সাধারণ ছুটিকালে ছাঁটাই বেআইনি

Send
ড. উত্তম কুমার দাস
প্রকাশিত : ১৬:২৭, এপ্রিল ১০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:১৮, মে ০১, ২০২০

ড. উত্তম কুমার দাসকরোনার প্রাদুর্ভাব বিশ্বব্যাপী, যার ঢেউ আমাদের দেশেও ঠেকেছে। এটি এমন এক দুর্যোগ, যার সৃষ্টিতে আমাদের হাত নেই; তবে প্রতিরোধে ও প্রভাব কমাতে সম্মিলিত চেষ্টা একমাত্র ভরসা। করোনার কারণে দেশে এক দুর্যোগময় সময় চলছে। যার প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবনযাপন, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ব্যবস্থা, শিল্প-উৎপাদন, অর্থনীতি, সবকিছুর ওপর।
দেশের শিল্প-কারখানায় এখন এক স্থবির অবস্থা চলছে। কবে এই পরিস্থিতি কাটবে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে এই পরিস্থিতিকে পুঁজি ও অপব্যবহার করে একশ্রেণির নিয়োগকারী (মালিক) আইনানুগ প্রক্রিয়া পালন ছাড়াই তাঁদের শিল্প-প্রতিষ্ঠান ও কারখানা বন্ধ করতে যাচ্ছেন বা করেছেন; কিংবা শ্রমিক-কর্মচারীদের বিনা বেতনে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠাচ্ছেন, পদত্যাগ করতে উৎসাহিত করছেন ও চাপ দিচ্ছেন, এমনকি ছাঁটাই করছেন। তৈরি পোশাক, বেসরকারি হাসপাতাল প্রভৃতি ক্ষেত্রে এমনটি ঘটছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। এহেন তৎপরতা সম্পূর্ণ বেআইনি ও চ্যালেঞ্জযোগ্য।

দেশে সব ক্ষেত্রে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু ছিল ২৫ মার্চ পর্যন্ত, ২৬ মার্চ ছিল সরকারি ছুটি। এরপর নির্বাহী আদেশে সরকার ২৭ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে; যা বাড়তে বাড়তে ১৩ এপ্রিল আর এখন ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত গড়িয়েছে। 
দেশের বেসরকারি তথা ব্যক্তি মালিকানাধীন শিল্প-কারখানা ও প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক-কর্মচারী নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর বিধানাবলি প্রযোজ্য।

শ্রম আইন বিশেষ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান-কারখানা মালিককে তাঁর প্রতিষ্ঠান (আংশিক বা সম্পূর্ণ) সাময়িক কিংবা দীর্ঘ মেয়াদে বন্ধ ঘোষণা (লে-অফসহ) করার সুযোগ দিয়েছে। এক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয় হলো- অগ্নিকাণ্ড, আকস্মিক বিপত্তি, যন্ত্রপাতি বিকল, বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ, মহামারি, ব্যাপক দাঙ্গা-হাঙ্গামা অথবা মালিকের নিয়ন্ত্রণ অন্য কোনও কারণে প্রয়োজন হলে...। তবে এই বন্ধের মেয়াদ হতে পারে সর্বোচ্চ তিন কর্মদিবস (১২ ধারা)। এই বন্ধ তিন কর্মদিবসের বেশি হলে ১৬ ধারা মোতাবেক লে-অফ ঘোষণা করা যাবে; এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শ্রমিক এক পঞ্জিকা বছরে সর্বোচ্চ ৪৫ দিন পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পাবেন [১৬(৪) ধারা]। এই সময়ে সংশ্লিষ্ট শ্রমিক তাঁর মাসিক মূল মজুরির অর্ধেক ও বাড়িভাড়াসহ প্রযোজ্য অন্যান্য ভাতা পুরোপুরি পাবেন। তবে কারখানা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ (লে-অফ) রাখার মেয়াদ দীর্ঘ হলে নিয়োগকারী সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের শ্রম আইনের ২০ ধারা মতে ছাঁটাই করতে পারবেন। প্রশ্ন আসতে পারে এখনকি ছাঁটাই চলবে?

ছাঁটাইয়ের মূল শর্ত হলো সংশ্লিষ্ট শ্রমিকের সংখ্যাতিরিক্ততা। এখন দেখার বিষয় হলো বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ছাঁটাইয়ের আইনগত অবস্থান কী?

এক কথায় বলতে গেলে সাধারণ ছুটি শুরু হওয়ার পর এবং তা বলবৎ থাকাবস্থায় ছাঁটাই বেআইনি হবে। এহেন আদেশ নৈতিকতা ও আইনের বিধান দুদিক থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ। একইভাবে সাপ্তাহিক ছুটি কিংবা অন্য কোনও ছুটির দিন ছাঁটাই কিংবা অন্য কোনোভাবে চাকরির অবসান-আদেশও বেআইনি হবে।

আরেকটি প্রসঙ্গ- তা হলো কারখানা লে-অফ। এই সাধারণ ছুটি চলাকালে কারখানার মালিক কর্তৃক লে-অফ ঘোষণাও কি বেআইনি হবে? উত্তর হলো, হ্যাঁ।

