করোনায় মৃত্যু, চিকিৎসা ও ত্রাণ

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৪:০২, এপ্রিল ০৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২৩, এপ্রিল ০৭, ২০২০

আনিস আলমগীরকরোনায় আক্রান্ত এবং মৃতের যে সংখ্যা সরকারি মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে অনেকে তা বিশ্বাস করেনি, সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রল করেছে। ট্রল বোধহয় এবার থামবে। কারণ এখন প্রতিদিন মৃত্যু এবং আক্রান্তের সংখ্যা আগেরদিনের দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। একমাস পরে, বা আরও সামনে গিয়ে এই সংখ্যা কোথায় যাবে, কেউ জানি না। জাতিসংঘ সতর্ক করেছে, করোনাভাইরাসজনিত কারণে বাংলাদেশে ২০ লাখ মানুষ মারা যেতে পারে। জাতিসংঘের অনুমানের ভিত্তি হচ্ছে করোনার বিস্তার নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে জোরালো কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী দু’জন এই সংখ্যাকে বাড়াবাড়ি রকম হিসেবে দেখেছেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শাহরিয়ার আলম বিদেশি মিডিয়াকে বলেছেন, বাংলাদেশ সামাজিক দূরত্ব নীতি বাস্তবায়ন করেছে; মল, দোকান এবং রেস্তোরাঁ বন্ধ করেছে; এবং চীনের সঙ্গে আসা-যাওয়ার উড়োজাহাজ ব্যতীত সমস্ত অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক বিমান সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনের ভিত্তি নিয়ে আমারও সন্দেহ আছে। অনুমান করে কথা বলা খুবই দুঃখজনক। এতে একটি জাতি তার মনোবল হারাতে পারে। বাংলাদেশের দুর্যোগ নিয়ে এমন রিপোর্ট আগেও হয়েছে। ১৯৯৮ সালে যে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল তাতেও বিবিসিসহ বিদেশি মিডিয়া আশঙ্কা করেছিল তিন লাখ লোক বন্যায় মারা যাবে। অথচ সেই বন্যায় লোক মারা গিয়েছিল ১৩৯ জন। আমাদের সামরিক বাহিনী তখন দেশ আক্রান্ত হলে যেভাবে জান-প্রাণ সমর্পণ করে কাজ করে, ঠিক সেইভাবে কাজ করেছিল। যাহোক, বাংলাদেশ ব-দ্বীপ অঞ্চল। বাংলাদেশের মানুষ প্রতিবছর দুর্যোগ মোকাবিলা করে। অতি প্রাচীনকাল থেকে বাংলাদেশের মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে আছে।

আইন-ই-আকবরিতে আছে আকবরের রাজত্বকালে বাংলাদেশের উপকূলে এমন এক তুফান আর জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল তাতে দূর্বাঘাস পর্যন্ত তুলে ফেলেছিল। চন্দ্রদ্বীপে তো কোনও প্রাণী ছিল না। চন্দ্রদ্বীপ হচ্ছে বর্তমানের বরিশাল। বরিশাল তখন মূল ভূখণ্ড থেকে পৃথক ছিল। ফরিদপুর তখন সম্পূর্ণ জেগে ওঠেনি। ১৯৬০ সালে বাংলাদেশের উপকূলে আরেকটি তুফান ও জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল। ১৯৭০ সালের নভেম্বর বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলে জলোচ্ছ্বাসে ১০ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা ত্রাণ নিয়ে আসেনি। ফলাফল পরের মাসের ভোটে শোচনীয় পরাজয়।

যাহোক, শত শত বছরব্যাপী বাংলাদেশের মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে বেঁচে আছে। গত ৬০-৭০ বছর আগেও কলেরা, বসন্ত মহামারি আকারে দেখা দিয়েছিল বাংলাদেশে। গ্রামকে গ্রাম মৃত্যুপুরীতে পরিণত হতো। তখন কলেরা বসন্তের কোনও প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি।

বাংলাদেশের মানুষ খোদাভীরু। তারা খোদার বিধানকে মাথা পেতে মেনে নেয়।  অনেক ডাক্তার আজ ‘নন্দলাল’ সেজে বসে আছেন। এই খবরও দেখতে হলো— করোনাভাইরাস পরীক্ষার জন্য বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগে পিসিআর মেশিন সংযোজন করার পর পরই ল্যাবের দায়িত্বপ্রাপ্ত মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. এম টি জাহাঙ্গীর হুসাইন স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের আবেদন করেছেন। মানবসেবায় এসে ডাক্তাররা যদি এমন আচরণ করেন, মানুষ যাবে কোথায়!

