মুজিবনগর সরকার আমাদের নিরন্তর প্রেরণার বাতিঘর

Send
মো. জাকির হোসেন
প্রকাশিত : ১১:৫৪, এপ্রিল ১৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:১৬, এপ্রিল ১৭, ২০২০

মো. জাকির হোসেনআজ মুজিবনগর দিবস। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের দীর্ঘ পথচলায় যে কয়টি তারিখ নক্ষত্রের মতো জ্বল জ্বল করছে, নিঃসন্দেহে ১৭ এপ্রিল সেগুলোর মধ্যে অন্যতম।  স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের আনুষ্ঠানিক শপথ নেওয়ার দিন এটি।  মুজিবনগর সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে এক উজ্জ্বল অধ্যায়।  প্রবাসী, বিপ্লবী, অস্থায়ী বা মুজিবনগর সরকার যে নামেই ডাকা হোক না কেন, যুদ্ধকালীন সরকার পরিচালনায় দক্ষতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছে এ সরকার।  মুক্তিযুদ্ধের সময়ে গঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার মুজিবনগর সরকার নামে সমধিক পরিচিত।  ভারতের আগরতলায় এ সরকার গঠিত হলেও এ সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের ভূখণ্ডে। বাংলার শোষিত, নিপীড়িত ও নির্যাতিত মানুষের মুক্তির বাসনাকে সঠিক খাতে প্রবাহিত করে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সমর্থনের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করা ছিল মুজিবনগর সরকারের স্মরণীয় সাফল্য ও কৃতিত্ব। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে দেশে দেশে এ ধরনের সরকার গঠনের অনেক নজির রয়েছে। পোলান্ডের স্বাধীনতাকামী প্রবাসী সরকারের সদর দফতর স্থাপিত হয়েছিল লন্ডনে।  বঙ্গবন্ধুও প্রথমে লন্ডনে প্রবাসী সরকার স্থাপন করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনা করতে চেয়েছিলেন। ভারতের সমর্থন চেয়ে তাই ১৯৬২ সালের ২৫ ডিসেম্বর ভারতীয় উপ-হাইকমিশনের পলিটিক্যাল অফিসার শশাঙ্ক এস ব্যানার্জিকে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু বরাবরে লেখা চিঠি হস্তান্তর করেছিলেন। প্রিন্স নরোদম সিহানুকের নেতৃত্বাধীন স্বাধীন কম্বোডিয়ান সরকারের সদর দফতর স্থাপিত হয়েছিল বেইজিংয়ে। কোনও কোনও সময় এরা থাইল্যান্ডেও অবস্থান করতেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন সমর্থিত আফগান সরকারের বিরুদ্ধে গঠিত আফগানিস্তানের মুজাহেদিনদের সদর দফতর ছিল পাকিস্তানের পেশোয়ারে, প্রবাসী পিএলও সরকারের সদর দফতর স্থাপিত হয় প্রথমে বৈরুতে, পরবর্তীকালে আম্মানে এবং সর্বশেষে তিউনিশিয়ায়। তবে এসব সরকারের তুলনায় মুজিবনগর সরকার ছিল অনেকটাই অতুলনীয়। মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়েছিলো কেবল নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে, যা প্রবাসী সরকার গঠনের ইতিহাসে বিরল। এমনকি এ সরকারের প্রধান সেনাপতিও ছিলেন জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি। সামরিক শক্তি বিবেচনায় অসম প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে যুদ্ধ পরিচালনার পাশাপাশি স্বাধীন অঞ্চলে নেতৃত্ব, দেশ-বিদেশে ব্যাপক জনসমর্থন ও সহানুভূতি আদায়, নিজস্ব আয়-ব্যয়ের ব্যবস্থা, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা, প্রায় এক কোটির মতো শরণার্থীর জন্য ত্রাণের ব্যবস্থা করা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা এবং সর্বোপরি স্বাধীনতা অর্জন, এসব দিক বিবেচনায় মুজিবনগর সরকার ছিল সত্যিই অতুলনীয়।

