‘বড়লোকে’র বড় আকাল যেখানে

Send
রুমিন ফারহানা
প্রকাশিত : ১৪:২০, এপ্রিল ১১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২২, এপ্রিল ১১, ২০২০

রুমিন ফারহানাব্ল্যাক ফ্রাইডে। নভেম্বর মাসের শেষ শুক্রবার উদযাপিত হয় দিনটি। ব্ল্যাক ফ্রাইডে মানেই উচ্ছ্বাস আর কেনাকাটার ধুম। অবিশ্বাস্য কম দামে সেদিন সবকিছু বিক্রি হয় আমেরিকায়। মানুষ প্রায় সারা বছর অপেক্ষায় থাকে দিনটির। বড়দিনের উৎসবকে সামনে রেখে সারা বছরের বিক্রি হয় এই একদিনে। বছরজুড়ে লাল কালিতে লোকসান লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া ব্যবসায়ীরা এদিন দোকানের খাতায় লাভের অঙ্ক লিখে কূল পান না। বড়দিনের উৎসব ধনী দরিদ্র সবার ঘরে পৌঁছে দিতে, আনন্দে সবার অংশ নেওয়া নিশ্চিত করতে ব্ল্যাক ফ্রাইডে বড় একটি ভূমিকা রাখে। শখের জিনিস থেকে শুরু করে প্রয়োজনের জিনিস যা হয়তো অনেক মানুষই সারা বছর কিনতে পারে না এই দিন সেই সুযোগ নিয়ে আসে তাদের সামনে। উৎসব হয়ে ওঠে সবার। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, উৎসব আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে এই একদিনে যে পরিমাণ বিক্রি হয়, তাতে এই এক দিনেই আমেরিকার অর্থনীতির সূচক এক লাফে অনেক ওপরে উঠে যায়। একসঙ্গে লাভবান হয় ক্রেতা, বিক্রেতাসহ সার্বিক অর্থনীতির খাত। 

অন্যদিকে আমাদের সবচেয়ে বড় উৎসব ঈদকে ঘিরে ঘটে সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য থেকে শুরু করে পোশাক প্রসাধনী সবকিছুর দামই বেড়ে যায় কয়েকগুণ। এমনকি রোজা শুরুর কয়েক মাস আগে থেকেই দাম বাড়া শুরু হয় সেসব পণ্যের, রোজায় যার চাহিদা থাকে সবচেয়ে বেশি। দরিদ্র মানুষের কথা বাদই দিলাম। নিম্নমধ্যবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্ত মানুষও পড়ে মহা দুর্বিপাকে। উৎসব তার সার্বজনীনতা হারিয়ে হয়ে ওঠে গুটিকয় মানুষের জন্য।

উৎসব হোক কিংবা ক্রান্তিকাল মানুষকে জিম্মি করা আমাদের স্বভাবজাত। যেখানে জীবন ও মৃত্যুর সীমারেখা মিলেমিশে একাকার প্রায় সেখানেও মুনাফাই মুখ্য হয় আমাদের কাছে। করোনায় পুরো বিশ্ব যখন জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে তখনও আমরা মাস্ক, গ্লোভস কিংবা হ্যান্ড স্যানিটাইজারের মতো সুরক্ষা সামগ্রী মজুত আর বিক্রি করেছি অবিশ্বাস্য দামে। যার সামর্থ্য আছে সে কয়েক গুণ বেশি দাম দিয়ে কিনে প্রয়োজনের কয়েক গুণ বেশি মজুত করেছে ঘরে আর অসংখ্য মানুষ রয়ে গেছে অরক্ষিত। অথচ একবারের জন্য চিন্তা করিনি যে এটি এমনই এক অভিশাপ যেখানে একা সুরক্ষিত থাকা কিছুতেই সম্ভব না। একজন অরক্ষিত মানুষ তীব্র ঝুঁকিতে ফেলে অসংখ্য, এমনকি সুরক্ষিত মানুষকেও।  

স্বাস্থ্য সংকটের সঙ্গে সঙ্গে করোনা তৈরি করেছে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট। বিশ্বজুড়ে মহামন্দা আসছে সে খবর এখন পুরনো। ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা ধরা পড়ার পর থেকে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে আছে অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করা রিকশাচালক, কৃষি শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, হকার, পরিবহন শ্রমিক, খণ্ডকালীন গৃহকর্মী, যাদের নেই কোনও চাকরি বিধিমালা, দিন আনি দিন খাই মানুষ তারা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৭ অনুযায়ী দেশের ৮৫ শতাংশ কর্মজীবী লোক অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। দেশে মোট ৬ কোটি ৮ লাখ লোক মজুরির বিনিময়ে কোনও না কোনও কাজে আছেন। এর মধ্যে ৫ কোটি ১৭ লাখ ৪ হাজার মানুষই এমন অনানুষ্ঠানিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সঙ্গে যুক্ত, যার কোনও নিশ্চয়তাই নেই। তাদের কারও হাতেই সে সঞ্চয় নেই যা দিয়ে ঘরে বসে চলা যায় কয়েকদিন। আর এখন তো সময় অনিশ্চয়তার, কেউ জানি না কবে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরব আমরা। সরকারি, বেসরকারি এবং ব্যক্তি উদ্যোগে যেটুকু সম্ভব সাহায্য দেওয়া হচ্ছে দরিদ্র আর হতদরিদ্র মানুষদের মাঝে। ইতিমধ্যেই সরকার ৭২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকা মূলত ঋণ যা ব্যাংক-ক্লায়েন্ট রিলেশনশিপের ওপর নির্ভর করবে কারা এই ঋণের আওতায় আসবে। বলার অপেক্ষা রাখে না এই প্রণোদনা বা ঋণের কোথাও দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা বলা নেই। তাই সরকারি বেসরকারি নানা প্রকার ত্রাণের ওপরেই মূলত এই মানুষগুলোর জীবন নির্ভর করে আছে।

