ডা. ম‌ঈনের মৃত্যু: শোকের মধ্যেও মাথাচাড়া দিচ্ছে তীব্র আতঙ্ক

Send
ডা. জাহেদ উর রহমান
প্রকাশিত : ১৬:২৬, এপ্রিল ১৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২৮, এপ্রিল ১৬, ২০২০

ডা. জাহেদ উর রহমানএই পর্যন্ত করোনায় ঘটা ৫০টা মৃত্যুর মধ্যে একটা মৃত্যুকে ভিত্তি করে কিছু কথা লিখতে যাচ্ছি আজ। এই লেখা যখন লিখছি (১৫ এপ্রিল) তখন খবর পাওয়া গেলো আজকের চার জনসহ মৃত্যুসংখ্যা অর্ধশত ছুঁয়েছে। প্রশ্ন আসতেই পারে, আগের মৃত্যুগুলো নিয়ে লিখিনি, কিন্তু কেন লিখছি এই মৃত্যুটিকে নিয়ে আলাদাভাবে? তবে কি আমি একজন ডাক্তারের জীবনকে বেশি মূল্যবান মনে করছি? কেউ এটাও ভাবতে পারেন, প্রফেশনে না থাকলেও যেহেতু আমি ডাক্তার এবং ব্যক্তিগতভাবে পরিচয় না থাকলেও ডা. ম‌ঈন আমার প্রতিষ্ঠান, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সিনিয়র, সেহেতু একটা ‘পিয়ার ফিলিং’ থেকে লিখছি এই লেখা।
তাই শুরুতেই বলে রাখি এই লেখা লিখছি সাধারণ নাগরিক হিসেবে, একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে, আমার চিকিৎসক এবং ডিএমসিয়ান সত্তাকে সরিয়ে রেখে। এই মৃত্যুটাকে বেছে নেওয়ার প্রধান কারণ হলো এই মৃত্যুটা ঘনিয়ে আসার প্রতিটা পদক্ষেপ আমরা জানি; বিস্তারিত জানতে পারিনি অন্যান্য মৃত্যু সম্পর্কে। এই মৃত্যু আসলে একটা উপসর্গ, যেটা আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং সার্বিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার ক্যানসারকে আমাদের সামনে উন্মোচন করে দেয়। আর করোনার এই ভয়ঙ্কর সময়ে ডাক্তারসহ আর সব স্বাস্থ্যকর্মীর মৃত্যু আলাদা মনোযোগের দাবি রাখে। কেন, সেই প্রসঙ্গে পরে আসছি। 

লেখাটা যখন লিখছি তখন কানে বাজছে কতগুলো বাগাড়ম্বর, আশা করি সেগুলো আমাদের স্মৃতি থেকে এখনও ফিকে হয়ে যায়নি। করোনা প্রাথমিকভাবে ধরা পড়ার পর থেকে সরকারের মন্ত্রী এবং গুরুত্বপূর্ণ নেতারা ক্রমাগত বলে যাচ্ছিলেন বাংলাদেশের করোনা প্রস্তুতিতে কোনও ঘাটতি নেই, বরং সেটা বহু ক্ষেত্রেই অনেক উন্নত দেশের চাইতে ভালো। পরবর্তী অংশ ওইসব বাগাড়ম্বর মাথায় রেখে পড়ুন।

করোনা চিকিৎসা নিয়ে সিলেটের প্রস্তুতি বা ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলার আগে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর, চট্টগ্রাম সম্পর্কে একটু জেনে নেওয়া যাক। দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি পত্রিকা ১৪ এপ্রিল করোনার চিকিৎসা প্রস্তুতিতে অতি জরুরি ভেন্টিলেটরসহ আইসিইউর সুবিধা একেবারে অনুপস্থিত থাকা নিয়ে রিপোর্ট করেছে ‘চট্টগ্রামে শ্বাসকষ্টের রোগীদের আইসিইউর জন্য ছোটাছুটি’ শিরোনামে। কেউ পড়লে অবাক হয়ে যাবেন এটা দেখে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরীতে করোনা আক্রান্ত রোগীদের বাঁচানোর শেষ চেষ্টাটা করতে পারছেন না চিকিৎসকরা। একজন করোনা আক্রান্ত রোগী আইসিইউ না পেয়ে মারা গিয়েছেন, সেই তথ্য আছে রিপোর্টে। 