মুজিবনগর সরকার গঠনের পটভূমি

মুজিবনগর সরকার হঠাৎ আবির্ভূত কোনও ম্যাজিক নয়। এটি বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ সংগ্রাম ও নজিরবিহীন ত্যাগ-তিতিক্ষার ফসল। শারীরিক গঠন, ভাষা, সভ্যতা-সংস্কৃতিতে মিল সত্ত্বেও বাঙালির ধমনীতে রয়েছে অস্ট্রিক, মোঙ্গলীয়, দ্রাবিড়, আর্য, পাঠান, মোগল, ইরানি বিচিত্র রক্তের স্রোতধারা। জাতিসত্তা অন্বেষণে বিভ্রান্ত, বিপর্যস্ত বাঙালি সমাজে ধর্মীয় দ্বিধাদ্বন্দ্ব , সামাজিক কুসংস্কার, সংকট, লোভ, দাসত্ব ইত্যাদি বারবার আঘাত করেছে। এক হয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি বাঙালি। স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন তাই সুদূরপরাহত হয়েছে হাজার বছর ধরে। বঙ্গবন্ধুর অসাধারণ নেতৃত্ব, বাঙালির প্রতি অতল ভালোবাসা, অসীম সাহসিকতা, বিরল ত্যাগ আর সৃজনশীলতা বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চরিত্রকে আপাদমস্তক বিকশিত করার পাশাপাশি ধর্মীয় গোঁড়ামি আর কুসংস্কারের বিরুদ্ধে মহাজাগরণ ঘটিয়েছিল। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাঙালি একাট্টা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ম্যাকব্রাইড যথার্থই বলেছেন, ‘Bangabandhu Sheikh Mujib was the soul of his nation’. মহাজাগরণ তৈরি করে বাঙালিকে এক কাতারে নিয়ে আসা সহজ কাজ ছিল না। এক লহমায় এটি হয়নি।  দীর্ঘ, কন্টকাকীর্ণ পথ বেয়ে ভয়ানক ঝুঁকিপূর্ণ ও দুরূহ এ চ্যালেঞ্জ সম্পন্ন হয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে সাংবাদিক সিরিলডন টাইম ম্যাগাজিনে লিখেছিলেন, ‘মাতৃভূমিকে পশ্চিম পাকিস্তানের একটি উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতার জন্য বর্তমানের চমকপ্রদ নাটকীয় যুদ্ধের পর্যায়ে নিয়ে আসার ঘটনা শেখ মুজিবের একদিনের ইতিহাস নয়, ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এটি তাঁর লক্ষ্য ছিল’। এ দীর্ঘ যাত্রায় কারাগার হয়ে উঠেছিল বঙ্গবন্ধুর আবাস। সংক্ষিপ্ত জীবনকালে দীর্ঘ ৪৬৭৫ দিন বঙ্গবন্ধুকে কারাগারের চার দেয়ালে বন্দি থাকতে হয়েছে। বিচারে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়েছে অন্তত দু’বার। রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়ার চরম ঝুঁকিও নিতে হয়েছে একাধিকবার। তবু দমে যাননি বঙ্গবন্ধু। বরং নিজের ও পরিবারের চাওয়া-পাওয়া, স্বপ্ন-সাধকে বিসর্জন দিয়ে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে জীবন বাজি রেখে সাহসী থেকে দুঃসাহসী হয়ে উঠেছেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠনের অধিকার অর্জন করে, কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক সরকার ক্ষমতা পূর্ব পাকিস্তানের হাতে ছেড়ে দিতে রাজি ছিল না। ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের তারিখ নির্ধারিত হয়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং সামরিক বাহিনীর অফিসারদের নিয়ে ষড়যন্ত্রের নীলনকশা বুনতে শুরু করেন। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ কোনও কারণ ছাড়াই ৩ তারিখের নির্ধারিত অধিবেশন বাতিল করা হয়। এই সিদ্ধান্তে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। বঙ্গবন্ধু সারা দেশে ৫ দিনের হরতাল এবং অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। তাঁর আহবানে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান কার্যত অচল হয়ে যায়। সামরিক সরকার কারফিউ জারি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, কিন্তু এতে আন্দোলন প্রশমিত হয়নি। ৫ দিন হরতাল শেষে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করে কার্যত বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা করে দেন। সারা দেশ যখন ক্ষোভে উত্তাল, তখন ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সরকার গঠন ও ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে আলোচনা শুরু করেন। কিন্তু মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক সফল হয়নি। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে বাঙালি নিধনযজ্ঞের সবুজ সংকেত প্রদান করে সন্ধ্যায় গোপনে পশ্চিম পাকিস্তান যাত্রা করেন। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী শুরু করে অপারেশন সার্চলাইট নামের গণহত্যাযজ্ঞ। আর পাকিস্তানি সেনারা সেই রাতেই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন- “এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের মানুষকে আহ্বান জানাই, আপনারা যেখানেই থাকুন, আপনাদের সর্বস্ব দিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যান। বাংলাদেশের মাটি থেকে সর্বশেষ পাকিস্তানি সৈন্যটিকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের আগ পর্যন্ত আপনাদের যুদ্ধ অব্যাহত থাকুক”।

