করোনা ও জ্যোতিষীরা

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৪:৩০, এপ্রিল ০৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১০, এপ্রিল ০৯, ২০২০

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীকরোনায় পুরো বিশ্ব টালমাটাল। আমার নিজের বয়স হয়েছে, আবার ৩২ বছর ধরে ডায়াবেটিস ও হাইপারটেনশনের রোগী। কখন কী হয় সে চিন্তায় অন্যরা অস্থির। ভারতের বিখ্যাত গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. ডি নাগেশ্বর রেড্ডি, যিনি বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি হাসপাতাল হায়দ্রাবাদের ‘এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি’র চেয়ারম্যান। ২০১৬ সালে চিকিৎসা ক্ষেত্রে কৃতিত্বের জন্য ভারত সরকার তাকে পদ্মভূষণ পদক প্রদান করেছিল। তিনি বলেছেন, ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন আর ক্যানসার রোগের জন্য করোনা হচ্ছে মৃত্যুদূত। ছেলেরা তাই আমাকে ঘরে তালাবদ্ধ করে রেখেছে। কোনোদিন জেলে যাইনি। তবে গত কয়েক দিন যেন জেল জীবন উপভোগ করছি।
ঘরে আগে থেকেই একটা ছোটখাট লাইব্রেরি গড়ে তুলেছিলাম, আর হকার দৈনিক আটটি পত্রিকা দেয়, এই না হলে মনে হয় দিনই শেষ করা যেত না। এরই মধ্যে একদিন মনে হলো—আমার জেলা চট্টগ্রামের একজন জ্যোতিষীর সঙ্গে জানাশোনা আছে, তাকে একবার টেলিফোন করি জিজ্ঞেস করি—এই অবরুদ্ধ করোনাকাল যেতে আর কতদিন লাগবে? জ্যোতিষীদের প্রতি যে আমার অগাধ বিশ্বাস আছে তাও নয়। আসলে জ্যোতিষশাস্ত্রের কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। ৭৫ জন নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত বিজ্ঞানীর স্বাক্ষর করা এক বিবৃতিতে একসময় জানানো হয়েছিল, ‘আকাশের গ্রহ-নক্ষত্রের চলাচল কোনোভাবেই পৃথিবীর মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।’ অথচ জ্যোতিষীরা বলে থাকেন গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাব রয়েছে মানুষের জীবনের ওপর।

আমেরিকান ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন খুবই কঠিন ভাষায় জ্যোতিষশাস্ত্র সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছিল, ‘অবৈজ্ঞানিক ভণ্ডামি।’ তবুও পৃথিবীর বহু দুর্বল মানুষই জ্যোতিষী, ঠিকুজি, কুষ্ঠি বিচার অবলম্বন করে ভরসা পেতে চায়।

সাধারণভাবে মনে হতে পারে, আমাদের মতো গরিব দেশে ভাগ্যে বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যা বেশি। কিন্তু পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে, যেখানে প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় বিজ্ঞানের ওপর অনেকখানি নির্ভর করতে হয়, সেখানেও বহু মানুষ যুক্তিবাদকে বিসর্জন দিয়ে অদৃষ্টবাদকে অবলম্বন করেছে। আমেরিকার মতো দেশেও শতকরা ৩৯ জন মানুষ জ্যোতিষশাস্ত্রের কিছু না কিছু বিশ্বাস করে এবং এদের মাঝে একটা অংশ দিনক্ষণ মেনেই নতুন কাজ আরম্ভ করে।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের অধীনে হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ ছিলেন ডোনাল্ড থমাস রেগান। তিনি চাকরি শেষে একটা বই লিখেছিলেন ‘ফর দ্য রেকর্ড: ফ্রম ওয়াল স্ট্রিট টু ওয়াশিংটন’। এই বইতে প্রেসিডেন্ট রিগ্যান এবং তার স্ত্রী ন্যান্সি রিগ্যান জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রতি কত অনুরক্ত ছিলেন তিনি তার বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন। প্রেসিডেন্ট রিগ্যান সোভিয়েত সুপ্রিম লিডার গর্বাচেভের সঙ্গে যে নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি করেছিলেন, তার দিনক্ষণও নাকি রিগ্যান ঠিক করেছিলেন জ্যোতিষীর সঙ্গে আলাপ করে।

ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ জ্যোতিষীর কথা ছাড়া এক কদমও দিতেন না। দীর্ঘ ১০ বছর তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি ছিলেন। এই ১০ বছর রাষ্ট্রপতি ভবনে যাগ-যজ্ঞ লেগে থাকত। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এতে নাকি বিরক্ত হতেন, কারণ তিনি এগুলোকে ভোজবাজি বা ইন্দ্রজালের ভেল্কি হিসেবে দেখতেন। ধর্মের প্রতি তার কোনও অনুরাগই ছিল না। মহাত্মা গান্ধীও পোশাকে ব্রতচারীর মতো চললেও কোনোদিন কোনও মন্দিরে যাননি বা কোনও বিগ্রহের সামনে মাথা নত করেননি। সৎ জীবনযাপন ও সন্ধ্যাকালীন প্রার্থনা হয়েছিল তার ধর্মকর্ম।