রিপোর্টে অনেক কিছু আছে, সবকিছু বাদ দিয়ে আমি উল্লেখ করতে চাই, সরকার সমর্থক চিকিৎসক সংগঠন স্বাচিপের একজন ডাক্তারের কথা। করোনা মোকাবিলায় গঠিত স্বাচিপের বিভাগীয় সমন্বয়ক আ ন ম মিনহাজুর রহমান বলেন, আইসিইউ কেবল গালভরা বুলি। কিন্তু কোনও হাসপাতালে আইসিইউতে রোগী ভর্তি করাচ্ছে না। অথচ জেনারেল হাসপাতাল থেকে তাদের ওই হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল।

আমি কোনোভাবেই এটা বলছি না, করোনার বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে ফ্রন্টলাইনার ডাক্তাররা আক্রান্ত হবেন না, বা কেউ মারা যাবেন না। তারা আক্রান্ত হচ্ছেন, মারা যাচ্ছেন আসলে সারা পৃথিবীতেই। কোনোভাবেই চাই না একটা মানুষও করোনায় মারা যাক, কিন্তু যাবে, এটাই বাস্তবতা। এটা দেখতে চাই রাষ্ট্র তার সামর্থ্যের সর্বোচ্চ দিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে।

যখন সিলেটে ডা. মঈনের করোনা ডায়াগনসিস হয়, তখন সিলেটে এই রোগী তেমন ছিল না, তাই আইসিইউর সমস্যা থাকার কথা নয়। কিন্তু আমরা দেখলাম উল্টোটা। সিলেট মেডিক্যাল কলেজে, যেখানে উনি কর্মরত ছিলেন সেখানকার আইসিইউতে তাকে নিতে অপারগতা জানানো হয়, কারণ সেই আইসিইউতে যেহেতু অন্য রোগী ছিল, সেহেতু অন্য রোগীর মধ্যেও করোনা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। তারপর জানা যায়, আরেকটা হাসপাতাল শামসুদ্দিন হাসপাতালে করোনা রোগীদের জন্য ব্যবস্থা আছে। আমরা জানলাম, সেখানে আইসিইউ আছে, কিন্তু সেটা পরিচালনার লোকবল নেই।

একজন রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা তিনি, মেডিক্যাল কলেজের সহকারী অধ্যাপক, কিন্তু তাকে ঢাকায় আনার জন্য হেলিকপ্টার চেয়েও পাওয়া যায়নি। এটা তার হক ছিল, কারণ তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন স্রেফ সরকারি ব্যর্থতায়, পিপিই ছাড়া রোগী দেখে। এই বিষয়ে তার একটা ফেসবুক মেসেঞ্জারে চ্যাট ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।  দেশে ডাক্তারদের সুরক্ষা উপকরণের অভাব এখনও কতটা ভয়ঙ্কর রকম প্রকট, সেটা একটু পরে আমরা আরও জানবো। আমাদের মনে থাকার কথা, কিছুদিন আগে একজন এসিল্যান্ডকে ঢাকায় চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারে করে আনা হয়েছিল। এই সরকার ক্ষমতায় থাকতে প্রশাসন লাগে, পুলিশ লাগে, ডাক্তার লাগে না।

শুধু তাই না, তাকে ঢাকায় আনতে অ্যাম্বুলেন্স‌ও পাওয়া যাচ্ছিল না ঠিকমতো; একটা আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স চেয়ে ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে তার আকুতিও ছড়িয়ে পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। সবশেষে অনেক দেরি করে তিনি পৌঁছতে পারেন কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে, তাও অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা হয় পারিবারিক উদ্যোগে। ঢাকায় পৌঁছার পথে তিনি দেখিয়ে দিলেন দেশের একটা বিভাগীয় শহরে, যেখানে দেশের একটি উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠিত মেডিক্যাল কলেজ আছে, সেখানে করোনার তথাকথিত প্রস্তুতি আসলে কী। 

