নারীর জীবন: বাইরে মহামারি, ঘরে নির্যাতনকারী

Send
শাহানা হুদা রঞ্জনা
প্রকাশিত : ১৫:৩০, এপ্রিল ১৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:২৯, মে ০১, ২০২০

শাহানা হুদা রঞ্জনাসেদিন যখন পত্রিকায় দেখলাম করোনাভাইরাস মহামারিতে সারাবিশ্বের মানুষ শুধু বেঁচে থাকা নিয়ে আতঙ্কিত, এই পরিস্থিতিতেও চলছে নারীর ওপর সীমাহীন নির্যাতন। সারাবিশ্বে পারিবারিক সহিংসতা অনেক বেড়ে গেছে এবং চরম অনিরাপত্তায় ভুগছে নারীরা। বিশ্বব্যাপী এই লকডাউন পরিস্থিতিকে ব্যবহার করা হচ্ছে গৃহে আবদ্ধ থাকা নারীর বিরুদ্ধে। গৃহে শিশুকে নিপীড়ন করা আরও সহজ, কারণ শিশু ভয়ে কাউকে কিছু বলে না, কী করতে হবে শিশু বুঝে না, কার কাছে যেতে হবে জানে না। এবং সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার, শিশুর কথা কেউ বিশ্বাসও করে না।
এই নির্যাতনের মাত্রা এতটাই বেশি যে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তেনিও গুতেরেস গত ৬ এপ্রিল এই বিষয়ে এক বিবৃতি দিতে বাধ্য হন। তিনি বলেছেন, করোনা পরিস্থিতিতে নিজের ঘরে সবচেয়ে নিরাপদে থাকার কথা ছিল নারীর। অথচ পারিবারিক নির্যাতন এমন আকার ধারণ করেছে যে অনেক নারীর কাছে ঘর এখন নরকের মতো হয়ে উঠেছে।
প্রশ্ন উঠতে পারে কেন পুরুষরা ঘরে আবদ্ধ নারীর ওপর নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিলো? যারা নির্যাতনকারী তাদের কাছে পরিস্থিতি কোনও ব্যাপার নয়। ব্যাপার হচ্ছে নারী বা শিশু, যাদের সে নির্যাতন করবে, তারা কতটা হাতের কাছে রয়েছে। গৃহবন্দিত্বকালের এই সময়ে নারী দীর্ঘ সময় তার অত্যাচারীর কাছাকাছি থাকে। তারা চাইলেই বাসা থেকে বের হয়ে যেতে পারছেন না, পারছেন না কারও কাছে গিয়ে সাহায্য চাইতে। এসময়টাতে পুলিশ, হাসপাতাল সবাই করোনাভাইরাস নিয়ে ব্যস্ত। আইন বিষয়ে সহায়তাকারী বিভিন্ন সংস্থাও বন্ধ বা কম কাজ করছে। নির্যাতিত হওয়ার পর অভিযোগ জানানোর কোনও উপায়ই নারীর হাতের কাছে খোলা থাকে না।

এছাড়া এইসময় ঘরে আবদ্ধ পুরুষ অর্থনৈতিক, সামাজিক, চাকরি হারানোর ভয়, ভাইরাস সংক্রমণ ইত্যাদি নানা কারণে হতাশাগ্রস্ত, চিন্তিত এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। তাদের এই নিরাপত্তাহীনতার সকল চাপ ও ক্ষোভ তারা উগড়ে দিচ্ছে তার পাশে থাকা নারী ও শিশুর ওপর। কারণ এটাই সবচেয়ে সহজ উপায় নিজেকে হালকা করার।