মুজিবনগর সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের বিধান অনুসারে (১৯৩৩ সনের মন্টিভিডিও কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ১) একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কয়েকটি আবশ্যকীয় উপাদান প্রয়োজন। উপাদানগুলো হলো -(ক) একটি সুনির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী; (খ) একটি সুনির্দিষ্ট সীমানা; (গ) একটি কার্যকর সরকার; এবং (ঘ) সার্বভৌমত্ব। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও রাষ্ট্রগঠনের আবশ্যিক উপাদান একটি আনুষ্ঠানিক সরকারের প্রয়োজনীয়তা আইন ও বাস্তবতার নিরিখে ব্যাপকভাবে অনুভূত হতে থাকে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মার্চ মাসেই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অনানুষ্ঠানিক সরকার পরিচিালিত হয়ে আসছিলো। পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিক সালিক ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত তার ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘অসহযোগ আন্দোলন ঘোষণার মধ্য দিয়ে মুজিব প্রদেশে সমান্তরাল সরকার প্রতিষ্ঠা করে ডি ফ্যাক্টো শাসকে পরিণত হন। মুজিব তাঁর শাসনকে সংহত করার জন্য একের পর এক নির্দেশ (মোট সংখ্যা ৩১) জারি করেন। বঙ্গবন্ধুর বাসভবনকে ডি ফ্যাক্টো প্রেসিডেন্ট ভবন হিসেবে উল্লেখ করে ব্রিগেডিয়ার সালিক লিখেছেন, ‘পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামার জন্য মুজিব ইতিমধ্যে তাঁর সশস্ত্র সংগঠন তৈরি করে ফেলেছেন। কর্নেল (অব.) এম এ জি ওসমানী কার্যত মুজিবের কমান্ডার-ইন-চিফ। তাঁর প্রাইভেট বাহিনী গড়ে উঠেছে আওয়ামী লীগের স্বেচ্ছাসেবক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্তদের নিয়ে। ‘আওয়ামী লীগের সামরিক প্রস্তুতির সঙ্গে যেসব সামরিক কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন, তাঁরা হলেন- ব্রিগেডিয়ার মজুমদার, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাসুদুল হাসান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইয়াসিন, মেজর (পরে ব্রিগেডিয়ার) মুশাররফ, মেজর জলিল ও মেজর মঈন। ব্রিগেডিয়ার মজুমদার ও অন্যরা তাঁদের লেখনী ও বক্তব্যে ওসমানীর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগের বিষয় নিশ্চিত করেছেন। ২৫ মার্চের আগেই বঙ্গবন্ধুর ডি ফ্যাক্টো কমান্ডার-ইন-চিফ কর্নেল ওসমানী কর্তৃক প্রণীত সামরিক পরিকল্পনার বিবরণ দিতে গিয়ে ব্রিগেডিয়ার সালিক লিখেছেন, ‘তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাঙালি সৈনিকদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করলেন, যাতে তাঁরা মুজিবের ডাকের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বেরিয়ে আসতে পারে। সামরিক পরিকল্পনার মধ্যে ছিল- এক. পূর্ব পাকিস্তান অবরোধের জন্য ঢাকা বিমানবন্দর ও চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দখল করা। দুই. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘাঁটি করে ঢাকা নগরের নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ। এর দায়িত্ব ছিল ইপিআর ও পুলিশ বাহিনীর। সশস্ত্র ছাত্ররা তাদের সাহায্য করবে। তিন. ইপিআর ও ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট পরিত্যাগকারীদের দায়িত্ব ছিল ক্যান্টনমেন্ট দখলের জন্য প্রচণ্ড আঘাত হানা’। আঘাত হানার সময় সম্পর্কে ব্রিগেডিয়ার মজুমদার লিখেছেন, 'বঙ্গবন্ধু ঢাকা রেডিওর বাংলা সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যাওয়াকে আঘাত হানার ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করলে ওসমানী বলেন, আর্মি অফিসারকে ইঙ্গিত দেওয়ার এটা নিয়ম নয়। আপনি কোনও বিশেষ সংকেত দিন, যেটা ওনাকে (ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে) জানাতে হবে। তখন বঙ্গবন্ধু বললেন, আমার মেসেজ টেপরেকর্ড করে রাখবো। একটা রেকর্ড ইপিআরকে দেব, আরেকটা কপি জহুর আহমেদ চৌধুরীকে দেব। সেটা পেলে তারা অ্যাকশনে যাবে। ’২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের আবশ্যিক উপাদান একটি আনুষ্ঠানিক সরকার গঠনের বাস্তব সত্যকে উপলব্ধি করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গঠিত হয় যুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকার তথা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম আনুষ্ঠানিক সরকার। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত এ সরকার ছিল সকল বিবেচনায় বৈধ সরকার। ফলে বাংলাদেশের জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে যে কোনও ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার আইনানুগ ক্ষমতাও ছিল এ সরকারের। মুজিবনগর সরকার গঠিত না হলে আমরা আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদী অথবা বিদ্রোহী হয়ে পড়তাম। কাতাঙ্গা যখন ১৯৬০ সালে কঙ্গোর বিরুদ্ধে অথবা বায়াফ্রা যখন ১৯৬৭ সালে নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করে তখন তাদের স্বাধীনতার ঘোষণাকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অপপ্রয়াসরূপে চিহ্নিত করা হয় এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ব তাদের রাষ্ট্ররূপে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে। মুক্তিযুদ্ধ সফল করতে হলে আইনানুগ সরকার গঠনের বিকল্প ছিল না। সরকার গঠিত না হলে বহির্বিশ্বের সহায়তা পাওয়া সম্ভব হতো না।

