নতুন এক বিশ্বকে চিনলো মানুষ

Send
আবদুল মান্নান
প্রকাশিত : ১৪:১৬, এপ্রিল ১০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:১৯, এপ্রিল ১০, ২০২০

আবদুল মান্নানকোনও ব্যক্তি, সমাজ বা রাষ্ট্র যখন কোনও সংকটের মুখোমুখি হয় তখন সমাজের অনেক মানুষের প্রকৃত চেহারা উন্মুক্ত হয়ে যায়। চেনা মানুষ হঠাৎ অচেনা হয়ে যায় আর যে মানুষটিকে কেউ কখনও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেনি বা চেনার প্রয়োজন মনে করেনি, সেই মানুষটাই হঠাৎ দেবদূতের মতো আত্মপ্রকাশ করে। একাত্তর সালের এপ্রিল মাসের কথা। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক চারদিকে এত হত্যাযজ্ঞ দেখে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে তার এক সহকর্মীর কাছে গেলেন আশ্রয় চাইতে। ভদ্রলোক একে তো বাঙালি, তার ওপর আবার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। তার তো ভীতসন্ত্রস্ত হওয়ারই কথা। তিনি যে সহকর্মীর কাছে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন তিনি ঘরের দরজা না খুলেই পরিচয় জানতে পেরে বলেছিলেন তিনি তাকে তার বাসায় ঢুকতে দিতে পারছেন না। কারণ, পাশের বাসায় যিনি থাকেন তিনি জামায়াতের একজন বড় সমর্থক। সেই শিক্ষক বললেন, তিনি শুধু একরাতের আশ্রয় চান। ভোর হতেই চলে যাবেন। তখন সন্ধ্যা হয় হয়। কিছুতেই কিছু হলো না। বিফল মনোরথে তিনি সেই ভবন হতে বের হয়ে রাস্তা দিয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে হাঁটা শুরু করলেন । চারদিকে গা ছম ছম করা নিস্তব্ধতা । হঠাৎ কোথা হতে একটা গুলি এসে তার বুকে আঘাত করলে তিনি রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। তার মৃতদেহ ওই রাস্তায় দু’দিন পড়ে ছিল। তারপর কারা যেন কোথায় নিয়ে গিয়েছিল। যার কাছে সেই শিক্ষক আশ্রয় চাইতে গিয়েছিলেন তিনি তার একই বিভাগের সহকর্মী। এটি কোনও গল্প নয়। একাত্তরের জীবন থেকে নেওয়া একটা ছোট চিত্র।

একাত্তর নিয়ে আর একটি ঘটনা বলি এই প্রজন্মের জন্য। আমার বন্ধু আবদুল হামিদ। চট্টগ্রাম সরকারি বাণিজ্য কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত ভিপি। বর্তমান অনেক ছাত্রনেতা কল্পনাও করতে পারবে না একজন ছাত্রনেতা কত অমায়িক হতে পারেন। এসএসসি ও এইচএসসিতে কুমিল্লা বোর্ডে মেধা তালিকায় স্থান পেয়েছিল। হামিদ কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিল। বাড়ি কক্সবাজারের চকরিয়ায়। যুদ্ধের প্রথম প্রহরেই যুদ্ধে গেল হামিদ। আগস্ট মাসে কক্সবাজার অঞ্চলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে মারাত্মক আহত হয়ে নিকটবর্তী গ্রামের এক মসজিদে আশ্রয় নিলো ফজরের আজানের কিছু আগে। এত রক্তপাত হয়েছে যে শরীর তখন অনেকটা ফ্যাকাসে। ফজরের আজান দিতে মুয়াজ্জিন এসে দেখে হামিদ মসজিদের বাইরে পড়ে আছে। হামিদ তার পরিচয় দিয়ে আকুতি করে তাকে একটু আশ্রয় দিয়ে দিনের আলো ফুটলে একজন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে। মুয়াজ্জিন আজান শেষ করে কাছের গ্রাম থেকে রাজাকারদের নিয়ে আসে। একজন রাজাকার হামিদের মাথায় বন্দুকের নল ঠেকিয়ে যখন গুলি করে তখনও সে বেঁচে ছিল। কোনও সিনেমার গল্প নয়। এটি আমার একাত্তরের বাংলাদেশ। ঠিক তার উল্টো চিত্র অসংখ্য। প্রত্যেক শহর, গ্রাম, মহল্লা, বাড়ি, ব্যক্তি হয়ে উঠে একাত্তরের অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়স্থল, দুর্গ।