আপৎকালীন সময়ে অপরাধীরা মানুষের এই দুর্বলতা, অমনোযোগিতা এবং ঘরবন্দি হওয়ার পরিস্থিতিকে কাজে লাগায়। দুঃসময়ে গৃহ একজন নারী বা শিশুর কাছে সবচেয়ে নিরাপদ হওয়ার কথা। কিন্তু মহামারির সময়কার এই সামাজিক দূরত্বকে পুঁজি করে নারীর ওপর অত্যাচারের হার বাড়িয়ে দিয়েছে, তারই পাশে থাকা পুরুষ।
বাংলাদেশে অধিকাংশ পারিবারিক সহিংসতার ঘটনার কোনও রিপোর্টই হয় না। কারণ পারিবারিক সহিংসতা এমন একটি ঘটনা, যা ঘটিয়ে থাকে পরিবারে থাকা কাছের মানুষ, পাশের মানুষ। যারা নীরবে নিয়মিত অত্যাচার করে কিন্তু সমাজের ভয়ে এসব অত্যাচারের অধিকাংশ কাহিনি বাইরে প্রকাশিত হয় না। পারিবারিক সহিংসতা হতে পারে মানসিক, শারীরিক, যৌন এবং অর্থনৈতিক। লকডাউনের কারণে বাংলাদেশে পারিবারিক সহিংসতার যে ঘটনা ঘটছে, সে বিষয়টি নজরে আনার ব্যাপারে এখনও তেমন কোনও জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বলেই যতদূর জানি।

কোয়ারেন্টিন একজন নারীকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। কারণ নারী নির্যাতন শুরুই হয় বাসা থেকে। এই নির্যাতন মাঝে মাঝে এমন মানুষের দ্বারা ঘটে থাকে যে পরিবারের সম্মানের কথা ভেবে অনেকক্ষেত্রে তা প্রকাশিতও হয় না।

শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্বটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে একটা জেলখানা, যেখানে অবরুদ্ধ নারী ও শিশুর ওপর নির্যাতন করছে পরিবারের শক্তিশালী ব্যক্তি। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মার্চ মাসে প্রকাশিত একাধিক রিপোর্ট ও সমীক্ষা বলছে, করোনার কারণে ঘরবন্দি বহু দেশেই পারিবারিক সহিংসতার ছবিটা একইরকম।

ভারতের লকডাউনের সময় নারী নির্যাতনের ঘটনা উত্তরোত্তর বাড়ছে। গত ২৩ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত জাতীয় মহিলা কমিশনে শুধুমাত্র ইমেইল মারফত ৫৮টি পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগ জমা পড়েছে। ব্যক্তিগতভাবেও অনেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন বলে জানিয়েছেন অল ইন্ডিয়া প্রগ্রেসিভ উইমেনস অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক কবিতা কৃষ্ণণ। তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত যারা যোগাযোগ করেছেন তাদের প্রত্যেকেই একটা কথা বলেছেন, লকডাউন ঘোষণা হবে জানলে সময় থাকতে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসতেন তারা। লকডাউনের জেরে পরিস্থিতি চরমে পৌঁছেছে।’

‘কোয়ারেন্টিন চলাকালে নারী হত্যাও বন্ধ হয়নি, থামেনি আমাদের ক্রোধ। এজন্যই জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা আর্জেন্টিনায় একটি জরুরি ইস্যু’ কথাগুলো বলেছেন সেখানকার নারীবাদী নিউনা মেনস। গত ২০ মার্চ শুরু হওয়া এই কোয়ারেন্টিনে বুয়েন্স আয়ার্সে ছয় জন নারী নিহত হয়েছে। সাংঘর্ষিক অবস্থায় লকডাউনে থাকায় এই সংখ্যা আরও বাড়বে বলে মনে করে নাউ দ্যাট দে সি আস নামের একটি মানবাধিকার গ্রুপ। তারা জানিয়েছে, মার্চেই নিহত হয়েছেন ২৪ জন, অর্থাৎ প্রতি ২৯ ঘণ্টায় ১ জন।

পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীর জন্য কোনও দেশই নিরাপদ নয়। কোয়ারেন্টিন তাদের নির্যাতনকারীর একেবারে কাছাকাছি নিয়ে গেছে। শুধু ভয়ংকর ভাইরাস নয়, এই অবস্থা নারীকে এমন এক পৃথিবীর কাছে নিয়ে গেছে, যেখানে অধিকাংশ দরজাই তার জন্য বন্ধ।

