‘আবার তোরা মানুষ হ’

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৮:০৮, এপ্রিল ১৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:১১, এপ্রিল ১৮, ২০২০

তুষার আবদুল্লাহপৃথিবী এখন মৃত্যুশয্যায়। বাংলাদেশও এই শয্যার বাইরে নয়। এক সপ্তাহে বিশ্ব থেকে ৫০ হাজার মানুষ হাপিস। বাংলাদেশও আজকে পর্যন্ত হারিয়েছে ৮৪ জনকে। গাণিতিক থেকে জ্যামিতিক আকারে রূপ নিয়েছে আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্যা। এই জ্যামিতিক রেখাও বুঝি অসীমের পথে যাত্রা করেছে। অন্তিম যাত্রার পথে যখন বিশ্ব, তখন মানুষ কি শুরু করেছে নিজেকে পরিশুদ্ধ, পরিশোধন করতে? ক্ষুদ্রতা, ব্যক্তি স্বার্থ, নষ্ট রাজনীতির কুয়ো থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে উন্মুক্ত ময়দানে? বাইরের দিকে তাকাবো কী, ঘরের কুয়োতে ব্যাঙের ছটফটানি দেখেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছি। পৃথিবীর বয়সের ভয়াবহতম দুর্যোগের একটির সঙ্গে লড়াই করছি আমরা। এক-দুই শতাব্দীতে এমন মহামারি দেখেনি বিশ্ব। দুর্যোগের এই ভয়াবহতার মুখোমুখি হয়ে মানুষ তার ভুল শুধরে নেবে। হবে বিনয়ী। নতজানু হবে সৃষ্টির বিশালতার কাছে। এমন প্রত্যাশা হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মানুষ হয়তো আর মানুষের সীমাতে নেই। বেপরোয়া ওই প্রাণীটির দেহ থেকে খসে পড়েছে মানবিক সকল উপকরণ।

এই দুর্যোগকালে বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে ত্রাণ চুরির ঘটনা। নতুন কোনও চিত্র নয় এটি। যখন যে সময়কালে দুর্যোগ এসেছে, ত্রাণ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। যাদের হাতে বিতরণের দায়িত্ব, বিলি করতে গিয়ে তাদের হাতে কিছু ত্রাণ লেগেই থাকে। ছেড়ে যেতে চায় না। দশকের পর দশক, হয়তো শতাব্দীকাল ধরেই এই দুষ্টচক্র থেকে ত্রাণ বেরিয়ে আসতে পারেনি। ত্রাণ সকল সরকারকেই নানা সময়ে বিব্রত করেছে। এবারও করছে। দেখা যাচ্ছে কিছু সরকারি লোক অভ্যাসবশত ত্রাণ চুরি করছে ঠিক, আবার চুরি না করা সত্ত্বেও একই দল বা প্রতিপক্ষের কূট রাজনীতির স্বীকার হয়ে ত্রাণ চোর হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছেন। কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে মহাযুদ্ধের অগ্রসেনা চিকিৎসক, নার্সদের বিতরণ করা উপকরণেও ভেজাল, দুর্নীতি। তাদের নকল মাস্ক, পিপিই দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজনীতি চলছে চিকিৎসকদের মাঝে। সম্মিলিতভাবে কাজ না করে এক পক্ষ কোভিড-১৯ সংক্রমণ বা পরিস্থিতি মোকাবিলার অব্যবস্থাপনার জন্য একপক্ষ, অপরপক্ষকে দায়ী করে যাচ্ছেন। কোনও কোনও পক্ষ অন্যের ভুল হওয়া বা ধরা পড়ার অপেক্ষার প্রহর গুনছে।

কোভিড-১৯ কোনও রাজনৈতিক দলের আমদানি করে নিয়ে আসা দুর্যোগ নয়। তাই কোভিড-১৯ এর সংক্রমণে সরকারকে বিব্রত হওয়ার প্রয়োজন নেই। দায় এড়াতে প্রয়োজন নেই শাকপাতা নিয়ে বসার। বরং রাষ্ট্রের দফতরগুলোকে এক ছাতার নিচে এনে, সমন্বিতভাবে করোনা সংক্রমণ ঠেকানো এবং এই মহামারিকালীন ও পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সক্রিয় থাকা প্রয়োজন। পৃথিবীর কোনও সরকারই ‘ছিদ্রহীন’ নয়। আমরা করোনাকালে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সরকার ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনায় সেই ছিদ্র দেখতে পেয়েছি। সরকারের উচিত ছিদ্র বড় না হতে দিয়ে, তাকে সামলে রাখা। বিরোধী দল যদি পুরনো কৌশলে এখন সরকারের সমালোচনায় মুখর থাকে, তাহলে বলতে হবে তাদেরও পরিশোধন হয়নি। কর্মীদের নিয়ে মানুষের পাশে না দাঁড়িয়ে শুধু সমালোচনা সাহিত্য পাঠের সময় নয় এখন। বিপন্ন মানুষ এই পাঠ বা কথন এখন কানে তুলবে না।

সরকার মাত্রই মুশকিলে থাকে। বিশেষ করে সরকার পরিচালনার দায়িত্বে যারা শীর্ষে অবস্থান করেন। মুশকিল হলো তাদের কাছে তৃণমূল থেকে শুরু করে দফতরের ওপরের ধাপগুলো থেকে শুধু মিথ্যে তথ্য দেওয়া হয়। কখনও কখনও তৃণমূল সত্য বলার চেষ্টা করলেও উপরের ধাপের তৈরি মিথ্যের কুয়াশার দেয়াল ভেদ করতে পারে না সেই সত্য। এই দেয়াল একপর্যায়ে ভেঙে পড়ে বালির বাঁধের মতো। কিন্তু ততক্ষণে সরকারের কাঁধে অভিযোগ, ব্যর্থতা উঠে আসে। মিথ্যে বচনকারী এই পেশাজীবীরা যে সরকার মনস্ক বা সরকারি দলের, তা নয়। তারা সকল সময়ে একই রূপে আবির্ভূত হয়। সরকারকে ফ্যান্টাসির মধ্যে রাখাই এদের উদ্দেশ্য।

কোভিড-১৯ নিয়েও একটি পক্ষ এই ফ্যান্টাসির খেলা শুরু করেছিল। রাষ্ট্র সেই খেলা বুঝতে পেরে দ্রুত সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তবে খেলোয়াড়রা খেলার মাঠ থেকে সরে গেছে, তা বলা যাবে না। তারা তাদের ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ নিশ্চিত করার চেষ্টা করবেই। সেই চেষ্টায় সফল হতে গিয়ে সরকার বিব্রত হচ্ছে কিনা, কোভিড-১৯-এ সংক্রমণ, মৃত্যুর রেখাচিত্র আরও ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে কিনা, এই মহাদুর্যোগেও এমন উদার চোখ তৈরি হয়নি তাদের। প্রকৃতির এমন ভয়ঙ্কর রূপ দেখেও তারা খসে পড়া মানবিক পোশাক তুলে নেয়নি। এই জীবাণুর চেয়েও ভয়ঙ্কর এই প্রাণীদের কাছ থেকে সরকার ও নাগরিকদের সতর্ক থাকতে হবে।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