মুজিবনগর সরকার গঠন ও সংবিধান প্রণয়ন

১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদ বৈঠক করেন। বৈঠককালেই তাজউদ্দীন আহমদ মনস্থির করেছিলেন, মার্চে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব দলের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও চার সহসভাপতিকে নিয়ে যে হাইকমান্ড গঠন করেছিলেন সে আদলেই সরকার গঠন করবেন। ইন্দিরা গান্ধীও সরকার গঠনের পরামর্শ দিয়ে বলেন বাংলাদেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা এমন একটি সিদ্ধান্ত নিলে ভারত সরকার ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের তাদের পাশে দাঁড়ানোর একটি আইনগত ভিত্তি সৃষ্টি হবে। দিল্লি থেকে ফিরে তাজউদ্দীন আহমদ দ্রুত সরকার গঠনের লক্ষ্যে দলের অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতাদের খোঁজে বের হন। কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেই তখন কলকাতায় পৌঁছে গিয়েছেন। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল নির্বাচিত সাংসদেরা (এমএনএ এবং এমপিএ) ভারতের আগরতলায় একত্র হয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন করেন। প্রবাসী সরকার গঠিত হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধে প্রবল গতি সঞ্চার হয়। নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম। মুক্তিযুদ্ধকে সর্বজনীন করার জন্য নতুন সরকার সর্বসম্মতিক্রমে ‘সর্বদলীয় উপদেষ্টা পরিষদ’ গঠন করা হয়। ওই পরিষদের ছয় সদস্যে ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী (ন্যাপ ভাসানী), অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ (ন্যাপ মোজাফফর), সিপিবির সভাপতি মণি সিংহ, বাংলাদেশ জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি মনোরঞ্জন ধর। এ ছাড়া পদাধিকারবলে ওই পরিষদে ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ ও খোন্দকার মোশতাক আহমদ। বিশ্বের সংবাদ মাধ্যমগুলো বাংলাদেশের জন্ম ও প্রবাসী সরকার গঠনের সংবাদ ১১ এপ্রিল গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করে। পরদিন ১১ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ দেশবাসীর উদ্দেশে বেতার ভাষণ দেন। এই ভাষণে তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘পাকিস্তান আজ মৃত এবং অসংখ্য আদম সন্তানের লাশের তলায় কবর রচিত হয়েছে। সাড়ে সাতকোটি বাঙালি অজেয় মনোবল ও সাহসের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে এবং প্রতিদিন হাজার হাজার বাঙালি সন্তান রক্ত দিয়ে এই শিশু রাষ্ট্রকে লালিত-পালিত করছেন। দুনিয়ার কোনও জাতি এই নতুন শক্তিকে ধ্বংস করতে পারবে না।’ ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল সরকার গঠনের পাশাপাশি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রও জারি হয়। পৃথিবীর যে কয়টি দেশ আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম। বাঙালিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। নব্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার জন্য ওই বছরের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার তাদের অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে শুধু বঙ্গবন্ধুর ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণাকে বৈধতা