মানুষের আজ সত্যি যাওয়ার রাস্তা নেই। একজন ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত হলে মৃত্যু অবধারিত নয়। সিংহভাগই ভালো হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন, অন্যান্য দেশের তুলনায়। আক্রান্ত ব্যক্তি আক্রান্ত কিনা জানবেন কী করে, আক্রান্ত হলে যাবেন কোথায়, চিকিৎসা ব্যয় কী পরিমাণ হবে, ডাক্তার-নার্সের সেবা পাবেন কিনা—আক্রান্ত হওয়ার চেয়ে এসবই এখন ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় মানুষের এসব ভীতি দূর করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু যদি অবধারিত থাকে, তবে বাঙালি জাতি ঘরে বসে আল্লাহ ছাড়া আর কারও কাছে গিয়ে আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ নেই!

গার্মেন্টস সেক্টরের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। দেখা গেলো আবার তারা ঢাকায় চলে এসেছে। অনেক গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি পুনরায় কাজ শুরু করেছে। মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে শ্রমিকেরা এসেছে কারণ তাদের পেটের দাবি, অন্য উপায় নেই। প্রধানমন্ত্রী কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন যারা স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের পিপিই বানাচ্ছে তারা ছাড়া অন্য ফ্যাক্টরি বন্ধ থাকবে। জানি না শেষ পরিণতি কী হবে এবং এই খোলা এবং বন্ধের চক্করে গার্মেন্টস শ্রমিকদের কী অবস্থা হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৫ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে গার্মেন্টস সেক্টরের জন্য পূর্বের ৫ হাজার কোটি টাকাসহ ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এই সুযোগ নিয়ে কেউ কোনও রকমের দুর্নীতি বা কোনও অনিয়ম বা অপব্যবহার করবেন না। এটা আমার সোজা কথা। আমরা যদি সঠিকভাবে কাজ করতে পারি তাহলে কোনও সেকশনের মানুষই, কেউই অসুবিধায় পড়বে না।’ কিন্তু এই প্রণোদনা প্যাকেজের সুবিধা পাওয়া নিয়ে সংশয়ে আছেন সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষেরা। তাদের আশঙ্কা, নিম্ন আয়ের মানুষ সরকারের প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হবেন, সব শ্রেণির মানুষ এই প্যাকেজের সুবিধা পাবেন না। বড় ব্যবসায়ীদের ঋণ পেতে অসুবিধা নেই, কিন্তু যারা মাসে ২০-৫০ হাজার টাকার পুঁজি নিয়ে ব্যবসা করে, তাদের বিষয়টি দেখতে হবে।

আবার প্রণোদনা দিয়ে ১৬-১৭ কোটি জনগোষ্ঠীর একটি জাতি বাঁচতে পারে না। একটি জাতি পরিপূর্ণভাবে কর্মহীন হয়ে বসে থাকলে তাদের খাওয়ানোর মতো সামর্থ্য আমাদের সরকারেরও নেই। সুতরাং সীমিত আকারে হলেও কিছু কাজকর্ম করতে হবে। চীনের উহানে সংক্রমণ বন্ধ হলেও দেশের অন্যত্র পুনরায় সংক্রমণ শুরু হয়েছে। তবুও তারা সীমিত আকারে উৎপাদন চালিয়ে রেখেছে। এই দুর্যোগের মধ্যে ব্যবসাও করছে। তাদের অভিজ্ঞতাকে আমরা কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারি।