বিশ্বব্যাপী নারী আন্দোলনকর্মীরা বলছেন যে পারিবারিক সহিংসতা ভয়াবহভাবে বেড়েছে চারিদিকে। যুক্তরাষ্ট্রও এর বাইরে নয়। সেখানে জাতীয় পারিবারিক সহিংসতা বিষয়ক হটলাইনে ১০ থেকে ২৪ মার্চের ভেতর অসংখ্য ফোন এসেছে। নির্যাতিতারা বলছেন নির্যাতনকারীরা তাদের বাড়ি ছেড়েও যেতে দিচ্ছে না, আবার অত্যাচারও চালিয়ে যাচ্ছে। ভিকটিমকে সহযোগিতাকারী নিউইয়র্ক ভিত্তিক প্রোগ্রাম সেইফ হরাইজন বলেছে, পরিবারিক সহিংসতার শিকার মেয়েরা কখনও ফোনই ধরতে পারে না। আমেরিকাতে চ্যাট সার্ভিস ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে ভিকটিমদের জন্য।

১৭ মার্চ থেকে লকডাউনে রয়েছে ফ্রান্স। তার ১১ দিন পরে সে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ফ্রান্সে পারিবারিক নির্যাতন ৩০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছে। রাজধানী প্যারিসে পরিসংখ্যানটা আরও বেশি, ৩৬ শতাংশ। ফরাসি সরকার ভিকটিমদের বলেছে সরাসরি ফার্মেসিতে সাহায্য চাইতে। ফার্মেসি পুলিশকে জানাবে।

ফরাসি অভ্যন্তরীণ (ইনটেরিয়র) মন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, ১৭ মার্চ কোয়ারেন্টিন শুরু হওয়ার পর পারিবারিক সহিংসতার হার বেড়েছে। জাতীয়ভাবে পুলিশের ইন্টারভেনশন বেড়েছে ৩২ ভাগ। অনেক হোটেল রুম কম টাকায় দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যেন ভিকটিমরা নিরাপত্তার সঙ্গে কোয়ারেন্টিনে থাকতে পারে। ফ্রান্সের ইকুয়ালিটি মন্ত্রী অনুরোধ করে বলেছেন, বাইরে করোনার বিপদ। কিন্তু যখন আপনি ভেতরেও বিপদের মুখোমুখি, কেউ আপনাকে অপমান করছে, মারছে, ধর্ষণ করছে, হত্যার হুমকি দিচ্ছে, তখন অবশ্যই আপনার বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার অধিকার আছে।

ইতালিতে যদিও কোনও পরিসংখ্যান নেই, কিন্তু নির্যাতিত নারীদের সাহায্যকারী সংস্থা ইভা কোঅপারেটিভা এনবিসি নিউজকে জানিয়েছে, নির্যাতিতদের কাছ থেকে অনবরত ইমেইল এবং হোয়াটস অ্যাপে বার্তা পাচ্ছেন তারা। অনেকে যোগাযোগও করতে পারছে না। সরকারি সংস্থা টেলিফোনো রোসাও বলেছে, আমরা বুঝতে পারছি অনেক সহিংসতা চলছে। ইতালির সরকার সেজন্যই একটা নতুন অ্যাপ খুলেছে যেখানে ফোন না করেও সাহায্য চাওয়া যাবে। এমনকী শিশুরাও মাঝেমাঝে পরিবারের অত্যাচারের চিত্র সহ্য করতে না পেরে ফোন করে।
স্পেনে পারিবারিক সহিংসতা বেড়েছে লকডাউন পিরিয়ডে। স্পেনে নারীরা ওষুধের দোকানে গিয়ে মাস্ক ১৯ বললে বোঝা যাবে তার সাহায্যের দরকার। ব্রিটেনে জাতীয় পারিবারিক নির্যাতন বিষয়ক হেল্পলাইন জানিয়েছে ফোনে অভিযোগ আসার পরিমাণ বেড়েছে ২৫ ভাগ, ওয়েবসাইটেও অভিযোগ আসছে দ্বিগুণ।
মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকার অধিকাংশ বিবাহিত নারীর চারভাগের একভাগের জন্য প্রতিদিন সহিংসতার শিকার হওয়া নতুন কোনও ঘটনা নয়। গত বছর প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে বলা হয়েছে ইয়েমেন, মরক্কো এবং মিশরে নারীরা নিয়মিতভাবে স্বামীদের দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছেন।
এই কিছুদিন আগে তিউনিসিয়ার নারী বিষয়ক মন্ত্রী আসমা সিরি বলেছেন, করোনার কারণে মধ্য মার্চে কারফিউ জারির পর এখানে পারিবারিক নির্যাতন ৫ গুণ বেড়ে গেছে। লেবানন ও মালয়েশিয়াতেও গতবছরের তুলনায় এবছর এইসময় পারিবারিক সহিংসতার হার দ্বিগুণ হয়েছে।