ও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫০ অনুচ্ছেদের বরাতে চতুর্থ তফসিলে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র বাংলাদেশের একটি ক্রান্তিকালীন অস্থায়ী বিধান হিসেবে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হবে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি এখন বাংলাদেশের সংবিধানে সংযুক্ত করা হয়েছে ও এই ঘোষণাপত্রকে সংবিধানের একটি মৌলিক কাঠামো হিসাবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দান করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাকে অস্বীকার করে জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করা সংবিধান লঙ্ঘন। এটি মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করা ও রাষ্ট্রদ্রোহীতার শামিল।

মুজিবনগর সরকারের বিরুদ্ধে পাকিস্তান সরকারের তৎপরতা

মুজিবনগর সরকার গঠনের দিনই প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এক ভাষণে পাকিস্তানকে সহযোগিতা না করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা সমস্ত বন্ধু রাষ্ট্র, পৃথিবীর সমস্ত সহানুভূতিশীল ও মুক্তিকামী মানুষের কাছে, রেডক্রস এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে সাহায্যের আবেদন জানাচ্ছি। যারা আমাদের সাহায্য করতে ইচ্ছুক অথচ বর্বর ইসলামাবাদ শক্তি তাদের এই মানবিক কাজটুকু করবার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, তারা এখন স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেন।...আমরা সেইসব বৃহৎ শক্তিবর্গের কাছে মানবতার নামে আবেদন জানাচ্ছি, এই হত্যাকারীদের হাতে যেন আর অস্ত্র সরবরাহ না করা হয়।’ মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসী মুজিবনগর সরকার গঠনের পরেই এই সরকারের প্রতিনিধিরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। তবে প্রবাসী সরকারের কোনও প্রতিনিধিই যেন বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করতে না পারেন, সে বিষয়ে সচেষ্ট ছিল পাকিস্তান।  একাত্তরের এপ্রিলে মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে ভারতে অবস্থানকারী যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। প্রভাবশালী দেশ হিসেবে এই দুই দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে আলোচনাকে প্রাধান্য দিচ্ছিলেন তিনি। তবে দিল্লিতে পাকিস্তানের তৎকালীন হাইকমিশনার সাজ্জাদ হায়দার বিষয়টি জানতে পেরে সেই সময় দিল্লির যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসকে জানান কোনোক্রমেই যেন তারা বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ না করেন। একই সঙ্গে ইসলামাবাদ থেকেও তৎপরতা শুরু করা হয়। ১৯৭১ সালে ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত আগা হিলালি একইভাবে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের তৎকালীন দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ভ্যান হোলেনের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়, মুজিবনগর সরকার একটি অবৈধ সরকার। মুজিবনগর সরকারের কোনও প্রতিনিধিই যেন বিশ্বের কোনও দেশেই মার্কিন কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক না করতে পারেন, সে লক্ষ্যে মার্কিন প্রশাসন যেন সব ধরনের উদ্যোগ নেয়। তবে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