হতেই পারত তিনি ঠিক সময়ে সিলেটে সেবা পেলে কিংবা ঢাকা চলে আসতে পারলে বেঁচে যেতেন। হতেই পারতো শুরু থেকেই ডাক্তারদের জন্য পর্যাপ্ত পিপিই থাকলেই তিনি করোনায় আক্রান্ত‌ই হতেন না।

কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালটির নাম বাংলাদেশের করোনা আক্রান্ত রোগী পাওয়া যাওয়ার পর থেকেই শোনা যাচ্ছে খুব। বলা যেতে পারে এটাই করোনা চিকিৎসার ‘ফ্ল্যাগশিপ’ হাসপাতাল, অর্থাৎ এই রোগের জন্য সবচেয়ে বিশেষায়িত হাসপাতাল। বলাই যায়, এই হাসপাতালটিই এই রোগ মোকাবিলায় আমাদের সব ক্ষমতার সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ।

এই হাসপাতালের একটা খবর তিন চারদিন আগে ভীষণ ভাইরাল হয়। ভাইরাল খবরটি দিয়েই শুরু করা যাক। একটা টেলিভিশন চ্যানেল জানায় পর্যাপ্ত বাজেটের অভাবে ওই হাসপাতালের নার্সদের আধপেটা খেয়ে কাজ করতে হচ্ছে। খাবারের অভাবে তারা রীতিমতো কান্নাকাটি করছেন।

কয়েক দিন আগে এই হাসপাতলে একজন গার্মেন্ট মালিক মোহাম্মদ তাসলিম আক্তার মারা যান। তার ছোটভাই মোহাম্মদ এহতেশাম বিবিসিকে বলছিলেন, হাসপাতালে ভর্তির পর তার ডায়াবেটিক ভাইকে ১২ ঘণ্টায় কোনও খাবার দেওয়া হয়নি, এমনকি কোনও চিকিৎসকও আসেননি তাকে দেখতে।  

মাত্র কয়েক দিন আগে, ১২ এপ্রিল এই হাসপাতাল নিয়ে একটা জাতীয় পত্রিকার রিপোর্টের কিছু অংশ এরকম– ‘শনিবার সারারাত এই হাসপাতালে পানি ছিল না। কর্তব্যরত ডাক্তার, নার্স ও ভর্তি রোগীদের থাকা-খাওয়ারও সমস্যার অন্ত নেই। রোগীরা সেবা পাচ্ছেন না। চিকিৎসক-নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের নেই পর্যাপ্ত পিপিই, সু-কভার’।  

ফেসবুকে একজন ডাক্তার জানিয়েছেন এই হাসপাতালে কেন্দ্রীয়ভাবে অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা নেই। অথচ হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের একটা অংশের ভেন্টিলেটরসহ আইসিইউ প্রয়োজন হয়, কিন্তু যে কোনও মুহূর্তে অক্সিজেন প্রয়োজন হতে পারে প্রায় সবার।

এই যদি হয় অতি সহজে ব্যবস্থা করা যায় এমন সব বিষয়ের প্রস্তুতি, তাহলে ভেন্টিলেটরসহ আইসিইউর কী অবস্থা যে কেউই খুব সহজেই অনুমান করতে পারছেন নিশ্চয়ই। সেটা নিয়েও আমাদের কাছে তথ্য আছে। ৫ এপ্রিল একটি জাতীয় পর্যায়ের পোর্টালে প্রকাশিত রিপোর্টের একটি অংশ এরকম—‘স্বাস্থ্য অধিদফতর ২৬টি আইসিইউর কথা বললেও বাস্তবে এই হাসপাতালে আইসিইউ বেডের সংখ্যা ১০টি।  তবে তার সবগুলোকেও পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ দাবি করা যায় না। তাছাড়া রয়েছে জনবলের ঘাটতি’।

যারা কপালগুণে কিংবা কোনও তদ্বিরের শক্তিতে গিয়ে স্থান পাবো দেশের এই ‘শ্রেষ্ঠ করোনা চিকিৎসালয়’-এ, তাদের জন্য অপেক্ষা করছে এই পরিস্থিতি। তাহলে তাদের কপালে কী আছে যারা যেতে পারবেন না এই হাসপাতালে, কিংবা বাস করেন দেশের অন্য বিভাগ, জেলা অথবা উপজেলা পর্যায়ে?

