করোনার চেয়েও ভয়ঙ্কর ব্যাধি ধেয়ে আসছে ইউরোপে

Send
দাউদ হায়দার
প্রকাশিত : ১৩:০৫, এপ্রিল ২০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:০৯, এপ্রিল ২১, ২০২০

দাউদ হায়দারআজ হোক কাল হোক কিংবা একমাস-দুইমাস-তিনমাস পাঁচ-ছয়মাস পরে হোক, করোনাভাইরাস খতম করার টিকা-বড়ি-ওষুধ, ফর্মুলা বেরুবে। ততদিনে লোকসংখ্যা ক্ষয়, অর্থনৈতিক ধস তো আছেই। এই ক্ষয় ও ধসে বিশ্বের বহু দেশ দিশেহারা হবে, মুখ থুবড়ে পড়বে। উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতাও থাকবে না। ধনী দেশ থেকে আর্থিক সাহায্যের পরিমাণ বিপুল হ্রাস পাবে। বেকারত্ব বাড়বে শনৈ শনৈ। ছোট-মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লুপ্ত হতে পারে। লক্ষণ এমনই। সবচেয়ে বড় বিপদ পর্যটন শিল্পে। বহু দেশই পর্যটন শিল্পে নির্ভরশীল। যেমন মালদ্বীপ।
করোনাভাইরাসে আরও মারাত্মক মানসিকতার বিপর্যয়। বেকার (মূলত শ্রমিক, কৃষিজীবী) কী করে বাঁচবে, কোথায় আশ্রয় পাবে? সরকারি সাহায্য, ভাতাও সংকুচিত হবে। জীবনধারণ অসম্ভব। তখন? জার্মানির বহুমান্য সাপ্তাহিক ‘ডিৎসাইট’ বলছে, ‘উন্মাদগ্রস্ত হবে। পরিবারে ভাঙন। নর-নারীর প্রেম সম্পর্ক ছিন্ন। ক্রাইমও বাড়বে। সামাল দেওয়া দুষ্কর।’
ঘটনা এখানেই শেষ নয়, দুর্ভিক্ষের কবলে নানা দেশ বিধ্বস্ত হবে। ‘আভাস’ নাকি ক্রমশ স্পষ্ট। বিশ্ব ব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলেরও (IMF) অত টাকা নেই দেশের পর দেশকে ‘মজবুত’ করা। ডলার-পাউন্ড-ইউরো ছাপিয়ে বিতরণ করলেও সুরাহা হবে না, টাকার অবমূল্যায়ন হতে বাধ্য। এবং তা কল্পনাতীত।

জানেন নিশ্চয়, ১৯২৩ সালে, এতটাই ইনফ্লেশন, ৫ মিলিয়ন ডয়েচ মার্ক দিয়েও এক কিলো আলু পাওয়া যেতো না।

ক্লারা ক্রিস, যৌনকর্মী (বার্লিনের), ডায়েরিতে লিখেছেন (প্রকাশিত অগাস্ট ১৯৫৮), ‘এক খদ্দেরকে বললুম দশ মিলিয়ন ডয়েচ মার্ক চাই না। এই জঞ্জাল কোথায় রাখবো, জায়গা নেই ঘরে। বদলে দুই কিলো আলু দাও, আপাতত খেয়ে বাঁচি।

ক্লারার কাহিনি হয়তো অনেকেরই আমাদের অজানা। ইউরোপের সব দেশেই অল্পবিস্তর ক্লারা আছে। যারা ভ্রামণিক, পূর্ব ইউরোপ থেকে, তিন মাসের জন্য, ট্যাক্স ফাঁকি দেন। ধরা পড়লে আম গেলো ছালাও গেলো।

জার্মানির নথিভুক্ত ক্লারারা সরকারকে ট্যাক্স দিতে বাধ্য। স্বাস্থ্যবিমাও দিতে হয়। যৌবন চলে গেলে, আয় না করলে, অর্থাৎ ‘কাজ’ না করলে, ৬৫/৬৭ বয়স হলে, ট্যাক্সের হিসাব অনুযায়ী পেনশনও পাবে।

করোনা পর্বে কাজ নেই, ক্লারাদের দাবি, ৬০ ভাগ অর্থ দিতে হবে। অবশ্য, ট্যাক্সের কাগজ, আয়ের হিসাব সরকারকে দেখাতে হবে।

করোনায় ইউরোপের ভবিষ্যৎ কি বিপদগ্রস্ত, ভাঙন অবধারিত? বিচ্ছিন্নতার আলামত ক্রমশ ঘন হচ্ছে। রাজনৈতিক বিভাজন ইতিমধ্যেই। অর্থনৈতিক প্রশ্ন তো আছেই। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ছোট দেশগুলোর (তথা গরিব দেশ) অবস্থা কাহিল থেকে কাহিলতর।