মুজিবনগর সরকারের শপথগ্রহণ

স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠিত হলো। কোথায় এই সরকার কীভাবে কাজ করছে সেটি দেখাতে একটি প্রমাণ চাই। পাকিস্তান সরকার অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে যে বাংলাদেশ সরকারের অস্তিত্ব নেই, এটি কেবল ভারতের প্রচারণা। সে কারণেই দেখাতে হবে বাংলাদেশ সরকার কাজ করছে এবং বাংলাদেশের মাটিতেই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ সরকার কাজ করছে। শপথ গ্রহণের স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হলো পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননকে। এলাকাটির তিন দিকেই ভারত। তাই পাকিস্তানি বিমান হামলার শঙ্কা ছিল না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের শপথগ্রহণ এক ঐতিহাসিক ঘটনা এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে আরেকটি ঐতিহাসিক দিন। প্রবাসী সরকার গঠনের পর বিদেশের মাটিতে নয়, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে যাতে নতুন সরকারের শপথ পাঠ করানো হয় তা একটি চ্যালেঞ্জ ছিল। বর্বর পাকবাহিনীর দখলে বাংলাদেশ। সেখানে সরকার গঠন ও শপথ পাঠ করার আনুষ্ঠানিকতা বিপজ্জনক। তবুও এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হবে। শপথ গ্রহণের জন্য খুব গোপনে নিজ ভূখণ্ডে একটি নিরাপদ মুক্তাঞ্চল হিসেবে মেহেরপুরের ভবেরপাড়া গ্রামের বৈদ্যনাথতলাকে নির্বাচন করা হলো। গোপনীয়তা রক্ষার জন্য শপথ গ্রহণের দিন-ক্ষণ নির্ধারণের দায়িত্ব বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ারে ছিল। সার্বিক নিরাপত্তা বিধানের জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর সতর্ক দৃষ্টি ছিল পুরো অঞ্চল ঘিরে। ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে নবাব সিরাজদ্দৌলার পতন ঘটেছিল ইংরেজদের হাতে। ১৯৭১-এ মেহেরপুরের আরেক আম্রকাননে শপথ গ্রহণ করে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে প্রবাসী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। শপথগ্রহণ শেষে সরকার স্বাধীন বাংলাদেশের সদর দফতর তথা অস্থায়ী কার্যালয় বৈদ্যনাথতলাকে বঙ্গবন্ধুর নাম অনুসারে মুজিবনগর নামকরণ করেন। সেই থেকে এ সরকার মুজিবনগর সরকার নামে দেশে-বিদেশে পরিচিতি লাভ করে। মুজিবনগর সরকারের সদর দফতর মুজিবনগরে স্থাপিত হলেও এর সদর দফতর কলকাতা স্থানান্তরিত হয়।

