠিকুজি বাংলাদেশ ব্যাংকে আছে। প্রয়োজনে তারা যেন একটি তালিকা সব ব্যাংকে পাঠিয়ে দেয় যে এই সকল ব্যবসায়ী বা শিল্পপতিকে এ ৩০ হাজার কোটি টাকা থেকে কোনও ঋণ দেওয়া যাবে না। বরং যে কথাটি সংবাদ সম্মেলনে অর্থ সচিব বলেছেন সেদিকেই গুরুত্ব দিতে হবে, তাদেরকেই ঋণ দিতে হবে যারা দ্রুত টাকা শোধ করে আবার ঋণ নিতে পারে। অর্থাৎ বছরে এটা যেন অন্তত দুই টার্ম হয়। তাতে ৩০ হাজার কোটি টাকা বাস্তবে ৬০ হাজার কোটি টাকায় পরিণত হবে। এই দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে হলে আসলে এই ধরনের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিই দেশের জন্য এখন প্রয়োজন। আর এক্ষেত্রে ব্যাংকের বোর্ড মেম্বারদের সর্বোচ্চ দক্ষতা, সততার পরিচয় দিতে হবে, যাতে এই টাকার সঠিক ব্যবহার হয়। তাদেরও মনে রাখতে হবে, মানব সভ্যতার ইতিহাসের এক মহাদুর্যোগে দেশের অর্থনীতিকে বাঁচানোর দায় পড়েছে তাদের ওপর। 

ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্প ও ব্যবসায়ে ২০ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা ঋণের ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী, যার ৯ শতাংশ সুদের ৫ শতাংশই সরকার ভর্তুকি দেবে। এই ঋণের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বিশেষ করে পোল্ট্রি ও মৎস্য খামারের কথা নিজেই উল্লেখ করেছেন। বাস্তবে লকডাউনের ফলে মৎস্য খামারও ক্ষতির মুখে, তবে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে পোল্ট্রি। তাদের ৩৫ টাকা দামের মুরগির বাচ্চার দাম এক টাকায় নেমে এসেছে। বড় মুরগি তারা পানির দামে বিক্রি করে দিয়েছে। এর পাশাপাশি ছোট দোকানদার বা এধরনের অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এই সময়ে তাদের পুঁজির আংশিক খেয়ে ফেলতে বাধ্য হবে। যদিও প্রণোদনায় বলা হয়েছে, ব্যাংক কাস্টমার রিলেশনশিপের ভিত্তিতে এরা ঋণ পাবে। তারপরে এই ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানের নীতি করার ক্ষেত্রে আরও একটি দিক দেখতে হবে, অনেকেই ছোট ব্যবসা বা ছোট মৎস্য খামার, পোল্ট্রি বা মুরগির খামার, গরুর খামার করেন কোনোরূপ ঋণ ছাড়া। তারা তাদের পুঁজির আংশিক খেয়ে ফেলার কারণে তাদের ব্যাংক ঋণের প্রয়োজন হতে পারে। অথচ তারা এর আগে কোনোদিন ঋণ নেয়নি। সেক্ষেত্রে ‘ব্যাংক -কাস্টমার রিলেশনে’ তারা ঋণ পাওয়ার যোগ্য হবে না। তাদের জন্য কোনও একটা বিধান রাখতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংককে। এর সঙ্গে দরকার হবে অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জন্য বিনা জামানতে ঋণ। সে বিষয়টিও কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সেটাও বাংলাদেশ ব্যাংককে ভাবতে হবে। তবে বিষয়টি যেহেতু পলিটিক্যাল ইকোনমির, তাই এ বিষয়ে নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে সহায়তা করার জন্য সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয় বিষয়ক কমিটি বা অর্থ, কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মিলে কোনও কমিটি তৈরি করা যেতে পারে। এর ভেতর দিয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে কাজে লাগালে তারা প্রকৃত সমস্যা ও সমাধান তুলে ধরতে পারবেন। আর সেটা বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিতে প্রতিফলন ঘটলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা লাভবান হবেন।

প্রধানমন্ত্রী তার প্রণোদনায়, অর্থ সরবরাহের জন্য ব্যাংককে সুযোগ দেওয়ার কথা বলেছেন। তিনি এখানে একটু আশঙ্কা করেছেন মুদ্রাস্ফীতির। বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক যদি সঠিকভাবে মনিটর করে, তাহলে মুদ্রাস্ফীতি ঘটার কথা নয়। তবে মুদ্রারবাজারে এই সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারের ও ব্যাংকের মুদ্রা জোগানের দিকটিও চিন্তা করা দরকার। এক্ষেত্রে সম্প্রতি যে ব্যাংকের নয় ও ছয় পার্সেন্ট সুদের কথা বলা হচ্ছে, অর্থাৎ সেভিংসে ছয় ও শিল্প ব্যবসা ঋণে নয় শতাংশ সুদ—এটাকে এ মুহূর্তে ভিন্ন দৃষ্টিতে বিবেচনা করা যেতে পারে। অর্থনীতির এই মন্দায় বড় ও দীর্ঘস্থায়ী শিল্প দুয়েক বছরের জন্য বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাছাড়া এই প্রণোদনার বাইরেও দেশে ট্রেডিংয়ের সময়ে অর্থ জোগান বেশি জরুরি হয়ে উঠবে। তাই ট্রেডিংয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংক কাস্টমার রিলেশনে ব্যাংক যদি তার নিজস্ব সুদ নির্ধারণ করতে পারে, তাহলে ব্যবসা ও ঋণ প্রবাহ বাড়ার সম্ভাবনা বেশি। অন্যদিকে এই করোনার ধাক্কার পরেও সারা দেশের সাধারণ মানুষের হাতে প্রচুর অর্থ থাকবে। সেখানে ব্যাংকগুলোকে বিশেষ আকর্ষণের স্কিমের অধীনে টাকা সঞ্চয়ের সুযোগ দিলে সাধারণ মানুষ ব্যাংকে ফিরে আসবে অনেক বড় আকারে। তাতে ব্যাংকের হাতে বা সরকারের হাতে টাকার জোগান বাড়বে। এই টাকার জোগান অভ্যন্তরীণ বাজারকে শক্তিশালী করবে এবং উন্নয়নের চাকা সচল রাখতে অনেক বড় সহায়ক হবে। এমনকি এই টাকার জোগান থেকে যে পরোক্ষ অর্থনৈতিক সুবিধা হবে, তা ৭২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনার থেকে বেশি হতে পারে। তাই এই অর্থের জোগান বাড়াতে সরকার এদিকটা এ মুহূর্তে ভেবে দেখতে পারে। তাছাড়া অর্থনৈতিক মন্দার সময় শেয়ারবাজার নিয়ে কারসাজি ঘটতে পারে। মানুষ সেই প্রলোভনে পড়ে অর্থ শেষ না করে যাতে ব্যাংকে থাকে, সেদিকটিও চিন্তা করা যেতে পারে। কারণ, এই দুর্যোগে যেন শেয়ারবাজারে ধাক্কা না আসে আবার। কারণ, দুর্বৃত্তদের কখনও বিশ্বাস করতে নেই। বাস্তবে করোনাকালে দেশ যেমন একটি যুদ্ধ করছে, করোনা উত্তর অর্থনৈতিক মোকাবিলাও মূলত আরেকটি যুদ্ধ। তাই যুদ্ধকালীন বিবেচনায় সবকিছু ভাবতে হবে। 

লেখক: রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ
X