করোনা বাংলাদেশে কী রূপ ধারণ করে এখনও তা বলা যাচ্ছে না। তবে খারাপের জন্য প্রস্তুত থাকাই ভালো। আমাদের যে প্রস্তুতি আছে তা কখনও পর্যাপ্ত নয়। খারাপের দিকে মোড় নিলেই বোঝা যাবে রাষ্ট্রের প্রস্তুতি কতটুকু ছিল। আমাদের যারা উচ্চপদে সমাসীন রয়েছেন এদের মধ্যে এতো তোষামোদকারীর উদ্ভব হয়েছে যে, ভয় হয় তিলকে তাল করে বলায়-লেখায় পারদর্শী তোষামোদকারীদের ভ্রান্ত প্রচারণায় বিভ্রান্ত হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে জড়িতরা আবার ভুল পদক্ষেপ নিয়ে বসেন কিনা।

আমেরিকার মতো দেশে পিপিই, ভেন্টিলেটরের অপর্যাপ্ততা চিকিৎসাকে সংকটময় করে তুলেছে। আমরা আমাদের সরকারকে অনুরোধ করবো এমন সংকটের মুখে বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা যেন একেবারে ধসে না পড়তে হয়। যুক্তরাষ্ট্র ভেন্টিলেটরসহ চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার জন্য পাচ্ছে না, অথচ ১৬শ’ কোটি ডলার মজুত রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন অর্থ দিয়ে অর্থ নিয়ে বসে ছিল, এখন প্রয়োজনের সময় অর্থ থাকলেও সরঞ্জাম পাচ্ছে না।

সরকার রিলিফ প্রদানের কাজ আরম্ভ করেছে। দেখলাম সরকারি দলীয় নেতাদের ঘরে রিলিফের চালের বস্তা উদ্ধার হয়েছে। চেয়ারম্যান, মেম্বার, মেয়র, কাউন্সিলররা ত্রাণ চুরিতে ধরা খাচ্ছে। আওয়ামী লীগের কোনও কর্মী অসহায় হলে তাকেও রিলিফ দিন। চুরি-চামারি করে এই সংকট মুহূর্তে দলের জন্য বদনাম কুড়াবে কেন! আওয়ামী লীগের আগেই রিলিফ নিয়ে বদনাম আছে।

এর মধ্যে খবর বেরিয়েছিল সেনা ও বিমানবাহিনী ত্রাণ বিতরণ করবে। পরে দেখা গেলো তা ভুয়া খবর। রিলিফের কাজে সমন্বয়ের অভাব দেখা যাচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি লোক, যে যার মতো দিচ্ছে। আমাদের গরিবদের বড় একটি শ্রেণি রিলিফ দেখলে পাগল হয়ে পড়ে। এদের মধ্যে সুসম বণ্টন জটিল কাজ। এখানে সব ধরনের ত্রাণের সমন্বয়ের দরকার আছে।

আবার সরকারি চ্যানেলের ত্রাণে নজরদারিতেও সমস্যা আছে। ইউএনওর হাত ছাড়া হওয়ার পর রিলিফ জনগণের হাতে যাচ্ছে কিনা দেখার কেউ নেই। সংবাদপত্রই একমাত্র ভরসা। কিন্তু এই রিলিফের মাল নয়-ছয় করা নিয়ে লিখলে সংবাদকর্মীরা আক্রমণের শিকার হচ্ছেন ত্রাণখোরদের হাতে। আমরা বিভিন্ন জাতীয় দুর্যোগ দেখেছি বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীকে দায়িত্ব দিলে তারা সব সময় সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন করেছে। এবারও জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা নিয়ে রিলিফ বণ্টনের মূল দায়িত্বটি সামরিক বাহিনীকে দিলে ভালো হয়। সুষ্ঠু বণ্টন এবং সমন্বয়ের কাজটি তারা যথার্থভাবে পালন করতে পারবে বলে বিশ্বাস।

সবশেষে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করবো সংসদে যেসব দলের প্রতিনিধি আছে তাদের দলীয় শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে শলা-পরামর্শ করার জন্য। এককভাবে নিজের কাঁধে দায়িত্ব রাখা ঠিক হবে না। তাদের সঙ্গে বসে তাদেরও সরকারের নেওয়া ব্যবস্থা সম্পর্কে অবহিত করলে সরকার ছোট হবে না।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

[email protected]

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