স্বাধীনতা যুদ্ধে মুজিবনগর সরকারের ভূমিকা

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মুজিবনগর সরকার নীতিনির্ধারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। এই সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সকল ক্ষেত্রেই বিশেষ ভূমিকা পালন করে। সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে স্বাধীনতাযুদ্ধ পরিচালনা করে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় গঠন করে বেসামরিক প্রশাসনকে সংগঠিত করে দেশের নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ায়। যুদ্ধকালীন সময়ে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে। এই সরকারের উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশের সাহায্যের আবেদন জানালে তিনি সম্মত হন। মুজিবনগর সরকার গঠনের পর এ সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো বাংলার শোষিত, নিপীড়িত ও নির্যাতিত জনতার মুক্তির বাসনাকে সঠিক খাতে প্রবাহিত করে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সমর্থনের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করা। মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ঠিক রাখা এবং মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় সাধন। পাশাপাশি জনগণের মনোবল ঠিক রাখা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বিজয় লাভের লক্ষ্যে মুজিবনগর সরকার শুরু থেকেই বিশ্ব জনমত গঠনে জোর তৎপরতা শুরু করে। বিশ্ব সম্প্রদায়কে বাংলাদেশের পক্ষে আনতে নানা কার্যক্রম হাতে নেয়। পাকিস্তানের বিভিন্ন দূতাবাসে কর্মরত বাঙালি কূটনীতিকরা যেন দ্রুত পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে মুজিবনগর সরকারের পক্ষে আনুগত্য প্রকাশ করেন, সে লক্ষ্যে কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর পাকিস্তানের বিভিন্ন দূতাবাস থেকে বাঙালি কূটনীতিকরা পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করেন।  তারা স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনে নানামুখী তৎপরতা শুরু করেন। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়লাভের লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা সফলে মুজিবনগর সরকার বেশ কয়েকটি উদ্যোগ গ্রহণ করে। এসব উদ্যোগের মধ্যে অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল বিশ্বব্যাপী জনমত গঠন ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস খোলা। সেসব দূতাবাস থেকে বাংলাদেশের পক্ষে প্রচার ও বিশ্ব জনমত গঠন ও পাকিস্তানের বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতার জবাব দেওয়া। এছাড়া বিশ্বের প্রভাবশালী দেশ হিসেবে ভারত, রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীনসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখা ও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য মুজিবনগর সরকার যেমন সশস্ত্র বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী সংগঠিত করেছিল, একইভাবে সরকার পরিচালনার জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, মন্ত্রণালয়ের সচিবালয় ও বিভিন্ন বিভাগ গঠন করেছিল। ফলে মুজিবনগর সরকারের বিভিন্ন কার্যাবলী পর্যালোচনা করলেই বোঝা যাবে কত ব্যাপক এবং সুসংগঠিত ছিল এই সরকারের কর্মসূচি এবং গঠন কাঠামো। মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের মনোবল অক্ষুন্ন রাখার জন্য এই সরকার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, সংবাদপত্র, বুলেটিন প্রভৃতির মাধ্যমে সর্বোত প্রচেষ্টা চালায়। স্বাধীন বাংলা বেতারের দেশাত্মবোধক গানগুলো এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠান বিশেষ করে চরমপত্র মুক্তিযোদ্ধা ও জনগণকে উদীপ্ত করে তুলে। মুক্তিযুদ্ধের একটি পর্যায়ে অনেক এলাকা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত ও স্বাধীন হয়। মুজিবনগর সরকার এসব মুক্ত এলাকায় বেসামরিক প্রশাসন গড়ে তোলে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করে। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা, লক্ষ্য, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হিংস্রতা ও গণহত্যা এবং পাশাপাশি মুক্তিবাহিনীর সাফল্য বহির্বিশ্বে প্রচার করে জনমত সৃষ্টি করার ক্ষেত্রেও মুজিবনগর সরকার প্রশংসনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে। মুক্তিযুদ্ধকে বিভ্রান্ত করতে ও ভুলপথে পরিচালিত করতে ষড়যন্ত্রও চালায় পাকিস্তান এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী পরাশক্তি আমেরিকা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা নস্যৎ করতে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব করলে মুজিবনগর সরকারের তৎপরতায় রাশিয়া (সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন) এর বিরুদ্ধে ভেটো দেয়। এমনকি পাকিস্তানের ইঙ্গিতে স্বাধীনতার দাবি থেকে সরে এসে পাকিস্তানের সাথে আবারো ঐক্যের প্রচেষ্টা চালাতে থাকে মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খোন্দকার মোশতাক। মোশতাক আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দকে বিভ্রান্ত করতে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলিং করে প্রচারণা শুরু করে, কি চাই জীবিত বঙ্গবন্ধুকে, না স্বাধীন বাংলাদেশ? স্বাধীন বাংলাদেশ চাইলে মুজিবকে ফেরত পাওয়া যাবে না।