প্রশ্ন আসতে পারে, যারা জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং যাদের ক্ষেত্রে ঘোষিত সাধারণ ছুটি প্রযোজ্য নয় তাদের ক্ষেত্রে।

যারা জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান তারা তাদের কৌশল, সাধ্য ও চাহিদা মতো সেবাদান অব্যাহত রাখবেন। না হলে (অপারগ হলে, যেমন- কোনও ভবনে করোনার প্রাদুর্ভাব) সাধারণ ছুটির প্রয়োগ বিবেচনা করবেন। সাধারণ ছুটি থেকে তাদের যে অব্যাহতি তা জরুরি সেবাদানের জন্য। এই সুযোগে তাদের শ্রমিক-কর্মচারীকে ছাঁটাই কিংবা অন্য কোনোভাবে চাকরিচ্যুত করার জন্য নয়।

প্রশ্ন আসবে, পরিস্থিতির কারণে সাধারণ ছুটি দীর্ঘায়িত হলে কী হবে। এই ক্ষেত্রে কারখানা মালিকের যেমন ব্যবসার (সম্পদ হিসাবে) মালিক হওয়ার এবং শ্রমিক-কর্মচারীদের (নাগরিক হিসেবে) তাদের আইনানুগ পেশা ও বৃত্তিতে নিয়োজিত থাকার মৌলিক অধিকার রয়েছে। দুইয়ের সমন্বয় সাধনই আসল কথা।
মালিককে দেখাতে হবে তিনি তার কারখানা-উৎপাদন চালু রাখার সাধ্যমতো ও সর্বতো চেষ্টা করেছেন। যাচ্ছেতাইভাবে চাকরির অবসান করা যাবে না। শ্রমিক-কর্মচারীদেরও এই সংশ্লিষ্ট মালিককে এক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে হবে।

২৭ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটির ঘোষণা এলো (যার পরিপত্র জারি হয় ২৪ মার্চ); আর সেই সুযোগে মজুরি কর্তন (মার্চ মাসের নির্ধারিত মজুরি থেকে), লে-অফ ঘোষণা, ছাঁটাইয়ের খড়গ প্রভৃতি নেমে এলো। এমনও অভিযোগ রয়েছে, আগের তারিখ দেখিয়ে লে-অফ ঘোষণা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের কিছু দায়িত্ব রয়েছে। তাদের খতিয়ে দেখতে হবে এহেন নোটিশ প্রকৃতপক্ষে কবে জারি করা হয়েছে, শ্রমিকরা কবে তা অবগত হয়েছেন; নিয়ম অনুযায়ী অধিদফতরকে নোটিশের কপি দেওয়া হয়েছে কিনা। একই তদারকি কথিত ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

ভেবে দেখুন আর সাত দিন কিংবা এক মাস পর কোনও শ্রমিক-কর্মচারীর চাকরির এক, পাঁচ, দশ কিংবা পঁচিশ বছর পূর্ণ হতো। তাঁকে প্রযোজ্য পাওনাদি থেকে বঞ্চিত করার জন্য আগেভাগে বেআইনিভাবে ছাঁটাই করা হয়নি তো?

সরকার প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকার আপৎকালীন প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এরমধ্যে রফতানিমুখী শিল্পের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সংশ্লিষ্ট শ্রমিক-কর্মচারীদের তিন মাসের বেতন-ভাতা বাবদ; যা আরও বাড়তে পারে। যাতে কোনও সুদ নেই, শুধু সার্ভিস চার্জ প্রযোজ্য। যার প্রধান উদ্দেশ্য সংশ্লিষ্ট শ্রমিক-কর্মচারীদের চাকরিতে টিকিয়ে রাখা। তারপরও ছাঁটাই করা হলে তা প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য।

এক্ষেত্রে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কঠোর অবস্থান দরকার। আইনের বিধান থাকার পরও তাদের পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে পরিপত্র জারি দরকার যে, সাধারণ ছুটি চলাকালে ছাঁটাই-টার্মিনেশন করলে তা বেআইনি ও অকার্যকর বলে গণ্য হবে। আর ২৬ মার্চ ছুটি শুরুর পর থেকে অদ্যাবধি কোনও ছাঁটাই বা অন্য কোনোভাবে মালিক কর্তৃক চাকরিচ্যুত হলে তা আইনের দৃষ্টিতে অকার্যকর বলে গণ্য হবে। এ বিষয়ে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতর ৩ এপ্রিল উক্ত মন্ত্রণালয়কে যে চিঠি দিয়েছে তা আমলে নেওয়া জরুরি।

কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, যারা সাধারণভাবে শ্রমিক সংজ্ঞার আওতায় পড়বেন না তাদের ক্ষেত্রে কী হবে?

তাদের চাকরির শর্তাবলি নিয়ন্ত্রিত হবে সংশ্লিষ্ট নিয়োগপত্র বা চুক্তিপত্র এবং প্রতিষ্ঠানের চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী। তবে এক্ষেত্রেও কোনও শর্ত শ্রম আইনের কোনও বিধানের চেয়ে কম অনুকূল হওয়া চলবে না।

লেখক: অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট অব বাংলাদেশ এবং শ্রম আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ আইনজীবী ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর সাবেক কর্মকর্তা।
ই-মেইল: [email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