সম্প্রতি ব্র্যাক পরিচালিত এক জরিপ বলছে দেশে সোয়া দুই কোটি মানুষের ঘরে কোনও খাবারই নেই। কাজ হারানো কিংবা কাজে যেতে না পারার কারণে চরম দারিদ্র্যের হার আগের তুলনায় বেড়ে গেছে ৬০ শতাংশ। এই জরিপ মতে মাত্র ৪ শতাংশ মানুষ (যাদের বেশির ভাগের বাস শহরে) জরুরি ত্রাণ পেয়েছেন। অথচ স্বাস্থ্য আর আর্থিক খাতের এই ভয়াবহ সময়েও দেখলাম প্রতিদিন খবরে আসছে ত্রাণ লুটের নানা কাহিনি। মাত্রাগত ভিন্নতা থাকলেও দুর্নীতি চুরি পৃথিবীর সব দেশেই আছে। কিন্তু দেশের ক্রান্তিকালে একেবারে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ খাদ্যসামগ্রী দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের দ্বারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চুরির এমন উদাহরণ খুব বেশি পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। সারা দেশে ৯ দিনে অন্তত ২২৬৮ বস্তা সরকারি ত্রাণের চাল চুরির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর সঙ্গে সরাসরি জড়িত প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারী আর স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। কয়েকটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানার কেবল একটি গুদামে অভিযান চালিয়ে দেখা গেছে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে অন্তত ৩ কোটি টাকার ত্রাণের চাল বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে আর উদ্ধার হয়েছে বিক্রয় নিষিদ্ধ ১৬ মণ চাল এবং ১৫ শত খালি বস্তা, যার চাল আগেই বিক্রি করা হয়ে গেছে। নওগাঁর রানীনগর উপজেলায় এক নেতার গুদাম থেকে দুস্থ মানুষের জন্য বরাদ্দ করা ভিজিডি’র ১৩৮ বস্তা চাল উদ্ধার হয়েছে, এছাড়া ওই গুদাম থেকে খাদ্য অধিদফতরের সিল মারা আরও ২০০টি খালি বস্তা জব্দ করা হয়েছে। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগসাজশ করে কম দামে ভিজিডির চাল কিনে পরে সেগুলো খোলা বাজারে পাইকারি দরে বিক্রি করছিলেন। শুধু চুরি নয়, ঝিনাইদহে ত্রাণের প্যাকেট সামনে নিয়ে সংসদ সদস্য, ইউএনও এবং মেয়রের সঙ্গে ছবি তোলার পর তা আবার কেড়ে নিয়েছেন স্থানীয় যুবলীগ নেতা। এরই মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটির এক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ত্রাণের নামে স্থানীয় ব্যবসায়ী আর প্রভাবশালীদের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা চাঁদা তুললেও পাশে দাঁড়াননি কারও। ফেনী সদর উপজেলার বালিগাঁও ইউনিয়নে ইউপি চেয়ারম্যান, সদস্য আর গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সামনে থেকে সরকারি বরাদ্দের চাল বিতরণের সময় ইউনিয়ন ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক ও তার ১০-১৫ জন সহযোগী অতর্কিত হানা দিয়ে চাল ছিনতাই করে নিয়ে যায়। নেত্রকোনায় ১০ টাকা কেজির খোলা বাজারে বিক্রির চাল উদ্ধার হয়েছে ভাঙ্গারির দোকান থেকে। একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে কিশোরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, মাদারীপুর, নেত্রকোনাসহ দেশের আরও অনেক এলাকায়। যারা ঘটিয়েছেন তারা কেউই অভাব বা অসহায়ত্বের শিকার নন।

ছেলেবেলায় বাবার মুখে শোনা একটা আপ্তবাক্য আজকাল খুব মনে পড়ে। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘বড়লোক’ আর ‘ধনীলোক’ এক নয়। অর্থ থাকলেই ধনী হওয়া যায়, কিন্তু বড়লোক হতে হলে বিবেক, প্রজ্ঞা, সততাসহ সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠতে হয়। প্রবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, মাথাপিছু আয় আর তীব্র বৈষম্যের গোলমেলে হিসাবে পড়ে কিছু ব্যক্তি ধনী হয়ে উঠেছে ঠিকই, কিন্তু হারিয়ে যাচ্ছে মানুষ।

লেখাটি শেষ করছি একজন ‘বড়লোকের’ গল্প দিয়ে। চট্টগ্রামের এক ব্যক্তি সম্প্রতি তার জমানো সকল টাকা নিয়ে দাঁড়িয়েছেন চারপাশের অনাহারে, অর্ধাহারে থাকা মানুষের পাশে। তার জমানো টাকার পরিমাণ খুব বেশি না। মাত্র ১২ হাজার, যা দিয়ে ৬০টি পরিবারের মধ্যে বিলানো হয়েছে ত্রাণসামগ্রী। পেশায় ভিক্ষুক এই পঙ্গু মানুষটি নিঃসন্দেহে কোনও ধনী ব্যক্তি নন বটে, তবে তার মতো বড়লোক কয়জন আছেন আমাদের চারপাশে? 

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট।  জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