বহির্বিশ্বে মুজিবনগর সরকারের তৎপরতা ও বিজয় অর্জন

যুদ্ধকালীন সময়ে বহির্বিশ্বে মুজিবনগর সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা ছিল উল্লেখযোগ্য। তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে বিশেষ দূত হিসেবে পাঠানো হয় বহির্বিশ্বে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে সমর্থন ও জনমত আদায়ের জন্য। এছাড়া বাংলাদেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জাপান, সুইডেন ও অন্যান্য কতিপয় প্রভাবশালী দেশের সমর্থন লাভের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা চালানো হয়। কলকাতা, দিল্লি, লন্ডন, ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক ও স্টকহোমসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের মিশন স্থাপন করা ছিল এই সরকারের একটি উল্লেখযোগ্য দিক। এই সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এপ্রিল মাস থেকে পাকিস্তান দূতাবাসের অনেক বাঙালি পক্ষত্যাগ করে। মে মাসের প্রথম দিকে শেখ মুজিবুর রহমানের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অধ্যাপক রেহমান সোবহান সরকারের নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্রে যান। তার তৎপরতার ফলে বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে। এছাড়া ১৯৭১ সালের অক্টোবরে মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্বে ১৬ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলকে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদানের জন্য পাঠানো হয়। এই অধিবেশনে উপস্থিত ৪৭টি দেশের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন ঘটনা শুনে সহানুভূতি প্রদর্শন করেন। এভাবে মুজিবনগর সরকার মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় বহির্বিশ্বের সমর্থন আদায়ে সচেষ্ট ছিল। বহির্বিশ্বে তৎপরতার ফলে বিদেশে প্রশিক্ষণরত সিভিল সার্ভেন্টদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ৭ (সাত) জন এবং যুক্তরাজ্যে ২ (দুই) জন স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ শুরু করেন। তাছাড়া ইরাক, ফিলিপাইন ও আর্জেন্টিনার পাক রাষ্ট্রদূতগণ এবং কলকাতা, দিল্লি, লন্ডন, ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক, কাঠমন্ডু ও হংকং প্রভৃতি স্থানে নিযুক্ত পাকিস্তান দূতাবাসের উচ্চপদস্থ কূটনীতিকগণ মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিবনগর সরকারের প্রতি সমর্থন ও আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষণা দিয়েছিলেন, মুজিবনগর সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার কারণেই ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জিত হয়।

উপসংহার

অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে সীমিত সামর্থ্য নিয়ে মুজিবনগর সরকার দক্ষতার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ ও প্রশাসন পরিচালনা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করেছেন। অসম স্বাধীনতাযুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছেন। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে মুজিবনগর সরকারের ভূমিকা ছিল অনন্য। তাই বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে মুজিবনগর সরকারের নাম। অতল দেশপ্রেমের পাশাপাশি মেধা, সততা ও ইস্পাত কঠিন ঐক্য ছাড়া এ গুরুদায়িত্ব পালন সম্ভব হতো না। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশেও মুজিবনগর সরকারের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ জাতি গঠনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা হিসেবে মুজিবনগর সরকারের নেতৃবৃন্দ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরও মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে। আওয়ামী লীগ, তার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপশক্তি, দুর্নীতিবাজ এমনকি বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বংশধরদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। অনুপ্রবেশকারীরা দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা অপকর্মে সংগঠনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনসমূহকে ঢেলে সাজানোর বিকল্প নেই। দুর্নীতিবাজ ও ষড়যন্ত্রীরা যতই শক্তিশালী হোক মুজিবনগর সরকার বাতিঘর হিসাবে আমাদের নিরন্তর প্রেরণা জোগায় কীভাবে ঐক্যবদ্ধ থেকে সব ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়তে হয়। সামনে এগিয়ে যেতে হয়।

 

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: [email protected]

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