ত্রাণ চুরি কি দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচনের খেসারত?

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৬:৪৫, এপ্রিল ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:১৭, এপ্রিল ২১, ২০২০

আনিস আলমগীরত্রাণ চুরির হিড়িক পড়েছে দেশে। প্রতিদিনের সংবাদে কোথাও না কোথাও ত্রাণের চাল চুরির দায়ে স্থানীয় সরকারের কোনও না কোনও স্তরের প্রতিনিধির নাম আসছে। মানে যাদের ত্রাণ বিতরণ করতে দিয়েছে সরকার, তারাই ত্রাণ আত্মসাৎ করছে। আবার সরকারও ছাড় দিচ্ছে না, ধরে ধরে জেলে দিচ্ছে। কিন্তু তারপরও চুরি থামতে দেখছি না। সর্বশেষ সরকার ৬৪ জেলায় ৬৪ সচিবকে তদারকির দায়িত্ব দিয়েছেন। তাতে কি থামবে নাকি গলদ অন্যখানে?
একটা কথা পরিষ্কার—এভাবে ত্রাণ চুরি চললে করোনায় বুভুক্ষু মানুষ কখনও লকডাউন বা তালাবন্দি থাকার নির্দেশ মানবে না। বরং তারা চাল চোরদের এমন অমানবিক কর্মকাণ্ড রুখে দাঁড়াবে। এই চোরেরা প্রায় সবাই সরকারি দলের নেতা। বিএনপি নেতাদের এমনিতেই স্থানীয় সরকারে পাওয়া যাচ্ছে না। এরমধ্যেও চুরিতে তারাও পিছিয়ে নেই। এখন শান্তি-শৃঙ্খলা মেনে চলার সময়, আন্দোলনের সময় নয়। আফ্রিকার এক মহিলা বলেছেন, রাখো তোমার লকডাউন, না খেয়ে মরার চেয়ে করোনায় মরা ভালো। শুধু ওই মহিলা নয়, তৃতীয় বিশ্বের পিছিয়ে পড়া মানুষদের সবাই এমনটি বলবে এখন।
ত্রাণ আত্মসাৎকারীদের একটি সহজ কথা বলি—মানুষের প্রাণ বড় কঠিন। সে বাঁচার শেষ চেষ্টা না করে থাকতে পারে না। সুতরাং চুরি করে আপনারা বুভুক্ষ মানুষকে উত্তেজিত করার চেষ্টা থেকে বিরত থাকুন, নয়তো আপনারা তাদের রুদ্ররোষের সম্মুখীন হবেন। যে পুলিশ আপনাদের ধরে এখন জেলে দিচ্ছে, তারাও রোষ থেকে বাঁচাতে পারবে না। আপনারা যদি অভাবী মানুষ হন, আপনারা সৎভাবে ত্রাণ নিন। বস্তা বস্তা চাল চুরি করবেন কেন! সরকারি ত্রাণ এবং ন্যায্যমূল্যের চালের বস্তা পাল্টিয়ে বাজারে বিক্রি করবেন কেন!

এখন সারা বিশ্ব এক মহাদুর্যোগের সম্মুখীন। মানব সভ্যতা করোনাকে উত্তরণ করতে পারবে নাকি করোনায় তার পতন হবে—আজ সেই প্রশ্নও উঠেছে। পৃথিবীর এমন ক্রান্তিলগ্নে আপনারা ভুখা মানুষের ত্রাণের চাল আত্মসাৎ করছেন, এর চেয়ে হীনতম কাজ আর কী হতে পারে! আল্লাহর ওয়াস্তে আপনারা এই কুকর্ম থেকে বিরত হোন। বিক্ষুব্ধ মানুষের লাঠিপেটা খেয়ে প্রাণ হারানো হবে সবচেয়ে ঘৃণ্য পরিণতি।

প্রশ্ন উঠতে পারে ত্রাণ চুরি এই দেশে নতুন কী! চুরি প্রতিরোধ করাও সম্ভব হতে দেখিনি আমরা। মুসলিম লীগ, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টির শাসন দেখেছে এই দেশের মানুষ। কারও কর্মীরা যুধিষ্ঠির বরপুত্র পরিচয় দেয়নি। বরং বিএনপির আমলে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের মানে চেয়ারম্যানদের বাদ দিয়ে বিএনপির ইউনিয়ন সভাপতি-সেক্রেটারি বা অন্য নেতাদের নেতৃত্বে ত্রাণ বিতরণ করতে দেখেছি।

