করোনা-উত্তর সময়ে আমরা কীভাবে বাঁচবো?

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ১৩:৪৭, এপ্রিল ০৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৩৩, এপ্রিল ০৬, ২০২০

আমীন আল রশীদএমন ভুতুড়ে শহর এর আগে আপনি কোনোদিন দেখেননি। ভরদুপুরেও সুনসান নগরী। রাস্তায় চলাচল নেই। চারদিকে নীরবতা। সারা বছরের ব্যস্ত মানুষেরা গৃহবন্দি; ‘লকডাউন’, মানে সবকিছু অচল। প্রায় পুরো পৃথিবীই এখন নিশ্চল।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন ভয়ঙ্কর আর গা শিউরে ওঠা ছুটির কথা এই সময়ের মানুষেরা স্মরণ করতে পারে না। এ এক বিষাদময়, অনিশ্চয়তায় ভরা ছুটি—যেখানে কোনও আনন্দ নেই। বরং মানুষের ভাবনার শরীর লেপ্টে আছে এক ঘোর অন্ধকারে।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত ছুটি থেকে পৃথিবীর মানুষ একসময় নিষ্কৃতি পাবে বটে। কিন্তু তার পরের পৃথিবী কেমন হবে?
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বা বৃহৎ শক্তিবর্গের অস্ত্রের প্রতিযোগিতা নয়। বরং সামান্য এক অদৃশ্য ভাইরাসে নাকাল পুরো পৃথিবী। সব রাষ্ট্রযন্ত্র বিকল। পারমাণবিক বোমার পরীক্ষাগারের বিজ্ঞানীও গৃহবন্দি। কাজ নেই। সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষটিও এখন নিজের হাতকে অবিশ্বাস করেন। অজান্তে, বেখেয়ালে যাতে নিজের অপরিষ্কার বা ‘আনস্যানিটাইজড’ হাতের স্পর্শ মুখে না লাগে, সেজন্য বোধহয় ঘুমের মধ্যেও তিনি আঁতকে ওঠেন। নিজেকে অবিশ্বাসের এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি এই পৃথিবীর মানুষ এর আগে আর কবে হয়েছে?

কিন্তু এই পরিস্থিতির জন্য তার নিজের কি কোনও দায় নেই? যদি থাকে, তাহলে আজ সে তো নিজেই নিজের শত্রু  হবে এবং সামান্য এক ভাইরাসের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করবে, এটিই স্বাভাবিক। তাহলে প্রশ্ন, যে মারণাস্ত্র, যে পারমাণবিক বোমা সে তৈরি করেছিল শত্রুকে ধ্বংস করার জন্য, সেই অস্ত্রই যেহেতু আজ অসহায় সামান্য এক ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়তে;  যে অস্ত্রের সঙ্গে নির্জীব লাঠির কোনও তফাৎ নেই; যে অস্ত্র তাকে রক্ষা বা সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ—করোনা-উত্তর পৃথিবীতেও কি সেই মারণাস্ত্র আর পারমাণবিক বোমার পেছনে জনগণের কষ্টে অর্জিত বিলিয়ন ডলার খরচ করা হবে, নাকি সেই অর্থ দিয়ে পৃথিবীটাকে আরেকটু বাসযোগ্য, পশু ও পাখিদের জন্য আরও কিছু অভয়ারণ্য, নিরন্ন মানুষের জন্য আরেকটু খাবারের ব্যবস্থা করা হবে?

করোনার কালে পৃথিবীর মানুষ যেভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো, এক দেশ থেকে অন্য দেশ তো বটেই, এমনকি ঘরের মধ্যে একজন আরেকজন থেকেও বিচ্ছিন্ন—করোনা-উত্তর পৃথিবীর মানুষেরা কি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করবে না, যাতে তারা একসঙ্গে, গায়ে গা ঘেঁষে, ভালোবাসা আর সহমর্মিতা নিয়ে একে অপরের পাশে দাঁড়াতে পারে? তারা কি এমন একটি পৃথিবী গড়ে তুলতে সচেষ্ট হবে না, যে পৃথিবীতে মানবিকতা আর সংবেদনশীলতাই হবে বেঁচে থাকার প্রধান কৌশল?

সামান্য এক ভাইরাস যেখানে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও রাষ্ট্রগুলোর চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো, তারা কত অসহায়; তাদের জিডিপি, মাথাপিছু আয়, বৈদেশিক মুদ্রা, রফতানি বাণিজ্য, বাণিজ্যযুদ্ধ ইত্যাদি কোনও কিছুই যে আখেরে তাদের বাঁচানোর জন্য যথেষ্ট নয়, তখন করোনা-উত্তর পৃথিবীর মানুষেরা বেঁচে থাকার জন্য কি নতুন কোনও কৌশল গ্রহণ করবে না? যে কৌশলে প্রেম ও ভালোবাসাই হবে তাদের মূলমন্ত্র? মানুষ কি আরেকটু বেশি মানুষ হয়ে ওঠার চেষ্টা করবে না? সে কার জন্য অস্ত্র বানাবে, সে কার জন্য গর্ত খুঁড়বে, যে গর্তে একসময় তার নিজের পতিত হওয়ারই উপক্রম হবে?