করোনার কারণে ইইউ (ইউরোপীয় ইউনিয়ন)-এর ধনী দেশগুলো থেকে আড়াই লাখ বুলগেরিয়ান শ্রমিক ফিরে গেছে। অন্যান্য দেশ থেকেও। সব মিলিয়ে দেড় মিলিয়নের বেশি। কতজনকে কী পরিমাণ সাহায্য করবে? এদিকে ট্যাঁকে টান পড়ছে। ইইউ এখনই প্রায় দিশেহারা। সামাল দেওয়া কি সহজ হবে? ইইউ বলছে, ‘ম্যানেজ’ করবে অচলাবস্থা কেটে গেলেই। কিন্তু কীভাবে ম্যানেজ করবে, কচকচানি ছাড়া আর কোনও বাতেলা নেই মুখে। অর্থনৈতিক মন্দাই মহাবিপদ ডেকে আনছে। এদিকে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। জাতীয়তাবাদী তথা উগ্র চরমপন্থীরা (ডানপন্থী) হেলেদুলে উঠছে, মাথা চাড়া দিচ্ছে। করোনার সুযোগ বুঝে কোপ। স্পেন ও ইতালির ঘোরতর আশঙ্কা, করোনার পরেই ডানপন্থীদের আস্ফালন বেড়ে যাবে, বলবে, করোনা চোখে কাঁটা বিঁধিয়ে দেখাবে ইইউর ঐক্য মূলত ফালতু। কেউ বিপদে পাশে নেই। প্রত্যেকে স্বার্থপর। নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত। আমরা বাদ কেন?

অতএব, ইইউ থেকে সটকে পড়ো, নিজের দেশের মানুষের আখের গড়ো। দেখতেই পাচ্ছো, ইইউর সব দেশই নিজেদের স্বার্থ দেখছে। সাথেপাছে নেই। ভবিষ্যতে আরও দেখবে।

লক্ষ করছি আমরা, সব দেশের (ইইউ) মধ্যে সম্পর্ক তথা পিরিত আগের মতো নেই, ফাটল ঘন হচ্ছে। আরও হবে। ইইউর মন্ত্রী, নীতিনির্ধারকদের মধ্যেই বিভাজন লক্ষণীয়। স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, ব্যবসা, সীমান্ত রক্ষণাবেক্ষণে জাতীয় মাতব্বরদের কুক্ষিগত।

ইসিবি (ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংক) ৭৫ হাজার কোটি ইউরোর বন্ড কেনার প্রকল্প জারি করলেও (স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি এখনই চাইছে বন্ড চালু করুক), সুরাহার পথ কী, নির্দেশিত নয়।  বন্ডের ব্যাপারে জার্মানি ইংল্যান্ডসহ উত্তর ইউরোপ রাজি নয়। টালবাহানা করছে। বলছে বন্ড প্রকল্প চালু করলেই বেকারত্ব, ছোট মাঝারি শিল্প চালু করা চটজলদি সহজ হবে না যে, ইইউর গরিব দেশগুলো ভাঁওতাবাজি ধরে ফেলেছে। ইতালিরও এই সন্দেহ।

যত ঘন হচ্ছে সন্দেহ, চরম জাতীয়তাবাদী দক্ষিণপন্থিরা সুযোগের সদ্ব্যবহারে মরিয়া। ইতালির উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতা মাত্তেও সালভিনি খুব জোরেশোরে বলছেন, ইতালিকে ইইউ থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে। আপনাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে হবে না, অন্ধ চোখেও দেখছেন করোনা দুর্যোগে ইইউর মতলব, দুরবস্থায় আমাদের পাশে রক্ষাকর্তা নেই।

ইতালির আগামী নির্বাচনে সালভিনির পাল্লা ভারী হচ্ছে। জয়ী হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। জার্মানির আ এফ ডে (A F D), বা, অলনেটিভ ফ্যুয়র ডয়েচল্যান্ড মাত্তেও সালভিনির ঢেঁকুর উগড়েচ্ছে।

এখানেই শেষ নয়, আরও  সূক্ষ্ম ঘটনার ক্রমবিকাশ। উদ্বাস্তু, বিদেশির প্রতি ঘৃণা দানা বাঁধছে। অনুন্নত দেশগুলোকে আর্থিক সাহায্য বন্ধের চাপ আসছে। চাপ দিচ্ছে জাতীয়তাবাদীরা। করোনার চেয়েও আর ভয়ঙ্কর ব্যাধি ঘনায়মান, ধেয়ে আসছে ইউরোপে। মানবিকতায় চিড় ধরছে। মানসিকতায় অসহিষ্ণু এর-ওর দিকে ত্যাড়া নজর।

জার্মানির বহুমান্য সাপ্তাহিক ডিৎসাইট-এর এক প্রতিবেদনে আশঙ্কা, করোনার প্রাদুর্ভাবে বেকার, দারিদ্র্য, দেউলিয়া এমনকি বিচ্ছেদ, সংসার, সমাজের বিরাট জনগোষ্ঠীর মনমানসিকতায় তীব্র আঘাত হানবে। করোনার চেয়েও ভয়াবহ।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

 

 

/এসএএস/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