এর আগে বিশ্ব দুটি বিশ্বযুদ্ধ দেখেছে বা তার কথা শুনেছে, কিন্তু সেসব যুদ্ধ একটি এলাকা বা মহাদেশে সীমাবদ্ধ ছিল। দেশে দেশে মহামারি হয়েছে। আমেরিকা হতে ইউরোপ, চীন বা ভারত উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ হয়েছে, মারা গিয়েছে লাখ লাখ মানুষ। এই বাংলার তেতাল্লিশের (১৯৪৩-৪৪) মন্বন্তরের কথা এখনও মানুষের মুখে মুখে। সেই দুর্ভিক্ষে অবিভক্ত বাংলায় একুশ থেকে ত্রিশ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল আর সেই দুর্ভিক্ষের জন্য ঐতিহাসিকরা ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে দায়ী করেন। কারণ, ব্রিটিশ সরকার বাংলার মানুষের পাতের ভাত নিয়ে ইউরোপ আর আফ্রিকায় যুদ্ধরত ব্রিটিশ সৈনিকদের পাতে দিয়েছিল।

বর্তমানে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব অন্য এক যুদ্ধে ও ক্রান্তিকাল মোকাবিলায় লিপ্ত। সেই যুদ্ধের শত্রুর নাম কোভিড-১৯। তাকে আবার খালি চোখে দেখা যায় না। সেই অদৃশ্য শত্রু বিশ্বের দুই শত নয়টির বেশি দেশে হামলা করেছে। হত্যা করেছে এই পর্যন্ত সাড়ে ৮৮ হাজার নিরীহ মানুষকে। আক্রান্ত হয়েছে পনের লক্ষ মানুষ। বাদ যায়নি শিশু থেকে বৃদ্ধ। প্রধানমন্ত্রী হতে সেনাবাহিনীর জেনারেল, মসজিদের ইমাম থেকে মন্দিরের পুরোহিত। নতুন শতাব্দীর নতুন যুদ্ধ আগের যেকোনও সময়ের যুদ্ধ বা ক্রান্তিকালের চেয়ে ভয়াবহ। পুরো বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মানুষ এই মুহূর্তে আত্মরক্ষায় নিয়োজিত। এই মহাদুর্যোগের সময় বিশ্বের অনেক মানুষের আসল চরিত্র ফুটে উঠেছে। একদল ‘মানুষ মানুষের জন্য ব্রত নিয়ে মাঠে নেমেছেন’। আর এক দল ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’কে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

চলমান যুদ্ধ মোকাবিলায় কোনও মোল্লা পুরোহিতের ঝাড়ফুঁক কাজে আসছে না। আসছে না কাজে কোনও মানত বা ফকিরের দরগায় শিরনি। এই যুদ্ধের একমাত্র অস্ত্র বিজ্ঞান, যে বিজ্ঞানের রাজ্য প্রায় আট শত বছর দখলে ছিল আরব বিজ্ঞানীদের, আর সেই বিজ্ঞানের ফল ভোগ করেছিল বিশ্বের সব মানুষ। সেই যুগের অবসান হয়েছে আরও অনেক আগে, যখন আরবরা প্রকৃত জ্ঞান বিজ্ঞানচর্চার স্থলে জায়গা করে নিয়েছেন লাগামহীন বিলাসী জীবনযাত্রা, অশিক্ষা কুশিক্ষা আর গোমরাহি। সেই অগ্রযাত্রার ধারাবাহিকতা যদি ধরে রাখা যেত হয়তো বর্তমান বিশ্ব এমন এক কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতো না। তারপরও বিজ্ঞানের কোনও বিকল্প নেই। এই কঠিন সময়ে বিশ্বের মানুষ দেখছে অনেক মানুষের মানবিক দিক, যা সাধারণত দেখা যায় না। আবার বিপরীত চিত্রও আছে।