১৯৯১ সালে ঈদুল ফিতরের সময় বিনামূল্যের সরকারি চিনি বিতরণ করেছিল বিএনপির ইউনিয়ন নেতারা। সংসদ অধিবেশনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখা হলে আমি চট্টগ্রামে আমাদের এলাকার বিএনপি দলীয় এমপির কাছে বিষয়টি জানতে চেয়েছিলাম—স্থানীয় সরকারকে বাদ দিয়ে এটা করা হচ্ছে কেন (আমার বড় ভাই তখন আমাদের ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এবং ঈদে বাড়ি গিয়ে বিষয়টি আমার চোখে পড়েছিল)? তিনি খুব বিশ্রী জবাব দিয়েছিলেন। সুশ্রী করে বললে অর্থ দাঁড়ায়—চেয়ারম্যানরা সেই চিনি আওয়ামী লীগ আর হিন্দুদের দিয়ে দেবে, তাই।

আমার জন্মের আগে থেকে ঘরে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি থাকায়, ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন, পরিষদের কার্যক্রম, পরিষদের প্রতিনিধিদের দায়-দায়িত্ব আমি দেখে দেখে বড় হয়েছি। স্থানীয় সরকার নির্বাচন মানেই সরকার দলের প্রার্থীদের বাড়তি সুবিধা। তারপরও নির্বাচনে লড়তেন সমাজের নেতৃস্থানীয় লোকেরা এবং তাদের মধ্য থেকে জনপ্রিয়তা, সরকারি দলের আনুকূল্য মিলিয়ে যোগ্য প্রার্থীরা নির্বাচিত হতেন। ভোট কারচুপি হতো, কিন্তু ডাকাতি ছিল না। এরশাদ আমল থেকে সরকারের বাকি নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচন ভোট ডাকাতির দিকে চলে যায়। জোর যার কেন্দ্র তার—এভাবে গুণ্ডা -হোন্ডা, ককটেল-বোমা দিয়ে নির্বাচনে বিজয় সাধারণ বিষয় হয়ে পড়ে। খালেদা জিয়ার ১৯৯১ সালের আমল থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্রমশ কারচুপি, কেন্দ্র দখল প্রাতিষ্ঠানিকতা পায়। জৌলুস হারাতে থাকে এবং সর্বশেষ শেখ হাসিনা সরকারের গত আমলে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা চূড়ান্ত অধপতনে পতিত হয়।

সমাজে আর কোনও ভদ্রলোকের দলমত নির্বিশেষে মানুষের ভালোবাসায় নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। গভীরভাবে দেখলে আইনগত বাধা না থাকলেও সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নির্বাচনে লড়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। দলীয় মনোনয়ন যারা পাবেন, তারাই নির্বাচিত হবেন—এটা নির্বাচনের আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। সরকার দলের প্রার্থীদের বেলায় এটা আরও সত্যি হয়ে দেখা দেয়। স্থানীয় এমপিদের পছন্দের প্রার্থীরা চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন পায়, তারা হয়তো ইউনিয়নে দলের সভাপতি-সেক্রেটারি বা প্রভাবশালী পদধারী কেউ। যাদের টাকা আছে তারাই এমপির আনুকূল্যে নির্বাচনি মনোনয়ন পান। অনেক স্থানে আইয়ুব খানের বেসিক গণতন্ত্র স্টাইলে দলীয় কাউন্সিলরদের ভোটে চেয়ারম্যান প্রার্থী নির্ধারিত হন।  আর কাউন্সিলরদের উচ্চমূল্যে কিনে দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত করে সিংহভাগ চেয়ারম্যান প্রার্থী।  
বর্তমানে ৬৪টি জেলায় জেলা পরিষদ, উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা পরিষদ এবং গ্রাম এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদ, ছোট শহর এলাকায় পৌরসভা ও বড় শহরে সিটি করপোরেশন মিলিয়ে স্থানীয় সরকারে ৬০ হাজারের বেশি জনপ্রতিনিধি রয়েছেন। এদের সিংহভাগই হচ্ছেন সরকার দলীয়। তার মধ্যে বর্তমান ৪ হাজার ৫৫৪টি ইউনিয়ন পরিষদের সিংহভাগ চেয়ারম্যান একাধারে ইউনিয়ন বা উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা, আবার ইউপি চেয়ারম্যানও। মেম্বার নির্বাচন দলীয় মার্কায় হয়নি, কিন্তু সেখানকার চিত্রও একই। কারণ, নির্বাচন প্রক্রিয়াটিই দলীয় ভিত্তিতে হয়েছে। এখন এসব নেতা দল চালানোর টাকা কই পাবেন! দলীয় নেতৃত্ব ধরে রাখার জন্য টাকা খরচ কোথা থেকে করবেন! নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় যে বিনিয়োগ তারা করেছেন তা ত্রাণ চুরি, অন্যান্য উন্নয়ন কাজের টাকা চুরি করা ছাড়া কীভাবে তুলবেন! অনেকে ভাবছেন আওয়ামী লীগ তো টানা ১১ বছর ক্ষমতায়, টাকার কি তাদের অভাব আছে? হ্যাঁ আছে, কারণ দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিরা এখনও পাঁচ বছর পার করেননি।