চীনের একজন মানবাধিকার কর্মী গুয়া জিং বলেছেন গত নভেম্বরে উহানে তিনি নিজেই অনেক কিশোর-তরুণ বয়সী ছেলেমেয়ের কাছ থেকে টেলিফোনে অভিযোগ পেয়েছেন যে তারা তাদের বাসায় ক্রমাগত বাবা মায়ের মধ্যে বিরোধ দেখতে পারছে। ঠিক কোথায় যেতে হবে তারা বুঝতে পারছে না।
চীনা সামাজিক মাধ্যমে পারিবারিক সহিংসতার কথা বারবার উঠে এসেছে। #মহামারিকালে পারিবারিক সহিংসতা# নিয়ে প্রায় ৩০০০ বার আলোচনা হয়েছে। তিনি মনে করেন ‘এরকম একটা সময়ে পুলিশের উচিত হবে না মহামারির কারণ দেখিয়ে নারী নির্যাতনের বিচার ফেলে রাখা।’
ইউএন উম্যান খুবই উদ্বিগ্ন এই ভেবে যে এই মহামারির ধাক্কা সামলে উঠতে গিয়ে দেখা যাবে নারী বিষয়ক ক্রিটিক্যাল ইস্যু থেকে বিভিন্ন দেশে ফান্ড চলে যাবে অন্যদিকে। নারী কাজ হারাবে, বাড়বে আরও নির্যাতনের হার।
যখন মানুষ কোন দুঃসময়ের ভেতর দিয়ে যায় এবং কোথাও বন্দি হয়ে থাকে তখনও কিন্তু একজন অত্যাচারীর প্রকৃত চেহারা ঢাকা পড়ে যায় না। যারা নারী ও শিশুর ওপর অত্যাচার ও নির্যাতন করে অভ্যস্ত তারা এই কাজ চালিয়েই যেতে থাকে। বরং এই সময়টাকে তারা নিরাপদবোধ করে। সেদিন ত্রাণ নিতে গিয়ে ১০ বছরের একটি শিশু কেরানীগঞ্জে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এরকম একটি দুর্যোগের মধ্যেও ধর্ষণের শিকার হয়েছে আরও এক প্রতিবন্ধী নারী। রাজশাহী এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এরমধ্যেও আইইডিসিআরের হটলাইনে ফোন করে নারী চিকিৎসকদের আজেবাজে কথা বলার মতো যৌন নিপীড়কও আছে।
কাজেই দুনিয়াজুড়েই নারী বাইরে মহামারি এবং ঘরে মারামারির শিকার হচ্ছে। নারী এই মহামারি আতংকের মধ্যে বসবাস করেও, সংসারের সকল দায়িত্ব পালন করেও, অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়ার পরও ঘরে-বাইরে বিপদের মধ্যে রয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে নারী নির্যাতনের বিষয়টির প্রতি দৃষ্টিপাত করা হলেও, বাংলাদেশে সেইভাবে কোনও রিপোর্ট উঠে আসছে না ।

লেখক: কমিউনিকেশন অফিসার, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন

 

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