রাজেন্দ্রপ্রসাদ যা করতেন তা আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করতেন। তাতে কোনও ভণ্ডামি ছিল না। শেষ জীবন কাটিয়েছেন তিনি পাটনায় তার প্রতিষ্ঠিত সাদাকাত আশ্রমে। শেষ জীবনে তিনি ধর্মকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। তিনি হিন্দুধর্মের একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন। এখন যারা ভারতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়, তারাও কিন্তু জ্যোতিষশাস্ত্রের একনিষ্ঠ অনুসারী। মুরলী মনোহর যোশী যখন শিক্ষা ও মানবসম্পদ দফতরের মন্ত্রী ছিলেন, তখন তিনি জ্যোতিষ বিদ্যাকে পাঠ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।

হিন্দু মহাকাব্যের চরিত্র ঋষি যাজ্ঞবল্ক্যকে একবার মৈত্রেয়ী জিজ্ঞেস করেছিলেন, ঐশ্বর্যপূর্ণ সমগ্র পৃথিবী যদি আমার হতো তবে কি অমরত্ব লাভ করতে পারতাম, প্রভু? উত্তরে যাজ্ঞবল্ক্য বলেছিলেন, না। উত্তর শুনে মৈত্রেয়ী বলেছিলেন, যা দিয়ে অমৃত লাভ হবে না, তা নিয়ে কী করবো আমি! (শান্তিনিকেতনের উপাচার্য ক্ষিতিমোহন সেন রচিত ‘হিন্দু ধর্ম গ্রন্থ’ থেকে)।

আমাদের ধন-ঐশ্বর্য-ক্ষমতা কিছুই মৃত্যুকে ঠেকাতে পারবে না। জন্মের পরে অবধারিত সত্য হলো মৃত্যু। সেই মৃত্যু করোনায় হোক আর কলেরায় হোক। তবুও ঘুরেফিরে এই দেশের ভাববাদীরা জ্যোতিষীর ধারস্থ হয়। আমাদের রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাত্তার সাহেবের মুখে শুনেছি, তিনি আর বিচারপতি সায়েম সাহেব নাকি ১৯৩৫ সালে একবার চৌরঙ্গী দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পথের ধারে বসা এক জ্যোতিষীকে তাদের হাত দেখিয়েছিলেন। জ্যোতিষী নাকি উভয়ের হাতে চুমু খেয়ে বলেছিলেন, আপনারা উভয়ে রাষ্ট্রপতি হবেন। সত্যিই তো তারা উভয়ে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম তার লেখা বই ‘অ্যাট বঙ্গভবন : লাস্ট ফেজ’ ( At Bangabhaban : Last Phase) বইতেও তাকে বলা কলকাতায় ওই জ্যোতিষীর ভবিষ্যদ্‌বাণীর কথা উল্লেখ করেছেন।

নেহরু যখন গুরুতর অসুস্থ, তখন ইন্দিরা গান্ধী দক্ষিণের এক নামকরা জ্যোতিষীকে ডেকে ত্রিমূর্তি ভবনে এনেছিলেন। জ্যোতিষী নাকি নেহরুর কুষ্ঠি দেখে ইন্দিরাকে বলেছিলেন আপনার পিতার পরমায়ু আর দুই দিন বাকি। সত্যিই দুই দিন পরেই নেহরুর মৃত্যু হয়েছিল। পাশ্চাত্যের বিজ্ঞান আর প্রাচ্যের ভাববাদের এই দ্বন্দ্ব কখনও মিটবে না।

পাঠক বন্ধুরা হয়তো করোনা নিয়ে চট্টগ্রামের ওই জ্যোতিষীর কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করছেন। আমি বহু কষ্ট করে তার মোবাইল নম্বর জোগাড় করে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। তার বয়স হয়েছে এখন যথেষ্ট। পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। বাকশক্তিও অস্পষ্ট হয়ে গেছে। তার ছেলের সঙ্গে কথা হলো। তার সঙ্গে কথা বলা বা কিছু জানা সম্ভব হলো না। আমি দুঃখিত।

তবে একটু বলি, করোনা নিয়ে বাংলাদেশের জ্যোতিষীরা কোনও ভবিষ্যদ্‌বাণী করতে পারেননি। কারও ভবিষ্যদ্‌বাণীও আমার চোখে পড়েনি। বাংলাদেশি কয়েকজন জ্যোতিষী এখন বলেছেন, আমরা আগে থেকেই জানি একটি বিপদ আসবে। তবে সেটি যে করোনা, তা জানতাম না। গ্রহ নক্ষত্রের হিসাব দিয়ে তাদের বেশিরভাগই বলেছেন, বাংলাদেশ করোনা থেকে আগামী জুনে মুক্তি পাবে। দেখা যাক তাদের বাণী ফলে নাকি আরও আগেই আমরা মুক্ত হতে পারি।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