সরকার ঘোষণা করেছে, করোনা আক্রান্ত হলে ডাক্তাররা ১০ লাখ টাকা পাবেন, আর মারা গেলে সেটা হয়ে যাবে পাঁচ গুণ অর্থাৎ ৫০ লাখ টাকা। সেই বিবেচনায় ডা. মঈন এর পরিবার ৫০ লাখ টাকার ভাগীদার হয়েছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আজ জানিয়েছেন এই টাকা খুব দ্রুত তার পরিবারের কাছে হস্তান্তরের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আবার অনেকেই দেখছি তাকে ‘জাতীয় বীর’, ‘করোনা শহীদ’ এরকম নানা খেতাবে ভূষিত করছেন। হবে কি শেষ রক্ষা এসব করে?

এই যুদ্ধে ডাক্তার এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীকে পর্যাপ্ত সরঞ্জাম দিয়ে সুরক্ষিত রাখা এবং কেউ আক্রান্ত হলে তার জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা শুধু তাদের জন্য না, এটা এই যুদ্ধে জেতার জন্য সবচেয়ে বড় অস্ত্র। ‌ যুদ্ধের মূল সৈনিকদের মনোবল দৃঢ় না রেখে যুদ্ধে জেতা দূরেই থাকুক, সম্মানজনকভাবে হারাও যাবে না। তাই প্রতিটি স্বাস্থ্যকর্মীর প্রতি রাষ্ট্রীয় অবহেলা প্রকারান্তরে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। এবারকার এই ঝুঁকি তাদের জন্যও যথেষ্ট বড়, যারা অতি তুচ্ছ স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ব্যাংকক সিঙ্গাপুর লন্ডন নিউইয়র্ক করে বেড়িয়েছেন। এবার তাদের দেশে থাকতে হবে এবং এখানেই চিকিৎসা নিতে হবে।

আর দেশের ‘ফ্ল্যাগশিপ’ করোনা হাসপাতালের পরিস্থিতি নিয়ে বলতে পারতাম এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় সামর্থ্যকে নগ্ন করে দেয়। সেটা বলছি না, আমাদের রাষ্ট্রীয় সামর্থ্য এর চাইতে অনেক বেশি কিছু। এই হাসপাতাল আসলে একেবারে প্রকাশ্য করে দেয় মানুষের জন্য চরম বিপদেও কাজ করার সরকারি সদিচ্ছার অভাবকে। শুধুমাত্র এই অভাবের কারণেই সারা বিশ্বে ভয়ঙ্কর অবস্থা সৃষ্টিকারী এই রোগ নিয়ে আমারা যা করছি, সেটা স্রেফ ছেলেখেলা। 

করোনায় আক্রান্ত আর মৃত মানুষের সংখ্যা সরকারি হিসাবেই প্রতিদিন বাড়ছে খুব দ্রুত। যে কেউ আমরা আছি সম্ভাব্য ঝুঁকির তালিকায়। ডা. মঈনের মৃত্যুতে আমাদের সামনে আবারও রাষ্ট্রীয় অক্ষমতা আর সদিচ্ছার অভাবকে যখন স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে তুলল আবার, তখন এই মানুষটার করুণ মৃত্যুজনিত গভীর শোকের মধ্যেও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে তীব্র আতঙ্ক—এই আতঙ্ক করোনা আক্রান্ত হয়ে ন্যূনতম চিকিৎসা না পাবার আতঙ্ক, এই আতঙ্ক মৃত্যুর আগে শেষ চেষ্টা হিসাবে একটা আইসিইউ বেড না পাবার আতঙ্ক।

লেখক: শিক্ষক ও অ্যাকটিভিস্ট

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