এই পৃথিবীর মানুষেরা তো দেখলো যে তার অর্থবিত্ত, দেশে বিদেশে একাধিক বাড়ি, বিদেশের ব্যাংকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা সামান্য এক সর্দি জ্বরের কাছেও অসহায়ের মতো ডুকরে কেঁদে ওঠে—সেই মানুষগুলোর মধ্যে কি কোনও পরিবর্তন আসবে না এবং তারা কি এই সিদ্ধান্ত নেবেন না যে, করোনা-উত্তর পৃথিবীতে তারা আর দুর্নীতি ও লুটপাট করবেন না এবং লুটপাটের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ তারা পৃথিবীকে আরেকটু ভালো রাখার কাজে ব্যয় করবেন?

করোনা-পূর্ব পৃথিবীতে যে মানুষগুলো সামান্য পেটের ব্যথা হলেও থাইল্যান্ড সিঙ্গাপুর চলে যেতেন, অথচ এখন তাদের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, এমনকি তিনি হাজার কোটি টাকার মালিক হলেও যদি সর্দি জ্বরে আক্রান্ত হন, তাহলে দেশের কোনও হাসপাতালের চিকিৎসকও তার শরীরে হাত দিতে ভয় পাচ্ছেন—সেই মানুষগুলোর মনে কি এই বোধ তৈরি হয়েছে বা হচ্ছে যে, সম্পদ গড়ে তোলাই শেষ কথা নয়? যদি এই বোধ তৈরি হয়, তাহলে কি আমরা আশা করতে পারি, করোনা-উত্তর পৃথিবীতে মানুষের লোভ-লালসা, দুর্নীতি ও লুটপাট কিছুটা হলেও বন্ধ হবে? যদি না হয়, তাহলে করোনা-উত্তর পৃথিবীতে আমাদের আবারও নতুন কোনও অদৃশ্য আততায়ী এবং আরও দীর্ঘ সময়ের লকডাউন কিংবা কোয়ারেন্টিনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

প্রশ্ন হলো, পৃথিবীর পরাশক্তিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক রেষারেষি কি বন্ধ হবে? তারা পরস্পরের বাজার দখল আর ধর্মের নামে বিভেদ সৃষ্টি করে অপছন্দের মানুষকে তাড়িয়ে দেওয়ার আয়োজন থেকে কি নিজেদের সরিয়ে নেবেন নাকি পৃথিবী থেকে করোনার বিপদ কেটে গেলে তারা আবারও ধর্মকে ভোটের রাজনীতি বানিয়ে মানুষের রক্ত নিয়ে পুনরায় খেলা শুরু করবেন? পৃথিবীটা যে কোনও ধর্মের নয়, বরং মানুষের; মানুষ না থাকলে যে ধর্ম, এমনকি ঈশ্বরেরও কোনও গুরুত্ব নেই, সে কথা কি বুঝবেন আমাদের বিশ্বনেতারা?

অস্বীকার করার উপায় নেই, এই করোনাভাইরাস ছোট ও মাঝারি অর্থনীতির তো বটেই, বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলোর মেরুদণ্ড ভেঙে দেবে। সুতরাং সেই সংকট তারা কীভাবে মোকাবিলা করবে? করোনা-পূর্ব পৃথিবীতে যে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধ ছিল গণমাধ্যমের নিয়মিত শিরোনাম—এবার এই বৈশ্বিক বিপদ মোকাবিলায় তারা একসঙ্গে কাজ করবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। নিশ্চয়ই এটি আশার সংবাদ। এটি ঠিক, করোনা-উত্তর পৃথিবীতে বিশ্বের নেতৃত্ব আর এককভাবে কোনও দেশের হাতে থাকছে না। সুতরাং মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক রাজনীতি এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও সৌদি আরবের হিসাব-নিকাশেও পরিবর্তন আসতে বাধ্য। সেই পরিবর্তনগুলো ধর্ম ও জাত নির্বিশেষে কেবলই মানুষের জন্যই হবে—এটিই আমাদের প্রত্যাশা।

সুতরাং করোনা-উত্তর সময়ে আমরা কীভাবে বাঁচতে চাই এবং সেজন্য আমাদের কৌশলপত্র কী হবে; আমরা কীভাবে সেই কৌশলপত্র তৈরি করবো, সেখানে জাতিসংঘসহ পরাশক্তিগুলো তো বটেই, বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্ব, এমনকি আফ্রিকার যেসব অঞ্চলের মানুষের কাছে এখনও একবেলা পেটপুরে খাওয়া স্বপ্নের মতো—সেই মানুষদেরও আমরা কীভাবে এই পরিকল্পনায় যুক্ত করবো—তার ওপর নির্ভর করবে পৃথিবী এবং এই গ্রহের মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর ভবিষ্যৎ।

লেখক: সাংবাদিক

/এসএএস/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