এই মুহূর্তে বিশ্বে দুটো জিনিসের খুবই প্রয়োজন। প্রথমটা, যারা এই মারাত্মক ভাইরাসে আক্রান্ত তাদের জন্য চিকিৎসা আর দ্বিতীয়ত খাদ্য। যেহেতু এই অজানা ভাইরাসের আবির্ভাব হঠাৎ করে, সেই কারণেই বিশ্বের কোনও দেশই তার জন্য প্রস্তুত ছিল না। হতে পারে তা বিশ্বের মহাশক্তিধর দেশ যুক্তরাষ্ট্র অথবা ধনী দেশ সৌদি আরব কিংবা বিশ্বের অন্যতম জনবহুল দেশ বাংলাদেশ বা ভারত। এই ভয়াবহ ভাইরাসটা কখন কোথা থেকে আসে আর কার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তা আগাম নির্ধারণ অসম্ভব। একবার কেউ আক্রান্ত হলে তার একমাত্র বন্ধু চিকিৎসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা। হতে পারেন তিনি একজন চিকিৎসক অথবা একজন চিকিৎসাকর্মী। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বললেন এই ভাইরাস মারাত্মক সংক্রামক। একজন থেকে আরেকজনের কাছে চলে যেতে পারে নীরবে। হতে পারে তা একটি পানির গ্লাসের অথবা দরজার ছিটকানির মাধ্যমে। চিকিৎসকরা বললেন সবাই সবার কাছ থেকে দূরে থাকুন, এমনকি নিজের সন্তানের কাছ থেকেও। যারা চিকিৎসা দেবেন তারা তো আর রোগীর কাছ থেকে দূরে থাকতে পারবেন না। তাদের তো কাছে যেতেই হবে। রোগীর সঙ্গে কথা বলতে হবে। এর জন্য সবার চাই সুরক্ষা ব্যবস্থা। রোগীর চিকিৎসা করতে গিয়ে যদি চিকিৎসকই আক্রান্ত হন তাহলে চিকিৎসা দেবেন কে? সব দেশেই এই সুরক্ষা ব্যবস্থার অপ্রতুলতা দেখা গেল। ফলাফল এই পর্যন্ত সারা বিশ্বে প্রায় একশত চিকিৎসক ও তাদের সহযোগী আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। মানুষের খাবার জোগান দিতে হবে। অনেক দেশের সরকারের পাশাপাশি সামর্থ্যবানরা এগিয়ে এলেন। রাস্তায় সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে হবে। অনেকটা কোনোরকমের সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই মাঠে নামলেন আইনশৃঙ্খলা আর সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা। এটি দেশে দেশে ঘটছে। আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী একজন চিকিৎসক। তিনি প্রধানমন্ত্রীর দফতর ছেড়ে এখন হাসপাতালে সেবা দিচ্ছেন। ভুটানের ডাক্তার প্রধানমন্ত্রী এখন হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন। অনেক দেশ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে না পেরে কাজে যোগ দিতে বললেন অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক আর নার্সদের। তাতে অভূতপূর্ব সাড়া পড়লো। ব্রিটেনে চিকিৎসক আর নার্সদের সুরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি পড়লে অনেককে দেখা যায় ময়লা ফেলার ব্যাগ মাথায় দিয়ে ডিউটি করছেন। বাংলাদেশ সরকারের অনেক সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ঘোষণা করলো খাদ্যসহ যেকোনও জরুরি জিনিসের প্রয়োজন পড়লে তাদের খবর দিলে তা তারা বাড়িতে পৌঁছে দেবে। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করলেন এই বিপদের সময় একজন মানুষও না খেয়ে মরবে না। চট্টগ্রামে ক’জন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা তরকারি উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণের তরকারি কিনে রাস্তার পাশে সাজিয়ে রেখে ব্যানারে লিখে দিলেন ‘বিনামূল্যে তরকারি’। এরা প্রমাণ করলেন ‘মানুষ মানুষের জন্য’।

এসবের পাশাপাশি ভিন্ন চিত্রও আছে। বিভিন্ন মিডিয়া খবর দিচ্ছে সরকারের দেওয়া ত্রাণের জিনিস অনেক চেয়ারম্যান, মেম্বারের বাড়িতে পাওয়া যাচ্ছে। কেভিড-১৯ আক্রান্তদের চেয়ে নাকি এই মুহূর্তে রিলিফ চোরের সংখ্যা বেশি। এমনটি ঘটেছিল স্বাধীনতা পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধুর সময়। তিনি তখন সব সময় বলতেন ‘আমি বিভিন্ন দেশ থেকে ভিক্ষা করে খাদ্যদ্রব্য আনি আর তা খেয়ে ফেলে একদল চোর’। বলতে বাধ্য হচ্ছি, এই সময় তাঁর কন্যাও অনেকটা একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন বা হচ্ছেন। কিছু চিকিৎসকও আবার তাদের সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই এই অজুহাতে রোগাক্রান্তদের চিকিৎসা দিচ্ছেন না বলে অভিযোগ আছে। তাদের অবশ্যই সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। কেউ মারা গেলে দাফন কাফনের সময় আপন কেউ কাছে আসছেন না। পুলিশই তখন এই কাজের জন্য একমাত্র ভরসা। এই মুহূর্তে এরাই হলেন জনগণের ক্রান্তিকালের একমাত্র বন্ধু। সরকার বলছে সবাইকে ঘরে থাকতে। অনেক মানুষ তা মানতে চান না। অনেক জায়গায় দেখা যাচ্ছে পুলিশ র‌্যাব তাদের কাছে হাতজোড় করছেন। কাজ হচ্ছে না। গত পঞ্চাশ বছরে আমাদের দেশের একশ্রেণির মানুষ আইন না মানার সংস্কৃতি মজ্জাগত করে ফেলেছে। মনে হচ্ছে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় আরও কঠোর হস্তে আইন অমান্যকারীদের দমন করা। প্রয়োজনে কিছু সময়ের জন্য দেশে কারফিউ জারি করা হোক। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই মুহূর্তে যদি সতর্ক না হওয়া যায় তাহলে মহামারি অবধারিত। অনেক দেশে তো রাস্তায় দেখা যাওয়া মাত্র গুলির হুকুম দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে তো তা করতে বলা হচ্ছে না। কারফিউ দিলে খেটে খাওয়া মানুষের কষ্ট হবে ঠিক। তাদের বাঁচাতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এই সমস্যা সরকারের একার নয়। দেশ ভালো থাকলে সবাই ভালো থাকবে। অতীতের মতো অন্ধকারের পর আলো ফুটবেই। চাই একটু জনসচেতনতা। ভালো থাকো বাংলাদেশ।

লেখক: বিশ্লেষক ও গবেষক

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