যখন ইউনিয়ন পরিষদকে দলীয়করণ করা হয়েছিল, তখনও আমি এর বিরুদ্ধে লিখেছি। টকশোর সাবজেক্ট করেছি এবং সরকারকে বলেছি দেশ শাসনের এই নিম্ন স্তরকে দলের ঊর্ধ্বে রাখুন। নয়তো সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। আজ তা-ই হয়েছে। ঘরে ঘরে, পাড়ায় পাড়ায় দলীয় ভিত্তিতে বিভক্তি। দলের পরিচয়টাই সমাজে বড় হয়েছে। গুণ্ডা, অশিক্ষিতরা সমাজের নেতৃত্ব নিয়েছে, সমাজপতিরা বিলীন হয়ে গেছে। গ্রামভিত্তিক সমাজ কাঠামোর পুরোটাই ভেঙে গেছে।

দলীয়করণের এই পরিণতিটা সরকার এবং আমলাতন্ত্রের উচ্চস্তরে বসা লোকেরা এখনও বুঝছেন কিনা তা জানি না। তবে দেশবাসী বুঝছেন যে সংঘবদ্ধভাবে ত্রাণের ওপর লুটেরাদের নজর পড়েছে সেই কারণে। সুতরাং গরিবের এখন বেঁচে থাকা দায় হবে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ মরিয়া হয়ে ওঠে। গরিবের কোনও ভয় থাকে না। হারাবার কিছু থাকে না। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে যারা ধ্বংস করেছেন আপনারা কেউ রাতারাতি নেতা হয়েছেন, কেউ উজির হয়েছেন। আপনাদের এখন সচেতন হওয়ার সময়। করোনা দীর্ঘায়িত হলে আর চুরি অব্যাহত থাকলে আপনারা আটলান্টিক মহাসাগরে ডুব দিয়েও মজলুম মানুষের রোষানল থেকে বাঁচতে পারবেন না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করবো যেন ইউনিয়ন পরিষদ দলীয়করণ ব্যবস্থা বাতিল করে দেন। কারণ, দলীয়করণের আগে ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার, চেয়ারম্যান, পৌরসভার চেয়ারম্যানরা (এখন মেয়র) ন্যূনতম সততা মেনে চলতেন। এখন তা শূন্যের কোঠায়। যিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র—তিনিই এলাকার রাজনৈতিক দলের প্রেসিডেন্ট, নয় সাধারণ সম্পাদক, নয়তো বড় নেতা। একদিকে দলীয় ক্ষমতার দাপট, অন্যদিকে সরকারের দেওয়া প্রশাসনিক ক্ষমতা—দুটোই তার হাতে। দুর্নীতি করে তা আড়াল করার সুযোগও তাই তাদের বেশি, জবাবদিহির পরিমাণ তাই কম। খুব বেকায়দায় না পড়লে দলকেও তার কৃতকর্মের পক্ষে সাফাই গাইতে হয়। আর অসহনীয় হলে কেন্দ্রীয় নেতারা চোরের কোনও দল নেই বলে যে বাণী দেয়—মানুষ এখন তা বিশ্বাস করে না।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

[email protected]

 

/এসএএস/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